
জুলফিকার নিউটন ||
৮
শৈশব থেকে বাবা-মার কাছে পরিচ্ছন্নতার কথা শুনেছি। পূর্ণ অবগাহনে শরীর পরিচ্ছন্ন হয় এবং প্রতিদিন বিভিন্ন কর্মের সূত্রপাতে শরীরকে পরিচ্ছন্ন করতে হয়। ধর্ম সাধন ক্ষেত্রে তো অবশ্যই কিন্তু কর্ম-সাধন ক্ষেত্রেও সকালে ঘুম থেকে ওঠার পর থেকে রাত্রিতে শয্যায় যাওয়ার মুহূর্ত পর্যন্ত আমরা অনবরত পানি ব্যবহার করে চলি। এটা আমাদের করতেই হয়। পরিচ্ছন্নতা শিষ্টাচার এবং সর্ব অবয়বকে গ্লানিমুক্ত করার জন্য পানির ব্যবহারের কথা আমি আমার বাবার কাছে শুনতাম। এটা যে শুধু মুসলমানদের জীবনে তাই নয় অন্য ধর্মাবলম্বীদের জীবনেও স্নানের প্রশান্তি এবং পবিত্রতার উল্লেখ আছে। হিন্দুদের পূরাণে আছে যে সীতা প্রকৃতির সৌন্দর্যের অনুরাগী ছিলেন। রাবণ কর্তৃক অপহরণের পর তিনি পর্বত দেখে আনন্দিত হতেন এবং নদীকে আপন অনিন্দ্য অশ্রুতে ধৌত করতেন। লঙ্কায় অবস্থানকালে রামের বিরহে ক্লিষ্টা হয়েও সীতা নাকি এক নদীর সঙ্গে একাত্ম না হয়ে থাকতে পারেননি। আজও লংকায় সীতা বাঁকা নামে একটি নদী আছে। আজও বর্ষাকালে সে নদী তার দুই তীরের মধ্য দিয়ে প্রবাহিত সমস্ত ভূভাগকে প্রাবিত করে তাদের সকলকেই সুবর্ণময় করে তোলে। আমরা এভাবেই পানির আতিথ্য নিয়ে জীবিত রয়েছি। বৃহদারণ্যক উপনিষদে বলা হয়েছে মধ্যক্ষরন্তী সিম্বব। অর্থাৎ নদী আমাদের মধুময় পানি প্রদান করুক। অবশ্য এককভাবে এ বাণীটি আসেনি। এর সঙ্গে আরো কতগুলো প্রার্থনা এসেছে। পূর্ণ প্রার্থনাটি হচ্ছে ঃ আমাদের জন্য বাতাস অনুকূল হোক। সকল ঔষধ এবং বনস্পতি মধুমান হোক। প্রথিবীর ধুলিকণা মধুময় হোক। রাত্রি আমাদের জুন্য কল্যাণকারী হোক, উষা সন্ধ্যা সুখদায়ী হোক। পিতৃস্বরূপ আকাশ আমাদিগকে আশীর্বাদ করুক। বৃক্ষ সকল আমাদের জন্য মিষ্ট ফল প্রদান করুক। সূর্য আমাদের কল্যাণ করুক। গাভী আমাদের জন্য মধুর দুগ্ধ দান করুক। এখানে যতগুলো কথা বলা হয়েছে সবগুলোই একে অন্যের সঙ্গে সংযুক্ত। অর্থাৎ জীবন শুধুমাত্র একটি বস্তুতে পরিপূর্ণ হয় না, জীবন সকল কিছুকে গ্রহণ করেই পরিপূর্ণ হয়। আমরা সূর্যের আলোক প্রত্যাশা করি, রাত্রির অন্ধকার কাম্য করি, বৃক্ষের শোভামান ছায়া আশ্রয় করি, প্রাণীকুলের দানে শরীরকে পুষ্ট করি এবং নদীর প্রবাহে পরিচ্ছন্ন ও বহমান হই। এটাই তো জীবনের গতি। যতদিন মানুষ বেঁচে থাকে ততদিন এই গতির প্রশ্রয়েই সে জীবন্ত থাকে। জাপানে দেখেছি সেখানকার মানুষ দীনতা থেকে, জীর্ণতা থেকে এবং সর্বম্বের ক্ষয়ের থেকে রক্ষা পাবার জন্য এমন কিছু পৃথিবীতে রেখে যেতে চায় যার শেষ সে দেখে না। জীবন তো শেষ হবেই সুতরাং জীবন প্রবাহকে গ্রহণ করলে মৃত্যু