
চিরায়ত সাহিত্য সাহিত্যে নবত্ব
রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর ||
আমাদের
দেশের নবীন লেখকদের সঙ্গে আমার পরিচয় পাকা হবার মতো যথেষ্ট সময় পাই নি,এ
কথা আমাকে মানতেই হবে। মাঝে মাঝে ক্ষণকালের দেখোশোনা হয়েছে তাতে বার বার
তাঁদের বলিষ্ঠ কল্পনা ও ভাষা সম্বন্ধে সাহসিক অধ্যাবসায় দেখে আমি বিস্মিত
হয়েছি। যথার্থ যে বীর সে সার্কাসের খেলোয়াড় হতে লজ্জা বোধ করে। পৌরুষের
মধ্যে শক্তির আড়ম্বর নেই,শক্তির মর্যদা আছে, বাহাদুরি নেই। অনেক নবীন কবির
লেখায় এই সবলতার লক্ষণ দেখা যাচ্ছে; বোঝা যায় যে, বঙ্গ সাহিত্যে একটি
সাহসিক সৃষ্টি-উৎসাহের যুগ এসেছে। এই নব অভ্যুদয়ের অভিনন্দন করতে আমি
কুণ্ঠিত হই নে।
# কিন্তু, শক্তির একটা নতুন স্ফুর্তির দিনেই
শক্তিহীনের কৃত্রিমতা সাহিত্যকে আবিল ক’রে তোলে। সন্তরণপটু যেখানে
অবলীলাক্রমে পার হয়ে যাচ্ছে, অপটুর দল সেখানেই উদ্দাম ভঙ্গিতে কেবল জলের
নীচেকার পাঁককে উপরে আলোড়িত করতে থাকে। অপটুই কৃত্রিমতা দ্বারা নিজের অভাব
পুরণ করতে প্রাণপণে চেষ্টা করে; সে রূঢ়তাকে বলে শৌর্য, নির্লজ্জতাকে বলে
পৌরুষ। বাঁধি গতের সাহায্য ছাড়া তার চলবার শক্তি নেই ব’লেই সে হাল-আমলের
নূতনত্বেরও কতকগুলো বাঁধি বুলি সংগ্রহ করে রাখে। বিলিতি পাকশালায় ভারতীয়
কারির যখন নকল করে, শিশিতে কারি-পাউডার বাঁধা নিয়মে তৈরি করে রাখে, যাতে
তাতে মিশিয়ে দিলেই পাঁচ মিনিটের মধ্যেই কারি হয়ে ওঠে; লঙ্কার গুঁড়ো বেশি
থাকাতে তার দৈন্য বোঝা শক্ত হয়। আধুনিক সাহিত্যে সেইরকম শিশিতে-সাজানো
বাঁধি ভুলি আছেÑঅপটু লেকখদের পাকশালায় সেইগুলো হচ্ছে ‘রিয়ালিটি
কারি-পাউডার’।ওর মধ্যে একটা হচ্ছে দারিদ্রের আস্ফালন, আর-একটা লালসার
অসংযম।
# অন্যান্য সকল বেদনার মতোই সাহিত্যে দারিদ্রবেদনারও যথেষ্ট
স্থান আছে। কিন্তু ওটার ব্যবহার একটা ভঙ্গিমার অঙ্গ হয়ে উঠেছে, যখন-তখন সেই
প্রয়াসের মধ্যে লেখকরেই শক্তির দারিদ্র প্রকাশ পায়। আমরাই রিয়ালিটির সঙ্গে
কারবার করে থাকি, আমারাই জানি কাকে বলে লাইফ’ এই আস্ফালন করবার ওটা একটা
সহজ এবং চলতি প্রেসক্রিপ্শনের মতো হয়ে উঠেছে। অথচ এঁদের মধ্যে অনেকেই দেখা
যায় নিজেদের জীবনযাত্রার ‘দরিদ্র-নারায়নের’ ভোগের ব্যবস্থা বিশেষ কিছু
রাখেনি;ভালোরকম উপার্জনও করেন, সুখে স্বচ্ছেন্দের থাকনে; দেশের দারিদ্রকে
এঁরা কেবল নব্যসাহিত্যের নূতনত্বের ঝাঁজ বাড়াবার জন্য সর্বদাই ঝাল-মশলার
মতো ব্যবহার করেন। এই ভাবুকতার কারি-পাউডারের যোগে একটা কৃত্রিম সস্তা
সাহিত্যের সৃষ্টি হয়ে উঠেছে। এই উপায় বিনা প্রতিভায় এবং অল্প শক্তিতেই
