মঙ্গলবার ৯ জুন ২০২৬
২৬ জ্যৈষ্ঠ ১৪৩৩
জীবনবোধ ও জীবনদর্শন
জুলফিকার নিউটন
প্রকাশ: বুধবার, ২৯ মে, ২০২৪, ১২:০২ এএম |

 জীবনবোধ ও জীবনদর্শন পূর্বে প্রকাশের পর ||
৯৭
শেক্সপিয়ার বিশেষজ্ঞ আনের্স্ট জোনসের বিচারে হ্যামলেট দৃঢ়চিত্ত যুবক বটে, কিন্তু সে এমন এক গভীর গূঢ়ৈষার দ্বারা আক্রান্ত, যাকে সে চেতনার স্তরে আসতে দিতে অনিচ্ছুক, হয়তো অক্ষম (ঊৎহবংঃ ঔড়হবং: ঐবসষবঃ ্ ঙবফরঢ়ঁং)। ফ্রয়েডীয় শাস্ত্রে এই গূঢ়ৈষার নাম ঈডিপাস কমপ্লেক্স। হ্যামলেট তার মা-র প্রতি আশৈশব আসক্ত; জননীর প্রশ্রয়ে তা ক্রমে প্রবলতর হয়েছে; এই আসক্তির ভিতরে নিহিত আছে পিতার প্রতি তার ঈর্ষা এবং মাতাকে একান্ত অধিকারের কামনা এই আসক্তি ও কামনার উদ্গতি ঘটেনি। অবচেতনে তাদের বিরুদ্ধ করার সূত্রে তাদের সঙ্গে জড়িত হয়েছে পাপবোধ এবং শাস্তির ভয়। হ্যামলেটের নির্বেদ, সংশয়, অস্থিরচিত্ততা, প্রতিশোধের দায়িত্বপালনে দীর্ঘসূত্রতা, মৃত্যুভয় ও দুঃস্বপ্নের বারংবার উল্লেখ -সব কিছুর মধ্যে জোন্স্ দেখেছেন এই ঢ়ৈষার উপস্থিতি -যাকে স্বীকার করে নেবার মতো না আছে তার সাহস না সামর্থ্য -এবং যার ফলে সে বিবেকী যন্ত্রণার চাপে বিমূঢ়। তার মগ্ন চৈতন্যে পিতার মৃত্যু এবং মাতার অন্য পুরুষে সংগত হওয়া পূর্বেই কল্পিত এবং দমিত হয়েছিল। ক্লডিয়াস-মৃত পাপের মধ্যে নিজের নিষিদ্ধ কামনার প্রতিফলন তার প্রতিশোধবৃত্তিকে দুর্বল করে। কিন্তু ক্লডিয়াসের ভ্রাতৃহত্যা তাকে গভীরভাবে বিচলিত করেনি যতটা করেছিল তার জননীর ব্যভিচারিতা। যাকে সে অতি সংগোপনে একান্তভাবে নিজের করতে চেয়েছিল সে যখন এত দ্রুত অন্য পুরুষের সঙ্গে ব্যভিচারে লিপ্ত হল, তখন তার মনে হল আত্মহত্যাই কাম্য, বিশ্বজগৎ অর্থহীন।

O that this too too slid flesh would melt....O God, God
How Weary, stale, flat and unprofitable
Seem to me all the uses of this world! (প্রথম অঙ্ক, দ্বিতীয় দৃশ্য)
এমনতর ঠেকবার কারণঃ
Ere yet the salt of most unrighteous tears
Had left the flushing in her galled eyes,
She married, O most wicked speed!....to past
With such dexterity to incestuous sheets.
হ্যামলেট প্রার্থনারত ক্লডিয়াসকে একা পেয়েও তাকে হত্যা করেনি, কিন্তু তারপরেই সে ছুটে গেছে গেরট্রুডের শয়নকক্ষে, এবং সেখানে প্রায় হিংস্রভাবে যে ভাষায় সে তার মাকে আক্রমণ করেছে তা যেন প্রচন্ড আঘাতে বিস্ফোরিত গূঢ়ৈষার চিহ্নবাহী:
You can not call it love; for at your age
The hey-day in the blood is tame..........Rebellious Hell,
If thou canst mutine in a martron’s bones.........
