সোমবার ২৭ জুলাই ২০২৬
১২ শ্রাবণ ১৪৩৩
কেমন হলো ফিফা বিশ্বকাপ ২০২৬!
মোহাম্মদ মাসুদ রানা চৌধুরী
প্রকাশ: সোমবার, ২৭ জুলাই, ২০২৬, ১:১৭ এএম আপডেট: ২৭.০৭.২০২৬ ১:৪১ এএম |

 কেমন হলো ফিফা বিশ্বকাপ ২০২৬!
সব জল্পনা-কল্পনার অবসান ঘটিয়ে বিশ্বকাপ ফুটবল ২০২৬ এর সফল সমাপ্তি হয়েছে। পৃথিবীর বুকে সেরা উৎসব (গ্রেটেস্ট শো অন দ্যা আর্থ) তথা ‘বিশ্বকাপ ফুটবল’ বর্তমান বিশ্বের সবচেয়ে আকর্ষণীয় একক খেলা হিসেবে বিবেচিত। ফুটবল ইতিহাসের বৃহত্তম টুর্নামেন্ট ফিফা বিশ্বকাপের ২৩তম আসর তিন দেশের যৌথ আয়োজনে ১১ই জুন থেকে ১৯শে জুলাই, ২০২৬ পর্যন্ত অনুষ্ঠিত হয়েছে। বাংলাদেশের বেশিরভাগ ফুটবল প্রেমিদের পছন্দের দুটো দল ব্রাজিল বা আর্জেন্টিনা বিশ্বকাপে চ্যাম্পিয়ন হতে ব্যর্থ হয়েছে। ১৯ জুলাই ২০২৬ মেটলাইফ স্টেডিয়ামে ফিফা বিশ্বকাপের ফাইনালে আর্জেন্টিনা ১-০ গোলে হারিয়ে ১৬ বছর পর আবারও চ্যাম্পিয়ন হয়েছে স্পেন। নিউ ইয়র্কের নিউ জার্সি স্টেডিয়ামে ফাইনাল ম্যাচ শেষে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডনাল্ড ট্রাম্প ও ফিফা সভাপতি জিয়ান্নি ইনফান্তিনো স্পেন দলের হাতে বিশ্বকাপ ট্রফি তুলে দেন। প্রসংগত উল্লেখ্য যে, স্পেনের মহিলা জাতীয় ফুটবল দল ফিফা নারী বিশ্বকাপের বর্তমান  (২০২৩ সালে অনুষ্ঠিত) চ্যাম্পিয়ন। 
ফিফা বিশ্বকাপ যুক্তরাষ্ট্র, কানাডা ও মেক্সিকোতে অনুষ্ঠিত ইতিহাসের প্রথম ৪৮ দলের টুর্নামেন্ট, যেখানে রেকর্ড ৩৬,০৫,৩৫৭ জন দর্শক মাঠে খেলা দেখেছেন। ২০০২ সালের পর এটিই হবে প্রথম পুরুষদের বিশ্বকাপ যা একাধিক দেশ যৌথভাবে ষোলটি শহরে আয়োজন করেছে। ২০২৬ বিশ্বকাপে ৪৮টি দলের মোট ১,২৪৮ জন খেলোয়াড় অংশগ্রহণ করেছে। ২০২৬ ফিফা বিশ্বকাপের ২৩তম আসরে কেপ ভার্দে, কুরাকাও, জর্ডান এবং উজবেকিস্তান মতো দলগুলোর ঐতিহাসিক অভিষেক ঘটেছে। এশিয়া থেকে ৮টি (ইরান, জাপান, জর্ডান, সাউথ কোরিয়া, কাতার, সৌদি আরব ও উজবেকিস্তান), আফ্রিকা থেকে ৯টি, উত্তর আমেরিকা থেকে ৬ টি দল (কানাডা, মেক্সিকো এবং মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র আয়োজক দেশ হিসাবে), ইউরোপ থেকে ১৬ টি, দক্ষিণ আমেরিকা থেকে ৬টি, ওশেনিয়া থেকে  ১টি এবং আন্তঃমহাদেশীয় খেলার মাধ্যমে বাছাই করা অতিরিক্ত ২টি দল অংশ নিয়েছে। ২০২৬ সালের ফুটবল বিশ্বকাপে সবচেয়ে কম জনসংখ্যার দেশ হলো কুরাসাও। ক্যারিবিয়ান অঞ্চলের এই দ্বীপরাষ্ট্রটির জনসংখ্যা মাত্র ১ লাখ ৫৬ হাজার, যা বিশ্বকাপের ইতিহাসে যোগ্যতা অর্জনকারী দেশগুলোর মধ্যে সবচেয়ে কম।
