ই-পেপার ভিডিও ছবি বিজ্ঞাপন কুমিল্লার ইতিহাস ও ঐতিহ্য যোগাযোগ কুমিল্লার কাগজ পরিবার
অ্যানালগ পরিবহনব্যবস্থা ডিজিটাল করার নামে আর কত অর্থ অপচয়
Published : Wednesday, 2 February, 2022 at 12:00 AM
অ্যানালগ পরিবহনব্যবস্থা ডিজিটাল করার নামে আর কত অর্থ অপচয়ডিজিটাল বাংলাদেশ গড়া এ সরকারের প্রধানতম প্রতিশ্রুতি। যার বাস্তবায়ন আমরা অনেক কিছুতেই দেখতে পাই। কিন্তু ঢাকার পরিবহনব্যবস্থা রয়ে গেছে সেই অ্যানালগে। এ যেন স্মার্টফোনের দুনিয়ায় কাউকে জরুরি খবর দিতে কবুতরের পায়ে চিঠি বেঁধে পাঠানো। পৃথিবীর বেশির ভাগ শহরের পরিবহনব্যবস্থা যেখানে ডিজিটাল হয়ে গেছে, সেখানে আমরা যেন পড়ে আছি কবুতর দিয়ে কাজ সারানোর যুগে। অবিশ্বাস্য হলেও হাজার কোটি টাকা খরচ করেও রাজধানীর পরিবহনব্যবস্থাকে ডিজিটাল করা যায়নি। একের পর এক প্রকল্প নেওয়া হয়েছে, সবগুলোই মুখ থুবড়ে পড়েছে। দিন শেষে সরকারের বিপুল অর্থ অপচয় ছাড়া কিছুই হয়নি।
প্রথম আলোর প্রতিবেদন বলছে, পৃথিবীর বেশির ভাগ বড় শহরে এখন পরিবহনে চড়তে হাতে ভাড়া দেওয়ার দিন শেষ হয়ে গেছে। চালু হয়েছে মাস, এমনকি বছরওয়ারি র‌্যাপিড পাস বা বিশেষ কার্ড মাধ্যমে ভাড়া পরিশোধের নিয়ম। মানুষ প্যাকেজ অনুসারে সেসব কার্ড কিনে রাখে। বাংলাদেশে সাত বছর আগে তেমন ব্যবস্থার উদ্যোগ নেওয়া হলেও কার্যকর করতে পারেনি ঢাকা যানবাহন সমন্বয় কর্তৃপক্ষ (ডিটিসিএ)। ৬০ হাজার র‌্যাপিড পাস ও যন্ত্রাংশ কিনে যেন দায়িত্ব শেষ করেছে তারা। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, হাতে ভাড়া নেওয়া বন্ধ করলে পরিবহন খাতে চাঁদাবাজিও অনেকটা বন্ধ হয়ে যেত। তাহলে প্রশ্ন থেকেই যায়, ঢাকার রাস্তায় কয়েক শ কোটি টাকার চাঁদাবাজি টিকিয়ে রাখতেই কি এ উদ্যোগ চালু করা যাচ্ছে না?
গত দুই দশকে সিগন্যাল বাতি স্থাপন, রক্ষণাবেক্ষণ এবং বারবার পরিবর্তনে প্রায় দুই শ কোটি টাকা খরচ হয়েছে। শ খানেক মোড়ে স্বয়ংক্রিয় সিগন্যাল বাতি থাকলেও গোটা শহরেই যান চলে ট্রাফিক পুলিশের হাতের ইশারায়। এ ছাড়া গত এক দশকে ডিজিটাল হয়ে গেছে যানবাহনের জন্য দরকার সব ধরনের নথি। বিআরটিএ যাবতীয় কর ও ফি আদায় এবং সংস্থাটির সারা দেশের কার্যক্রম অনলাইনে সমন্বয় করার জন্য সফটওয়্যার ব্যবহার করা হচ্ছে। এসব ডিজিটাল ব্যবস্থা চালু করতে তিন হাজার কোটি টাকার বেশি ব্যয় হচ্ছে। এ অর্থের পুরোটাই নেওয়া হচ্ছে দেশের প্রায় ৪৫ লাখ যানবাহনের মালিক ও চালকদের কাছ থেকে। নিয়ন্ত্রণকক্ষে বসেই যে কোনো গাড়ির বিরুদ্ধে আইনি ব্যবস্থা নেওয়া যাবে। রাস্তায় গাড়ি আটকে নথি চেক করার কোনো সুযোগই আর নেই। তবু সবকিছু চলছে হাতের ইশারাতেই। ফলে এখানেও আসছে চাঁদাবাজির প্রশ্ন। ফলে ডিজিটাল সুবিধার এত সব তালিকা গালভরা গপ্পে পরিণত হয়েছে।
যানজটে ঢাকায় দৈনিক ৫০ লাখ কর্মঘণ্টা নষ্ট হচ্ছে। যার আর্থিক ক্ষতি বছরে প্রায় ৩৭ হাজার কোটি টাকা। যানজটের কারণে রাজধানীতে একটি যানবাহন ঘণ্টায় যেতে পারে গড়ে পাঁচ কিলোমিটার, যা হাঁটা গতির সমান। এ গতিতে যানবাহন চলাচলে দুর্ঘটনায় পড়ার কথা নয়। এরপরও ঢাকায় সড়ক দুর্ঘটনায় মৃত্যু হচ্ছে প্রতিনিয়ত। এর মূলে সড়কে বিশৃঙ্খলা দায়ী। দেখা যাচ্ছে, শুধু এক কর্মদিবসে সিগন্যাল বাতি মেনে পরীক্ষামূলকভাবে যানবাহন চলাচলের ব্যবস্থা করা হয়েছিল সেদিনই যানজটে ঢাকা শহর প্রায় অচল হয়ে পড়েছিল।
পরিবহন বিশেষজ্ঞ অধ্যাপক সামছুল হক বলছেন, মোড়ে মোড়ে হাজারো প্রকৌশলগত ত্রুটি না সারিয়ে কেবল বাতি স্থাপন করে সফল হওয়া যাবে না। বিজ্ঞানসম্মত উপায়ে সেসব পরিচালনা করার মতোও লোকবল তৈরি করা হয়নি। যেসব সুবিধা দেওয়া হবে বলে বিআরটিএ গ্রাহকদের কাছ থেকে টাকা নিচ্ছে, তা দিতে না পারা অন্যায়। ঠিকাদার প্রতিশ্রুতি অনুযায়ী সেবা দিচ্ছে না অথবা সেই সুবিধা নেওয়ার মতো সক্ষমতা অর্জন না করেই বিআরটিএ ডিজিটাল ব্যবস্থা চালু করেছে। উন্নয়ন মানে শুধু প্রকল্প নেওয়া আর বরাদ্দ পাস করা নয়—এর চেয়ে বাস্তব নজির আর কিছুই হতে পারে না। সেই হুঁশ আমাদের নীতিনির্ধারকদের কবে হবে?