ই-পেপার ভিডিও ছবি বিজ্ঞাপন কুমিল্লার ইতিহাস ও ঐতিহ্য যোগাযোগ কুমিল্লার কাগজ পরিবার
বৈষম্য পেরিয়ে জীবন জয়ী হোক
Published : Saturday, 1 January, 2022 at 12:00 AM
বৈষম্য পেরিয়ে জীবন জয়ী হোকঅনুপম সেন ||
দু'হাজার একুশ সাল আমাদের কাছে তিনটি বিশেষ কারণে বড় বেশি তাৎপর্যপূর্ণ। জাতীয় ইতিহাসের তিনটি বিশেষ অধ্যায় এই সালকে আমাদের কাছে বিশেষভাবে স্মরণীয় করে রাখবে। জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান, যার ডাকে ও নেতৃত্বে আমাদের এই প্রাণপ্রিয় দেশটির অভ্যুদয় ঘটেছিল ৯ মাসের মুক্তিযুদ্ধে; এর আগে আরও দীর্ঘ সময়ব্যাপী চলে আসা আন্দোলন-সংগ্রামে তৈরি হওয়া প্রেক্ষাপটে সেই মহতীর জন্মশতবর্ষ জাতি উদযাপন করেছে। একই বছর জাতি উদযাপন করল স্বাধীনতা ও বিজয়ের সুবর্ণজয়ন্তী। এ যেন জাতীয় জীবনের তিনটি স্রোত এক মোহনায় মিশে যাওয়ার গৌরবগাথা। এই তিনটি অধ্যায় স্বতন্ত্র নয়। বরং বলা যায়, একই প্রবাহের মধ্য দিয়ে একেকটি অধ্যায়ের মাইলফলক স্পর্শ করা। আমরা শ্রদ্ধার সঙ্গে সে সবকিছু স্মরণে রেখে পদার্পণ করতে যাচ্ছি ইংরেজি নতুন বছরে। ২০২২ আমাদের জন্য হয়ে উঠুুক কল্যাণময়। অশুভ সব ছায়া কেটে যাক।
প্রায় দুটি বছর ধরে বৈশ্বিক মহামারি করোনাভাইরাসের সংক্রমণ বিশ্বের দেশে দেশে বড় বেশি মর্মান্তিকতার ছায়া গাঢ় করেছে এবং এর বাইরে আমরাও নই। এ বছরেও হারিয়েছি আমরা অনেককে। দেশের খ্যাতিমান সাহিত্যিক, লেখক, সাংবাদিক, চিকিৎসকসহ বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার ও অনেক সাধারণ মানুষকে আমরা হারিয়েছি, যাদের নানাভাবে অবদান কিংবা ভূমিকা রয়েছে আমাদের আন্দোলন-সংগ্রামের বাঁকে বাঁকে; সমাজের বিভিন্ন স্তর কিংবা পর্বে। শ্রদ্ধার সঙ্গে তাদের স্মরণ করি। এ রকম বেদনাকাতর পরিস্থিতি থেকে আমরা যখন অনেকটাই স্বস্তির জায়গায় ফিরছিলাম, তখনই বছরের প্রায় শেষদিকে বারবার রূপ পরিবর্তনকারী প্রাণঘাতী করোনার ধরন পরিবর্তন আবারও ফেলেছে শঙ্কার ছায়া। নতুন এই ধরন 'ওমিক্রন' বিশ্বের বিভিন্ন দেশে এরই মধ্যে ছড়িয়ে পড়েছে। আমাদের দেশেও এর সন্ধান মিলেছে। তবে ব্যাপকভাবে যাতে এ ধরনটি ছড়িয়ে পড়তে না পারে, এ জন্য অতীতের পরিস্থিতি আমলে রেখে, অভিজ্ঞতার আলোকে সব রকম প্রতিরোধ ব্যবস্থা নিতে হবে সরকার ও গণমানুষের সম্মিলিত প্রয়াসে।