বাহবা পাওয়া যায়, এই জন্যেই অপটু লেখকের পক্ষে এ একটা মস্ত প্রলোভন এবং
অবিচারক পাঠকের পক্ষে একটা সাহিত্য অপথ্য।
# সাহিত্যে লালসা
ইতিপূর্বে স্থান পায় নি বা এর পরে স্থান পাবে না, এমন কথা সত্যের খাতিরে
বলতে পারি নে। কিন্তু, ও জিনিসিটা সাহিত্যের পক্ষে বিপদজনক। বলা বাহুল্য,
সামাজিক বিপদের কথাটা আসিম তুলছি নে। বিপদের কারণটা হচ্ছে , ওটা অত্যন্ত
সস্তা, ধুলোর উপর শুয়ে পড়ার মতোই সহজসাধ্য। অর্থাৎ ধুলোয় যার লুটোতে সংকোচ
নেই তার পক্ষে একবারেই সহজ। পাঠকের মনে এই আদিম প্রবৃত্তির উত্তেজনা করা
অতি অল্পেই হয়। এইজন্যেই, পাঠকসমাজে এমন একটা কথা যদি উঠে যে, সাহিত্যে
লালসাকে একান্ত উন্মথিত করাটাই আধুনিক যুগের একটা মস্ত ওস্তাদি , তা হলে
এজন্যে বিশেষ শক্তিমান লেখকের দরকার হবে নাÑ সাহস দেখিয়ে বাহাদুরি করবার
নেশা যাদের লাগবে তারা এতে অতি সহজেই মেতে উঠতে পারবে। সাহসটা সমাজেই কী,
সাহিত্যেই কী, ভালো জিনিস। কিন্তু, সাহসের মধ্যেও শ্রেণীবিচার , মূল্যবিচার
আছে। কোনো-কিছুকে কেয়ার করি নে ব’লেই যে সাহস, তার চেয়ে বড়ো জিনিস হচ্ছে
একটা-কিছুকে কেয়ার করি ব’লেই যে সাহস। মানুষের শরীর-ঘেঁষা যে-সব সংস্কার
জীবসৃষ্টির ইতিহাসে সেইগুলো অনেক পুরানো, প্রথম অধ্যায় থেকে তাদের আরম্ভ।
একটু ছুঁতে- না ছুঁতেই তারা ঝন্ঝন্ ক’রেই বেজে ওঠে। মেঘনাদবধের নরক বর্ণনায়
বীভৎস রসের অবতারণা উপলক্ষে মাইকেল এক জায়গায় বর্ণনা করেছেন, নারকী বমন
ক’রে উদ্গীর্ণ পদার্থ আবার খাচ্ছেÑএ বর্ণনায় পাঠকের মনে ঘৃণা সঞ্চার করতে
কবিত্বশক্তির প্রয়োজন করে না, কিন্তু আমাদের মানসিকতার মধ্যে যেÑসব
ঘৃণ্যতার মূল তার প্রতি ঘৃণা জাগিয়ে তুলতে কল্পনাশক্তির দরকার। ঘৃণাশক্তির
প্রকাশটা সাহিত্যে জায়গা পাবে না, এ কথা বলব না কিন্তু সেটা যদি একান্তই
একটা দৈহিক সস্তা জিনিস হয় তা হলে তাকে অবজ্ঞা করার অভ্যাসটাকে নষ্ট না
করলেই ভালো হয়।
# তুচ্ছ ও মহতের, ভালো ও মন্দের কাঁকর ও পদ্মের ভেদ
অসীমের মধ্যে নেই, অতএব সাহিত্যেই বা কেন থাকবে, এমন একটা প্রশ্ন পরম্পায়
কানে উঠল। এমন কথারও কি উত্তর দেয়ার দরকার আছে। যাঁরা তুরীয় অবস্থায় উঠেছেন
তাঁদের কাছে সাহিত্যও নেই আর্টও নেই; তাঁদের কথা ছেড়ে দেওয়া যায়। কিন্তু,
কিছুর সঙ্গে কিছুরই মূল্যভেদ যদি সাহিত্যের না থাকে তা হলে পৃথিবীতে সকল
লেখাই তো সমান দামের হয়ে ওঠে। কেননা, অসীমের মধ্যে নিঃসন্দেহই তাদের সকলেই
এক অবস্থাÑখণ্ড দেশকালপাত্রের মধ্যেই তাদের মূল্যভেদ। আম এবং মাকাল অসীমের
মধ্যে একেই, কিন্তু আমরা খেতে গেলেই দেখি তাদের মধ্যে অনেক প্রভেদ। এজন্যে
