নজরুলের প্রমীলা

শান্তিরঞ্জন ভৌমিক ||
প্রমীলা নজরুল-এর পারিবারিক নাম ছিল শ্রীমতী আশালতা সেনগুপ্তা, ডাকনাম দোলন বা দুলি/দুলী। ছোটরা ‘রাঙাদি’ বলে তাঁকে সম্বোধন করত। তিনি বসন্তকুমার সেনগুপ্ত ও তাঁর দ্বিতীয় পক্ষের স্ত্রী গিরিবালা দেবীর একমাত্র সন্তান। তাঁর জন্মের পর পিতার মৃত্যু হয়।
প্রমীলা দেবী তৎকালীন ঢাকা জেলার মানিকগঞ্জ মহকুমার (বর্তমানে জেলা) তেওতা গ্রামে ১৩১৫ সালের ২৭ বৈশাখ (১৯০৮, মে) জন্মগ্রহণ করেন। বসন্তকুমার সেনগুপ্ত প্রথম স্ত্রী বর্তমান থাকা অবস্থায় গিরিবালা দেবীকে বিয়ে করেন। এর পিছনে কি কারণ, তা জানা যায়নি। তবে প্রথম পক্ষের কোন সন্তান সম্প্রতি ছিল কিনা তার কোন উল্লেখ কোথাও পাওয়া যায়নি। তাই ধারণা করা যায় সন্তান প্রাপ্তির জন্যই দ্বিতীয় বিয়ে করে থাকতে পারেন।
পিতার মৃত্যুর পর আশালতা মা গিরিবালার সাথে গ্রামেই বাস করতে থাকেন। আর্থিক অস্বচ্ছলতা ও সামাজিক কারণে পিতৃব্য ইন্দ্রকুমার সেনগুপ্তের কুমিল্লা শহরের কান্দিরপাড়ের বাসায় মাতাসহ চলে আসেন। কান্দিরপাড়ের বাসা যৌথ পরিবারের মালিকানা ছিল কিনা তাও জানা যায়নি। এই বাসায় আশালতা তেরটি বৎসর কাটিয়েছেন, স্থানীয় ফয়জুন্নেছা বালিকা বিদ্যালয়ে পড়াশোনা করেছেন। সাংস্কৃতিক পরিমণ্ডলে পরিবারটি উদ্ভাসিত বলে গান-বাজনা, নাচ ইত্যাদিতে আশালতা অভ্যস্ত হয়ে উঠেছিলেন। উচ্ছ্বল বাল্যবয়স আনলে অতিবাহিত হয়েছে তাঁর। স্বপ্নময় নিস্তরঙ্গ জীবনে একসময় কাজী নজরুল ইসলাম এসে উপস্থিত হলেন, জীবন কল্পনায় রঙিন হলো, জীবনের হিসেব-নিকেশ হয়ে গেল শেষ পর্যন্ত। আশালতা হয়ে গেলেন প্রমীলা নজরুল। এই ইতিহাস কাব্যিক ও মধুময়, ইতিহাসও বটে।
তখন নজরুলের আবেদন আন্তরিক।
‘আমি তব দ্বারে প্রেম-ভিখারি
নয়নের অনুরাগ দৃষ্টির সাথে চাহি নয়ন-বারি।
তব পুষ্পিত তনুতে, হৃদয়-কমলে
গোপনে যে প্রেম-মধু উথলে
তোমার কাছে সেই অমৃত যাচে
তৃষিত এ পথচারী ।
(নজরুল রচনাবলী ৩য় খণ্ড- ৪২৮, পৃষ্ঠা ঃ ৬৫৭)
প্রমীলার অবস্থাও তদ্রূপ-
‘তোমারেই আমি চাহিয়াছি, প্রিয়, শতরূপে শতবার।
জনমে জনমে চলে তাই মোর অনন্ত অভিসার
বনে তুমি যবে ছিলে বনফুল
গেয়েছিনু গান আমি বুলবুল,
ছিলাম তোমার পূজার থালায় চন্দন ফুলহার।’
(ঐ ৪৭০ : পৃ:৬৭৭)
নজরুল ১৯২১ সালের এপ্রিলের প্রায় মাঝামাঝি এক সকালে আলী আকবর খানের সাথে কান্দিরপাড় বাসায় এসে উপস্থিত হলেন। অজানা অপরিচিত অদেখা অতিথি। স্বভাবে উচ্ছ্বল, মুখর, ভাবে আবেগপ্রবণ, গানে গানে ভরিয়ে দিতে পারেন পৃথিবী, কবিতা লিখে জাগাতে পারেন তুফান। অল্পসময়ে আপন করে নিলেন সবাইকে। বিরজাসুন্দরী দেবী হলেন মা, গিরিবালা দেবী মাসিমা, বীরেন সেনগুপ্ত হলেন রাঙাদা এবং পরিবারের হলেন কাজীদা। ৩/৪ দিন থাকলেন সেন পরিবারে, জাগিয়ে গেলেন সবাইকে, মনে বাঁধা পড়লেন।
অ- চেনা অ-জানা আমি পথের পথিক
মোরে হেরে জলে পুরে ওঠে কেন তব ঐ বালিকার
আঁখি অনিমিখ?
(পূজারিণী- দোলনচাঁপা)
দু'মাস কাটালেন নজরুল কুমিল্লা জেলার মুরাদনগর থানার দৌলতপুর গ্রামে। সেখানে নজরুলের প্রথম প্রেমের পাত্রী সৈয়দা খাতুন, কবির নার্গিস। কবির জীবনের স্বপ্ন, স্বপ্নের বাস্তব রূপায়ণ এবং স্বপ্নভঙ্গের ইতিহাস চিরদিনের প্রশ্ন রেখে ঘটনার সমাপ্তি। নার্গিসের সাথে প্রেম-পরিণতিতে পরিণয় এবং তাৎক্ষণিক বিচ্ছেদ- এত দ্রুত বলয়ে আবর্তিত হয়েছিল, তাকে স্বপ্নই বলতে হয়। নজরুলের এই বিয়েতে আশালতা সেনগুপ্তাও উপস্থিত ছিলেন, ঘটনার আকস্মিকতা ও পরিণতি উপলব্ধি না করতে পারলেও এমন একটি ঘটনায় কারও প্রতি সহানুভূতি জাগাতে পারে। নজরুল ৪ঠা আষাঢ় ১৩২৮ বীরেন সেনগুপ্তের সাথে নৌকায়, হেঁটে রাতের অন্ধকারে জীবনের এক অমানিশার অভিশাপ থেকে মুক্তি পেয়ে সেন পরিবারে এসে পৌঁছেন। আর সেনপরিবারের সদস্যরা ৪ঠা আষাঢ়ের রাতে এসে কুমিল্লায় পৌঁছান। বিধ্বস্ত বিপর্যস্ত নজরুলের পরিচর্যায় সেন পরিবার আন্তরিক হয়ে উঠলেন। সেখানে আশালতার ভূমিকা কিরূপ ছিল? অনুমান করা যায়- যে সহানুভূতি দৌলতপুরে তাঁর মনে উপ্ত হয়েছিল, তারই একটি প্রকাশোন্মুখ আবেদন স্ফূরিত হয়েছিল। নজরুলও গোবিন্দলালের মতো ভ্রমরের পরিবর্তে রোহিণীকে যেমন চিন্তা করতে শুরু করেছিল (কৃষ্ণকান্তের উইল-বঙ্কিমচন্দ্র), মানসিক স্থিতি প্রতিষ্ঠায় নার্গিসের পরিবর্তে আশালতায় মনকে স্থিতি করতে চেষ্টা করেছিলেন। প্রকৃত প্রেমের সূত্রপাত এখানেই।
‘শূন্য ছিল নিতল দীঘির শীতল কালো জল।
কেন তুমি ফুটলে সেথা ব্যথার নীলোৎপল?’