Stewed in corruption, honeying and making love
Over the nasty sty.....
Good night: but go not to my uncle’s bed(তৃতীয় অঙ্ক, চতুর্থ দৃশ্য)
তবুু বিশ্বাস নেই। ব্যভিচারী ভ্রাতৃঘাতী ক্লডিয়াসের কামোদ্দীপনে বিগলিত হয়ে যদি তার জননী সন্তানের গোপন কথা ফাঁস করে দেয় তাই কাটা ঘায়ে নুন ছড়ানো দরকারঃ
Let the bloat king tempt you again to bed;
Pinch wanton on your cheek; call you his mouse;
And let him for a pair of rechy kisses,
Or Paddling in your neck with his damn’d fingers,
Make you ravel all this mater out........
গ্রেরট্রুড-এর চরিত্র যতই ঝাপসা হোক, হ্যামলেটের মানস বিপর্যয়ের একটি প্রধান সূত্র যে মাতা-পুত্রের সম্পর্কের ভিতরে নিহিত, সে বিষয়ে সংশয়ের অবকাশ রাখেন নি।                                                                                  
কিন্তু যতই প্রধানই হোক এটিই যে একমাত্র সূত্র নয় তাও সুনিশ্চিত। যেখানে মূল কাহিনীতে প্রতিশোধ নেবার চেষ্টাই মুখ্য বিষয়, সেখানে শেক্সপীয়রের নায়ক কেন যে সে কাজটিকে ক্রমাগতই নানা অজুহাতে পিছিয়ে দিচ্ছে তার ব্যাখ্যা-সূত্রে বিভিন্ন আলোচক হ্যামলেট চরিত্রের বিভিন্ন দিকের ওপরে আলোকপাত করেছেন। দীর্ঘসূত্রতা ব্যাখ্যার এই সব বিভিন্ন প্রয়াস থেকে   অন্তত একটা কথা স্পষ্ট হয়ে ওঠে যে হ্যামলেট চরিত্র অন্যান্য “রিভেঞ্জ ট্র্যাজেডি”-র নায়কদের মতো কোনও একটি সহজ,সরল আদলে কল্পিত হয়নি, যে এই নায়কের ব্যক্তিতায় বিবিধ, কখনও কখনও বিপরীতমুখী, প্রবণতা সক্রিয়। দীর্ঘদিনের চর্চা সত্ত্বেও হ্যামলেটের আচরণ যে অনেকটা রহস্যময় রয়ে গেছে, তার চরিত্র নিয়ে জল্পনা-কল্পনার যে আজও অন্ত নেই, তার অন্তত একটা কারণ এই বহুমুখী প্রবণতা। অনেকে যেমন তার দার্শনিকতা, সুবেদিতা, নীতিবোধ এবং কল্পনাশক্তির ভূয়সী প্রশংসা করেছেন, অপর অনেকে তেমনই তার আত্মকেন্দ্রিকতা, হৃদয়হীনতা, বিকৃত-কামিতা এবং কর্তব্যবিমুখতার নিন্দা করেছেন। আদি-কাহিনীর নায়ক ছিল মধ্যযুগের মানুষ। কিন্তু শেক্সপীয়রের হ্যামলেট রেনেসাঁসের সন্তান। হ্বিটেনবের্গ বিশ্ববিদ্যালয়েল এই তরুণ ছাত্রের চিন্তায় এবং আচরণে অনেকেই দেখেছেন সংশয়বাদী ভাবুক মঁতাইয়ঁ-র গভীর প্রভাব। (Feis, Shakespeare and Montaigne; John Owen, The Five Great Skeptical Dramas of History)| মানুষের আস্তিত্বিক স্ববিরোধ সম্পর্কে শেক্সপীয়রের নায়ক পূর্ণ সচেতন। রেনেসাঁসের দার্শনিক পিকো দেলা মিরান্দোলার প্রতিধ্বনি করে যে হ্যামলেটের উদ্দীপ্ত ঘোষণা: What a piece of work is man! how moble in reason! how infinite in faculties! in form and moving how express and admirable! in action how liæke an angel! in apprehension how liæke a god! the beauty of the world! the paragon of animals! (দ্বিতীয় অঙ্ক,দ্বিতীয় দৃশ্য)
