নীল প্রহর শরীফ উদ্দীন ||
|| পাঠ প্রতিক্রিয়া ঃ কাজী মোহাম্মদ আলমগীর ||
কথাশিল্পী
শরীফ উদ্দীনের গল্প গ্রন্থ ‘নীল প্রহর’ সতেরোটি গল্পের সমন্বয়ে প্রকাশিত এ
গ্রন্থের প্রকাশকাল ২০২১ ফেব্রুয়ারি, প্রকাশক ‘বাংলা জার্ণাল’। কথাশিল্পী
শরীফ উদ্দীন চলমান জীবনের কথা বলেন। সারসরি ক্ষোভ প্রকাশ করেন। পরিবার সমাজ
অফিস বা প্রতিষ্ঠান এবং রাষ্ট্র ও পৃথিবীর অসঙ্গতীর কথা বলেন। তাঁর গল্পের
চরিত্রেরা মধ্যবিত্ত, কখনো বিত্তহীন, কখনো উচ্চবিত্তের সুবিধাভোগী,
অবিবেচক, সাহসী অথবা দূর্বল। ঠকে যাওয়া মানুষ অধিকাংশ। বিগত কালের ভালোর
বিন্যাসে আটকে থাকে তারা। ফলে প্রচলিত নতুন ভালো (?) প্রশ্নের সম্মুখীন হয় ।
গল্পের বিন্যাস ঝরঝরে। পাঠককে তাঁর গল্প কোন জটে আটকে রাখে না। মাটি
সংশ্লিষ্ট গল্প। তাঁর গল্প পাঠক আগে শুনেছে। তবু এ গল্প পড়তে অনিচ্ছা হয়
না। কথাশিল্পী শরীফ উদ্দীনকে সাধুবাদ দিতে হয়, তিনি সহজ কথাটি সহজভাবে বলতে
পারেন। গল্পের জন্য ভূমি বা মাটি লাগে। ভূমিই বলে দেয় কোন দেশের-কোন
কালের- কোন লোকেদের গল্প। তিনি যাদের গল্প বলেছেন তাদের মাটিশ্লিষ্ট
অবস্থায় পেয়েছেন। তিনি মাটি পরিস্কারের দায়িত্ব নেননি। যা আছে তাই
রেখেছেন। বরংচ একটু মাটি গতরের এখানে সেখানে লাগিয়ে দিয়েছেন। তবে অচিন
করেননি। কথাশিল্পী শরীফ উদ্দীনের ডিসকোর্সে রয়েছে চাকরি বিষয়ক মহা রসায়ন,
বৃদ্ধ বাবা, বাবার মৃত্যু, অকাল প্রয়াত কন্যা , হিজড়া, বিবাহ পূর্ব
প্রেমিকার প্রতি উপকারের টান, রাষ্ট্রের সুবিধভোগীদের ব্যবহৃত শব্দ
প্রতিশোধ বা খেলার ছল, গার্মেন্টস শ্রমিকের জটিলতম জীবন। আরও এমন অসংখ্য
জীবন পাঠ আছে যেগুলোর সঙ্গে দেশের মানুষ পত্র-পত্রিকা টিভির মাধ্যমে
পরিচিত। কথাশিল্পী শরীফ তাতে অসুবিধা বোধ করেননি। তিনি বিষয় হিসেবে এগুলো
বেছে নিয়েছেন। তিনি পাঠককে চমকে দেবার ধান্ধাবাজিতে নেই। প্রচলিত জীবনে চমক
কোথায় ? এই প্রশ্নই যেন করেছেন তিনি। তিনি ফর্মের বা শৈলীর কসরত করেন না ।
কিন্তু তাঁর জীবন বোধ অভিজ্ঞতা এমন রসে সিক্ত যার ফলে ফর্মের প্রয়োজন পড়ে
না। অপর কথায়, তাঁর গল্পের শৈলীতো তাঁর গল্পের কাঠামোতেই আছে। ফর্মের কথা
পৃথক ওঠার দরকার কী? ফর্মতো পৃথক কিছু না। বলা দরকার শরীফ উদ্দীন শিক্ষকতা
করেন। তাঁর শিক্ষক জীবনের এমনসব অভিজ্ঞতার কথা পাঠক এ বইয়ে জানতে পারেন, যা
পূর্বে জানা থাকলেও একটু নড়েচরে বসতে হয়, যেমন ‘বৃত্তের বাইরে’ গল্পটি।
আরও দুটি গল্পের কথা বলছি, প্রথম গল্প ‘ শব্দ যেথায় নিঃশব্দে কাঁধে’
দ্বিতীয় গল্প ‘বোধ’। দুটি গল্পে বৃদ্ধ বয়সিদের কথা রয়েছে হৃদয় ছুঁয়ে।
এবার
কথাশিল্পী শরীফ উদ্দীনের কিছু উক্তির সঙ্গে আমরা পরিচয় লাভ করবো ।১.
