ক্ষমতার
দম্ভে অন্ধ ফেরাউনকে দ্বীনের দাওয়াত দেওয়ার জন্য আল্লাহ তাআলা নির্বাচন
করেছিলেন মুসা ও হারুনকে (আ.)। তাদেরকে নির্দেশ দিয়েছিলেন ফেরাউনকে নম্র
ভাষায় দ্বীনের দাওয়াত দিতে। পাশপাশি দিয়েছিলেন মুসার (আ.) লাঠি সাপ হয়ে
যাওয়া ও হাত উজ্জ্বল আলোয় উদ্ভাসিত হয়ে ওঠার মুজিজা।
মুসা (আ.) দীর্ঘ
প্রবাস জীবনের পর মিশরে ফিরলেন, ফেরাউনের রাজপ্রাসাদে গিয়ে তাকে আল্লাহর
আনুগত্যের দাওয়াত দিলেন আল্লাহর নির্দেশ অনুযায়ী নম্র ভাষায়। কিন্তু ফেরাউন
রূঢ়ভাবে তার দাওয়াত প্রত্যাখ্যান করলো। সে বললো আমিই সবচেয়ে বড় রব!
মুসা
(আ.) তখন আল্লাহর দেওয়া মুজিজা দেখালেন। তার হাতের লাঠিটি আস্ত এক অজগরে
পরিণত হলো এবং তাঁর হাতটি জামার ভেতর থেকে বের করতেই অলৌকিক উজ্জ্বল আলোয়
উদ্ভাসিত হয়ে উঠল, তখন ভীত ফেরাউন এটিকে ‘জাদু’ বলে উড়িয়ে দেওয়ার চেষ্টা
করল। সে বুঝতে পারলো না, এটি কোনো মানুষের চাতুরি নয়, বরং বিশ্বজাহানের
রবের সুস্পষ্ট নিদর্শন।
নিজের সভাসদ ও মিশরের জনগণের সামনে নিজের
মর্যাদা বাঁচাতে ফেরাউন পুরো সাম্রাজ্যের আনাচকানাচ থেকে নামজাদা ও ঝানু
জাদুকরদের ডেকে পাঠানোর নির্দেশ দিল। (সুরা ইউনুস: ৭৯) মুফাসসিরদের মতে,
ফেরাউনে আহ্বানে সাড়া দিয়ে প্রায় ষাট হাজার জাদুকর উপস্থিত হয়েছিল।
জাদুকররা
ফেরাউনকে বলল, আমরা যদি বিজয়ী হই, তবে আমাদের জন্য কি বড় পুরস্কার থাকবে?
ফেরাউন প্রতিশ্রুতি দিল, অবশ্যই! তোমরা কেবল পুরস্কারই পাবে না, বরং আমার
সবচেয়ে নিকটবর্তী মানুষে পরিণত হবে। (সুরা আ’রাফ: ১১৩, ১১৪)
প্রতিযোগিতার
দিন প্রকাশ্য ময়দানে মুখোমুখি হলেন মুসা (আ.) এবং জাদুকরদের বিশাল বাহিনী।
আত্মবিশ্বাসী মুসা (আ.) তাদের আগে কৌশল দেখানোর সুযোগ দিলেন। জাদুকররা
অহংকার করে বলে উঠল, ফেরাউনের মর্যাদার কসম! আমরাই বিজয়ী হবো। (সুরা
শুয়ারা: ৪৪) তারা তাদের দড়ি ও লাঠিগুলো ময়দানে ছুঁড়ে মারল। জাদুর প্রভাবে
মুহূর্তের মধ্যে পুরো ময়দান কিলবিল করা হাজারো সাপে ভরে গেল। দৃশ্যটি দেখে
সাধারণ মানুষ তো বটেই, মুসার (আ.) মনেও ক্ষণিকের জন্য আশঙ্কার রেখাপাত
হয়েছিল। কিন্তু ঠিক সেই মুহূর্তে ঐশ্বরিক ওহি তাঁর হৃদয়কে শান্ত করল, ভয়
পেও না, তুমিই বিজয়ী হবে। (সুরা ত্বাহা: ৬৮)
আল্লাহর নির্দেশে মুসা (আ.)