সেই হ্যামলেটের মুখেই বিমূঢ়া কিশোরী ওফেলিয়া শোনে: I am very proud, revengeful, ambitious, with more offences at my beck than I have thoughts to put them in, imagination to give them shape, or time to act them in. What should such fellows as I do crawling between earth and heaven? We are arrant knaves, all; believe none of us.(তৃতীয় অঙ্ক, প্রথম দৃশ্য) হ্যামলেটের ওই আত্মনিন্দাকে সত্য কথন বলে মেনে নিয়ে বিখ্যাত স্প্যানিশ ভাবুক মাদারিয়াগা সিদ্ধান্ত করেন যে মনের গঠনের দিক থেকেই হ্যামলেট যেমন স্বার্থপর তেমনই নিষ্ঠুর, স্বার্থসিদ্ধি ছাড়া আর কিছু সে বোঝে না, তার চারিত্রিক ক্রটিকে সে বাগাড়ম্বরে ঢাকবার চেষ্টা করে। কর্তব্য পালনে সে পরাঙ্খুখ, কারণ তার ঝুঁকি বিস্তর।(S. de Madariage, On Hamlet)|  অপর পক্ষে দুই জার্মান তাত্ত্বিক ওটো রাঙ্ক এবং কুনো ফিশার হ্যামলেটকে ‘কল্পনাবিলাসী’  (Phantasie-mensch) বলে চিহ্নিত করেছেন। হ্যামলেটের কল্পনাশক্তি কর্ম ক্ষমতার চাইতে অনেক বেশি প্রবল; “তার উদ্বেলিত প্যাশন কাজের বদলে কথার মধ্যেই নিঃশেষিত হয়ে যায়।” (Otto Rank, æDas Schauspiel in Hamlet”; Kuno Fischer, Shakespeare’s Hamlet”!)।
বস্তুত হ্যামলেট স্বয়ং নিজেকে ভর্ৎসনা করে বলেছে:
This is most brave, That I the son of a dear father murdered,
Prompted to my revenge by heaven and hell,
Must, liæke a shrew, unpack my heart with words,
And fall
a-cursing, liæke a very drab! A scullion! (দ্বিতীয় অঙ্ক, দ্বিতীয় দৃশ্য)
ফলত হ্যামলেট নাটকে শেক্সপীয়র এমন একটি চরিত্র কল্পনা করেছিলেন কোনও নির্দিষ্ট বর্ণনার ফ্রেমে যাকে ধরতে গেলে তার সামনের পিছনের অনেকটাই বাইরে থেকে যায়। গোয়েটের কথাতেই আমরা আরেকবার ফিরে যাই।
ওফেলিয়ার মুখে আমরা শুনেছি চিত্তভ্রংশ ঘটবার আগে হ্যামলেট ছিল:
The expectancy and rose of the fair state,
The glass of fashion and the mould of form,
The observed of all observes (তৃতীয় অঙ্ক, প্রথম দৃশ্য)
কিন্তু নাটকের দ্বিতীয় অঙ্কের প্রথম দৃশ্যে পিতা পলনিয়াসের কাছে সন্ত্রস্ত ওফেলিয়া সেই বিদগ্ধ নায়কেরই এ কী দশার বিবরণ দেয়:
My lord, as I was sewing in my closet,
Lord Hamlet,-with his doublet all unbraced,
No hat upon his head, his stockings foul’d,
Ungarter’d and down-gyved to his ancle;
Pale as his shirt, his knees knocking each other;
And with a look so piteous in purport
As is he had been loosed out of hell
To speak of horrors-he comes before me.