নজরুলের বেদনা ভুলাতে সেনপরিবারের সহযোগিতা মানবিক কারণেই স্বাভাবিক, আশালতা বা দুলির সান্নিধ্য তপ্ত বিরহের মধ্যে প্রশান্তির স্নিগ্ধতা অনুভব করলেন কবি, তাঁর চোখে মুখে দেখলেন এক নতুন রূপ, সন্ধান পেলেন যেন হারানো মানিককে।
‘আমার আপনার চেয়ে আপন যে জন
খুঁজি তারে আমি আপনায়।
আমি শুনি যেন তার চরণের ধ্বনি
আমারি তিয়াসী বাসনায়।
(আপন পিয়াসী-ছায়ানট)
কিশোরী বুলির মৌন যত্নে, চলার দোলায়িত গতিচ্ছন্দে, চোখের ভাষায় দোল খায় কবি-চিত্ত।
হে মোর রাণী। তোমার কাছে হার মানি আজ শেষে।
আমার বিজয়কেতন লুটায় তোমার চরণ-তলে এসে।
আমার সমর জয়ী অমর তরবারি
দিনে দিনে ক্লান্তি আনে, হয়ে ওঠে ভারী,
এখন এ ভার আমার তোমায় দিয়ে হারি,
এই হার মানা হার পরাই তোমার কেশে।
(বিজয়িনীঃ ছায়ানট)
দুলিও প্রথম প্রেমে শিহরিত হন হন দুলতে থাকে, কল্পনায় রূপকথার রূপকুমার নিজের দেহ ও মনের কাছাকাছি অনুভব করেন। রথযাত্রার সঙ্গদানে তুলি নজরুলের সান্নিধ্য পেলেন একান্তভাবে। মনে বড় প্রশ্ন জেগেছিল-
ফিরিনু যেদিন দ্বারে দ্বারে কেউ কি এসেছিল?
মুখের পানে চেয়ে এমন কেউ কি হেসেছিল?
..........
আমার যত কলঙ্ক সে
হেসে বরণ করল এসে
আহা বুক জুড়ানো এমন ভালো কেউ কি বেসেছিল?
ওগো জানত কে যে মনের মানুষ সবার শেষে ছিল?
মোহাম্মদ আবদুল কুদ্দুস লিখেছেন-
কিশোরী দুলী কবির ব্যাথাহত ক্ষতে প্রলেপ দিয়েছে প্রাণ উজাড় করা মমতা মাখা সেবায়। আর অন্তরতলে হয়ত অজান্তে অনুভব করেছে কবির বিরহ কাতরতার কাঁতরানী। এ সমবেদনা, সহানুভূতি তার প্রেমানুভূতির বহিঃপ্রকাশ, তাই তো কবি পূজারিণীতে বলেছেন-
কাঁটা-বেধা রক্তমাখা প্রাণ নিয়া এনু তব পুরে,
জানি নাই ব্যথাহত আমার ব্যথায়
তখনো তোমার প্রাণ পুড়ে।
তবু কেন কতবার মনে যেন হত,
তব স্নিগ্ধ মদির পরশে মুছে নিতে পারে মোর
সব জ্বালা সব দক্ষ ক্ষত।
মনে হত প্রাণ তব প্রাণে যেন কাঁদে অহরহ-
‘হে পথিক। ঐ কাঁটা মোরে দাও, কোথা তব ব্যথা বাজে
কহ মোরে কহ’।
নীরব গোপন তুমি মৌনা তাপসিনী,
তাই তব চির মৌন ভাষা
শুনিয়াও শুনি নাই, বুঝিয়াও বুঝি নাই ঐ ক্ষুদ্র চাপা-বুকে
কাঁদে কত ভালবাসা আশা
(পূজারিণীঃ দোলনচাঁপা)
১৯২২ সালের ফেব্রুয়ারি মাসে নজরুল কুমিল্লায় এলেন। এবার তিনি প্রায় চার মাস অবস্থান করেছিলেন। তৃতীয় ও চতুর্থবার কুমিল্লায় অবস্থানকালে দুলির সঙ্গে নজরুলের হৃদয়ের সম্পর্ক স্থাপিত হয়। ডঃ সুশীলকুমার গুপ্ত লিখেছেন-
‘এই সময় বীরেন্দ্রকুমার সেনগুপ্তের ভগিনী প্রমীলার সঙ্গে নজরুলের গভীর প্রেম সম্পর্ক স্থাপিত হয়। অসহযোগ আন্দোলনের শুরুতেই প্রমীলা স্কুল ছেড়ে দিলেন। প্রমীলার প্রাণময়তা, স্বাদেশিক মনোভাব, ব্যক্তিত্ব, সংগীত-প্রীতি প্রভৃতি নজরুলকে বিশেষভাবে আকর্ষণ করেছিল। ‘বিজয়িনী’ কবিতাটি এই সময়ে রচিত। এর মধ্যে নজরুলের প্রেম-জীবনের একটি উল্লেখযোগ্য স্বাক্ষর আবিষ্কার করা দুরূহ নয়।
(নজরুল চরিত মানস-পৃঃ ৫১)
‘বিজয়িনী’ কবিতাটি প্রমীলার কাছে নজরুলের আত্মনিবেদনের, নিজেকে সর্পণের নির্ভুল দলিল।
(নজরুল জীবনী-ডঃ রফিকুল ইসলাম, পৃঃ ২২৯)
