বাংলাদেশের প্রাথমিক শিক্ষার মানোন্নয়নে ৩০ কোটি ডলার ঋণ দেবে বিশ্ব ব্যাংক। প্রাক্-প্রাথমিক থেকে পঞ্চম শ্রেণি পর্যন্ত ২ কোটি ৬০ লাখ শিশুর পড়া, লেখা ও গণিতের মৌলিক দক্ষতা বাড়াতে এ অর্থ ব্যয় করা হবে। পাশাপাশি সরকারের পঞ্চম প্রাথমিক শিক্ষা উন্নয়ন কর্মসূচি বাস্তবায়নেও সহায়তা দেবে সংস্থাটি।
‘লার্নিং এনহ্যান্সমেন্ট অ্যান্ড অ্যাকসেলারেশন ইন প্রাইমারি এডুকেশন প্রোগ্রাম’ নামের কর্মসূচির আওতায় এ অর্থায়ন করবে বিশ্বব্যাংক।
শুক্রবার সংস্থাটি এক বিজ্ঞপ্তিতে বলেছে, বিশ্ব ব্যাংক সদর দপ্তরে পরিচালনা পর্ষদের সভায় এ ঋণ অনুমোদন দেওয়া হয়েছে। বর্তমান বিনিময় হার (প্রতি ডলার ১২৪ টাকা ৫০ পয়সা) অনুযায়ী বাংলাদেশি মুদ্রায় পরিমাণ ৩ হাজার ৭৩৫ কোটি টাকা।
বিশ্বব্যাংক গ্রুপের স্বল্প আয়ের দেশগুলোকে সহজ শর্তে অর্থায়নকারী সংস্থা ইন্টারন্যাশনাল ডেভেলপমেন্ট অ্যাসোসিয়েশনের (আইডিএ) অর্থায়নে কর্মসূচিটি বাস্তবায়িত হবে। ঋণ পরিশোদের মেয়াদ ২৫ বছর। এর মধ্যে প্রথম পাঁচ বছর গ্রেস পিরিয়ড বা রেয়াতকাল হিসেবে রাখা হয়েছে।
বিশ্বব্যাংক বলছে, প্রাথমিক শিক্ষায় বাংলাদেশ প্রায় সর্বজনীন প্রবেশাধিকার নিশ্চিত করলেও শিক্ষার মান এখনও বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে রয়েছে। দেশের ১০ বছর বয়সি শিশুদের প্রায় অর্ধেকই বয়স উপযোগী একটি সহজ লেখা পড়ে তার অর্থ বুঝতে পারে না। অর্থাৎ বিদ্যালয়ে যাওয়ার সুযোগ থাকলেও বিপুলসংখ্যক শিশু প্রয়োজনীয় মৌলিক শিখনদক্ষতা অর্জন করতে পারছে না। ফলে প্রাথমিক শিক্ষায় প্রবেশাধিকারের পাশাপাশি শিক্ষার গুণগত মান নিশ্চিত করার প্রয়োজনীয়তা তুলে ধরেছে বৈশ্বিক আর্থিক এ প্রতিষ্ঠানটি।
বিজ্ঞপ্তিতে বাংলাদেশ ও ভুটানে বিশ্বব্যাংকের বিভাগীয় পরিচালক জ্যঁ পেসমে বলেন, বিশ্বের প্রতিযোগিতামূলক শ্রমবাজারের উপযোগী কর্মশক্তি গড়ে তোলার অন্যতম ভিত্তি হল মানসম্মত প্রাথমিক শিক্ষা।
“গত দুই দশকে বিশ্বব্যাংক গ্রুপ বাংলাদেশে প্রায় সব শিশুর বিদ্যালয়ে যাওয়ার সুযোগ নিশ্চিত করতে সহায়তা করেছে। নতুন অর্থায়নের মাধ্যমে শিশুরা আরও ভালোভাবে শিখতে পারবে এবং বিদ্যালয়ে পড়াশোনা অব্যাহত রাখতে উৎসাহিত হবে। এর মধ্য দিয়ে ভবিষ্যতে তাদের ভালো কর্মসংস্থানের সুযোগ তৈরির ভিত্তি তৈরি হবে।”