২০২৬ ফিফা বিশ্বকাপে মোট ১০৪টি ম্যাচে সর্বমোট ৩০৮টি গোল হয়েছে। মোট ১০৪টি ম্যাচে গড়ে প্রতি ম্যাচে ২.৯৬টি গোল হয়েছে। ২০২৬ ফিফা বিশ্বকাপে ব্যক্তিগত পরিসংখ্যানে সর্বোচ্চ গোলদাতা হিসেবে ফ্রান্সের কিলিয়ান এমবাপে গোল্ডেন বুট এবং রদ্রি গোল্ডেন বল জিতেছেন। স্পেনের উনাই সিমোন ‘গোল্ডেন গ্লাভ’ এবং সতীর্থ পাউ কুবারসি ‘সেরা তরুণ খেলোয়াড়’-এর পুরস্কার জিতেছেন। টুর্নামেন্টে ইংল্যান্ড ও ফ্রান্স দল সর্বোচ্চ ২০টি করে, আর্জেন্টিনা ১৯টি গোল করেছে। কিলিয়ান এমবাপ্পে (ফ্রান্স) ১০ গোল, লিওনেল মেসি (আর্জেন্টিনা) ৮ গোল, জুড বেলিংহ্যাম (ইংল্যান্ড) ও আর্লিং হালান্ড (নরওয়ে) ৭টি করে গোল করেন। ২০২৬ ফিফা বিশ্বকাপে মোট ৪টি হ্যাটট্রিক হয়েছিল; জোনাথন ডেভিড, লিওনেল মেসি এবং উসমান দেম্বেলে এই কৃতিত্ব অর্জন করেছিলেন।
অর্থনীতির সঙ্গে ফুটবলের একটা গভীর সম্পর্ক আছে। বিশ্বকাপ ফুটবল বিভিন্ন উপায়ে অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি বাড়ানো, নতুন কর্মসংস্থানের সুযোগ তৈরী এবং নতুনতর দক্ষতার সাথে সংযোগ ঘটানোর মাধ্যমে অর্থনীতিতে নতুন মাত্রা যোগ করতে সহায়তা করে। ২০২৬ বিশ্বকাপ ফুটবল থেকে এবার রেকর্ড আয় করেছে ফুটবলের সর্বোচ্চ সংস্থা ফিফা। আগের যেকোনো আসরের চেয়ে এবারের বিশ্বকাপটি অনেক বড় পরিসরে অনুষ্ঠিত হয়েছে। বেশি দেশ অংশ নেওয়ায় ম্যাচের সংখ্যাও বেড়েছে, যা কোটি কোটি দর্শকের নজর কাড়ার পাশাপাশি টাকা আয়ের পথও সুগম করেছে। ফিফা সদস্যদেশগুলোকে যে তথ্য দিয়েছে, এবার বিশ্বকাপ থেকে তারা ১৫ বিলিয়ন বা ১ হাজার ৫০০ কোটি ডলার, বাংলাদেশি মুদ্রায় ১ লাখ ৮৪ হাজার ৫০০ কোটি টাকা আয় করেছে। আয়ের সিংহভাগ এসেছে আতিথেয়তা ও টিকিট বিক্রি, বিশেষ করে উচ্চমূল্যের সেকেন্ডারি টিকিটের বাজার থেকে। আর্জেন্টিনাকে ১-০ গোলে হারিয়ে দ্বিতীয়বারের মতো বিশ্বচ্যাম্পিয়ন হওয়া স্পেন পাচ্ছে ৫ কোটি ১০ লাখ মার্কিন ডলার, যা বাংলাদেশি মুদ্রায় প্রায় ৬২০ কোটি টাকা (প্রতি ডলার প্রায় ১২১.৫ টাকা ধরে)। চ্যাম্পিয়ন হওয়ার পুরস্কারের ৪৫ শতাংশ স্পেনের খেলোয়াড়দের মধ্যে ভাগ করে দেওয়া হবে। ফলে প্রত্যেকে প্রায় ৯ লাখ ৪০ হাজার মার্কিন ডলার, অর্থাৎ প্রায় ১১ কোটি ৪২ লাখ টাকা করে পাবেন। রানার্সআপ আর্জেন্টিনা পাচ্ছে ৩ কোটি ৪০ লাখ মার্কিন ডলার, যা বাংলাদেশি মুদ্রায় প্রায় ৪১৩ কোটি টাকা। তৃতীয় স্থান অধিকারী ইংল্যান্ড পেয়েছে  ৩০ মিলিয়ন ডলার বা ৩৬৫ কোটি টাকা ।