গল্পের নাম ‘বোধ’। তিনি গল্পের শুরুতে বলেন, শিক্ষকতা করি। শিক্ষক বলে, ‘
জানোয়ার কাকে বলে?’ ছাত্র বলছে. ‘বাসায় দেখা শুনার লোক নেই অজুহাতে যারা
নিজের বাবা মাকে বৃদ্ধাশ্রমে রেখে আসে তাদেরকে জানোয়ার বলে।’ ২.বৃত্তের
বাইরে’ গল্পে , আমি চরিত্রটি স্ত্রীকে বলে- ‘আমার অর্ধেক গোঁফ তো বিয়ের
দিনেই তোমার বাপ দাদার ভিটেতে রেখে এসেছি। শেয়াল ফাঁদে পরলে লেজ কাটা যায়,
আমার গোঁফ কাটা গেছে।এমন অসংখ্য অভিজ্ঞান রয়েছে লেখকের যা মেরুদ- বরাবর
রক্তকে হিম করে দেয়। ৩.আরেকটি উদাহরণ দেই, ‘গলির বাঁকে’ গল্পে, বিসমিল্লাতে
লেখক বলেন, ‘আমি হলাম হতাশা-¯্রষ্টা।’
এবার একটু অন্য প্রসঙ্গঃ ‘বহে
নিরন্তর’ গল্পে, লেখক নিজে কথার দায়িত্ব গ্রহণ করলেন। তিনি সাব-রেজিস্ট্রার
মশিউর রহমানকে বলেন, ‘যেমন অসৎ তেমন তার দুর্ব্যবহার’। এই মন্তব্য তিনি
যেকোন চরিত্র দিয়ে বলিয়ে নিতে পারতেন। লেখক পূর্বেই সিদ্বান্ত নিয়েছেন
সাবরেজিস্ট্রার খারপ লোক। অকাল প্রয়াত মরিয়মের কবরের পাশে দাঁড়িয়ে পিতা
নুরুদ্দিন মোনাজাতে অধিকাংশ সময় অফিসের বয়ান দেন, যেখানে নুরুদ্দিন
অর্থবৈষম্যে পতিত, যার ফলে অফিস কলিকদের নিস্পৃহতা কলোনির সৃষ্ট চাকর
মনোবৃত্তির বাইরে যেতে পারে না।এ জাতীয় গল্প আমাদের এখানে আগেও লেখা হয়েছে
(ডলি নামের এক বেড়ালের চকলেট খাওয়া নিয়ে),আন্থন চেখভের দি ডেথ অপ এ
গভর্নন্টে ক্লার্ক এই ধারার প্রথম দিকের গল্প।
গ্রন্থের নামধেয় ‘নীল
প্রহর’ গল্পটির কথা বলা জরুরী। গল্পের শুরু হাসপাতালে। এক লাইনে সঙ্কট
বিধৃত করেন লেখক সুক্ষ ফলায়, ‘এদেশে আঙ্গুর বড় লোকের ফল।... ‘ শরীর বশ মানে
, পেট মানে না।’... ‘মোতার (মোতাহার আলির) খিদে পেয়েছে। ভাতের খিদে।’ ...