নজরুলের প্রথম কাব্যগ্রন্থ ‘অগ্নিবীণা’, দ্বিতীয় ‘দোলনচাঁপা’। অগ্নিবীণার প্রকাশ ১৩২৯ এর কার্তিকে, আর তার প্রায় এক বছর পরে ১৩৩০-এর আশ্বিনে দোলনচাঁপায় জ্যোৎস্না। অগ্নিবীণায় বিদ্রোহ, দোলনচাঁপায় সমর্পণ। বিদ্রোহের মধ্যে তো স্বপ্নেরই দূরদর্শন। আর যে স্বপ্ন দেখতে পারে সে তো বাস্তবের বিরুদ্ধে বিদ্রোহী হয়েছে বলেই। প্রেমও তো প্রগাঢ় বিদ্রোহ। দোলনচাঁপা যখন প্রকাশিত হয় তখন নজরুল জেলে। সেখানে যেমন সমর্পণ আছে তেমনি আছে ‘আশান্বিতা’।
এবার আমায় সঁপে দিলাম তোমার চরণতলে,
তুমি শুধু মুখ তুলে চাও বলুক যে যা বলে
এ পক্ষের স্বীকৃতির উত্তরে ওপক্ষের নিষ্কম্প প্রতীক্ষা
আবার কখন আসবে ফিরে
সেই আশাতে জাগব রাত,
হয়তো সে কোন নিশুতি রাতে
ডাকবে এসে অকস্মাৎ।
(জ্যৈষ্ঠের ঝড়-অচিন্ত্য কুমার সেনগুপ্ত পৃ. ১৬৯-১৭০)
ইন্দ্রকুমার সেনগুপ্তের বাড়ির উদার অসাম্প্রদায়িক ও সাংস্কৃতিক পরিবেশ, বিরজাসুন্দরী দেবীর মাতৃস্নেহ নজরুলকে সেনপরিবারের সাথে ঘনিষ্ঠ বন্ধনে আবদ্ধ করেছিল। দৌলতপুরে যে বেদনায় জর্জরিত হয়েছিলেন নজরুল, সেনপরিবারের সহযোগিতায় তা ভুলতে পেরেছিলেন। 'নার্গিসের স্মৃতি অস্পষ্ট হয়ে গিয়েছিল দোলনের সুরভিতে । কুমিল্লায় নজরুল হারালেন তাঁর প্রথম প্রিয়াকে; কুমিল্লাতেই তিনি খুঁজে পেলেন তাঁর আজীবন সঙ্গিনীকে।’
(নজরুল জীবনী-পূর্বোক্ত পৃঃ ২২২)
প্রমীলাকে ভালোবাসল নজরুল। নজরুল জীবনের বিজয়িনী প্রমীলা। মহীয়সী প্রমীলা।
হে মোর রাণী! তোমার কাছে হার মানি
আজ শেষে।
আমার বিজয় কেতন লুটিয়ে তোমার
চরণতলে এসে।
..........
যে বিজয়িনী সে তার তপস্যায় স্থিরব্র্রতা। সে নজরুলকে শুধু কবি করবে না, ভক্ত সাধক করে তুলবে। নজরুলের সমস্ত অন্ধকারে সেই তো শাশ্বতী উন্নয়ঊষা॥
“তুমি আমায় ভালোবাসো তাই তো আমি কবি।
আমার এরূপ সে যে তোমার ভালোবাসার ছবি।
আপন জেনে হাত বাড়ালো
আকাশ বাতাস প্রভাতে-আলো
বিদায় বেলায় সন্ধ্যা তারা
পূবের অরুণ রবি-
তুমি ভালোবাসো বলে ভালোবাসে সবি।’
আবর্ণবিভ্রান্ত চোখ দুটির কী অনাবিল শুভ্রতা, মধ্যে কালো মণিকা দুটি যেন কী অলৌকিক রহস্যজগতের ইঙ্গিত করছে। দেহের মধ্যেই রয়েছে যেন কোন এক দেহাতীতের বাসা, পুষ্পশরের স্পর্শের নিচেই রয়েছে কোন এক অমর্ত্য স্পন্দন। প্রেম অর্থই বুঝি পূজা, মিলন অর্থই বুঝি উপাসনা, আর চুম্বনে বুঝি সেই অসীমের স্বাক্ষর।
‘তুমিই আমার মাঝে আমি
অসিতে মোর বাজাও বাঁশি
আমার পূজার যা আয়োজন
তোমার প্রাণের ছবি।
আমার বাণী জয়মাল্য রাণী। তোমার সবি।’
(জ্যৈষ্ঠের ঝড়, পূর্বোক্ত, পৃঃ ১৩৩-১৩৪)
প্রেম সব সময়ই বন্ধুর পথ অতিক্রম করে চলে। প্রেমের পথ 'বঙ্কিম সংকীর্ণ-দুর্গম। নমাজ-ধর্ম-নৈতিকতা প্রেমের প্রাথমিক প্রতিবন্ধক। নজরুল মুসলমান, দুলি হিন্দু ধর্ম বিশ্বাস বা ধর্ম চর্চার বৈপরীত্যের জোড়ালো প্রতিবন্ধকতা, ভীনদেশী শিখরহীন নজরুল, অখ্যাত রাঢ় অঞ্চলের ঠিকানা মোহা ব্রুক্ষ মাটির নজরুল, শ্যামল কোমল মাটির দুলির সাথে এক সূত্রে মালা গাঁথায় বৈপরীত্যের প্রতিবন্ধকতা, হোঁচট খাওয়া নজরুল, দৌলতপুরের ঘটনায় নজরুলের জীবন নিস্তরঙ্গ নয়- হালভাঙ্গা, আঘাতপ্রাপ্ত দিশেহারা স্থিতিহীন নজরুলের একমাত্র প্রেমের দাবী লৌকিকতার রক্তচক্ষুর কাছে ক্ষমাহীন তো বটে। তাই নজরুল-দুলির প্রেমের বিষয়টি কুমিল্লায় প্রথম দিকে উত্তেজনার সৃষ্টি করে, অপমানিত ও লাঞ্ছিত করার প্রয়াস চলে। যদিও শেষ পর্যন্ত এমনটি ঘটেনি। প্রেমের নিরবিচ্ছিন্ন স্বাভাবিক প্রবাহও হতে দেয়নি। দেয়নি সেনপরিবারও।