মানুষের জীবনে সমস্যা হয় না। মৃত্যুর কারণে অসহায় বোধ করা জীবনের অপলাপ মাত্র। গাছের পাতা ঝরে যায়। কিন্তু গাছকে তো আমরা অস্বীকার করি না, ক্ষয়িষ্ণু পৃথিবীর সব ছবি যেন ম্রিয়মান না হয় সে জন্য জাপানীরা কিছু কিছু দীর্ঘস্থায়ী বস্তুকে সম্ভ্রমের সঙ্গে রক্ষা করে। এর মধ্যে একটি হচ্ছে স্রোতবাহী পানি। তাদের বাগানে প্রবাহিত পানির কল্লোলিত গুঞ্জনের ব্যবস্থা আছে। মানুষ তার জীবনে সর্বসম্পদেরই শেষ দেখবে না কিছুটা সম্পদের মধ্যে আপন চিহ্ন রেখে যাবে। এ প্রার্থনাই জাপানী চিত্তকে আনন্দময় করেছে, কলা কৌলতায় উদগ্রীব করেছে। জীবন মূল্যবান বলেই নদীর প্রবাহকে তারা মূল্য দিয়েছে। এ অবধারিত এবং অনন্ত প্রবাহ সহজ এবং সত্য বলেই তাদের কাছে জীবন মূল্য পেয়েছে। রামায়ণে আছে যে মহর্ষি বাল্মিকী জাহ্নবীর নিকটস্থ তমস্যা নদীর তীরে এসে তার সঙ্গী শিষ্য ভরদ্বাজুকে বললেন ভরদ্বাজ দেখো এই তীর্থ কেমন কর্মশূন্য রমণীয়, এর জল সচ্চরিত্র মানুষের মনের তুল্য স্বচ্ছ! বৎস তুমি কলস রেখে আমার বক্কল দাও, আমি এই উত্তম তমস্যা তীর্থে অবগাহন করবো। বাল্মিকী রামায়ণের সূত্রপাত এভাবেই পবিত্রতা এবং পরিচ্ছন্নতার কথা বলা হয়েছে। আমার জীবনে আমি সর্বদাই পিতা-মাতার মুখে ঐশ্বর্য এবং সমৃদ্ধির কথা শুনেছি। শুনেছি, পবিত্রতা ও পরিচ্ছন্নতার কথা। আজ চতুর্দিকে দৃষ্টিপাত করে গ্লানি ও অকল্যাণ যখন আমাকে বিমর্ষ করে তখন পুরনো দিনের পরিচ্ছন্নতার দাবীর কথা মনে জাগে। ভাবি, যদি চতুর্দিককে মুক্ত বায়ু প্রবাহে স্নিগ্ধ করা যেত এবং পানির প্রবাহকে স্বচ্ছ এবং গতিমান রাখা যেত তাহলে বোধহয় আমাদের সমৃদ্ধির অপলাপ ঘটতো না। রামায়ণের বালকাণ্ডে রাক্ষসের নিধনের জন্য রাম-লক্ষণের প্রস্তুতির কথা আছে। রাত্রি প্রভাত হলে প্রাতঃকৃত্য সমাপন করে কিছুদূর যাত্রা করে তারা এক রমণীয় আশ্রমে উপনীত হলেন। উক্ত আশ্রম ছিলো জাহ্নবী সরযূর সঙ্গমস্থলে। আশ্রমবাসী মুনিগণ বিশ্বামিত্রের আগমনে অত্যন্ত প্রীত হয়ে তাদের সৎকার এবং রাত্রি যাপনের বাবস্থা করলেন। পরদিন বিশ্বামমিত্রসহ রাম-লক্ষণ গঙ্গাতীরে এসে নৌকাযোগে পার হলেন। নদীর মধ্যে এসে রাম প্রশ্ন করলেন বারিণ্যে ভিদ্যমানস্য কৈময়ং তুমুলো ধ্বনি? অর্থাৎ আমরা যে জল ভেদ করে যাচ্ছি এ তুমুল শব্দ কি তারই। বিশ্বামিত্র বললেন ব্রহ্মা কৈলাশ পর্বতে তার মন দ্বারা এক সরোবর রচনা করেছিলেন, তার নাম মানস সরোবর। অযোধ্যার দিকে যে পূণ্যতোয়া নদী গেছে তার ব্রহ্মার সরোবর থেকে নিঃসৃত সেজন্য তার নাম সরযূ। সরযূ এখানে জাহ্নবীর সঙ্গে মিলিত হয়েছে, তারই বারিসংক্ষোভের জন্য এই অতুলনীয় শব্দ হচ্ছে রাম। তুমি মনঃসংযম করে প্রণাম কর।'