বিজ্ঞপ্তিতে বলা হয়, বাংলাদেশের প্রাথমিক শিক্ষাব্যবস্থা বিশ্বের অন্যতম বৃহৎ। সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়, বেসরকারি সংস্থা (এনজিও) পরিচালিত স্কুল, কিন্ডারগার্টেন ও মাদ্রাসা মিলিয়ে এ ব্যবস্থায় ২ কোটির বেশি শিশু পড়াশোনা করছে।
নতুন কর্মসূচির আওতায় শিশুদের মৌলিক সাক্ষরতা ও গণিতের দক্ষতা বাড়াতে বিশেষ প্যাকেজ চালু করা হবে। এতে থাকবে পাঠদানের উপকরণ, সুনির্দিষ্ট পাঠপরিকল্পনা এবং শিক্ষকদের প্রশিক্ষণ। পাশাপাশি দেশের ৯০ শতাংশ সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষকদের নেতৃত্ব ও বিদ্যালয় ব্যবস্থাপনা বিষয়ে প্রশিক্ষণ দেওয়া হবে। বিদ্যালয় পরিচালনা ও ব্যবস্থাপনার কাঠামোও শক্তিশালী করা হবে।
বিশ্বব্যাংকের জ্যেষ্ঠ শিক্ষা বিশেষজ্ঞ ও ‘লার্নিং এনহ্যান্সমেন্ট অ্যান্ড অ্যাকসেলারেশন ইন প্রাইমারি এডুকেশন প্রোগ্রাম’ কর্মসূচির দলনেতা তাশমিনা রহমান বলেন, “ভালো কর্মসংস্থানের জন্য প্রয়োজনীয় দক্ষতা অর্জনের ভিত্তি তৈরি হয় প্রাথমিক পর্যায়ে শক্তিশালী শিখন নিশ্চিত করার মধ্য দিয়ে। কোনো শিশু যাতে পিছিয়ে না পড়ে, তা নিশ্চিত করতে এ কর্মসূচির আওতায় পিছিয়ে থাকা শিক্ষার্থীদের জন্য অতিরিক্ত পাঠদানের ব্যবস্থা করা হবে।
“বিশেষ করে যেসব জেলার শিক্ষার্থীরা সবচেয়ে বেশি পিছিয়ে রয়েছে, সেসব জেলায় এ উদ্যোগকে অগ্রাধিকার দেওয়া হবে।”
তিনি বলেন, “শিক্ষকদের দক্ষতা ও বিদ্যালয়ের নেতৃত্বের মান উন্নয়নের পাশাপাশি শিক্ষাখাতে বরাদ্দ অর্থের জবাবদিহিমূলক ব্যবহার এবং সিদ্ধান্ত গ্রহণে তথ্য-উপাত্তের কার্যকর প্রয়োগ নিশ্চিত করার উদ্যোগ নেওয়া হবে।”
এ কর্মসূচির আওতায় সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষকদের প্রশিক্ষণ ও প্রয়োজনীয় সহায়তা দেওয়া হবে, যাতে তারা শ্রেণিকক্ষে শিশুদের পড়া ও গণিতের মৌলিক দক্ষতা অর্জনে আরও কার্যকর ভূমিকা রাখতে পারেন। একইসঙ্গে সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের প্রাক্-প্রাথমিক শিক্ষার মান উন্নয়নেও কাজ করা হবে। এতে শিশুরা শিক্ষাজীবনের শুরুতেই প্রয়োজনীয় ভিত্তি তৈরি করতে পারবে এবং প্রাথমিক বিদ্যালয়ে ভর্তির জন্য আরও ভালোভাবে প্রস্তুত হবে।
বিশ্বব্যাংকের প্রত্যাশা, এ কর্মসূচির মাধ্যমে সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে ৮ লাখ ৪৩ হাজার নতুন ও তুলনামূলক ভালো বেতনের কর্মসংস্থানের সুযোগও সৃষ্টি হবে।