তেজস্বিনী গিরিবালা স্থির করলেন মেয়ে যখন নজরুলকে বরণ করে নিয়েছে তখন তাকে নজরুলের হাতে সমর্পণ করবেন। কতটুকুনই বা মেয়ে। কিশোর-সরসীতে স্নান সেরে যৌবনের ঘাটের প্রথম সিঁড়িতে শুধু পা দিয়েছে। তবু বরণ করে নেবার পর আর প্রত্যাবর্তন নেই। দৃঢ়তায় বদ্ধমুষ্টি গিরিবালা প্রমীলার বিধবা মা, প্রমীলার বৈধী অভিভাবিকা । কিন্তু সামাজিক পরিবেশ কি এতই সহজ, এতই সদয়? চারদিক থেকে প্রাতিকূল্যের তরঙ্গ উঠল। ইন্দ্ৰকুদর স্বভাবতই রুষ্ট হলেন, তাঁর ছেলে বীরেনও সম্মত হতে পারল না। তা ছাড়া চারদিকের আত্মীয়মহল তো মুখ ফিরিয়ে থাকবেই।
কিন্তু গিরিবালা তাঁর নীতিতে নির্মম, সিদ্ধান্তে নির্বিচল। তাঁর মেয়ের ভবিষ্যৎ তিনি স্থিরনেত্রে দেখে রেখেছেন। জীবনের সেই তটভূমিতেই ইন্দ্রের ঐশ্বর্য খুঁজে নিয়ে তাকে নতুন অমরাবতী রচনা করতে হবে।'
(জ্যৈষ্ঠের ঝড়-পূর্বোক্ত, পৃঃ ১৩৪)
একমাত্র দুলির মা গিরিবালা দেবীর আন্তরিক ইচ্ছায়, মনের অসাধারণ দৃঢ়তার কারণে নজরুল-দুলির জীবন বন্ধন এক সুষ্ঠু পরিণতিতে পৌঁছে।
অনেক বাধাবিপত্তি অতিক্রম করে নজরুল ও প্রমীলার বিবাহ স্থির হয়েছিল গিরিবালা, প্রমীলা এবং নজরুলের বোঝাপড়ার মধ্য দিয়েই। গিরিবালা দেবী এই বিয়ের জন্য মেয়েকে সঙ্গে করে দেবরের সংসার থেকে কোলকাতা চলে আসেন। কারণ সেনপরিবারের কেহই এই বিয়ের পক্ষে মত দেননি। এমন কি বিরজা সুন্দরী দেবীও নীরব ভূমিকা পালন করেছিলেন। আজহার উদ্দীন খান লিখেছেন-
‘এই বিয়েতে সেনগুপ্ত পরিবার অর্থাৎ ইন্দ্রকুমার সেনগুপ্ত, বিরজাসুন্দরী দেবী এবং বীরেন্দ্রনাথ সেনগুপ্তের ঘোর অমত ছিল। উদারপন্থী হয়েও পুরোপুরি ধর্ম ও সংস্কারের উর্ধ্বে উঠতে পারেন নি তাঁরা বাড়ির মেয়েকে মুসলমানের সঙ্গে বিয়ে দিতে তাঁরা প্রস্তুত ছিলেন না। এই ঘটনার পর থেকেই সম্পর্কের অবনতি হতে থাকে। বিবাহ সম্ভব হয়েছিল একমাত্র দুলির মা গিরিবালা দেবীর দৃঢ়তার জন্য। মেয়ের সুখশান্তিতে তিনি সবার উপরে স্থান দিয়েছিলেন। মেয়ে যাকে ভালোবেসেছে বিয়ে করে যদি তাতে সুখী হয় আনন্দ পায় মা হয়ে তিনি কেন বাধা দেবেন। নিজ পরিবার আত্মীয়-স্বজন ব্রাহ্ম সমাজের বাধা বিপত্তিকে অগ্রাহ্য করে তিনি কন্যাকে নিয়ে কলকাতায় চলে আসেন। বিয়ের আগে বিরজাসুন্দরী দুলিকে কুমিল্লায় ফিরিয়ে নিয়ে যাবার চেষ্টা করেছিলেন। কিন্তু গিরিবালার জন্য সফলকাম হতে পারেননি।'
(বাংলা সাহিত্য নজরুল-আজহার উদ্দিন খান, পৃঃ ১২৩)
অচিন্ত্যকুমার সেনগুপ্ত লিখেছেন-
‘নজরুল স্থির করল প্রমীলাকে বিবাহ করবে। কিন্তু সে স্থির হলেই তো অন্য পক্ষের সম্মত হবার কথা নয়। এখানে অন্য পক্ষ অর্থ প্রমীলা একা নয়- প্রমীলার পক্ষ, প্রমীলার ধর্ম, প্রমীলার স্বজন-সমাজ। প্রমীলা নিজে অর্পিতচিত্তা, স্থিরব্রতা, কিন্তু তার মা কী বলবেন, বুড়ীমা কী বলবেন, ইন্দ্রকুমার-বীরেন্দ্রকুমারই বা নেবেন কী ভাবে? আর অগণন আত্মীয়ের দলই বা কী চোখে দেখবে? এ তো আইন অতিক্রম করে পলায়ন নয়, অপহরণ বা অপসারণ নয়, এ আইনের মধ্যে থেকে সসম্মান পাণিগ্রহণ কন্যাপক্ষ সহজে তা মানে কী করে?