রামায়ণে বর্ণনায় দেখা যায় জীবনের সিদ্ধি এবং সৌহার্দ্য এবং পবিত্রতার জন্য নদী এক সময় পূজ্য ছিলো। জীবনকে শান্ত, স্নিগ্ধ এবং আনন্দময় করবার জন্য নদী তার গতিমানতাকে দূর করেছে এবং ভূমিকে উর্বরা করেছে। উর্বরতাই যেহেতু জীবনের প্রাণবিন্দু তাই পানিই হচ্ছে পরিচ্ছন্নতার সর্বোত্তম উপকরণ। কোরআন শরীফে অনেক উপমায় নির্ঝণীর কথা এসেছে। স্বর্গের প্রশান্তি তখনোই সম্ভবপর যখন নির্ঝরণীর সিক্ত প্রসাদে তা অভিসিক্ত হচ্ছে। যে আনন্দ চিরকালের, যে তৃপ্তি সর্বমুহুর্তের এবং যে বিশ্বাসের ব্যতিক্রম নেই সে সমস্ত কিছুই প্রবাহিত নহরের মতো। প্রথম মানুষ সৃষ্টি করে আল্লাহ তায়ালা এই অপরূপ স্রোত ধারার সান্নিধ্যে তার জন্য অবস্থিতি নির্দিষ্ট করেছিলেন। আমার কাছে এটি একটি অসাধারণ রূপক বলে মনে হয়। কোরআন শরীফে বলা হয়েছে, আল্লাহ তায়ালা যে প্রভূত উপকরণ পৃথিবীতে দিয়েছেন তা পরিচ্ছন্ন এবং পবিত্র এবং তা তিনি দিয়েছেন মানুষের জীবন রক্ষার জন্য। এ পৃথিবীর জীবনে জীবন-যাপনের সততার জন্য মানুষের জন্য যে উকরণ বিধাতা দিয়েছেন তার মধ্যে পানি হচ্ছে একটি। পৃথিবীতে মানুষের জন্য অনেক কিছু বর্জন এবং উপেক্ষা করার নির্দেশ আছে কিন্তু পানিই একমাত্র উপকরণ যাকে সমগ্রভাবে গ্রহণ করবার নির্দেশ আছে। পানির আরেক নাম হচ্ছে কৃতজ্ঞতা। জীবন যাপনের সুফলতার কৃতজ্ঞতাস্বরূপ মানুষ পানিকে পেয়েছে, তার ভাসমান স্রোতধারায় সে পবিত্র হয়েছে, নদীর সাহায্যে সমুদ্রের সাহায্যে সে পৃথিবীর সমগ্র অঞ্চলের সঙ্গে কল্লোলিত। পানির প্রবাহ যেন মানব অস্তিত্বের আনন্দের অভিব্যক্তি’!
আমি অনেক সময় স্বপ্ন দেখি যে একটি বিরাট নীল তরঙ্গের মধ্যবিন্দুতে আমি আন্দোলিত হচ্ছি। আমি ডুবে যাচ্ছি না, হারিয়ে যাচ্ছি না, কিন্তু আন্দোলনের উচ্ছলতায় উদ্ভিন্ন যৌবন হচ্ছি। এ স্বপ্নের অর্থ কি আমি জানি না। কিন্তু আমার মনে হয় শৈশব থেকে পানির প্রতি যে মমতা আমার চিন্তায় এবং বিশ্বাসে নির্মিত হয়েছিল তার ফলেই আমি সর্বদাই পানির প্রবাহের মধ্যে নিজেকে আন্দোলিত দেখতে পাই এবং এভাবেই আমার বিশ্বাস হয়েছে যে জীবন কখনো নিঃশেষ হবার নয়। জীবন একটি অনন্ত যাত্রার মতো। পৃথিবীতে মানুষ মনে করে এককভাবে সেই বোধহয় সকল বিবেচনার অধিকারী। কোনো মানুষই অন্য মানুষের অস্তিত্বকে চেনে না। আমরা প্রতিদিন বহুবিধ মানুষের সংস্পর্শে আসি কিন্তু সর্বদাই নিজেকেই দেখি অন্যকে দেখি না। মানুষ সব সময় মনে করে সেই একা বেঁচে আছে এবং অন্যরা ক্রমশঃ হারিয়ে যাচ্ছে। এই একান্ত নিষ্ঠুর চিন্তার ফলে আমরা জীবনে একটি সংকীর্ণতার অবাস্তব পটভূমি নির্মাণ করছি। কিন্তু যখন মানুষ হিসাবে আমি অনুভব করতে পারবো যে একটি বিপুল অনন্ত যাত্রায় আমি অংশভাগী মাত্র, তখন বিশ্বাস জাগবে যে জীবনের শেষ নেই, তাই জীবনগত প্রত্যয়ের কোনো শেষ নেই। আমাকে নিয়েই জীবনের আরম্ভও নয়, শেষও নয়।
