সোমবার ২৭ জুলাই ২০২৬
১২ শ্রাবণ ১৪৩৩
ঢাকায় গ্যাস লাইন লিকেজ বিস্ফোরণ, স্বামী-স্ত্রী ও ভাগনি মৃত্যু, গ্রামের বাড়িতে দাফন সম্পন্ন
উদ্যোক্তা হওয়ার স্বপ্ন নিয়ে স্বামীর সঙ্গে ঢাকায় গিয়ে ফাহিমাফিরলেন লাশ হয়ে
শাহীন আলম
প্রকাশ: সোমবার, ২৭ জুলাই, ২০২৬, ১:১৭ এএম আপডেট: ২৭.০৭.২০২৬ ১:৪২ এএম |



উদ্যোক্তা হওয়ার স্বপ্ন নিয়ে  স্বামীর সঙ্গে ঢাকায় গিয়ে ফাহিমাফিরলেন লাশ হয়ে উদ্যোক্তা হওয়ার স্বপ্ন ছিল ফাহিমার। অনলাইনে নিজের হাতে তৈরি কেক, পোশাক বিক্রি করে একদিন বড় ব্যবসায়ী হবেন, সংসারে স্বচ্ছলতা ফেরাবেন, ছোট্টপরিসরে শুরুও করেছিলেন। এমন স্বপ্ন বুকে নিয়ে গ্রামের মেয়ে ফাহিমা আক্তার মাত্র দেড় মাস আগে স্বামীর সঙ্গে রাজধানীর উত্তর বাড্ডার ভাটারা এলাকায় একটি ভাড়া বাসায় উঠেছিলেন। কিন্তু সে স্বপ্ন থেমে গেলো একটি মর্মান্তিক দুর্ঘটনায়। স্বামী ও ছোট ভাগনিসহ নিথর দেহ গ্রামের বাড়িতে ফিরলো ফাহিমা আক্তারের মরদেহ।  
গত মঙ্গলবার ভোর ৪টার দিকে রাজধানীর নতুন বাজারের ১০০ ফিট সড়কের একটি ৬তলা ভবনের নিচতলায় গ্যাস লাইনের লিকেজ থেকে ভয়াবহ বিস্ফোরণ ঘটে। এতে দগ্ধ হয় ফাহিমার স্বামী আনোয়ার হোসেন শাহীন (২৪) ভাগনি হাফসা (৮) ও ফাহিমা আক্তার (২১)। পরে তাদের উদ্ধার করে জাতীয় বার্ন ও প্লাস্টিক সার্জারি ইনস্টিটিউটের নিবিড় পরিচর্যা কেন্দ্রে (আইসিইউ) চিকিৎসা দেওয়া হয় সেখানে চিকিৎসাধীন অবস্থায় বৃহস্পতিবার সন্ধ্যায় মারা যায় স্বামী আনোয়ার হোসেন শাহীন, শুক্রবার সকালে মারা যায় ভাগনি হাফসা এবং শনিবার সন্ধ্যায় মারা যায় ফাহিমা আক্তার।   
নিহত ফাহিমা আক্তার দেবিদ্বার উপজেলার গোমতী আবাসিক এলাকার গোলাম হোসেনের ছোট মেয়ে। সে উপজেলার জাফরগঞ্জ মীর আব্দুল গফুর ডিগ্রি কলেজ থেকে এইচএসসি পাস করে অনার্সে ভর্তি হয়েছিলেন। পাশাপাশি অনলাইন ফেসবুকে একটি পেজ খুলে হাতের তৈরী কেক ও পোশাক বিক্রি করতেন। গত বছরের ১৯ সেপ্টেম্বর আনোয়ার হোসেন শাহীনের সঙ্গে প্রেমের সম্পর্কে গোপনে বিয়ে হয় তার। আনোয়ার হোসেন শাহীন দেবিদ্বার উপজেলার গুনাইঘর উত্তর ইউনিয়নের বাঙ্গুরী গ্রামের মীর্জা আলী ব্যাপারী বাড়ি আবদুল মোমেন মিয়ার ছেলে। তিনি ঢাকায় একটি পোশাকের শো-রুমে সেলম্যান হিসেবে চাকরি করতেন। তাদের সঙ্গে ঢাকায় আসে ফাহিমার বড় বোনের আট বছরের মেয়ে হাফসা। হাফসা আক্তার উপজেলার ফতেহাবাদ ইউনিয়নের সুলতানপুর গ্রামের মো. বাবুল মিয়ার মেয়ে। 