অতিবড় তত্ত্বজ্ঞানী অধ্যাপকদের যখন ভোজে নিমন্ত্রণ করি তখন তাঁদের পাতে
আমের অকুলোন হলে মাকাল দিতে পারি নে। তত্ত্বজ্ঞানের দোহাই পেড়ে মাকাল যদি
দিতে পারতুম এবং দিয়ে যদি বাহাবা পাওয়া যেত, তা হলে সস্তায় ব্রাহ্মণভোজন
করানো যেত, কিন্তু পুণ্য খতিয়ে দেখবার বেলায় চিত্রগুপ্ত নিশ্চয়
পাতঞ্জলদর্শনের মতে হিসেব করতেন না। পুণ্যলাভ করতে শক্তি দরকার। সাহিত্যের
একটা পুণ্যের খাতা খোলা আছে।
# ভালোরকম বিদ্যা শিক্ষার জন্যে
মনুষকে নিয়ত যেÑপ্রয়াস করতে হয় সেটাতে মস্তিষ্কের ও চরিত্রের শক্তি চাই।
সমাজে এই বিদ্যাশিক্ষার বিশেষ একটা আদর আছে ব’লেই সাধারণত এত ছাত্র এতটা
শক্তি জাগিয়ে রাখে। সেই সমাজেই যদি কোন কারণে কোনো একদিন ব’লে বসে
বিদ্যাশিক্ষা ত্যাগ করাটাই আদরণীয়, তাহলে অধিকাংশ ছাত্র অতি সহজেই সাহাস
প্রকাশ করবার অহংকার করতে পারে। এইরকম সস্তা বীরত্ব করবার উপলক্ষ সাধারণ
লোককে দিলে তাদের কর্তব্যবুদ্ধিকে দুর্বল করাই হয়। বীর্যসাধ্য সাধনা বহুকাল
বহু লোকেই অবলম্বন করছে ব’লে তাকে সামান্য ও সেকেলে ব’লে উপেক্ষা করবার
স্পর্ধা একবার প্রশ্রয় পেলে অতি সহজেই তা সংক্রমিত হতে পারেÑ বিশেষভাবে,
যারা শক্তিহীন তাদেরই মধ্যে। সাহিত্যে এইরকম কৃত্রিম দুঃসাহসের হাওয়া যদি
ওঠে তা হলে বিস্তর অপটু লেখকের লেখনী মুখর হয়ে উঠবে, এই আমাদের আশঙ্কা।
আমি
দেখেছি কেউ কেউ বলছেন, এইসব তরুণ লেখকের মধ্যে নৈতিক চিত্তবিকার ঘটেছে
ব’লেই এইরকম সাহিত্যের সৃষ্টি হঠাৎ এমন দ্রুতবেগে প্রবল হয়ে উঠেছে। আমি
নিজে তা বিশ^াস করি না। এঁরা অনেকে সাহিত্যে সহজিয়া সাধন গ্রহন করেছেন, তার
প্রধান কারণ এটাই সহজ। অথচ দুঃসাহসিক ব’লে এতে বাহবাও পাওয়া যায়, তরুণের
পক্ষে এটা কমপ্রলোভনের কথা নয়। তারা বলতে চায় ‘ আমরা কিছু মানি নে’Ñ এটা
তরুণের ধর্ম। কেননা, অধিকাংশ ক্ষেত্রেই না মানতে শক্তির দরকার করে; সেই
শক্তির অহংকার তরুণের পক্ষে স্বাভাবিক। এই অহংকারের আবেগে তারা ভুল করেও
থাকে সেই ভুলের বিপদ সত্বেও তরুণের এই স্পর্ধাকে আমি শ্রদ্ধাই করি।
কিন্তু, যেখানে না মানাই হচ্ছে সহজ পন্থা, সেখানে সেই অশক্তের সস্তা
অহংকার তরুণের পক্ষেই সবচেয়ে অযোগ্য। ভাষাকে মানি নে যদি বলতে পারি তাহলে
কবিতা লেখা সহজ হয়, দৈহিক সহজ উত্তেজনাকে কাব্যের মুখ্য বিষয় করতে যদি না
বাধে তা হলে সামান্য খরচাতেই উপস্থিতমত কাজ চালানো যায়, কিন্তু এইটি
সাহিত্যিক কাপুরুষতা।
(প্লানসিউজ জাহাজ ২৩ আগষ্ট ১৯২৭)
উদ্দেশ্যবাদ
( সাহিত্যকর্ম যে অর্থ নির্দেশ করে তা সবসময় সাহিত্যিকের নির্দেশিত অর্থ নয়।)

হাসিব উল ইসলাম ||
নিচের তিনটি বিবৃতির সাহিত্যিক উদ্দেশ্য বিবেচনা করুন :
১.