‘স্কুলে কোনদিন আমার সাথে পেরেছে? কাল থেকে ভাত খাইনি তাই।’ পাঠকের মনে
হবে হাভাতের গল্প। কিন্তু এ যে মায়ের নাড়িছেঁড়া বন্ধনের গল্প। একবারে নিটোল
গল্প। মোতাহার নানার মৃত্যুর পর তার প্রিয় কুকুরের সঙ্গে যেভাবে ওম
ভাগাভগি করে নেয় আর স্বগত উক্তিতে তার নিতল বেদনা আমড়া গাছের পাতায় জমে
থাকা শিশির কান্না হয়ে ঝরে, তা পাঠককে বিহ্বল করে। লেখক একে বলেছেন মধ্য
রাতের হাহাকার। মা থেকেও নেই, বাবা নেই, নানা নেই এবং স্কুল নেই। স্কুলে না
যাওয়া মোতাহার নিরুদ্দেশ হয় তার কুকুর ফতুকে নিয়ে। আর মা এখনো অন্য
সংসারে, ভরা পূর্ণিমায় উঠোনে নেমে উপরে তাকায়, মা সুরাইয়া বেগম চাঁদ দেখতে
পায় না। দেখে, সাত বছর আগের চোখের পাতায় আটকে থাকা মোতার আলোয় ঝলমল করা
মুখ। সুরাইয়া বেগমের মন বলে, একদিন না একদিন সব অভিমান ভুলে মোতা মায়ের
কাছে ফিরে আসবে। এই গল্পটির জন্য পাঠক লেখক শরীফ উদ্দীনকে মনে রাখবেন অনেক
অনেক দিন তা হলফ করে বলা যায়।
নীল প্রহর গ্রন্থের প্রচ্ছদ শিল্পী
সাফিনাজ ইসলাম রুপু। গল্পকারের মতই সরল মনোগ্রাহী অভিব্যক্তি রয়েছে প্রচ্ছদ
শিল্পীর অঙ্কন শৈলীতে। বইটির বহুল প্রচার ও বিক্রি কামনা করছি। বইটর মূল্য
২৭০ টাকা।
ফেরার কোনো পথ নেই 
মো. আরিফুল হাসান ||
পৃথিবীটা
একটা ক্ষুদ্র বিন্দুকে কেন্দ্র করে ঘুরছে, ঠিক তোমার মনের মতো। আমি অবাক
হয়ে বললাম, আমার মনের মতো মানে? এই যেমন তুমি এখন একটি সাধারণ বিষয় নিয়ে মন
খারাপ করে আছো, এ রকমটি কেনো থাকো? আসলে তুমি কি বলতে পারো তুমি আসলে কী
চাও? আমি? আমি কী চাইবো? Ñবললাম আমি। চাও, কোনোকিছু একটা চাও। একটা না একটা
কিছু তো মানুষ নিশ্চই চায়। তুমিও তার ব্যাতিক্রম নও। আমি নিজেকে মানুষ
ভাবতে পারি না। তাহলে কী ভাবো? এলিয়েন? চোখে চোখ রেখে সে বললো। আমি তার
চোখে হারিয়ে যেতে থাকলাম। সে বললো, ধরো, তুমি একটা সোনার খনি পেলে; তাহলে
তুমি কী করবে? আমার সোনার খনি চাই না, Ñবললাম আমি। মুচকি হাসলো সে।
অবিশ্বাস্য! তুমিও তখন লোভী হয়ে যাবে, এমনকি খুনেও হতে পারো। আমি বললাম,
না, এমনটি ভাবা ঠিক নয়। বলেছি তো, আমি নিজেকে আর সব দুপেয়ো মানুষের মতো
ভাবি না। তাহলে কি তুমি চার হাতপায়ে চলাফেরা করো? আশ্চর্য! আমি চার হাতপায়ে
চলাফেরা করবো কেনো? শুনো, জীব-জন্তুদেরও কিন্তু লোভ থাকে। তা থাকে,
অস্বীকার করছি না। কিন্তু আমি আমার নিজেকে জীব-জন্তু পর্যায়েও নামাতে পারি
না। তাহলে কি নিজেকে ফেরেস্তা ভাবো? না, আমি নিজেকে ফেরেস্তাও ভাবি না।
শোনো, তাহলে এসব মিথ্যে মুখোশ ধরে লাভ নেই। দলের অন্য সবাই যেভাবে কাজ করে,
তুমিও সেভাবে করতে থাকো।