পলনিয়াসের সুচিন্তিত বিশ্বাস প্রেমে ব্যাহত হবার ফলেই যুবরাজের এই চিত্তভ্রংশ-সরলাবালা ওফেলিয়াও বাপের সিদ্ধান্তে সায় দেয়। কিন্তু গোয়েটে তাঁর উপমাটিকে অনুসরণ করে আমাদের অন্য সূত্রের নির্দেশ দেন। যে মূল্যবান পাত্রটিতে ওকের চারারূপী দায়িত্ব রোপণ করা হয়েছিল তাতে বহুগুণের সমাবেশ ঘটে থাকলেও একটি মুখ্য গুণের মারাত্মক অভাব সব কিছুই বানচাল করে দেয়। হ্যামলেটের ভিতরে চরিত্রের সেই দৃঢ়তা ছিল না যা ঐ গুরুভার দায়িত্ব পালনে অথবা বর্জনে সক্ষম। লেয়াটেস পিতৃহত্যার সংবাদ পাওয়া মাত্র ক্লসিয়াসকে খুন করতে গিয়েছিল। কিন্তু হ্যামলেট তো লেয়ার্টেস নয়। প্রতিশোধের গুরু দায়িত্ব পালন করবার মতো তার মনের গঠন নয়। অথচ সেই দায়িত্ব অস্বীকার করবার মানসিক সামর্থ্যও সে অর্জন করেনি।
নিজের এই অক্ষমতার দুঃসহ চেতনা তার সাময়িক চিত্তভ্রংশ, নাটকব্যাপী দীর্ঘসূত্রতা এবং পরিশেষে ট্র্যাজেডির মূলে।
গোয়েটে যে অভাবের কথা বলেছেন কোলরিজ তার হেতু নির্দেশ করেছেন হ্যামলেটের আত্যন্তিক ভাবুকতায়। (S. T. Coleridge, Lectures on Shakespeare)। হ্যামলেট সব কিছুর কার্যকারণ,ফলাফল, ঔচিত্য-অনৌচিত্য নিয়ে এত বেশি চিন্তানিমগ্ন যে ফলে কোনও সিদ্ধান্তে পৌঁছে কাজটি সম্পন্ন করবার ইচ্ছা এবং শক্তি দুই-ই তার আগে থেকে ক্ষীণ হয়ে আসে। তৃতীয় অঙ্ক প্রথম দৃশ্যে হ্যামলেটের স্বগতোক্তি তাঁর এই প্রস্তাবটিকে সমর্থন করে।
And thus the native hue of resolution
is sicklied o’er with the pale cast of thought,
And enterprises of great pitch and moment
With this regard their currents turn away,
And lose the name of action.
তার মনের ভাবুক গঠন এবং হ্বিটেনবার্গ বিশ্ববিদ্যালয়ের দর্শন চর্চার ফলে সে যে শুধু সব কিছু ব্যাপারেই সংশয় বোধ করে তাই নয়, যা বিশেষ তাকে সামান্য বা সর্বব্যাপী রূপে দেখার প্রবণতাও তার ভিতরে প্রবল। ফলে তার পিতার হত্যার ভিতরে সে দেখে ডেনমার্কের সার্বিক আপজাত্য; হত্যার প্রতিশোধ হয়ে ওঠে দেশের সার্বিক নিরাময় ঘটানোর দায়িত্ব। একজন মানুষকে খুন করা কঠিন নয়, কিন্তু একটা জাতিকে কলুষমুক্ত করা! প্রথম সাক্ষাতের সময়েই পিতার প্রেত তাকে স্পষ্ট নির্দেশ দেয়:  Revenge his foul and most unnatural murder.” কিন্তু হ্যামলেটের মনে সেই নির্দেশ অবিলম্বে রূপান্তরিত হয় অসাধ্য দায়িত্বে:
The time is out of joint: O cursed spite,
That ever I was born to set it right( প্রথম অঙ্ক, পঞ্চম দৃশ্য)
ফলে যেহেতু বিশেষ নির্দেশটি পালন করলেও বিরাট কর্তব্য সামানই অসমাপ্ত রয়ে যাবে, হ্যামলেট প্রতিশোধ নেবার ব্যাপারে বিশেষ উৎসাহ বোধ করে না।