নজরুল জানে সমস্ত প্রতিবন্ধের কথা, তবু সে পিছু হটল না, পাশ কাটাল না, সবিনয়ে সত্যের সামনে দাঁড়াল সোজা হয়ে। এখানেই তো সে সত্যিকার বিদ্রোহী। সে বাঁধনহারা তাতে সন্দেহ কী, নইলে অসামাজিক বিয়ে সে করে কেন- কিন্তু তাই বলে সে দায়িত্বহীন নয়। যখন নিয়েছি আদ্যোপান্ত নিয়েছি, সমস্ত দায়িত্ব আমার, নজরুলের এই মনোভাব না সরে পড়ব না, বর্তমানের তো বটেই, সমস্ত অনিশ্চিত ভবিতব্যতার সম্মুখীন হয়। এই দৃপ্ত ভঙ্গিমায় নজরুল তো রাজ্যেন্দ্রসুন্দর।
(জ্যৈষ্ঠের কড়-পূর্বোক্ত, পৃঃ ১৭০)
গিরিবালা দেবী মেয়ের নিভৃত মনের খোঁজ নিলেন। বুঝলেন নজরুলই তাঁর জীবন সর্বস্ব, তাঁর সর্বাঙ্গীন, তাঁর ইহকাল-পরকাল। গিরিবালার দ্বিধা-দ্বন্দ্বের লেশমাত্রা রইল না। নজরুলের হাতে মেয়ে তুলে দিলেন; দৃঢ়তার সাথে তিনি ঘোষণা দিলেন। গিরিবালা দেবী দেবরের পরিবার ত্যাগ করলেন এমন কি বিহারে বসবাসরত ভাইয়ের উপর নির্ভরশীল হলেন না। তাঁর দ্বিধাহীন সিদ্ধান্ত ও দৃঢ়তার জন্যই পরিবার ও সমাজের বিশেষত ব্রাহ্ম সমাজের শত বাধা সত্ত্বেও নজরুল প্রমীলার বিয়ে হতে পেরেছিল।
এবং কুমল্লিায় নজরুল

আনোয়ারুল হক ||
কাজী নজরুল ইসলামরে (১৮৯৯-১৯৭৬) ১২৩তম জন্ম-র্বাষকি জাতীয় অনুষ্ঠান এবছর অনুষ্ঠতি হচ্ছে কবরি স্মৃতধিন্য কুমল্লিায়। বলে রাখ,ি নজরুলরে কুমল্লিা আগমনরে একশত বছর করোনাকালে নরিবে পার হয়ছে।ে তবে তাঁর অনন্য কবতিা ‘বদ্রিোহী’ রচনার একশত বছর একবোরে নরিবে যায়ন।ি ‘ছোট গল্পরে আসর’ নামরে একটি সংগঠন এবং অন্যান্য একাধকি প্রতষ্ঠিান নজরুলরে ‘বদ্রিোহী’ কবতিার শতর্বষ র্পূণ উপলক্ষে মনোজ্ঞ অনুষ্ঠানরে আয়োজন করছে।ে কুমল্লিায় এবার (২০২২) জাতীয় অনুষ্ঠান হতে যাচ্ছে বধিায় আমরা মনে কর,ি এর তার্ত্পয বহুমাত্রকি। নজরুল অনুরাগী কুমল্লিাবাসী এত আনন্দতি। তব,ে এই কুমল্লিাকে ঘরিে নজরুলরে জীবনে প্রথম যৌবনে গ্রফেতার হওয়াসহ নব-সৃষ্টরি আনন্দ এবং তাঁর ব্যক্তগিত জীবনে বদেনার যমেহাকাব্য রচতি হয়ছেে এর সঠকি মূল্যায়ন আজও হয়ছেে বলে আমাদরে মনে হয় না।
লক্ষ করা গছে,ে নজরুলরে মতো মানবতাবাদী মহত্ প্রাণরে বড় কবি বাংলাদশেরে যকেোন জায়গার মাটতি,ে জনপদে যখনই পা রখেছেনে, তখনই সে অঞ্চল এবং তার আশপাশ উদ্বলে, ধন্য হয়ছে।েপ্রথম যৌবনে (তখন তনিি উদীয়মান হাবলিদার কব)ি যুবক নজরুল দৌলতপুর নবিাসী আলী আকবর খানরে (কলকাতায় পাঠ্যপুস্কক রচয়তিা, ব্যবসায়ী এবং রুমমটে) আমন্ত্রণে প্রথম (৪ এপ্রলি, ১৯২১) যখন কুমল্লিায় আসনে, তখন তাঁর বয়স মাত্র বাইশ বছর। উর্পযুক্ত সময় থকেে ১৯২৩ সনরে ১৮ ডসিম্বের র্পযন্তনজরুল কুমল্লিায় এসছেনে পাঁচবার। প্রথমবার ৪ ও ৫ এপ্রলি এই দুইদনি ছলিনে খান সাহবেরে কুমল্লিা জলিা স্কুলে সহপাঠী বীরন্দ্রেকুমার সনেগুপ্তরে কান্দরিপাড়রে বাসায়। তারপর দৌলতপুরে ছলিনে একই বত্সররে ১৭ জুন (৩ আষাঢ়, ১৩২৮ বঙ্গাব্দ)র্পযন্ত প্রায় তনি মাস। দৌলতপুরে অবস্থানরে এই সময়রে মধ্যে নজরুলরে জীবনে র্নাগসিরে আবর্ভিাব, প্রণয়, র্ব্যথতা নজরুলরে জীবন ইতহিাসে ‘করুণ অধ্যায়’ বলে চহ্নিতি হয়ছে।ে যার রশে সারাজীবন ধরইে কবকিে বহন করতে হয়ছে।ে
দৗেলতপুরে র্নাগসিরে সঙ্গে প্রমে নজরুলরে নজিরে ইচ্ছতেইে পারবিারকিভাবে পরণিয়রে দকিে গলেওে অজানা কারণে পরণিতি সুখকর হয়ন।ি এ ববিাহ নয়িে নানা কথা আছে তবে তা সবই অনুমান। বয়িরে রাতইে মানসকিভাবে বর্পিযস্ত ক্ষুব্ধ নজরুল বীরন্দ্রেকুমাররে সঙ্গে দৌলতপুর থকেে কুমল্লিা ফরিছেনে ১৮ জুন (৪ঠা আষাঢ়, ১৩২৮) ভোররে দকিে পায়ে হঁেট।