এদিকে, একই পরিবারের তিনজনের এমন মর্মান্তিক মৃত্যুর খবরে দেবিদ্বারের গ্রামের বাড়ি বাঙ্গুরি এলাাকায় নেমে এসেছে শোকের ছায়া, স্বজনদের আহাজারী আর কান্নায় ভারী হয়ে ওঠে বাতাস। পরে শুক্রবার সন্ধ্যায় নিহত আনোয়ার হোসেন শাহীন ও শিশু হাফসার মরদেহ একটি  লাশবাহী অ্যাম্বুলেন্সে করে গ্রামের বাড়ি বাঙ্গুরী এলাকায় নিয়ে আসা হয় । পরে রাত ৮ টার দিকে জানাজা শেষে শাহীনকে বাঙ্গুরী গ্রামের পারিবারিক কবরস্থানে ও শিশু হাফসাকে নিজ বাড়ি সুলতানপুর গ্রামের কবরস্থানে দাফন করা হয়। অপরদিকে, শনিবার সন্ধ্যায় মারাও যাওয়া ফাহিমা আক্তারের মরদেহ রাতেই গ্রামের বাড়িতে নিয়ে আসা হয়। পরে রবিবার সকাল সাড়ে ৯টার দিকে দেবিদ্বার নিউ মার্কেট এলাকার চানমিয়া মার্কেট মাঠে জানাজা শেষে বাঙ্গুরী এলাকার একই কবরস্থানে স্বামী শাহীনের পাশে দাফন করা করা হয়। 
নিহত ফাহিমার ভাবি মোসা. শামীমা আক্তার বলেন, এমন মৃত্যু আমারা মেনে নিতে পারছি না। এটি মৃত্যু নয় এটি হত্যাকাণ্ড। বাড়ির মালিক অবহেলা না করলে আমার ননদ, তার স্বামী ও ভাগনি বেঁচে যেত। তাদের মৃত্যুতে পরিবারের কারও অবস্থা ঠিক নেই। আমরা এখন কার কাছে বিচার চাইবো।    
নিহত ফাহিমার বাবা গোলাম হোসেন বলেন, ১১ মাস আগে শাহীনের সঙ্গে মেয়ের বিয়ে হয়। পড়ালেখার পাশপাশি অনলাইনে টুকটাক বেচাবিক্রি করত। প্রায়ই বলত অনেক বড় উদ্যোগতা হবে। কিন্তু অল্প বয়সে আমার মেয়ের জীবন চলে গেল। তিনি অভিযোগ করে বলেন, ওরা  যে বাসা ভাড়ায় উঠছে ওঠার পরপরই বাড়ির মালিককে গ্যাস লিকেজের কথা বলেছিলো। কিন্তু মালিক বিষয়টি কোনো গুরুত্ব দেননি। যার কারণে তিনজনের প্রাণ চলে গেল। আমি আমার মেয়েও নাতনীকে হারালাম। এখানে বাড়ির মালিকের অবহেলা রয়েছে, তিনি সময়মত এর ব্যবস্থা নিলে এমন দুর্ঘটনা ঘটতো না। আমি তার দৃষ্টান্তমূলক বিচার দাবি করছি।  
নিহত আনোয়ার হোসেন শাহীনের বাবা মীর্জা আলী ব্যাপারী কান্নাজড়িত কন্ঠে বলেন, আমার ছেলে বিয়ের কিছুদিন আগে ঢাকায় একটি কাপড়ের শো-রুমে চাকরি নিয়েছে। দেড় দুই মাস আগে ঢাকার  ভাটারায় ওই বাড়িতে ভাড়ায় ওঠে। আমার ছেলে আর নাই, তার মুখটা শেষবার দেখেছি, আমার ছেলে আমার আগেই দুনিয়া থেকে চলে গেছে বলেই তিনি কান্নায় ভেঙে পড়েন।  