জেন অস্টিন তাঁর বিখ্যাত উপন্যাস প্রাইড অ্যান্ড প্রেজুডিস লেখা শেষে বোন
ক্যাসান্ড্রাকে এক চিঠিতে তাঁর পরবর্তীতে উপন্যাস ম্যান্সফিল্ড পার্ক এর
বিষয়বস্তু সম্পর্কে জানান : "এখন আমি অন্যকিছু লেখার চেষ্টা করবো, এবং এটা
হবে একেবারে ভিন্ন বিষয়ে — যাযকবৃত্তি সম্পর্কীয় বিষয়ে।"
২. জন মিল্টন
তাঁর অমর সৃষ্টি প্যারাডাইস লস্টের প্রথম সর্গে বলছেন : " (এই রচনার
উদ্দেশ্য হচ্ছে) মানুষের প্রতি ঈশ্বরের খেয়ালের নায্যতা প্রতিপাদন।"
৩.
চার্লস ডিকেন্স তাঁর মার্টিন চুজেলউইট উপন্যাসের ভূমিকায় লিখেছেন : "
আশাকরি, দরিদ্র জনগোষ্ঠীর অবহেলিত ঘরবসতে শৌচাগার সমস্যার উন্নয়নের ঘাটতি
দেখানোর জন্য আমি সম্ভাব্য সকল সুযোগ নিয়েছি।"
লেখক কি জানেন তিনি কি লিখছেন?:
ইংরেজি
সাহিত্যের একটি চমৎকার 'সেরা গ্রন্থ ' তালিকা অবশ্যই জেন অস্টিন, জন
মিল্টন, এবং চার্লস ডিকেন্সের রচিত পুস্তক ছাড়া অসম্ভব । কিন্তু আমরা যদি
অস্টিনের ম্যান্সফিল্ড পার্ক ইংরেজ যাজক বিন্যাসের বিচক্ষণ ভাবনার জন্য না
পড়ে বরং দাসপ্রথা নিয়ে ফ্যানি প্রাইসের গভীর চিন্তাচেতনার জন্য পড়ি, তবে
আমরা কি অস্টিনের উপন্যাসটি ভুলভাবে পড়ছি? আমরা যদি প্যারাডাইস লস্ট তার
খ্রিস্টীয় মতবাদের জন্য না পড়ে, কাব্যগুণের জন্য পড়ি, তবে কি আমাদের পাঠ
ভুল হয়? ডিকেন্সের উপন্যাস মার্টিন চুজেলউইট কে দরিদ্র মানুষের শৌচাগার
বিষয়ক জনহিতকর উদ্বেগ (যা পুরোপুরি দৃশ্যমান নয়) হিসেবে না পড়ে, আমেরিকা
নিয়ে তার পক্ষপাতদুষ্ট (কিন্তু দারুণ উপভোগ্য) বিদ্রুপের জন্য পড়ি, আমরা
কি ডিকেন্সের আলোচ্য বিষয় এড়িয়ে যাচ্ছি?