েকান্দরিপাড় বীরন্দ্রেকুমার সনেগুপ্তরে বাড়তিে সদেনিরে পর থকেে অবস্থান করছেনে ৮ জুলাই, র্পযন্ত। ইতোমধ্যে নজরুলরে মানসকি বর্পিযয়রে এবং অঘটনরে সংবাদ চঠিতিে অবগত হয়ে কলকাতা থকেে তাঁর অন্তরঙ্গ বন্ধু, সুহৃদ কমরডে মুজফ্ফর আহমদ ৮ জুলাই কুমল্লিায় এলে সদেনিই বকিলেে দুজনএকসঙ্গে কলকাতায় ফরিে যান। বলা সঙ্গত, এই সময়ে মধ্যে নজরুলরে জীবনে প্রমীলা প্রমেরে সুচনা হয়ে গছেে এবং অন্তরঙ্গ অনুভবরে টানে এরপর নজরুল আরও চারবার কুমল্লিায় এসছেনে। শষেবার রাজদ্রোহীতার অপরাধে এক বছররে কারাদণ্ড প্রাপ্ত কবি নজরুল (গ্রফেতারও হয়ছেলিনে কুমল্লিায়) ১৯২৩ সালরে ১৫ ডসিম্বের বহরমপুর জলে থকেে মুক্তি পয়েে কাউকে কছিু না জানয়িে প্রমীলার সান্নধ্যি লাভরে জন্য ১৮ ডসিম্বের কুমল্লিায় চলে আসনে। কুমল্লিায় নজরুলরে এবাররে আগমনে রক্ষণশীলদরে অসন্তুষ্টি টরে পয়েে সহসাই কবি কলকাতা ফরিে যাওয়ার সময় গরিবিালা দবেী ও প্রমীলাকে সঙ্গে করে নয়িে যান। জানা আছ,ে ১৯২৪ খ্রস্টিাব্দরে ২৫ এপ্রলি কলকাতার হুগলতিে বয়িরে মাধ্যমে নজরুল-প্রমীলা প্রণয়রে পরণিতি লাভ কর।ে
প্রকৃতরি নয়িম, কবি নজরুল যে বয়সে প্রথম কুমল্লিায় এসছেনে সইে বয়স প্রমোগুনে দগ্ধ হওয়া এবং পোড়ানোর বয়স। মাত্র তনিমাসরে ব্যবধানে কবি দুইজন রূপসী নারীর প্রমেে পড়ছেনে। অবশ্য, এরপরওে তনিি একাধকি নারীর প্রমেে পড়ছেনে। প্রমীলার ভাগ্য ভালো, ঐ সব প্রমে সফলতার মুখ দখেনে।ি তা না হলে প্রমীলার সংসার জীবনে বর্পিযয় নমেে আসতে পারতো। তবে প্রমেে র্ব্যথ হোন বা সফলতা লাভ করুন নজরুল তাঁর জীবনে নয়িতরি বরিূপ দৃষ্টি থকেে কখনো বরে হয়ে আসতে পারনেন।ি পারনেনি য,ে তার কারণ আমাদরে অনুমান, তনিি নজিইে নজিরে মোহে বন্দি ছলিনে।
বদিতি, কাজী নজরুল ইসলামরে ব্যক্তত্বিে এমন এক প্রচন্ড সম্মোহন শক্তি ছলি, যা তাঁর সমসাময়কি অন্যকোন কবরি মধ্যে ছলি না। সহজে যকেোন মানুষকে কাছে টানার ক্ষমতা ছলি তাঁর চরত্রিরে অন্যতম বশৈষ্ট্যি। আর্কষণীয় ঝাঁকড়া চুলরে বারড়ি দোলানো সৌম্য চহোরার অধকিারী নজরুলরে দৃষ্টি একবার যার চোখে পড়ছে,ে নারী- পুরুষ নর্বিশিষেে সইে তাঁর কাছে আজীবনরে জন্য বাঁধা পড়ছে।ে একমাত্র ব্যতক্রিম অঙ্কশাস্ত্রী ফজলিাতুন্নসো। নজরুল ছলিনে বঠৈকী মজোজরে প্রাণরসে ভরা মধুর ভাণ্ড, আর অন্যরা মধুপ। যইে তাঁর সান্নধ্যিে গছেে সকলইে তাঁকে নজিরে করে পতেে চয়েছে।ে
তনিি রূপরে আর তাঁর অগ্রজ রবীন্দ্রনাথ ছলিনে অরূপরে কব।ি সম্মোহতি করার ক্ষমতা নজরুলরে যমেন ছলি তমেনি তনিি নজিওে বগিলতি হয়ছেনে স্নহে,ে আদর,ে সবোয়, প্রমেে ও নারীর রূপ।ে অরূপরে সাধনা ধর্যৈরে, সংযমরে। ধর্যৈ, সংযম, স্থরিতা কবি নজরুলরে জীবনে কখনো ছলিনা। নারগসিকে তনিি প্রথম দখোতইেতাঁর রূপে মুগ্ধ হয়ে প্রমেে পড়ছেনে। তনি মাসরে মধ্যে বয়িরে প্রস্তাব দয়িছেনে। র্ব্যথ হয়ছেনে। আবার দৌলতপুর থকেে কুমল্লিা ফরিে প্রমীলার প্রমেে পড়তে নজরুলকে রূপরে মোহইে খুব একটা আপক্ষো করতে হয়ন।ি আর অপরদকিে নারগসি নজরুলকে ফরিে পতেে ষোল বছর অপক্ষো করছেনে!
বলছে,ি নজরুলরে জীবনে দৌলতপুর অধ্যায়ে র্নাগসিরে প্রমে পরণিতি লাভ করনে।ি এর কারণ নর্ণিয় করতে গয়িে জীবনীকার, নজরুল গবষেক কউেই আজ র্পযন্ত একমত হতে পারনে।ি অবশ্য দ্বমিতরে ব্যাপার ঘটছেে তখন, যখন নজরুলরে অন্তরঙ্গ বন্ধুকমরডে মুজফফর আহমদ (১৮৮৯- ১৯৭৩) তাঁর রচতি গ্রন্থ ‘স্মৃতকিথা’র তৃতীয় সংস্করণে (১৫ অক্টোবর, ১৯৬৯) দৌলতপুর অধ্যায় সর্ম্পকে নজিরে মত পরর্বিতন করনে। নজরুলরে জীবন ও সৃষ্টি সর্ম্পকতি উল্লখেযোগ্য বষিয় নয়িে প্রণীত ‘স্মৃতকিথা’ প্রথম প্রকাশতি (প্রথম মুদ্রণ) সপ্টেম্বের, ১৯৬৫ খ্রস্টিাব্দে এবং১ মে ১৯৬৭ দ্বতিীয় সংস্করণপ্রকাশতি হয়। এই দুটি সংস্করণে নজরুল-র্নাগসি ববিাহ বষিয়ে তনিি যে ইতবিাচক মত দয়িছেলিনেতা তনিি তৃতীয় সংস্করণে এসসেন্তোষকুমার-এরবরাত দয়িে ‘ববিাহ হয়ন’ি বলে আগরে বক্তব্য বাতলি করে দনে।বলা আবশ্যক, এই সন্তোষ দৌলতপুরে বয়িতেে অংশগ্রহণকারী নমিন্ত্রতি অতথিদিরে একজন, যার তখন বয়স ছলি মতান্তরে ১২-১৪ বছর। মুসলমি বয়িে সর্ম্পকে ঐ বয়সরে একজন হন্দিু বালকরে বয়ান প্রত্যক্ষর্দশি হসিবেে মুজফফর আহমদ গ্রহণ করছেনে যখনসন্তোষকুমার কলকাতায় সরকারি চাকুরি থকেে অবসরপ্রাপ্ত ষার্টোধ বৃদ্ধ।এ ছাড়াও, গ্রন্থে র্নাগসিকে তনিি বলছেনে, অভনিত্রেীএবং তাঁর মামা আলী আকবর খান সর্ম্পকে স্মৃতকিথকরে রয়ছেে ‘মনে হওয়া’মন্তব্য, যাতথ্য নর্ভির এবং যুক্তসিংগত মনে না হবার মতো উপাদান ‘স্মৃতকিথা’ গ্রন্থইেপরবিশেতি তথ্যে পাওয়া যায়।
