রণবীর ঘোষ কিংকর।
রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধে কুমিল্লার চান্দিনা উপজেলার নিহত সাগর মৃত্যুর আগেই বুঝতে পেরেছিলেন তিনি হয়তো আর এই যুদ্ধ ক্ষেত্র থেকে ফিরে আসতে পারবেন না। যে কারণে মাকে ভিডিও বার্তায় বলেছিলেন ‘তোমাকে মিস করি মা, আমার আর কোন খোঁজ না পেলে গায়েবেনা জানাজা দিয়ে দিও’।
গত শনিবার (১৭ অক্টোবর) রাশিয়ার যুদ্ধক্ষেত্র থেকে রাজন নামে সাগরের এক বন্ধু তার বোনের মোবাইল ফোনে মেসেজ পাঠান, ‘সাগর আর নেই’। এমন খবরে তার পরিবারে নেমে আসে গভীর শোকের ছায়া।
নিহত মো. সাগর চান্দিনা পৌরসভার ছায়কোট এলাকার কবির হোসেনের ছেলে। তিন বোন ও দুই ভাইয়ের মধ্যে তিনি সবার ছোট।
মৃত্যুর আগে নিজের মাকে একটি ভিডিও বার্তা পাঠিয়েছিলেন সাগর। সেখানে তাকে অত্যন্ত আবেগপ্রবণ অবস্থায় যুদ্ধক্ষেত্রের কঠিন পরিস্থিতির কথা বলতে শোনা যায়। ভিডিও বার্তায় সাগর বলেন, ‘মা, তোমাকে অনেক মিস করি মা। তোমার ছবিটা দেখলে আমার কান্না আসে মা। তুমি খালি দোয়া করো মা আমার লাইগা।
তিনি আরো বলেন, ‘মা, এক বছর সময়, দুই মাস তিন মাস গেছে মা। যদি আমি না আসি, তাইলে গায়েবি জানাজা দিয়া দিও মা। আর যদি আল্লাহ ফিরাইয়া আনে, তাইলে তো তোমার কোলে যাইয়া ফিরমু মা। আলহামদুলিল্লাহ মা, দোয়া করো আমার লাইগা, সবাই দেইখা খেয়াল রাইখো মা।’
যুদ্ধক্ষেত্রের কথা তুলে ধরে সাগর ভিডিওতে বলেন, ‘এখানে ইন্টারনেট নাই, মানুষের বুক-পিঠ নাই মা, এখানে কোনো মায়া-দয়া নাই।
কারো কোনো দোষ নাই মা। নিজেই আইছি মা, কারো কোনো দোষ দিও না। কেউরে ফোন-টোন দিও না।’
কান্নাজড়িত কণ্ঠে মাকে সান্ত্বনা দিয়ে তিনি আরো বলেন, প্রতিদিন তোমারে মিস করি মা। তোমার লাইগা আমার কলিজাটা ফাইটা যায় মা। তুমি দোয়া করো আমার লাইগা মাৃ টেনশন করো না মা।’
পরিবার সূত্রে জানা যায়, অভাব অনটনের মধ্যেই বেড়ে ওঠায় লেখাপড়ায় প্রাথমিকের গণ্ডি পার হতে পারেননি সাগর। কিশোর বয়স থেকেই রিক্সা-ভ্যান চালিয়ে পরিবারের আর্থিক জোগান দিতেন।
উপজেলা সদরের একটি রড-সিমেন্টের দোকানে নিয়মিত ভ্যান চালানোর সুবাদে ওই দোকানের ম্যানেজারের সঙ্গে সুসম্পর্ক হয় তার। ম্যানেজার চাকরি ছেড়ে বিদেশ চলে গেলেও তাদের মধ্যে যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন হয়নি। কয়েক বছর পর ওই ম্যানেজার বিদেশ থেকে দেশে ফিরে আবারও চাকরি নেয় সেই রড-সিমেন্ট দোকানে। বন্ধুত্বের সুবাদে সাগরকে বিদেশ পাঠানোর প্রস্তাব দেন ওই ম্যানেজার। পরবর্তীতে ২০২৫ সালের মাঝামাঝিতে ৬ লাখ টাকায় রাশিয়া পাড়ি জমান সাগর।
সেখানে গিয়ে একটি বেকারিতে কাজ নেন সাগর। বেতনও পাচ্ছিলেন প্রায় ৭০ হাজার টাকা। সেখানে কাজ করা অবস্থায় পরিচয় ঘটে এক বাংলাদেশি দালাল সোহেল রানার সঙ্গে। ওই দালাল তাকে রাশিয়ান সেনা বাহিনীতে চাকরি এবং এককালীন ৩০ লাখ টাকা দেওয়ার প্রলোভন দেখান। সাগর তার প্রলোভনে রাজি হয়ে চলতি বছরের মে মাসে ওই চাকরি ছেড়ে রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধে চলে যান। তারপর থেকে পরিবারের সঙ্গে যোগাযোগ বন্ধ হয়ে যায়।
সাগরের চাচা আব্দুল আওয়াল বলেন, সাগর যখন বেকারির চাকরি ছেড়ে রাশিয়ান সেনাবাহিনীতে চাকরির কথা আমাকে জানায় তখন আমি তাকে বারণ করেছিলাম। কারণ সাগর লেখাপড়াই জানে না। সে বিদেশে সেনাবাহিনীতে চাকরি করবে কীভাবে?
তিনি আরো বলেন, ‘ওই দেশের দালাল তাকে ভুল তথ্য দিয়ে রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধে সৈনিক হিসেবে যুক্ত করেছে। সাগর যুদ্ধে যাওয়ার আগে আমার একাউন্টে তিন লাখ টাকাও পাঠায়। তারপর আর যোগাযোগ করা সম্ভব হয়নি। শনিবার তার বন্ধু রাজন ম্যাসেজ করেছে সাগর মারা গেছে।’