তাহিতি ডাকাত দলের প্রধান সুমিয়া তাহিতির সাথে
কথা বলছিলাম এতক্ষণ। সে আমাকে শেষ নির্দেশ দিয়ে চলে গেছে। আমি স্থানুর মতো
বসে আছি। ঠা-া একটি হাত আমার কাঁধের উপর পড়লো, আমি ঘাড় ঘুরিয়ে দেখলাম দলের
অপর সদস্য সুরেশ আমার পেছনে দাঁড়িয়ে আছে। উঠ্! এখন অপারেশনে যেতে হবে।
দোহাই ভাই, আমি এসবে যেতে চাই না। এই র্ধু! এ সবে ভাই-টাই বলে কোনো পার
পাওয়া যায় না, চল্, উঠ্। আমি অগত্যা সুরেশের পেছন পেছন গেলাম। সে আমাকে
একটি গুহামুখের সামনে এনে দাঁড় করালো। নে, পাথরটা এবার ঠেলে সরা। আ..আমি
পারবো না, পারবো না। পারতে তোকে হবেই সোলেমান। এখন কেঁদে লাভ নেই। বুঝেছিস
তো, আমাদের রানীর তোর উপর সু-নজর পড়েছে বলে, না হলে এতোক্ষণে কেটে টুকরো
টুকরো করে বিক্রি করে দিতাম। নে, এবার সময় ক্ষেপন না করে পাথরটা ঠেলে সরা।
আমি সর্বশক্তি দিয়ে পাথরটাকে ঠেললাম, গরগর করে পাথরটা সরে গেলো। সুরেশ
আমাকে নিয়ে ভেতরে ঢুকলো। একটা পঁচা গন্ধ নাকের লোমগুলিকেসহ পুড়িয়ে দিচ্ছে।
আমি মাথা তুলে দেখলাম মশালের আলোয়, দুটো ফুলে উঠা লাশ পড়ে আসে গুহার ভেতর।
সুরের কনুই দিয়ে আমার পাঁজরের কাছে খোঁচা দিয়ে বললো, দেখছিস কি? লাশগুলোকে
সরা। আমার রক্ত হীম হয়ে গেলো। একে তো মরা লাশ, তার উপর আবার পঁচে-গলে একসা
অবস্থা। আমি অস্ত্রের মুখে একটা লাশের পা ধরে টানতে লাগলাম, এক বিন্দুও
নড়লো না লাশটা। সুরেশ আমার পিঠে জোরে একটা চাপর মেরে বললো, আরে এভাবে না।
সে রশি দিয়ে লাশটাকে বেঁধে রশির অপরদুটি প্রান্ত আমার কাঁধে সেঁটে দিয়ে
বললো, টান্। এবার সুপুরিখোলের গাড়ির মতো লাশটা গড়াতে থাকলো। রাত একটা
পয়তাল্লিশ মিনিটে আমি দুটো লাশকে আধাকিলোমিটার দূরে নদীতে ফেলতে সক্ষম
হলাম।
সকালের আলো ফুটলে আমি নিজেকে আবিষ্কার করলাম একটি তাবুর ভেতর।
সঙ্গে আরও চারপাঁচজন পড়ে আছে মরার মতো। তাদের গা থেকে উদ্ভট মাদকের গন্ধ
বেরুচ্ছে। আমার প্রায় বমি হবার উপক্রম হলো। আমি গলা খাকারি দিলে একজন
মেশিনের মতো উঠে বসে গেলো। কি, ঘুম হয়েছে ভালো? Ñপ্রশ্ন করলো সে। আমি কোনো
কথা বললাম না, মাথা নেড়ে হা বা না একটা কিছু বুঝালাম। লোকটি আবার শুয়ে
পড়লো। তাহিতি ডাকাত দলের প্রায় সবাই দিনের বেলায় মরার মতো ঘুমায়। অবশ্য
পালা করে করে পাহাড়ায়ও জাগতে হয় তাদেরকে। আমি এখানে এসেছি তিনদিন হলো।
প্রথমদিন আমার চোখ খোলা হয়নি। কোনো একটি বদ্ধ গুহায় আটকে রাখা হয়েছিলো।
গতকালই প্রথম আমার চোখ খোলা হয় এবং আমি মুখোমুখি হই তাহিতি ডাকাত দলের
সর্দারনী সুমিয়া তাহিতির। সুমিয়াকে আমার কেনো যেনো ডাকাত বলে মনে হয়নি। এতো