২০২১ সালে দেশে করোনা প্রতিরোধে টিকা কেনা ও সংগ্রহের পাশাপাশি এরই মধ্যে উল্লেখযোগ্য সংখ্যক মানুষকে টিকার আওতায় নিয়ে আসতে পারার বিষয় সরকারের বড় সাফল্য। করোনার নতুন ধরন প্রতিরোধে স্বাস্থ্যবিধি অনুসরণসহ প্রাতিষ্ঠানিক ব্যবস্থার আরও উন্নয়ন ও সব রকম প্রস্তুতির জন্য সরকার ও মানুষকে সচেতনতা-সতর্কতায় চলতে হবে। দুর্যোগের মেঘ কেটে যাক যূথবদ্ধ প্রচেষ্টায়। করোনার অভিঘাত নানা দিকেই লেগেছে, তবে সরকার অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড পুনরুদ্ধার ও সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচির পরিসর বাড়ানোর পাশাপাশি নিরাপত্তা বলয় সৃষ্টি করতে সক্ষমতা ও দূরদর্শিতার পরিচয় দিয়ে চলেছে। তবে, এই ক্ষত শুকাতে সময় লাগবে। ২০২২ সালে এসব বিষয়েই আমাদের প্রত্যয়-অঙ্গীকার হোক আরও শক্তিশালী। একটি সমাজ ও রাষ্ট্র সম্মিলিত প্রচেষ্টাতেই হতে পারে বিকশিত, আলোকিত এবং যা কিছু কল্যাণকর তা হতে পারে নিশ্চিত- এমন দৃষ্টান্ত তো আমাদের সামনেই আছে।
নিজস্ব অর্থায়নে পদ্মা সেতু নির্মাণযজ্ঞ সম্পন্নের আরও অগ্রগতির পাশাপাশি ২০২১ সালে আমাদের চলমান মেগা প্রকল্প মেট্রোরেল, কর্ণফুলী টানেলসহ অনেক উন্নয়ন প্রকল্পের অগ্রগতি আরও দৃশ্যমান হয়ে উঠেছে। আমাদের উন্নয়ন সহযোগী বিভিন্ন দেশ ও আন্তর্জাতিক সংস্থার সহযোগিতার নতুন দিগন্তও উন্মোচিত হয়েছে ২০২১ সালে। মুজিববর্ষে সরকারি খরচে গৃহহীনকে গৃহদান, জলবায়ু পরিবর্তন মোকাবিলা, অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি অর্জনসহ নানা অর্জন ও উদ্যোগের কারণে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা প্রশংসা পেয়েছেন।
২০২১ সালে শিল্প খাতে বড় দুর্ঘটনায় হতাহতের মর্মন্তুদ ঘটনাও ঘটেছে। নারায়ণগঞ্জে হাসেম ফুডস কারখানায় অগ্নিকাণ্ডে অনেকের প্রাণহানি এরই এক মর্মান্তিক নজির। বছরের শেষদিকে ঝালকাঠিতে যাত্রীবাহী লঞ্চে অগ্নিকাণ্ডের ঘটনা বেদনাকাতর করেছে আমাদের। এ সবকিছুর পেছনে মুখ্য কারণ সংশ্নিষ্টদের নিয়মনীতি অগ্রাহ্যের পাশাপাশি শুধু মুনাফার চিন্তা ব্যক্তি বা মহলবিশেষের কাছে প্রাধান্য পাওয়া। নতুন বছরে এসব জনগুরুত্বপূর্ণ বিষয় সামনে থাকুক। ২০২১ সালে শারদীয় দুর্গোৎসবে কতিপয় হীন স্বার্থবাদীর চক্রান্তে যে ক্ষত সৃষ্টি হয়েছে, এর উপশমেও এ রকম অবস্থান কাম্য। সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতির বাংলাদেশ। যে দেশটির অভ্যুদয় মুক্তিযুদ্ধের মাধ্যমে রক্তগঙ্গা পেরিয়ে, সেই দেশে কোনো রকম অমানবিক কর্মকাণ্ড চালিয়ে কেউ যাতে পার পেতে না পারে, তা নিশ্চিত করতেই হবে।
