জুলাই
অভ্যুত্থানে মানবতাবিরোধী অপরাধের মামলায় ফাঁসির দণ্ডপ্রাপ্ত সাবেক
প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাকে প্রত্যর্পণের অনুরোধ আবারও করেছে বাংলাদেশ
সরকার। দিল্লি সফরে পররাষ্ট্রমন্ত্রী খলিলুর রহমানের বৈঠকে তাকে ফেরত
চাওয়ার কথা বুধবার জানিয়েছে পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়।
তিনদিনের সফরে
দিল্লিতে যাওয়া খলিলুর রহমান ভারতের পররাষ্ট্রমন্ত্রী এস জয়শঙ্করের
পাশাপাশি জাতীয় নিরাপত্তা উপদেষ্টা অজিত দোভাল এবং পেট্রোলিয়াম ও প্রাকৃতিক
গ্যাস বিষয়ক মন্ত্রী হারদীপ সিংহ পুরির সঙ্গে বৈঠক করেছেন।
পররাষ্ট্র
মন্ত্রণালয়ের সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে বলা হয়, “আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালে
মৃত্যুদণ্ড পাওয়া শেখ হাসিনা এবং তার স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খান
কামালকে বাংলাদেশের কাছে প্রত্যর্পণের অনুরোধ পুনর্ব্যক্ত করেছে বাংলাদেশ
প্রতিনিধি দল।”
জুলাই অভ্যুত্থানে মানবতাবিরোধী অপরাধের ‘নির্দেশ ও
ইন্ধনদাতা’ হিসেবে অভিযুক্ত করে সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ও তার
সরকারের স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী কামালকে ১৭ নভেম্বর মৃত্যুদণ্ড দেয় ঢাকার
আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল।
আসামি প্রত্যর্পণ চুক্তির আওতায়
হাসিনাকে ফেরত দিতে দ্বিতীয়বারের মতো অনুরোধ জানিয়ে রায়ের চার দিন পর ২১
নভেম্বর ভারতের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে চিঠি পাঠায় বাংলাদেশ।
জুলাই অভ্যুত্থানে ২০২৪ সালের ৫ অগাস্ট ক্ষমতাচ্যুত হওয়ার পর থেকে ভারতেই অবস্থান করছেন শেখ হাসিনা ও কামাল।
ওই
অভ্যুত্থানে মানবতাবিরোধী অপরাধের অভিযোগে বিচারকাজ শুরুর পর হাসিনাকে
ফেরাতে ২০২৪ সালের ডিসেম্বরে ভারতকে প্রথমবার চিঠি পাঠিয়েছিল
অন্তর্র্বতীকালীন সরকার। এর মধ্যে বিচারকাজ শেষে রায় হয়ে গেলেও সেই চিঠির
জবাব দেয়নি ভারত সরকার।
চিঠির প্রাপ্তি স্বীকার বিষয়ে ভারতের পররাষ্ট্র
মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র রণধীর জয়সওয়াল বুধবার দিল্লিতে সাংবাদিকদের প্রশ্নের
উত্তরে বলেন, “হ্যাঁ, আমরা অনুরোধটি পেয়েছি এবং তা পর্যালোচনা করা হচ্ছে।”
শেখ হাসিনাকে ফেরানোর বিষয়ে দিল্লি থেকে কোনো জবাব না পাওয়ার মধ্যে আবারও অনুরোধ জানাল বাংলাদেশের নতুন নির্বাচিত সরকার।
অন্তর্র্বতীকালীন