বাঙ্গুরী এলাকার স্থানীয় ইউপি সদস্য মো. আবু হানিফ সরকার বলেন, আনোয়ার হোসেনশাহীন খুবই শান্ত প্রকৃতির ছিলেন,  বিয়ের পর ঢাকায় একটি পোশাকের শো রুমে চাকরি নিয়ে ছিলেন। ফাহিমার সঙ্গে তার বিয়ে হয়েছে বেশিদিন হয়নি। তিনজনের এমন মমার্šিÍক মৃত্যু এলাকার কেউ মেনে নিতে পারছে না। শাহীন ও তার স্ত্রীকে গ্রামের একটি কবরস্থানে পাশাপাশি দাফন করা হয়েছে। আর শিশু হাফসাকে তার গ্রামের বাড়ি সুলতানপুরে দাফন করা হয়েছে। এই ঘটনায় যদি বাড়ির মালিকের কোন অবহেলা থাকে তা তদন্ত করে বিচার দাবি করছি। 
নিহত পরিবারের মাঝে আর্থিক অনুদান : এদিকে, নিহতদের পরিবারের সঙ্গে সাক্ষাৎ করেন দেবিদ্বার উপজেলা নির্বাহী অফিসার (ইউএনও) অশোক বিক্রম চাকমা। রবিবার রাতে নিহত আনোয়ার হোসেন শাহীনের বাবা মো. আবদুল মোমেনেসহ তার পরিবারের খোঁজ খবর নেন তিনি। পরে নিহত আবদুল মোমেনের হাতে নগদ ২০ হাজার টাকার অনুদান তুলে দেন তিনি। এসময় উপজেলা সহকারী কমিশনার (ভূমি) মো. ফয়সল উদ্দিন, ইউপি (প্যানেল) চেয়ারম্যান মহিউদ্দিন মাহমুদ, ইউপি সদস্য মো. আবু হানিফ সরকারসহ স্থানীয় গণমান্য ব্যক্তিবর্গ উপস্থিত ছিলেন। 
দেবিদ্বার উপজেলা নির্বাহী অফিসার ( ইউএনও) অশোক বিক্রম চাকমা বলেন, এই ক্ষতি পোষানোর কোন ক্ষমতা আমাদের নেই। আমরা শোক সন্তপ্ত পরিবারকে সমবেদনা জানিয়েছি। ওই পরিবারকে উপজেলা পরিষদ থেকে  আর্থিক অনুদান দেওয়া হয়েছে। এছাড়াও তারা যদি একটি আবেদন করেন তাহলে আরও সহযোগিতা করা হবে। 













http://www.comillarkagoj.com/ad/1752266977.jpg
Loading...
Loading...
Follow Us
সম্পাদক ও প্রকাশক : মোহাম্মদ আবুল কাশেম হৃদয় (আবুল কাশেম হৃদয়)
বার্তা ও বাণিজ্যিক কার্যালয়ঃ ১২২ অধ্যক্ষ আবদুর রউফ ভবন, কুমিল্লা টাউন হল গেইটের বিপরিতে, কান্দিরপাড়, কুমিল্লা ৩৫০০। বাংলাদেশ।
ফোন +৮৮ ০৮১ ৬৭১১৯, +৮৮০ ১৭১১ ১৫২ ৪৪৩, +৮৮ ০১৭১১ ৯৯৭৯৬৯, +৮৮ ০১৯৭৯ ১৫২৪৪৩, ই মেইল: [email protected]
© সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত, কুমিল্লার কাগজ ২০০৪ - ২০২২