ফিফা জানিয়েছে, এই বিপুল আয়ের বড় একটি অংশ ব্যয় করা হবে বিশ্বজুড়ে ফুটবলের কাঠামোগত উন্নয়নে। ফুটবল উন্নয়ন কর্মসূচির আওতায় বিভিন্ন দেশের জাতীয় ফুটবল সংস্থাগুলোকে তৃণমূল থেকে শুরু করে সর্বোচ্চ স্তর পর্যন্ত ফুটবলের বিকাশে দেওয়া হবে। ফিফা ও বিশ্ব বাণিজ্য সংস্থার এক গবেষণায় প্রাক্কলন করেছিল ফিফা বিশ্বকাপ ২০২৬ টুর্নামেন্টটির বরাতে বৈশ্বিক অর্থনীতিতে প্রায় ৪ হাজার ১০০ কোটি ডলার যুক্ত হবে, যার মধ্যে শুধু যুক্তরাষ্ট্রের অর্থনীতিতেই যোগ হবে ১ হাজার ৭০০ কোটি ডলার (১৭.২ বিলিয়ন ডলার) এবং মূলত হোটেল ও আতিথেয়তা খাতে প্রায় ১ লাখ ৮৫ হাজার কর্মসংস্থান সৃষ্টি হবে। সম্প্রচারকারীদের এই টুর্নামেন্ট দেখানোর স্বত্ব কিনতে বিপুল পরিমাণ অর্থ খরচ করতে হলেও দর্শক সংখ্যা এবং নিজেদের ব্র্যান্ড তুলে ধরতে বিজ্ঞাপন বিক্রি থেকে তারা বিশাল অংকের মুনাফা করেছে। যুক্তরাষ্ট্রের মাটিতে বিশ্বকাপের এই বিপুল আর্থিক সাফল্যের কারণে ভবিষ্যতে আবারও সেখানে বিশ্বকাপ আয়োজিত হতে পারে-এমন সম্ভাবনা জোরালো হচ্ছে। তবে অক্সফোর্ড ইউনিভার্সিটির ফেলো এবং অক্সফোর্ড গ্লোবাল প্রজেক্টসের প্রধান নির্বাহী আলেকজান্ডার বুডজিয়ার মনে করেন, এত বড় একটি ক্রীড়া ইভেন্ট আয়োজনের দীর্ঘমেয়াদি অর্থনৈতিক সুবিধাগুলো শেষ পর্যন্ত বাস্তবে রূপ নেয় না।
ফুটবলকে আরও আধুনিক ও গতিময় করতে সময়ে সময়ে নিয়ম বদলেছে ফিফা। এবার উত্তর আমেরিকায় অনুষ্ঠেয় ২০২৬ বিশ্বকাপেও যুক্তরাষ্ট্র, মেক্সিকো ও কানাডার উষ্ণ আবহাওয়ার কথা চিন্তা করে, ম্যাচের দুই অর্ধেই পানি পানের (বাধ্যতামূলক হাইড্রেশন) বিরতির নিয়ম করেছে ফিফা। প্রতি অর্ধের মাঝে তিন মিনিটের এই সময়ে খেলোয়াড়দের সঙ্গে কৌশল নিয়ে আলোচনা করার সুযোগও পান কোচিং স্টাফের সদস্যরা। ২০২৬ সালের বিশ্বকাপে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা ম্যাচ পরিচালনা, কৌশলগত বিশ্লেষণ, সম্প্রচার এবং খেলোয়াড়দের সুরক্ষায় যুগান্তকারী ভূমিকা পালন করেছে। অফসাইড শনাক্তকরণে নিখুঁত থ্রিডি অ্যাভাটার তৈরি, রেফারিদের বডি-ক্যামেরার ফুটেজ স্টেবিলাইজ করা এবং সব দেশকে সমানভাবে উন্নত ম্যাচ অ্যানালিটিক্স সরবরাহ করার ক্ষেত্রে এআই ব্যবহৃত হয়েছে। ফিফা টুর্নামেন্টের আনুষ্ঠানিক মাসকটগুলি ছিল মেপল, জায়ু এবং ক্লাচ। মেপল হল একটি মুজ, জায়ু হল একটি জাগুয়ার এবং ক্লাচ হল একটি বন্ড ঈগল। মাসকটগুলি কানাডা, মেক্সিকো এবং মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যকে প্রতিফলিত করে। এ টুর্নামেন্টের ম্যাচ বলটির নাম হবে অ্যাডিডাস ট্রিওল্ডা। 