তাঁর হাতের সাধারণ লাঠিটি মাটিতে নিক্ষেপ করলেন। দেখতে দেখতে সেই লাঠিটি
এক বিশাল ও ভয়াল অজগরে রূপান্তরিত হলো এবং জাদুকরদের তৈরি সব ভুয়া ও
কৃত্রিম সাপগুলোকে গপাগপ গিলতে শুরু করল! সত্যের সামনে মুহূর্তে ভেঙে
চুরমার হয়ে গেল আসুরিক শক্তির মিথ্যার বেসাতি।
এই দৃশ্য দেখে সবচেয়ে বড়
ধাক্কা খেলেন জাদুকররা নিজেরাই। জাদুতে পারদর্শী হওয়ার কারণে তারা খুব ভালো
করেই জানতেন, জাদুর ক্ষমতার সীমানা কতটুকু। তারা বুঝতে পারলেন, এটি কোনো
মানুষের জাদুকরী চাল হতে পারে না, এটি সরাসরি মহান সৃষ্টিকর্তার অলৌকিক
নিদর্শন বা মুজেজা।
সত্যের আলো হৃদয়ে প্রবেশ করতেই জাদুকররা সিজদায়
লুটিয়ে পড়লেন। সমস্বরে ঘোষণা করলেন, ‘আমরা ঈমান আনলাম বিশ্বজাহানের রবের
ওপর যিনি মুসা ও হারুনের রব!’
কিন্তু ফেরাউন পিছু হটার পাত্র ছিল না।
মুসার (আ.) কাছে লজ্জাজনক হারের পর জাদুকরদের এভাবে ইমান আনতে দেখে ফেরাউন
রাগে উন্মত্ত হয়ে উঠল। নিজের সম্মান বাঁচাতে সে অবাস্তব এক তত্ত্ব দাঁড়
করিয়ে বলল, আমার অনুমতি ছাড়াই তোমরা তাঁর প্রতি ইমান আনলে? সে নিশ্চয়ই
তোমাদের বড় গুরু, যে তোমাদের জাদু শিখিয়েছে! এরপর সে কঠোর শাস্তির হুমকি
দিল, আমি তোমাদের হাত ও পা বিপরীত দিক থেকে কেটে ফেলব এবং তোমাদের সবাইকে
খেজুর গাছের কাণ্ডে শূলবিদ্ধ করব! (সুরা ত্বাহা: ৭১)
কিন্তু যে হৃদয়
একবার ইমানের স্বাদ পেয়েছে, তাকে পার্থিব কোনো হুমকি দিয়ে আর দমানো যায় না।
জাদুকররা অবলীলায় ফেরাউনের মুখের ওপর বলে দিলেন, কোনো ক্ষতি নেই! আমরা তো
আমাদের রবের কাছেই ফিরে যাচ্ছি। আমরা আশা করি, আমাদের রব আমাদের ভুলত্রুটি
ক্ষমা করবেন, কারণ আমরাই প্রথম ইমান এনেছি। (সুরা শুয়ারা: ৫০-৫১)
তাঁরা
স্পষ্ট জানিয়ে দিলেন, যে সুস্পষ্ট প্রমাণ আমাদের কাছে এসেছে, তার ওপর আমরা
তোমাকে প্রাধান্য দেব না। কাজেই তুমি যা করার করো, তুমি তো কেবল এই দুনিয়ার
জীবনের ওপরই নির্দেশ চালাতে পারো। (সুরা ত্বাহা: ৭২)
সেদিন সকালেই যারা
ছিল পার্থিব অর্থ ও ভোগ বিলাসের লোভে অন্ধ, ফেরাউনের অনুগ্রহের ভিখারী,
সন্ধ্যায় তারাই হয়ে উঠলেন সত্যের পথের অমর শহীদ। তারা আল্লাহর সন্তুষ্টি
লাভ করেছেন, আল্লাহর দরবারে সম্মানিত হয়েছেন। আল্লাহ তাআলা তার সর্বশ্রেষ্ঠ
গ্রন্থ কোরআনে তাদের গল্প বলেছেন, এর চেয়ে বড় সৌভাগ্য আর কী হতে পারে!
