কুমিল্লার
ব্রাহ্মণপাড়া উপজেলার ৮টি ইউনিয়নে একসময় প্রচুর তালগাছের দেখা মিলত। আর
সেই তালগাছগুলোতে ঝুলে থাকত নিপুণ কারিগর বাবুই পাখির অপূর্ব সব বাসা।
ভোরের আলো ফুটতেই বাবুই পাখির কিচিরমিচির শব্দে ঘুম ভাঙত গ্রামগঞ্জের
মানুষের। খাবারের সন্ধানে ডানা মেলে উড়ে বেড়ানো কিংবা আনমনে নতুন বাসা
বোনার কাজে ব্যস্ত থাকা বাবুইয়ের দল ছিল গ্রামবাংলার চিরচেনা রূপ। তবে
কালের আবর্তে সেই দৃশ্য এখন শুধুই স্মৃতি।
উপজেলার বিভিন্ন গ্রাম ঘুরে
এখন আর আগের মতো বাবুই পাখির দেখা মেলে না, মেলে না তাদের বোনা চমৎকার
বাসাও। পরিবেশ বিপর্যয়, নির্বিচারে তালগাছ নিধন এবং প্রযুক্তির আধুনিকায়নে
প্রকৃতি থেকে যেন ধীরে ধীরে হারিয়ে যাচ্ছে এই পরিবেশবান্ধব পাখিটি।
এ বিষয়ে চান্দলা ইউনিয়নের প্রবীণ ব্যক্তিত্ব গেদু মিয়া আক্ষেপ করে বলেন,
"আমরা
একসময় দেখতাম তালগাছে থোকা থোকা বাবুই পাখির বাসা ঝুলত। সকালে ওদের ডাকেই
আমাদের ঘুম ভাঙত। বাতাস এলেই বাসাগুলো দোল খেত, দেখতে অসাধারণ লাগত। এখন
তালগাছও কমে গেছে, আর বাবুই পাখিও চোখে পড়ে না।"
একই অভিজ্ঞতার কথা জানান সিদলাই ইউনিয়নের ৭০ বছর বয়সী আবদুল মান্নান। তিনি বলেন,
"আমাদের
ছোটবেলায় গাছে গাছে শত শত বাবুই পাখির বাসা দেখা যেত। পাখির তৈরি এ
বাসাগুলো এত শক্ত আর নিপুণ ছিল যে ভারী ঝড়েও ভেঙে পড়ত না। এখন নতুন
প্রজন্মকে বাবুই পাখির গল্প বলতে হয়, সরাসরি দেখানোর উপায় নেই।"
স্থানীয় শিক্ষক ফরিদুল ইসলাম মনে করেন, প্রাকৃতিক পরিবেশের পরিবর্তনের কারণেই আজ এমন পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়েছে। তিনি বলেন,
"মূলত
আবাসন তৈরি ও কাঠের প্রয়োজনে প্রতিনিয়ত তালগাছ কেটে ফেলা হচ্ছে। বড় বড়
উঁচু তালগাছ ছাড়া বাবুই পাখি সহজে বাসা বাঁধে না। ফলে নিরাপদ আশ্রয়ের
অভাবেই এরা অন্যত্র চলে যাচ্ছে অথবা বিলুপ্ত হয়ে যাচ্ছে। পাখি রক্ষায়
তালগাছ রোপণ বাড়ানো জরুরি।"
বাবুই পাখি বিলুপ্তির পেছনের বৈজ্ঞানিক ও প্রাকৃতিক কারণ ব্যাখ্যা করে ব্রাহ্মণপাড়া উপজেলা কৃষি অফিসার কৃষিবিদ মো. আবদুল মতিন বলেন,
"বাবুই
পাখি কেবল প্রকৃতির সৌন্দর্যের প্রতীক নয়, এরা ফসলের ক্ষতিকারক
কীটপ্রত্যঙ্গ খেয়ে কৃষকের নানাবিধ উপকার করত। উঁচু তালগাছ কমে যাওয়া, জমিতে
অতিরিক্ত কীটনাশকের ব্যবহার এবং জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে বাবুই পাখির
বংশবৃদ্ধি ব্যাহত হচ্ছে। পরিবেশের ভারসাম্য রক্ষায় আমাদের বেশি করে তালগাছ
রোপণ করা এবং পাখির অভয়ারণ্য গড়ে তোলা দরকার।"
প্রকৃতির এই নিপুণ
শিল্পীকে টিকিয়ে রাখতে সরকারি-বেসরকারি উদ্যোগে অবিলম্বে তালগাছ রোপণ
অভিযান পরিচালনা এবং সচেতনতা বৃদ্ধির দাবি জানিয়েছেন উপজেলার সচেতন নাগরিক
সমাজ।