বিশেষ থাকে সামান্য সিদ্ধান্তে দ্রুত পৌঁছানোর প্রবণতা শুধু কর্তব্য নিষ্পাদনকেই অসাধ্য করে তোলে না, তার ফলে যে কতখানি ক্ষতি হতে পারে হ্যামলেট-ওফেলিয়ার করুণ-কাহিনীতে সেটি আমরা দেখতে পাই। ক্লডিয়াসের ভ্রাতৃহত্যার বিশেষ ঘটনা থেকে যেমন ডেনমার্কের সার্বিক অপচারের সিদ্ধান্ত টানা হয়েছিল, তেমন গেরট্রুডের ব্যভিচারের অভিঘাত থেকে নারী জাতির নৈতিক ভঙ্গুরতা বা চরিত্রহীনতার সিদ্ধান্তে পৌঁছতেও দার্শনিক যুবরাজের বিশেষ দেরি হয়নি। এবং এই সিদ্ধান্তে পৌঁছানোর পর তার প্রয়োগ ঘটল নিরীহ, নির্মৎসর, নিষ্কলুষ কিশোরী ওফেলিয়ার ওপরে। কোমল প্রকৃতি ওফেলিয়া কোনও ব্যাপারেই আপনাকে প্রতিষ্ঠিত করতে শেখেনি। ভালবাসাই তার স্বভাব, কিন্তু শেক্সপীয়রের অন্য অনেকে নায়িকার মধ্যে যে দুর্নিবার প্যাশন অথবা বৌদ্ধিক বয়ঃপ্রাপ্তির পরিচয় পাই এই মধুরা তা থেকে একেবারেই বঞ্চিত। এই নাটকের অপর নারী চরিত্র দুর্বলচিত্ত গেরট্রুড যেমন উৎকাক্সক্ষা-উদ্বেলিত লেডি ম্যাকবেথ নয়, ওফেলিয়ার প্রকৃতিও তেমনি অভীক অনন্যতন্ত্র অনুরাগিণী জুলিয়েট অথবা বিচক্ষণ বিজয়িনী পোর্শিয়ার থেকে সম্পূর্ণ ভিন্ন। সংসারী, রক্ষণশীল হ্রস্ববোধ পিতার হিসেবি নির্দেশ সে নির্দ্বিধায় মানতে অভ্যস্ত। সে শুধু হ্যামলেটের উচ্ছ্বসিত প্রেমপত্র কর্তব্য জ্ঞানে পিতা পলনিয়াসের হাতে তুলে দেয় না; রাজপুত্রের প্রেম যে মন্ত্রী-কন্যার নাগালের বাইরে এই সতর্কবাণী শুনে সে পিতার নির্দেশে হ্যামলেটের সঙ্গে দেখা সাক্ষাৎ বন্ধ করে, বিনা প্রতিবাদে প্রেমিকের সঙ্গে সব সম্পর্ক তুলে দিতে রাজি হয়। পরে যখন উদ্ভ্রান্ত যুবরাজ বিস্রস্ত বেশবাসে পা-ুর বয়ানে তার সামনে এসে দাঁড়ায়, তার মণিবন্ধ চেপে ধরে তার মুখের দিকে এক দৃষ্টিতে চেয়ে থাকে, তারপর ভগ্ন হৃদয়ে প্রবল দীর্ঘশ্বাস ফেলে তার দিক থেকে নজর না সরিয়ে পিছু হটে ঘর থেকে বেরিয়ে যায়, তখন এই বিভ্রান্ত কিশোরী পিতার নির্দেশে  ক্লডিয়াসের খাসদরবারে গিয়ে তার কাছে এই ঘটনার রিপোর্ট পেশ করতে একটুও আপত্তি করে না। এবং শেষে যখন বাপের নির্দেশে সে অস্থির পদচারণরত হ্যামলেটের সামনে এসে দাঁড়ায় যাতে আড়াল থেকে হ্যামলেটের আলাপ আচরণ লক্ষ করে ক্লডিয়াস আর পলনিয়াস স্থির নিশ্চিত হতে পারে প্রণয়ে বাধাই হ্যামলেটের অস্বাভাবিক ভাবভঙ্গির কারণ কিনা, তখন আমরা দর্শকরা এই বোকা মেযের কা- দেখে কপাল চাপড়ানো ছাড়া উপায় দেখি না।