মনে কর,ি নজরুল-র্নাগসি অধ্যায়ে কখনো বর্তিক সৃষ্টি হতো না, যাঁর ভাষ্য পলেে তনিি কবি নজরুল ইসলাম এবং যার কাছে নজরুল প্রথম আদ্যোপান্ত ঘটনার র্বননা করছেনে, সইে মুজফফর আহমদরে বক্তব্যে যদি কোন ‘ফাঁক’ না থাকতো! এই দুজনরে একজন তো অবশ্যই প্রকৃত সত্য জাননে। বলা হয়ছে,ে এ ব্যাপারে কবি কখনো মুখ খোলনেন।ি আর দলেতৈপুরে ঘটনার পর (৮জুলাই) থকেে জীবনরে উল্লখেযোগ্য সময় দুজন একসাথে থকেওে কমরডে তাত্ক্ষণকি এবং পরওে কখনও কবকিে র্নাগসিরে সঙ্গে তাঁর বয়িে হয়ছেে কি হয়ন,ি এ বষিয়ে ‘বব্রিত করা হব’ে উছলিায় কোনদনি জজ্ঞিসে করনেন!ি যদওি নজরুল সদেনি র্পূবাপর দৌলতপুররে সব ঘটনা ছবরি মতো স্মৃতকিথককে বলছেনে, কবেল বয়িরে ঘটনাটি বাদ।েএই ‘ফাঁক’ রখেইে জীবনীকাররা নজরুলরে বশিাল জীবনী লখিে গছেনে, গাল-গল্প, কোথাও নোংরা ইংগতিও করা হয়ছে।ে র্নাগসি এবং তার মামা আলী আকবর খান সর্ম্পকে মাঠ র্পযায়ে কোন যাচাই ছাড়াই মুজফফর আহমদকে অনুসরণ করে গছেনে প্রায় সকলইে। অন্যদকিে অযাচতি অপবাদরে বোঝা মাথায় নয়িে র্নাগসি প্রবাসে লোকান্তরতি হয়ছেনে আর আলী আকবর খান ভলিনেরে ভূমকিায় অক্ষয় হয়ে আছনে।
তাই বলছলিাম, কাজী নজরুল ইসলামরে জীবনে প্রমীলা ও র্নাগসি প্রসঙ্গ এবং কুমল্লিায় অবস্থানকালে নজরুলরে রাজনতৈকি ভূমকিা,অসংখ্য কবতিা ও গান রচনা, গুণীজন সান্নধ্যিে সময় যাপন,আমাদরে কুমল্লিাবাসীর র্স্পশকাতর ভালো লাগা- মন্দ লাগার জায়গা। কবরি জীবনে ও সৃজনে যে দুজন নারী আমৃত্যু গুরুত্বর্পূণ ভুমকিা রখেে গছেনে তাঁরা দুজনই এই মাটরি। এদরে কারো প্রতি অজ্ঞতাপ্রসূত নন্দিাবাক্য, ধারণা পোষণ করে নজরুলরে জীবন ইতহিাস রচনা আমাদরে কাম্য নয়। দবেতা নয়, যুক্তগ্রিাহ্য তথ্যরে আলোকে দোষ-েগুণমোনবকি নজরুলকে আমরা পতেে চাই।কনেনা, কবরি জীবনরে নতেবিাচক-ইতবিাচক সব ঘটনাই আমরা বরণ করে নইি সইে মানবকিতাবোধে যে রোধরে কারণে কবি র্সবকালরে সরো, চরিকালরে অনন্য ও একক।
২৪.৫. ২০২২
বনশ্রী, রামপুরা, ঢাকা।
ইউরোপে নজরুলের চিকিৎসা
মুজাফফর আহ্মদ ||
‘কাজী
নজরুল ইসলাম স্মৃতি কথা’ গ্রন্থে মুজাফফর আহ্মদ, তাঁর স্মৃতি কথা প্রসঙ্গে
বলেন- ‘‘ কেউ কেউ বলতে পারেন ‘ আপনি তো ছিয়াত্তর বছরের বুড়ো, আপনি... ...
.. খবর কি রাখেন?’ তাঁদের আমি শুধু এই উত্তর দিতে পারি যে তেতাল্লিশ বছর
আগে আমার বয়স ছিল তেত্রিশ বছর। তাঁর স্মৃতি গ্রন্থ প্রথম প্রকাশ হয়
সেপ্টাম্বর ১৯৬৫ সাল।
উনিশ শ’ ত্রিশের দশকে নজরুলের জীবনের একটি বিশেষ
যুগ। এই দশকে সঙ্গীত সাধনার ভিতর দিয়ে নজরুলের অপরূপ সৃষ্টির তুলনা নেই।
সে গান রচনা করেছে, গান শিখিয়েছে, এক কথায় আমাদেও সঙ্গীতকে সে নতুন
নতুনঅবদানে সমৃদ্ধ করেছে। গ্রামফোন কোম্পানির সহিত সংযুক্ত থাকায় তার
পরিশ্রমের অন্ত ছিল না এবং একান্তভাবে তাকে মস্তিস্কেও পরিশ্রমই করতে
হয়েছিল অত্যন্ত বেশী। নজরুলের যে এতো বড় রোগ তা নোটিস না দিয়ে আসেনি। সেই
নোটিসের ভাষা শুরুতে শুধু নজরুলেই বুঝেছিল। আমি আগেই বলেছি যে তখন সে
বিজ্ঞানের দিক হতে মুখ ফিরিয়ে নিয়েছিল। ১৯৪২ সালের জুলাই মাসে তার রোগ যখন
সকলের চোখেপ্রকাশ পেল তখন চিকিৎসা হয়েছিল বটে, কিন্তু ‘‘ প্রাথমিক চিকিৎসা
অত্যন্ত অপরিমিত ও অসম্পূর্ণ হয়েছে।” তখনও অবশ্য কোনো কোনো ডাক্তার
বলেছিলেন যে বড় দেরি হয়ে গেছে। তখন যদি কবিকে ইউরোপে পাঠানো যেত তা হালে
তার মস্তিষ্কে অপারেশন অন্তত হতে পারত। তবে, টাকা থাকলেও সেই সময় কবিকে
ইউরোপে পাঠানো সম্ভব হতো না। কেন না বিশ^ যুদ্ধ চলছিল। কিন্তু ‘ নজরুল
নিরাময় সমিতি’ গঠিত হয়েছিল বড় দেরীতে,- ১৯৫২ সালের জুন মাসে। চার মাস
রাঁচিতে চেষ্টা করার পওে সস্ত্রীক কবিকে ইউরোপে ( লণ্ডনে) পাঠানো হয়েছিল
১৯৫৩ সালের মে মাসে। ১০ মে তারিখে তাঁরা হাওড়া স্টেশন হতে রওয়ানা
হয়েছিলেন।
লন্ডনে বড় বড় ডাক্তারেরা কবির রোগ নির্ণয়ের চেষ্টা করেছেন।