সব উন্নয়ন কর্মকাণ্ড চলুক প্রকৃতি সামনে রেখে, গুরুত্ব দিয়ে। দেশের মনোমুগ্ধকর প্রকৃতি আমাদের বড় বন্ধু। নতুন প্রজন্ম আমাদের ভরসার বড় জায়গা। উৎসাহ-অনুপ্রেরণা দিয়ে উন্নয়নসহ সব কাজে তাদের সম্পৃক্ততা বাড়ানোর জোরদার প্রয়াস নতুন করে শুরু হোক ২০২২ সালে। শিক্ষায় ঘাটতি পূরণে মনোযোগ বাড়াতে হবে। করোনায় শিক্ষার যে ক্ষতি হয়েছে, তা পোষাতে আরও পরিকল্পিত ছক কষে এগোতে হবে। ২০২১ সালে আন্তর্জাতিক অঙ্গনে আমাদের নতুন প্রজন্মের প্রতিনিধিরা আরও বেশকিছু ক্ষেত্রে কৃতিত্বের স্বাক্ষর রেখেছে। আমাদের নারী সমাজের অগ্রগতি অত্যন্ত আশা-জাগানিয়া হলেও নিরাপত্তাজনিত এবং অন্যান্য সামাজিক ব্যাধি এখনও এ পথে কাঁটা হয়ে আছে। সম্প্রতি কক্সবাজারে সমুদ্রসৈকতে বর্বরোচিত ঘটনাটি এরই একটি খারাপ নজির। নারী-পুরুষের সম্মিলিত প্রচেষ্টায় আমাদের অনেক দৃষ্টান্তযোগ্য অধ্যায় রয়েছে। নারী নিগ্রহের মতো অন্যান্য সামাজিক ব্যাধি নির্মূলে সরকার ও প্রশাসনের আরও জোরদার ভূমিকার পাশাপাশি নাগরিক সমাজের প্রতিনিধিসহ রাজনীতিকদেরও পালন করতে হবে কাঙ্ক্ষিত ভূমিকা।
নতুন বছরে বড় প্রত্যাশা- দুর্যোগমুক্ত ভবিষ্যৎ। মানবজীবনের যে ক্ষয় ঘটেছে, ক্ষত সৃষ্টি হয়েছে; এ সবকিছুর উপশম হোক। শুধু বাংলাদেশেই নয়, সমগ্র বিশ্বেই মানবিকতার আলো ছড়িয়ে পড়ূক। অর্থনৈতিক উন্নয়নের অভিযাত্রায় আমাদের আরও সাফল্য অর্জনের পথ হোক প্রশস্ত। সমাজ থেকে সরুক বৈষম্যের ছায়া। নতুন অভিযাত্রায় যে সম্পদ আমাদের অর্জনের খতিয়ানভুক্ত হবে, এর সুষম বণ্টন নিশ্চিত হোক। নিপীড়িত-বঞ্চিত সব মানুষ পাক তাদের ন্যায্য হিস্যা। কিছু মানুষের হাতে যদি অর্থ-সম্পদ সঞ্চিত থাকে কিংবা তাদেরই তা ক্রমাগত বাড়তে থাকে, তাহলে একদিকে যেমন উন্নয়ন টেকসই হবে না, তেমনি বৈষম্যের কারণে সৃষ্ট বৈরী পরিস্থিতির ছায়াও গাঢ় হবে। অর্থনীতির তত্ত্ব বলে, একটি দেশকে এগিয়ে যেতে হবে তার নিজস্ব অর্থনীতির ভিত্তিতে। এ জন্য দেশের মানুষকে আর্থসামাজিক সমস্যা থেকে মুক্তির লক্ষ্যে তাদের চাহিদার নিরিখে সবকিছু নির্ধারণ করতে হবে। তা না হলে উন্নয়ন মুখ থুবড়ে পড়তে পারে।
বৈষম্যের কাছে সাম্য যেন হেরে না যায়। সংবাদমাধ্যমেই দেখেছি, যুক্তরাষ্ট্রের মতো দেশেও দুই কোটির বেশি মানুষ আগামী বছর খাদ্যাভাবের ঝুঁকিতে থাকবে। সম্পদ যদি একটি নির্দিষ্ট শ্রেণি-গোষ্ঠীর মুষ্টিবদ্ধ হয়ে পড়ে, তাহলে এমন অমানবিক পরিস্থিতিরই সৃষ্টি হবে। বঙ্গবন্ধু এই জাতিকে ১৯৭২ সালের ৪ নভেম্বর একটি অসাধারণ সংবিধান দিয়েছিলেন। সেই সংবিধানের হূত সবকিছু ফিরে আসুক। আমার দৃঢ় বিশ্বাস, সেই সংবিধানের আলোকে রাষ্ট্র পরিচালিত হলে মানবিকতার আলো আরও ছড়াবে। কাঙ্ক্ষিত গণতান্ত্রিক সমাজব্যবস্থা নিশ্চিত হবে। শিক্ষা, স্বাস্থ্যসহ মৌলিক অধিকারের সব পথ হোক প্রতিকূলতা-প্রতিবন্ধকতাহীন এবং এ দেশের মানুষের জীবন হোক আরও সংস্কৃতিঋদ্ধ।
ড. অনুপম সেন: সমাজবিজ্ঞানী; সাবেক অধ্যাপক, চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়