এখন ভাবুক, মেধাবী, কল্পনাপ্রবণ বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র যে এমন একটি নির্বিবোধ, নিরদ্যম, নিরহঙ্কার, পিতৃচালিত কিশোরীর প্রেমে পড়তে পারে এটা এমন কিছু অকল্পনীয় নয়। প্রেম এমনই ব্যাপার যা বিচার বিবেচনার তোয়াক্কা করে না। এবং গভীর আঘাতের ফলে বিপর্যস্ত অবস্থায় সব প্রেমিকই তার ভালবাসার পাত্রীর কাছে মানসিক আশ্রয় ও সহমর্মিতা খোঁজে। পিতার প্রেতের সঙ্গে সাক্ষাতের পরে বিভ্রান্ত হ্যামলেট ওফেলিয়ার কাছে সে কারণেই ছুটে গিয়েছিল। এবং তখনই সে বুঝেছিল তার আত্যন্তিক সংকটের ব্যাপারটা এই নিষ্পাপ এবং অনভিজ্ঞ কিশোরীর বোধবুদ্ধির অগম্য। ফলে ওফেলিয়ার প্রতি তার মন বিমুখ হওয়া স্বাভাবিক। কিন্তু ওফেলিয়ার বোধবুদ্ধি পরিণত না হলেও তার ভালবাসার কোনও খাদ ছিল না। অপরপক্ষে গেরট্রুডের ব্যভিচার হ্যামলেটের মনে এমনই গভীর আঘাত হেনেছিল যে তার ভাবুক মন এক লাফে বিশেষ থেকে সামান্যের ধারণায় পৌঁছে সমস্ত স্ত্রী জাতিকেই নির্বিশেষে দুর্নীতিপরায়ণ বলে ঘোষণা করল, এবং সেই সিদ্ধান্ত নির্বিচারে চাপিয়ে দিল ওফেলিয়ার ওপরে। তার পদচারণারত অবস্থায় বিখ্যাত স্বগতোক্তির শেষে ওফেলিয়া যখন তার সামনে এসে দাঁড়ায় তখন যাকে সে একদা উচ্ছ্বসিত প্রেমপত্র লিখেছিল তাকে সে শুধু বলল না, এক সময়ে তোমাকে ভালবাসতাম, না তোমাকে ভালবাাসিনি; তারপরই সেই নিষ্পাপ অনুরাগিণীকে অশ্লীল আক্রোশে জানিয়ে দিল:  
It thou wilt needs marry, marry a fool; for wise
men know well enough what monsters you make
of them....God has given you one face, and you make
yourselves another you jig, you amble, and you lisp,
and micname God’s creatures, and make your wantonness
your ignorance    (তৃতীয় অঙ্ক, প্রথম দৃশ্য)
প্রেমপত্রে সে একদা লিখেছিল বটে `My soul’s idol, the most beautified Ophelia',এই “চমৎকার চিন্তা” কার্যক্ষেত্রে কতটা এগিয়েছিল বলা শক্ত, কিন্তু চতুর্থ অঙ্ক পঞ্চম দৃশ্যে উন্মাদিনী কিশোরী ওফেলিয়ার কণ্ঠে যখন আমরা শুনি:
Hamlet: Lady, shall I lie in your lap?
Ophelia: No, my lord.
Hamlet: I mean, my head upon your lap?
Ophelia: Ay, my lord.
Hamlet: Do you think I meant country matters?
Ophelia: I think nothing, my lord.
Hamlet: That’s a fair thought to lie between maid’s legs.
এই “চমৎকার চিন্তা” কার্যক্ষেত্রে কতটা এগিয়েছিল বলা শক্ত, কিন্তু চতুর্থ অঙ্ক পঞ্চম দৃশ্যে উন্মাদিনী কিশোরী ওফেলিয়ার কণ্ঠে যখন আমরা শুনি:
Then up he rose, and donn’d his clothes
And dupp’d the chamber door;
Let in the maid, that out a maid
Never departed more,.....
Quoth she, before you tumbled me,
You promis’d me to wed.
So would I ha’ done, by yonder sun
An thou hadst not come to my bed.