রূপ লাবণ্যের একটি কুমারী মেয়ে কি করে ডাকাত দলের সর্দার হবে? কিন্তু কথা
বলে বুঝলাম, এ যে সে লোক নয়। খুব ঠা-া মস্তিষ্কে সে কাজ করতে পারে। আমার
সাথে খুব মিষ্টি সুরে কথা বললো। একবারের জন্যও তুমি থেকে তুই সম্বোধনে
নামেনি। হ্যা, আমি অবশ্য এমন কোমল ত্বকের যুবতী দেখে তাকে বেশ দুর্বল
ভাবছিলাম, আমার কথাবার্তায় ছিলো ঔদ্ধত্ব। কিন্তু তার কথাবার্তা ছিলো ধীর।
হ্যা, এই তাহিতি পর্বতের মতোই ধীর এবং অলঙ্ঘনীয়।
আমি বিছানা ছেড়ে তাবু
থেকে বাইরে বেরিয়ে আসলাম। বের হবার সময় একজন ঘুমজড়ানো কণ্ঠে বলেছিলো, একশো
গজের বাইরে যাসনে। প্রতিপক্ষ অথবা আমাদেরই গুলি খেয়ে মরবি। আমি পাহাড়টার
ভাঁজে ভাঁজে দেখলাম সুমিয়া তাহিতির লোকজন ভাড়ি অস্ত্র হাতে এলাকা পাহাড়া
দিচ্ছে। আমার কেমন মন খারাপ করতে থাকে। তাহলে এখানে বেঁচে থেকেও তেমন কোনো
মূল্য নেই? সারাক্ষণ যদি অস্ত্রহাতে একদল লোক পাহাড়া দিতে থাকে সেখানে
বেঁচে থাকার আনন্দ কোথায়? আমি আবার তাবুর ভেতর ফিরে গেলাম। সেখানে আরেকটি
লোক ঘুম থেকে উঠে হাতের মধ্যে গাঁজা পাতা ঢলতে থাকে। কিরে, চলবে নাকি
একটান? আমি ডানে বায়ে মাথা দোলালাম। আরে দেখই না একটা টান দিয়ে, কেমন লাগে?
আমি দুই হাতে নাক চেপে ধরলাম। লোকটি হো হো করে হেসে উঠলো। শালা, তাহিতি
ডাকাত দলের সদস্য হলি, এই সামান্য গাঁজার গন্ধেই এমন করছিস? আরে, আমাদের
রক্ত চেটে খেতে হয়, হুম মানুষের রক্ত। আমার বোধ-বুদ্ধি কেমন যেনো লোপ পেতে
থাকে। কি আজব জায়গায় এসে পড়লাম! কেনো যে সেদিন রাগ করে বাড়ি থেকে বেরিয়ে
এসেছিলাম! নিজের প্রতি খুব ঘৃণা হচ্ছিলো আমার।
সংসারে অশান্তি কমবেশি
সবারই থাকে। কিন্তু কখনো কখনো তা খুব বেশি চরমে গেলে একজনকে না একজনকে
চরমতম মাশুল গুনতে হয়। আমিও জীবনের মাশুল বুঝে নিয়ে আত্মহত্যা করার জন্য
বের হয়েছিলাম। সম্পূর্ণ সম্পদশূণ্য, অর্থাৎ আমি যখন বের হয়েছিলাম মোবাইল
ফোনটাও সাথে আনিনি। কি দরকার? একটু পরে তো মরেই যাবো। অযথা মাঝপথ থেকে কোনো
ফোন এসে আমার মৃত্যুমগ্ন সময়টাতে ডিস্টার্ব করুক তা আমি চাইনি। তাহিতি
পর্বতের সবচেয়ে উপরের শৃঙ্গে উঠে আমি সন্ধা নামার জন্য অপেক্ষা করলাম।
সূর্য ডুবে গেলে আমি শেষবারের মতো ঈশ্বরের আরাধনা করে নিলাম। আত্মহত্যাজনিত
পাপের জন্য আগাম ক্ষমা চেয়ে নিলাম তার কাছে। অদৃশ্য প্রভূর উদ্দেশ্যে
বললাম, প্রভু, আমি জানি আত্মহত্যা পাপ। তার চেয়ে অধিক পাপ বেকার অবস্থায়
বৃদ্ধ বাবা মায়ের কাঁধে পড়ে থাকা। হ্যা, প্রভু, যে ভাইটির বোনের বিয়ের বয়েস
পেরিয়ে যাচ্ছে আর বৃদ্ধ বাবা মা চিকিৎসার অভাবে দিনদিন মৃত্যুর কোলে ঢলে
পড়ছে, তার আর বেঁেচ থাকার সার্থকতা কী? বলুন প্রভু,বলুন। আমি শেষ বাক্যটি