বিরাট বিপুল অনন্তের মধ্যে রহেস্যের যে বিপুল আবর্ত, যাকে শিল্পী কানদিনিস্কি একটি কসমিক আবর্তন বলেছেন এবং যাকে রঙের বিচিত্র লীলায় তিনি অভিষিক্ত করেছেন আমরা ব্যাকুল কামনায় তার দিকেই ছুটে চলেছি। এ কারণে জীবনকে স্রোতবাহী নদী বলাই ভালো। কোরআন শরীফে আল্লাহ তায়ালা প্রশ্ন করেছেন, তোমার কি পা আছে হাঁটবার জন্য? তোমার কি হাত আছে কোন কিছু অবলম্বন করবার জন্য? তোমার কি দৃষ্টি আছে দেখবার জন্য? শুনবার জন্য তোমার কি কান আছে? এই প্রশ্ন করে আল্লাহ তায়ালা বলছেন ‘তুমি তাকেই আহবান করবে যিনি তোমাকে অবলম্বন দেবেন, যিনি তোমাকে গতি দেবেন, যিনি তোমাকে লক্ষ্য দেবেন এবং যিনি তোমাকে শ্রুতি দেবেন শুভ সংবাদের জন্য। তিনি আমার প্রভু যিনি আমাকে এই অক্ষয় বিরাট অনন্তের মধ্যে ভাসমান রেখেছেন। গভীরভাবে অনুধাবন করলে হয়তো মনে হতে পারে যে আমি তো কিছুই নই। আমি শব্দ নই, আমি শব্দার্থ নই, আমি বাণীবদ্ধ নই, আমি সুরের সম্মোহন নই-বিরাট অনন্তের মধ্যে আমি অস্তিত্বহীন সম্পর্কশূন্য একটি নাস্তি। কিন্তু আসলে কি তাই? অনন্ত তো ‘ক্ষুদ্রকে দিয়েই, বিনিঃশেষ থেকেই তো সম্পূর্ণতা, সাধারণ থেকেই তো অসাধারণ, বীজ থেকেই তো বিরাট মহীরুহ। শীর্ণ কল্লোলিত নদী ক্রমান্বয়ে বিপুল সমুদ্রের আবর্তে পরিণত হচ্ছে। সুতরাং কোন্যে কিছুই ক্ষুদ্র নয়। এবং সঙ্গে সঙ্গে কোনো কিছুই বৃহৎ নয়। অনন্তের দায়ভাগে সকলেই চিরকাল অগ্রসরমান। মহাত্মা কবীর তার একটি দোহাঁয় বলেছেন, সুগন্ধ বলে আমি ফুলকে আশ্রয় করবো, এবং ফুল বলে আমি সুগন্ধকে গ্রহণ করবো। ভাষা বলে আমি সত্যকে আশ্রয় করবো এবং সত্য বলে আমি ভাষাকে আশ্রয় করবো। অনন্তের মধ্যে এটিই হচ্ছে প্রতিনিয়ত একে অন্যকে পাবার প্রত্যাশা।' এই প্রত্যাশার বিপুল আবর্তের মধ্যে আমরা পৃথিবীতে বাস করছি। যদি এই প্রত্যাশা না থাকতো তাহলে বিচ্ছিন্নতার বিরামহীন স্পর্ধায় সমগ্র পৃথিবী নিঃশেষ হয়ে যেত। আমরা নিঃশেষ হই না আমরা চলমান হই। আমরা সুপ্ত হই না, আমরা জাগরিত হই, আমরা নিস্তদ্ধ হই না, আমরা কল্লোলিত হই। বিরাট বিশ্বব্রহ্মাণ্ডের আবর্তে যে সঙ্গীতের মুখরতা আছে তা আমরা শুনতে পাই না কেননা তা আমাদের শ্রবণের ক্ষমতার বাইরে। কিন্তু এই যে সঙ্গীত, এই সঙ্গীতের মনোহর লালিত্যে পৃথিবী প্রতিনিয়ত হিল্লোলিত এবং বিভিন্ন বর্ণে আলোকিত।
(চলবে...)