তখন একদিকে যেমন ওই ‘চমৎকার চিন্তা’র কথা আমাদের স্মরণে আসে, অন্যদিকে সন্দেহ হয় পিতার অপঘাত-মৃত্যুই কি ওফেলিয়ার চিত্তভ্রংশের একমাত্র, এমনকী প্রধান কারণ, অথবা দায়িত্ববিমুখ অথচ কামাতুর দার্শনিক যুবরাজেরও এ ব্যাপারে বড় ভূমিকা ছিল। বিশেষ থেকে সামান্যে লাফ দেবার দার্শনিক প্রবণতা অনেক সময়ে ব্যক্তিগত দায়িত্ব বিস্মরণের সহায়ক। পর্দার পিছনে আড়িপাতা পলনিয়াসকে হঠাৎ আক্রোশে হত্যা করবার পর হ্যামলেটের একবারও মনে হয়নি পিতার এই আকস্মিক অপমৃত্যু কিশোরী ওফেলিয়ার চিত্তে কী বিপর্যয় ঘটাতে পারে। লাশের ঠ্যাং ধরে টানতে টানতে যখন সে সিঁড়ির কিনারে ফেলে দেয় তখন তার হৃদয়হীনতার পরিমাপ আর গোপন থাকে না। কিশোরী অনুরাগিণীর দেহের আকর্ষণ এবং তার অপরিণত মনের প্রতি গভীর বিরূপতা তাকে কি এতটাই নিষ্ঠুর করে তুলেছিল যে ব্যভিচারিণী জননীর সঙ্গে এই নিষ্পাপ কিশোরীকে একাকার করে দেখতে তার কিছুমাত্র বাধেনি? ফলে যখন ওফেলিয়ার মৃতদেহ কবরস্থ করবার সময়ে লেয়ার্টেস-এর শোক প্রকাশের প্রতিস্পর্ধী রূপে তাকে কবরের ভিতরে ঝাঁপিয়ে পড়তে দেখি তার শোকবোধ আমাদের মোটেই গভীর, এমনকি অকৃত্রিম বলেও ঠেকে না। ভাই যেখানে প্রার্থনা করে বোনের নিষ্কলঙ্ক দেহ থেকে ভায়োলেট পুষ্পরাশি যেন উদ্ভূত হয়, গেরট্রুড যেখানে কবরে ফুল ছড়িয়ে বলে Sweets to the sweet: farewell, সেখানে স্বকামী যুবরাজ কবরের ভিতরে সগর্জনে লম্ফ দিয়ে পড়ে ঘোষণা করে: ঞযরং রং ও / ঐধসষবঃ ঃযব উধব. সে দাবি করে যে চল্লিশ হাজার ভাইয়ের ভালবাসাও ওফেলিয়ার প্রতি তার ভালবাসার সমতুল্য নয়। তার ভালভাসার প্রমাণ হিসেবে কী সে পারে না যা লেয়ার্টেস পারে? ভিনিগার পান, কুমীর গিলে ফেলা? ওফেলিয়ার সঙ্গে কবরস্থ হওয়া?
Nay, an thou ‘It mouth,
I’ll rant as well as thou. . (পঞ্চম অঙ্ক, প্রথম দৃশ্য)
এবং বিধ অতিশয়োক্তির মন্ত্রেই সে কি একদা অনভিজ্ঞা কিশোরীর হৃদয় হরণ করেছিল?