ডাক্তার রাসেল ব্রেন, ডাক্তার উইলিয়াম স্যারগাস্ট ও ডাক্তার ম্যাক্ কিস্
ক্-এর মতো প্রসিদ্ধ ডাক্তারগণ কবিকে নিয়ে তিনবার বসেছিলেন। শুনেছি প্রত্যেক
বৈঠকে তাঁরা ২৫০ পাউণ্ড হিসাবে ফিস নিয়েছেন। প্রবীণ চিকিৎসক ডাক্তার রাসেল
রেনের মতে কষির মস্তিষ্ক বিকৃতি দুরারোগ্য রোগীর রোগ সম্বন্ধেও লণ্ডনেই
দুই দল বিশেষজ্ঞের মধ্যে প্রবল মতভেদ হয়েছে। একদল বিশেষজ্ঞ বলেছেন যে, রোগী
'ইন্ভল শনাল সাইকোসিস রোগে ভগেছেন, অপরদল কলিকাতার বিশেষজ্ঞদের
ডায়োগনেসিসকেই সমর্থন করেছেন। তবে উভয় দলীয় বিশেষজ্ঞদের মতেই প্রাথমিক
চিকিৎসা অত্যন্ত অপরিমিত ও অসম্পূর্ণ হয়েছে। লন্ডনের 'লন্ডন ক্লিনিক' নামক
হাসপাতালে কবির মস্তিষ্কে বাতাস পরে এয়ার এনসেফ্যালোগ্রাফী। নামক এক্স-রে
পরীক্ষা করা হয়। ঐ পরীক্ষায় প্রতিপন্ন হয় যে, কবির মস্তিষ্কের পরোভাগ
অর্থাৎ ফ্রনটাল লোবাম্বয় সংকুচিত হয়ে গেছে। ডাক্তার ম্যাককিস্ক প্রমূখে
ডাক্তারগণ বলেন যে ম্যাকুসিক অপারেশন' নামক অস্ত্রোপচার বিধির বারা যদি
কবির মস্তিষ্কের পরোভাগে অবস্হিত ফ্রন্টোথ্যালমিক ট্রাক্ট নামক নায়থে
মস্তিষ্কের অপরাংশ হতে বিচ্ছিন্ন করা যায়, তবে হয়তো রোগীর বর্তমান
অপরিচ্ছন্নতা প্রভৃতি বদভ্যাসগুলি উপশম হবে, কিন্তু ডাক্তার রাসেল ব্রেন এই
মতের বিরোধিতা করেন। অতঃপর কবির রোগ বিবরণী ও পরীক্ষার রিপোর্টসমূহ ভিয়েনা
ও ইউরোপের অন্যান্য বহস্হানের চিকিৎসকদের দ্বারা পরীক্ষা করানো হয়।
জার্মানীর বন ইউনিভার্সিটির মস্তিষ্ক শলাবিদ্যার অধ্যাপক, প্রফেসর রোয়েগেন
বলেন যে, ম্যাককিক্ অপারেশন কবি নজরুলের ক্ষেত্রে প্রযোজ্য নয়। ভিয়েনার
মস্তিষ্ক শল্যবিদ ডাক্তার ম্যাককিস্ক-এর মতের বিরোধিতা করেন। উপরিউক্ত
তিনজনেই কবির মস্তকে সেরিব্রাল অ্যানজিওগ্রাফি নামক পরীক্ষা (এক্স-রে) করার
পক্ষে মত প্রকাশ করেন। কবির সংহদগণের ইচ্ছায় কবিকে (ভিয়েনায়) নোবেল
পুরস্কার প্রাপ্ত প্রফেসর হবাগনার ইয়াউরেগ এর সংযোগা ছার ডাক্তার হানস
হফ-এর অধীনে ভর্তি করা হয়। গত ৯ই ডিসেম্বর (১৯৫৩) বুধবার কবির ঊপর
সেরিব্রাল অ্যানজিওগ্রাফি পরীক্ষা করা হয়। ডাক্তার হয়, এই পরীক্ষার ফলদষ্টে
দৃঢ় মত প্রকাশ করেন যে, কবিবর
পিক্স ডিজিজ নামক মস্তিষ্কের রোগে
ভুগছেন। উক্ত রোগে মস্তিষ্কের সম্মূখে ও পার্শ্ববর্তী অংশগুলি সংকুচিত হয়ে
যায়। ডাক্তার হফের মতে রোগীর বর্তমান লক্ষণগুলি এই রোগের সহিত মিলে যায়।
ডাক্তার হফ বলেন যে, কবির -ব্যাধি এতদূর অগ্রসর হয়েছে যে, নিরাময়ের বিশেষ
কোনই আশা নেই।
১৯৫৩ সালের ডিসেম্বর মাসের ২৭শে তারিখে কলকাতার যগোন্তর’
দৈনিকে ‘ভিয়েনায় নজরুল' নাম দিয়ে কলকাতার ‘নিউরো সার্জন’ ডাক্তার অশোক
বাগচীর একটি লেখা ছাপা হয়েছিল। ডাক্তার বাগচী তখন ভিয়েনায় উচ্চশিক্ষা লাভ
করছিলেন। নজরুল ইসলামের চিকিৎসার ব্যাপারের সঙ্গে তিনি বিশেষভাবে যক্তও
ছিলেন। ওপরের উদ্ধৃতি তাঁর সেই লেখা হতে নেওয়া। আজহার উদ্দীন খান তাঁর
'বাংলা সাহিত্যে নজরুল' নামক গ্রন্থের চতুর্থ সংস্করণে (৬১ ও ৬২ পৃষ্ঠা)
'যুগান্তর’ হতে ডাক্তার বাগচীর লেখা তুলে দিয়েছেন। আমার উদ্ধৃতি আমি তা
থেকেই নিয়েছি। জেলখানায় পরানো ‘যাগোন্তর' পাওয়ার উপায় নেই। তবে বাংলা
সাহিত্যে নজরুলের ওই অংশটা আমি ডাক্তার বাগচীকে দেখিয়ে নিয়েছি। আমার
অনুরোধে এবং পশ্চিমবঙ্গ সরকার তাঁর সঙ্গে আমার মুলাকাত মঞ্চার করায়, তিনি
দয়া করে দমদম জ্বেলে এসেছিলেন। তাঁর সঙ্গে আলোচনা করে আমি অনেক বিষয় বুঝতে
পেরেছি। বন ইউনিভার্সিটির প্রফেসর রোয়েটগেন ব্যক্তিগতভাবেও কবিকে পরীক্ষা
করেছেন। ইংল্যান্ডের ডাক্তাররা কবিকে পরীক্ষা করার জন্যে মোটা ফিস
নিয়েছিলেন, কিন্তু ইউরোপের অন্যান্য স্হানের ডাক্তাররা বাঙলার জাতীয় কবিকে
পরীক্ষা করার জন্যে কোন ফিস নেননি। নজরুলরা ইউরোপ ত্যাগ করার পরক্ষণেই
পশ্চিমবঙ্গের মুখ্যমন্ত্রী ডক্টর বিধানচন্দ্র রায় ভিয়েনা গিয়েছিলেন।
নজরুলের ব্যাপারে তিনি ডাক্তার হাস হফ-এর সঙ্গে দেখাও করেছিলেন। নজ