শেষ করার আগেই তিনচারজন অস্ত্রধারী আমাকে ঘিরে ধরলো এবং তারপর কিছু বুঝে
উঠার আগেই আমার হাত-পা বেঁধে ফেললো।
দ্বিতীয় দিন যখন সুমিয়া তাহিতি আমার
মনের অবস্থা সম্পর্কে জানতে চাইলো আমি তাকে বলেছিলাম আমার লোভ নেই, এমনকি
আমার জীবনের প্রতিও। সে আমাকে শান্ত করার চেষ্টা করছিলো আর বিভিন্ন যুক্তির
মাধ্যমে এটিই বুঝাতে চাইছিলো যে বেঁচে থাকা একেবারে অর্থহীন নয়। এমনকি
অন্যের প্রাণ নিয়ে হলেও নিজের বেঁচে থাকা নিশ্চিত করতে চায় মানুষ। আমি তাকে
বলেছিলাম, আমি মানুষ নয়। তাহিতি সুমিয়া আমাকে বলেছে, অবয়ব তো মানুষের।
জন্ম যখন নিয়েছো, সংগ্রামটা তোমাকে তো করতেই হবে। আমি বলেছিলাম, আমি ভিষন
ক্লান্ত। এখন আর কোনো সংগ্রামে আমার আগ্রহ নেই। সে আমাকে বিত্তবৈভবের লোভ
দেখাতে চাইলো, কিন্তু না, ওসব আমাকে কাবু করতে পারেনি। সে আমাকে মৃত্যুর ভয়
দেখাতে চাইলো, কিন্তু না, ওসবও আমাকে আমার অবস্থান থেকে ফিরাতে পারলো না।
অবশেষে সে আমার চোখে চোখ রাখলো। একটা বিদ্যুৎপৃষ্টের মতো আমি পাল্টে গেলাম।
কেনো জানি না, তার কথার অবাধ্য হতে আর সাহস হয়নি। আমি তাহিতি সুমিয়ার
সামনে মাথা নিচু করে বসে রইলাম। যাবার সময় সে তার ডান হাত বাড়িয়ে আলতো করে
আমার ডানহাতের আঙ্গুলের অগ্রভাগ ছুঁয়ে দিলো, আমি আবারও বিদ্যুৎপৃষ্টের মতো
চমকে উঠলাম।
তাবুর কাছেই কোথাও রান্না হচ্ছে। মসলার একটা ঝাঁঝালো গন্ধ
আমার নাকে এসে লাগলো। একমুহুর্তে আমার বেঁচে থাকার স্বপ্নটা মাথাচাড়া দিয়ে
উঠলো। আমার মনে হলো, না, মরে গেলে এতোসব বৈচিত্রজীবন আমি দেখতে পেতাম না।
আমি তাবু থেকে আবারও বাইরে এসে নাক টেনে গন্ধ নিলাম, আহ্, মাংস তরকারির
গন্ধ। আমার নাককে অনুসরন করে আমি সামনে এগুতে থাকলাম। তিনটা তাবুর পর
তাহিতি সুমিয় নিজে দলের সবার জন্য রান্না করছে। আমি কাছে যেতেই নরোম সুরে
বললো, এসেছো? আমি চুপচাপ তার কাছে গিয়ে বসলাম। আগুনে দুটো শুকনো লাকড়ি ছুড়ে
দিয়ে সুমিয়া আমাকে বললো, জীবন! বুঝেছো, জীবন! জীবন কোনো ছেলে খেলা নয়।
বাঁচার জন্য এখানে প্রতিনিয়ত যুদ্ধ করতে হয়। তুমি যদি একবার থেমে যাও,
তাহলেই তোমার মরন। এই দেখো না, আমি একজন নারী হয়ে কীভাবে এই দুর্ধর্ষ ডাকাত
দলের নেতৃত্ব দিচ্ছি? দম্, বুঝলে, দম্ লাগে বাঁচতে গেলে। আমি বললাম, এ
বাঁচাটাকে কি সত্যিই বাঁচা বলে? আমার দিকে গভীর হতাশার চোখে তাকালো সুমিয়া,
বললো, নাহ, এ বাঁচাকে বাঁচা বলে না, এ হলো জীব-জন্তুর হাটবাজার। আমি
বললাম, তাহলে কি ফেরা যায় না? জ্বলন্ত চুলার ভেতর যেনো তার কণ্ঠ হাহাকার
করে উঠলো, নাহ্, এখান থেকে ফেরার কোনো পথ নেই!