হ্যামলেট চরিত্রে তিনি চেয়েছেন ব্যক্তিতার সেই অন্ধকার অন্তর্লোকে প্রবেশ করতে দৃশ্যমান ঘটনাবলি থেকে যাকে আলোচিত করতে অসমর্থ ইঙ্গিত সমৃদ্ধ কাব্য ভাষার পাশেও যা দৃশ্যযোগ্য।
এখন রেনেসাঁসের সন্তান শেক্সপীয়র গল্পকাহিনী ফাঁদার চাইতে বাস্তব স্ত্রী-পুরুষের বহুবেধ আত্মবিভক্ত রহস্যময় অস্তিত্বের অনুসন্ধান এবং উ˜্ঘাটনকে অনেক বেশি আকর্ষণীয় বলে মেনেছিলেন। তাঁর শ্রেষ্ঠ নাটকগুলিতে এই অনুসন্ধানের সার্থক পরিচয় আমরা বারে বারেই পাই। কিন্তু যে সব চরিত্রকে তিনি নাটকের ঘটনা বিন্যাস এবং ভাষা প্রয়োগের অতুলনীয় সামর্থ্যে প্রত্যক্ষ করে তুলেছিলেন তারা নাট্যরূপের সীমাবদ্ধ সামর্থ্যকে লঙ্ঘন করেনি। হ্যামলেট চরিত্রে তিনি যেন চেয়েছিলেন ব্যীক্ততার সেই অন্ধকার অন্তর্লোকে প্রবেশ করতে দৃশ্যমান ঘটনা বিন্যাস যাকে আলোকিত করতে অসমর্থ, ইঙ্গিতসমৃদ্ধ কাব্য-ভাষার পক্ষেও যা দু®প্রবেশ্য হ্যামলেট-চরিত্র প্রসঙ্গে বোয়াজ লিখেছিলেন, “যে মানুষটির নিজের কাছেই তার জীবন রয়ে গেল রহস্যাবৃত বাইরের মানুষ তার গোপন মর্ম কী করে বুঝবে” F. S. Boas, Shakespeare and his Predecessors)। এবং ডোভার উইলসন হ্যামলেটকে “সম্পূর্ণভাবে ক্রটিমুক্ত” বলবার পর আমাদের বোঝাতে চেয়েছিলেন যে হ্যামলেটের দীর্ঘসূত্রতার কারণ আমাদের মতোই হ্যামলেটের কাছেও অবোধ্য বটে, কিন্তু শেক্সপীয়র নাকি তাই চেয়েছিলেন, এবং এই রহস্য যে আমরা ভেদ করতে পারি না এটাই নাকি শেক্সপীয়রের অতুলনীয় শিল্প নৈপুণ্যের প্রমাণ। (Dover Wilson, What happens in Hamlet; Six Tragedies of Shakespeare). (চলবে...)












সর্বশেষ সংবাদ
এক বছরে সাড়ে ৩ শ ধর্ষণের অভিযোগ কুমিল্লায়
সংস্কার কমিশনের রিপোর্ট পেলে ধারনা করা যাবে নির্বাচন কবে হবে: সিইসি
আজ কুমিল্লায় আসছেন সিইসি
চান্দিনায় মধ্য রাতে ভয়াবহ অগ্নিকাণ্ড
এক বছরে ৯৬ বেওয়ারিশ লাশ দাফন কুমিল্লায়
আরো খবর ⇒
সর্বাধিক পঠিত
কুমিল্লায় বিজিবি অভিযানে ৬০ কেজি গাঁজা জব্দ
জিয়া সাইবার ফোর্স- কুমিল্লা উত্তর জেলা কমিটি অনুমোদন
কুমিল্লা ইকরা মডার্ণ স্কুলের বার্ষিক ফল প্রকাশ ও কৃতি শিক্ষার্থী সংবর্ধনা
এক বছরে সাড়ে ৩ শ ধর্ষণের অভিযোগ কুমিল্লায়
এক বছরে ৯৬ বেওয়ারিশ লাশ দাফন কুমিল্লায়
Follow Us
সম্পাদক ও প্রকাশক : মোহাম্মদ আবুল কাশেম হৃদয় (আবুল কাশেম হৃদয়)
বার্তা ও বাণিজ্যিক কার্যালয়ঃ ১২২ অধ্যক্ষ আবদুর রউফ ভবন, কুমিল্লা টাউন হল গেইটের বিপরিতে, কান্দিরপাড়, কুমিল্লা ৩৫০০। বাংলাদেশ।
ফোন +৮৮ ০৮১ ৬৭১১৯, +৮৮০ ১৭১১ ১৫২ ৪৪৩, +৮৮ ০১৭১১ ৯৯৭৯৬৯, +৮৮ ০১৯৭৯ ১৫২৪৪৩, ই মেইল: newscomillarkagoj@gmail.com
© সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত, কুমিল্লার কাগজ ২০০৪ - ২০২২