
কক্সবাজারের মাতারবাড়ীতে ভাসমান এলএনজি টার্মিনালের কারিগরি ত্রুটির কারণে দেশে গ্যাস সরবরাহে বড় ধরনের বিপর্যয় দেখা দিয়েছে। এই ত্রুটির ফলে জাতীয় গ্রিডে দৈনিক প্রায় ৪৫০ মিলিয়ন ঘনফুট (এমএমসিএফডি) গ্যাস সরবরাহ কমে গেছে। সবচেয়ে বড় ধাক্কা লেগেছে সিএনজি ফিলিং স্টেশন, বাসাবাড়ির রান্নাবান্না এবং দেশের শিল্প খাতে। যানবাহনচালকরা ঘণ্টার পর ঘণ্টা লাইনে দাঁড়িয়েও গ্যাস পাচ্ছেন না। অনেকে হতাশ হয়ে খালি সিলিন্ডার নিয়েই ফিরে যাচ্ছেন। এতে যানবাহন চলাচল ব্যাহত হওয়ায় বেড়েছে সাধারণ যাত্রীদের ভোগান্তি। গ্যাসের চাপ কমে যাওয়ায় রাজধানীর বেশ কিছু এলাকায় গ্যাসের চুলা জ্বলছে না, আবার অনেক এলাকায় তা টিম টিম করে জ্বলছে। একই কারণে ব্যাহত হচ্ছে শিল্পোৎপাদন, যা অর্থনীতির জন্য বড় উদ্বেগের।
সরকারের মতে, বর্তমান সংকটের প্রধান কারণ এফএসআরইউটির কারিগরি সমস্যা এবং এটি দ্রুত সমাধানে কাজ চলছে। এই সমস্যার জন্য কেবল একটি দুর্ঘটনাকে দায়ী করা চলে না। এর পেছনে রয়েছে দীর্ঘদিনের গ্যাস আমদানিনির্ভরতার এক তিক্ত বাস্তবতা। দেশীয় গ্যাস অনুসন্ধান ও উৎপাদনে প্রয়োজনীয় গুরুত্ব না দেওয়ায় আমদানি করা এলএনজির ওপর নির্ভরতা ক্রমশ বাড়ছে। ফলে আমদানি অবকাঠামোর কোনো একটি অংশে সামান্য সমস্যা দেখা দিলেই পুরো জাতীয় গ্যাস সরবরাহব্যবস্থার ওপর বড় ধরনের চাপ সৃষ্টি হয়। একটি ভাসমান টার্মিনালের ত্রুটির কারণে যখন গ্যাস সরবরাহে বিপর্যয় দেখা দেয়, দেশের স্বাভাবিক জনজীবন ব্যাহত হয় ও শিল্প খাত স্থবির হয়ে পড়ে, তখন তাকে একটি মাত্র দুর্ঘটনা বলে হালকা করে দেখার সুযোগ থাকে না। যেকোনো ব্যবস্থায় কারিগরি ত্রুটি হতেই পারে, তবে এ কারণে গোটা দেশে যানবাহন চলাচলে অচলাবস্থা, শিল্পোৎপাদন ব্যাহত হওয়ার মতো পরিস্থিতি মেনে নেওয়া যায় না। এর জন্য বিকল্প পথের সন্ধান অবশ্যই করতে হবে আমাদের।
গ্যাসের অভাবে শিল্পকারখানায় উৎপাদন বন্ধ থাকলে তা যেমন রপ্তানি আয়ে নেতিবাচক প্রভাব ফেলে তেমনি পণ্যসংকটের অজুহাতে অসাধু ব্যবসায়ীরা মূল্য বৃদ্ধির পাঁয়তারার সুযোগ পেয়ে যায়। রাজধানীসহ দেশের বিভিন্ন এলাকায় সাধারণ মানুষের নিত্যদিনের রান্নাবান্নার বিষয়টি গ্যাসের ওপর নির্ভরশীল। গ্যাসসংকট দেখা দিলে ভয়াবহ ভোগান্তিতে পড়ে এসব এলাকার বাসিন্দা। তাদের হাতে রান্নাবান্না করার অথবা শিশু, বৃদ্ধ বা অসুস্থদের মুখে সময়মতো খাবার দেওয়ার বিকল্প সুযোগ অনেক সময় থাকে না। এতে সাধারণ মানুষের দুর্ভোগ যেমন বাড়ে, তেমনি হতাশাও বাড়ে। সরকার এই মুহূর্তে কারিগরি সমস্যা সমাধানে ব্যস্ত থাকলেও কর্মকর্তারা বলছেন, এটি সময়সাপেক্ষ। তাই এই গ্যাসসংকটের তাড়াতাড়ি অবসান হবে, এমনটি ধারণা করা যাচ্ছে না। এমন পরিস্থিতিতে সব মহলের ধৈর্যধারণ যেমন অপরিহার্য, তেমনি অপরিহার্য বিকল্প পথের সন্ধান। যেকোনো মূল্যে আমাদের গ্যাস আমদানিনির্ভরতা থেকে বেরিয়ে আসার উপায় খুঁজতে হবে।
আমদানিনির্ভরতা না কমলে গ্যাস লাইনে এ ধরনের বিপর্যয় ভবিষ্যতে আবারও যে দেখা দেবে না, তার কোনো নিশ্চয়তা নেই। ভবিষ্যতে এমন পরিস্থিতি এড়াতে দেশীয় গ্যাস অনুসন্ধান ও উৎপাদন বৃদ্ধিতে স্বল্প, মধ্য ও দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা গ্রহণ করা এখন সময়ের সবচেয়ে বড় দাবি। স্বল্পমেয়াদে বিদ্যমান গ্যাসক্ষেত্রগুলোর কার্যক্ষমতা বাড়াতে হবে এবং মধ্যমেয়াদে বাপেক্সকে আধুনিক প্রযুক্তি ও আর্থিক সহায়তা দিয়ে নতুন গ্যাসক্ষেত্র অনুসন্ধানে লাগাতে হবে। দীর্ঘমেয়াদে সমুদ্রে (অফশোর) গ্যাস অনুসন্ধান এবং নবায়নযোগ্য জ্বালানির বিকল্প উৎস সৃষ্টিতে জোর দিতে হবে। নিজস্ব সম্পদের সর্বোচ্চ ব্যবহার নিশ্চিত করতে না পারলে শিল্পোৎপাদন ব্যাহত হওয়ার ঝুঁকি যেমন থাকবে তেমনি ঝুঁকি থাকবে দেশের অর্থনীতিতে কাক্সিক্ষত গতি না পাওয়ার। বিষয়টি গুরুত্ব দিয়ে সরকারকে ভাবতে হবে।