সন্দেহাতীতভাবে, উপরের তিনটি
প্রশ্নের উত্তর হচ্ছে 'না '। কিন্তু এই 'না ' এর মানে কি?এই 'না ' মানে
কি, একটা সাহিত্যকর্মের অধিকার রচয়িতার নয়, বরং পাঠকের? পাঠকের
সাহিত্যকর্মের মালিক হওয়া বাস্তবায়নের পথের বাঁধা এবং লেখকের ইজ্জত
বাঁচানোর ভাষ্যটা অনেকটা এরকম : 'লেখকদেরকে ক্ষমা করে দিন, ঈশ্বর, তাঁরা
আসলে জানেন না তাঁরা কি লেখেন। ' সৃজনশীল লেখকেরা তাঁদের সৃষ্টিকর্ম
সম্পর্কে পুরোপুরি বা সবসময় সচেতন নন যে তাঁরা আসলে কি সৃষ্টি করছেন। এই
বক্তব্যের সমর্থনে ড্যানিয়েল ডিফো রচিত রবিনসন ক্রুসোর শিরোনামের পাতাটি
প্রমাণ হিসেবে হাজির করা যায় :
"ইয়র্কের নাবিক রবিনসন ক্রুসোর জীবন ও
অদ্ভুত বিস্ময়কর দুঃসাহসিক অভিযান : যিনি আমেরিকার উপকূলে, বিশাল নদী
ওরোনোকের মুখে, একটি নির্জন দ্বীপে, একাকী এক কুড়ি আট বছর বেঁচে ছিলেন;
যেখানে জাহাজডুবিতে সমস্ত মানুষের মৃত্যু হয়, কেবল তিনিই তীরে নিক্ষেপিত
হন; কিভাবে তিনি অবশেষে অদ্ভুতভাবে দস্যুদের দ্বারা নিষ্কৃত হন তার বিবরণ;
তাঁর নিজেরই লেখা। "
আমরা, আমাদের পরবর্তী কালের গভীর ও বিস্তৃত জ্ঞান
দিয়ে, রবিনসন ক্রুসোকে একটি উপন্যাস হিসেবে দেখি। সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হলো,
রবিনসন ক্রুসোকে একটি অগ্রগণ্য রচনা হিসেবে বিবেচনা করা হয় যেটি পরবর্তী
সকল উপন্যাস রচনার রীতির পথিকৃত। ডিফো একটি লিখেছেন, এবং উপন্যাস লেখার
ধারা প্রবর্তনের কোন উদ্দেশ্য ছাড়াই পরবর্তীতে অন্যদের জন্য উপন্যাস রচনার
রীতিকে সম্ভব করেছেন। তাঁর জীবনী থেকে জানা যায়, তাঁর প্রকৃত উদ্দেশ্য ছিল
কিছু টাকাপয়সা কামানো। তখন তাঁর বয়স প্রায় ষাট বছর। হাতে অর্থকড়ি নেই।
দরিদ্র অবস্থা। বিক্রির জন্য তিনি নির্জন দ্বীপে একলা নাবিকের এক দারুণ
মিথ্যে গল্প ফেঁদে বসলেন। একটা নতুন রীতির প্রবর্তন করা (হয়তো) তাঁর
সর্বশেষ চিন্তা ছিল।
লেখকের উদ্দেশ্য, পাঠকের পর্যালোচনা:
সাহিত্যের
অনান্য কৌতুহলোদ্দীপক ধারনার মতোন লেখকের 'উদ্দেশ্য '(রহঃবহঃরড়হ) আমাদেরকে
একটি চিন্তা উদ্রেককারী কানাগলির দিকে নিয়ে যায়। সোজা কথায়, আমরা লেখক ও
পাঠকের ভেতর একটা দঁড়ি টানাটানির ছবি দেখতে পাই : লেখকের বক্তব্য এমন, আমি
অথর (ধঁঃযড়ৎ), অতএব সাহিত্যকর্মে অথরিটি (ধঁঃযড়ৎরঃু) আমার এবং আমার
উদ্দেশ্যই আমার কর্মের সহীহ্ ব্যাখ্যা; পাঠক ঘুরেফিরে এসে বলবেন, "আমি
পড়েছি, আমি যা বুঝেছি তাই সহীহ্ '। আধুনিক নারীবাদীরা যদি শার্লট ব্রন্টির
জেন আয়ার উপন্যাসের নায়িকাকে চিলেকোঠায় বন্দী এক নির্যাতিত উন্মাদিনী