চার বছর অপেক্ষার পর আসে ফুটবল বিশ্বকাপ। ২০৩০ সালের শতবর্ষ উদযাপনের ফুটবল বিশ্বকাপের আয়োজক ছ’টি দেশ। আর্জেন্টিনা, উরুগুয়ে, প্যারাগুয়ে, স্পেন, পর্তুগাল এবং মরক্কো। শতবর্ষ উপলক্ষে তিন মহাদেশে বিশ্বকাপ আয়োজনের সিদ্ধান্ত নিয়েছে ফিফা। তবে টুর্ণামেন্টের ফাইনাল ম্যাচের ভেন্যু এখনো নির্ধারিত হয়নি। সেই বিশ্বকাপকে ঘিরে সমর্থকরা দিন গুনতে শুরু  করেছেন। এবারের বিশ্বকাপে খেলা অনেক নামি-দামি খেলোয়াড়দের হয়তো পরবর্তী বিশ্বকাপে দেখা যাবে না। একইসাথে নতুন নতুন খেলোয়াড়দের পদচারনায় জমে উঠবে বিশ্বকাপ-২০৩০। মন খারাপ করা খবর হলো লিওনেল মেসি, ক্রিশ্চিয়ানো রোনালদো, লুকা মদরিচ ও ম্যানুয়েল নয়্যারের মতো এক প্রজন্মের কিংবদন্তিরা বিশ্বকাপের মঞ্চকে বিদায় জানিয়েছেন। 
ফুটবল কেবলমাত্র একটি খেলা নয় এটি একটি আবেগ, একটি সংস্কৃতি এবং একটি জীবনযাত্রা। দেশে দেশে মানুষের মধ্যে ‘বৈশ্বিক বন্ধণ’ তৈরীতে ‘ফুটবল’ হচ্ছে অন্যতম সবচেয়ে কার্যকর একটি মাধ্যম। বিনোদন ও অর্থনীতির বাইরেও ফুটবলের একটি শক্তিশালী সামাজিক প্রভাবও রয়েছে। এটি প্রায়শ:ই সমাজে ইতিবাচক পরিবর্তনের হাতিয়ার হিসেবে কাজ করে। ‘ফুটবল’ দেশে দেশে মানুষের যোগসূত্রের ক্ষেত্রে একটি সর্বজন গৃহীত ভাষা হিসেবে কাজ করছে। ফুটবলকে কেন্দ্র করে বিভিন্ন সংস্কৃতি, পটভূমি, বিশ্বাস ও দর্শনের মানুষ একসূত্রে জড়ো হয়। তাই ফুটবলের ইতিহাস থেকে শুরু করে আজকের এর যে অবস্থান তা বিশ্বব্যাপি ফুটবলকে এক অনন্য খেলা হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করেছে। ফুটবল খেলার মাধ্যমে বিশ্ব ভ্রাতৃত্ব গড়ে উঠুক, মানুষ-মানুষে আন্তরিক সম্পর্ক গড়ে উঠুক, যুদ্ধ ও মাদকের বিরুদ্ধে প্রতিরোধ গড়ে তুলতে ফুটবল জয়ী হউক-এ কামনা আমাদের সবার। 
লেখকঃ গবেষক, কলাম লেখক, সমাজকর্মী এবং একজন সরকারি কর্মচারী।














http://www.comillarkagoj.com/ad/1752266977.jpg
Loading...
Loading...
Follow Us
সম্পাদক ও প্রকাশক : মোহাম্মদ আবুল কাশেম হৃদয় (আবুল কাশেম হৃদয়)
বার্তা ও বাণিজ্যিক কার্যালয়ঃ ১২২ অধ্যক্ষ আবদুর রউফ ভবন, কুমিল্লা টাউন হল গেইটের বিপরিতে, কান্দিরপাড়, কুমিল্লা ৩৫০০। বাংলাদেশ।
ফোন +৮৮ ০৮১ ৬৭১১৯, +৮৮০ ১৭১১ ১৫২ ৪৪৩, +৮৮ ০১৭১১ ৯৯৭৯৬৯, +৮৮ ০১৯৭৯ ১৫২৪৪৩, ই মেইল: [email protected]
© সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত, কুমিল্লার কাগজ ২০০৪ - ২০২২