হিসেবে দেখতে চান, তা-ই দেখুক। তাঁরা গাঁটের পয়সা খরচ করে জেন আয়ার কিনে
পড়েছেন, তাঁরা যেমন ইচ্ছে তেমন ভাবতে পারেন।
ঊনিশশো তিরিশের দশকে,
যুক্তরাষ্ট্রে নিউ ক্রিটিসিজম এবং যুক্তরাজ্যে প্র্যাকটিক্যাল ক্রিটিসিজমের
উদ্ভবের সাথে সাথে ' উদ্দেশ্যবাদ ' (রহঃবহঃরড়হধষরংস) চাপা পড়ে যায়। নব্য
এবং প্রায়োগিক সমালোচনা তত্ত্ব দ্রত স্কুল, কলেজ, এবং বিশ্ববিদ্যালয়ে
সাহিত্য পড়ানোর মানদণ্ডে পরিণত হয়।
একজন রয়চিতা যে নির্ধারণ
করতে পারেন কিভাবে তাঁর রচনাটি পাঠ করা হবে, নব্য ও প্রায়োগিক সাহিত্য
সমালোচনা মতবাদ তার তীব্র বিরোধিতা করে। এই তীব্র বিরোধিতার ভেতর রাজনৈতিক
উদ্দেশ্যও খুঁজে পাওয়া যায়। তিরিশের দশক ছিল স্বৈরাচার আর বৈশ্বিক
রাজনীতিতে 'একদল মতবাদ' এর দশক। নীতি ছিল এমন 'আমার নেতাকে অনুসরণ করুণ ',
এর মানে, নেতার কথায় যদি যুদ্ধও করতে হয়, তাহলে তা -ই সই। অতএব, লেখককে
তাঁর রচনাটি কিভাবে পাঠ করতে হবে তা থেকে সরিয়ে দেওয়াটা ছিল 'একদল মতবাদ '
এর বিপরীত, এবং পাঠকের এক ধরণের স্বাধীনতা ঘোষণা।
রাজনীতি একপাশে রেখে,
নব্য/প্রায়োগিক সমালোচনার নেতৃবৃন্দের দিকে তাকানো যাক। যুক্তরাষ্ট্রের
ক্লিনেথ ক্লিনেথ ব্রুকস এবং পেন ওয়ারেন, যুক্তরাজ্যের এফ আর লেভিস এবং
উইলিয়াম এম্পসন, এই মত পোষণ করেছিলেন যে পুস্তকের পাতায় লেখকের উদ্দেশ্য
অনুসন্ধান করা মারাত্মকভাবে মনোযোগ হানিকর। ধরুন, আপনি কীটসের বিখ্যাত
কবিতা "অড অন গ্রেসান আর্ন" পড়ছেন। 'কবিতাটি কি বোঝায় ' জিজ্ঞাসা না করে
আপনি বরং 'কীটস কি বোঝাতে চান ' জিজ্ঞাসা করেন, তখন আপনাকে কবিতা থেকে
মনোযোগ সরিয়ে কীটসের উদ্দেশ্য খোঁজার জন্য অনান্য বইপুস্তক ঘাটতে হবে।
কিছু
সংখ্যক নব্য এবং প্রায়োগিক সমালোচকবৃন্দ, আর ঐ প্রজন্মের পাঠকেরা যারা
তাঁদের কাছ থেকে শিক্ষা গ্রহণ করেছিলেন, মনে করেন, উদ্দেশ্যবাদ এক ধরনের
ভ্রান্ত বিষয়। উদ্দেশ্যবাদ এমন এক কানাগলির দিকে নিয়ে যায় যেখান থেকে
পাঠকরা ফিরে আসতে বাধ্য। তাঁদের মতে, একটি সাহিত্যকর্ম পাঠ করার সময় তার
রচয়িতা এবং রচনার উদ্দেশ্য মনে না রাখাই শ্রেয়।
স্ট্যানলি ফিশের সমাধান:
কিন্তু,
সুস্পষ্টভাবে রচয়িতার অভিপ্রায় একটি গুরুত্বপূর্ণ ব্যাপার। প্রধাণ কারণ
হিসেবে , প্রতিটি পুস্তকের শিরোনামে রচয়িতার নামের কথা বলা যায়। রচয়িতা
ছাড়া রচনা আসলে এতিম হয়ে যায়। আমেরিকার সাহিত্য তাত্ত্বিক স্ট্যানলি ফিশ
উদ্দেশ্যবাদের কানাগলি থেকে বের হওয়ার একটা পথ বাতলে দেন। তাঁর বিতর্কনীয়
গ্রন্থ ডুয়িং হোয়াট কামস ন্যাচুরালি তে বলেন, এই সমস্যার সমাধান রয়েছে যারা
সাহিত্যের ব্যাখ্যাবিশ্লেষণ করেন তাদের মধ্যেই; যেমন, পাঠকেরা সুচিন্তিত
বিবেচনা করে একটা যৌথ সিধান্তে আসেন যে কিভাবে লেখকের উদ্দেশ্য বুঝতে হবে।
সাহিত্য
তার পাঠকের সাথে একটা ভিন্ন ধরনের সম্পর্ক প্রতিষ্ঠা করে। (লেখকের)
'উদ্দেশ্য ' ফিশের আপাতগ্রাহ্য মত, '(সাহিত্যের) অনান্য সবকিছুর মতোই
পর্যালোচনার ব্যাপার। ' যে উদ্দেশ্যে একটা সাহিত্যের সৃষ্টি সেই উদ্দেশ্যকে
আমরা সাহিত্য থেকে আলাদা করতে পারি না। "কিন্তু তার মানে এই না যে,
(লেখকের লেখার) উদ্দেশ্যে ব্যাখ্যাবিশ্লেষণের স্বার্থ সংরক্ষণ করবে,
লেখার বাইরে থেকে আমাদেরকে বিশ্লেষণের পথ দেখাবে; উদ্দেশ্য সাহিত্যের
অনান্য সবকিছুর মতোই বিশ্লষণের বিষয়; এতএব, (লেখকের) অভিপ্রায়ও অবশ্যই
পর্যালোচনা করতে হবে। '
ফিশের আলোচনা আমাদের জন্য অত্যন্ত সহায়ক।
লেখকের উদ্দেশ্য আসলে পুস্তক রচনা প্রক্রিয়ার বাইরের কোন বিষয় নয়, এবং
একটা পুস্তককে পুস্তক হিসেবে বিশ্লেষণ করার প্রতি সংবেদনশীল।
[ইউনিভার্সিটি কলেজ লন্ডনের লর্ড নর্থক্লিফ ইমেরিটাস প্রফেসর, লেখক, এবং কলামিস্ট জন এন্ড্রু সাদার্ল্যাণ্ডের লেখা অবলম্বনে।]
পরিচিতি:
হাসিব উল ইসলাম ইংরেজি ভাষা ও সাহিত্যের শিক্ষক। পড়ান বাংলাদেশ সেনাবাহিনী
আন্তর্জাতিক বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়, কুমিল্লা সেনিবাসে। ]
যদি ইচ্ছে হয়
আবেদীন মাওলা ||
যদি ইচ্ছে হয়
নিজের নীরবতা লিখুন।
এর চেয়ে ভালো ইবাদত
আর কী হতে পারে।
লিখতে যদি ইচ্ছে হয়
নিজেকে নিয়ে লিখুন
নিজেকে ছাড়া আপনি
আর কাকেই বা জানেন
হাজার চেষ্টা করেও
অন্যকে সম্পূর্ণ জানা
আপনার পক্ষে
একবারেই অসম্ভব
লিখতে যদি ইচ্ছে হয়
বন্ধুর মুখ নিয়ে লিখুন
ওটা আয়নার চেয়ে উত্তম
ওখানে প্রতিক্রিয়া হয়,
সিদ্বান্ত আদেশ নিষেধ
সরাসরি ধরা যায়।
সেই মুখের কথা লিখুন
যে’ মুখটি কতো কতো প্রহর
আপনার অনুপস্থিতির আগুনে
দগ্ধ হতে হতে বিদগ্ধ না হয়ে সেই সরলই আছে
শব্দের কারুকাজে অলঙ্কারে
বাঁকাচুড়া পথে নিজের কথাটি
মেরে না ফেলে তরতাজা মাছের ধরফরানি লিখুন
একজনকে পশ্চিমে নিয়ে যাবার পর
পিতা মাতা ফুফু আত্মীয় অনাত্মীয়
বলেছিল প্রভু তাকে ফিরিয়ে দিয়ো
সেইসব মুখেদের কথা লিখুন
লিখতেই যদি ইচ্ছে হয়
অন্তত একজনের কথা লিখুন
শুধু একজনের কথা,
অনেক লেখার ভীড়ে
যে লেখাটি উজ্জ্বল হয়ে রয়ে যাবে,
সেই পিতার কথা লিখুন
বঙ্গবন্ধুর কথাই লিখুন।