সরকারের দেড় বছরে টানাপড়েন পেরিয়ে ঢাকায় নতুন সরকার গঠনের পর দুই দেশের
সম্পর্ক ‘মেরামতের’ চেষ্টার মধ্যে দিল্লি সফর করছেন পররাষ্ট্রমন্ত্রী
খলিলুর।
ভারতে নতুন সরকারের প্রথম উচ্চ পর্যায়ের সফরে পররাষ্ট্রমন্ত্রীর
সঙ্গী হয়েছেন প্রধানমন্ত্রীর পররাষ্ট্র বিষয়ক উপদেষ্টা হুমায়ুন কবিরও।
পররাষ্ট্র
মন্ত্রণালয় জানিয়েছে, মঙ্গলবার দিল্লিতে পৌঁছার পর রাতে ভারতের নিরাপত্তা
উপদেষ্টা অজিত দোভালের সঙ্গে বৈঠক হয়েছে বাংলাদেশ প্রতিনিধি দলের।
বুধবার
দুপুরের পর খলিলুর রহমানের সঙ্গে বৈঠকের খবর দেন ভারতের পররাষ্ট্রমন্ত্রী
জয়শঙ্কর। এরপর পেট্রোলিয়াম ও প্রাকৃতিক গ্যাসমন্ত্রী হারদীপ সিংহ পুরির
সঙ্গে বৈঠক হয় প্রতিনিধি দলের।
হাদি হত্যার আসামিদের ফেরানোর ‘ঐকমত্য’:
শেখ
হাসিনা ও কামালের প্রত্যর্পণের পাশাপাশি ইনকিলাব মঞ্চের প্রধান শরীফ ওসমান
হাদির হত্যা মামলার আসামিদের ফেরতের বিষয়েও আলোচনা হওয়ার কথা বলেছে
পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়।
সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে বলা হয়, “শরীফ ওসমান হাদির
সন্দেহভাজন খুনিদের গ্রেপ্তার করায় ভারত সরকারকে ধন্যবাদ দিয়েছেন ড. খলিল।
দুই দেশের মধ্যে প্রত্যর্পণ চুক্তিতে থাকা প্রক্রিয়া অনুযায়ী গ্রেপ্তার
ব্যক্তিদের বাংলাদেশে ফেরানোর বিষয়ে উভয়পক্ষ একমত হয়েছে।”
বাংলাদেশে
ভারতের ভিসা প্রক্রিয়া সহজের আলোচনা হওয়ার কথা জানিয়ে সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে
বলা হয়, “আলোচনায় পররাষ্ট্রমন্ত্রী জয়শঙ্কর বলেছেন, আগামী সপ্তাহগুলোতে
বাংলাদেশিদের জন্য ভারতীয় ভিসা প্রক্রিয়া সহজ করা হতে পারে। বিশেষ করে,
মেডিকেল ও বিজনেস ভিসা।”
ডিজেল ও সারের সরবরাহ বাড়াতে ভারতের প্রতি
অনুরোধ জানানোর কথা তুলে ধরে বিজ্ঞপ্তিতে বলা হয়, “সম্প্রতি ভারতের তরফে
বাংলাদেশকে ডিজেল সরবরাহ করায় মন্ত্রী হারদীপ সিংহ পুরিকে ধন্যবাদ
জানিয়েছেন ড. খলিল এবং ডিজেল ও সার সরবরাহের পরিমাণ বাড়ানোর জন্য অনুরোধ
করেছেন।
“ভারত এই অনুরোধ সহজে এবং অনুকূলভাবে বিবেচনা করবে বলে ইঙ্গিত দিয়েছেন মন্ত্রী পুরি।”
পররাষ্ট্র
মন্ত্রণালয় বলেছে, দিল্লির বৈঠকগুলোর আলোচনায় বিভিন্ন মাত্রায় দ্বিপক্ষীয়
সম্পর্ককে এগিয়ে নিয়ে যাওয়ার ওপর গুরুত্বারোপ করেছে উভয়পক্ষ। প্রধান প্রধান
আঞ্চলিক ও আন্তর্জাতিক ইসুতেও আলোচনা করেছেন তারা।
তবে, কি কি বিষয়ে
আলোচনা হয়েছে, তা খোলাসা না করে সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে বলা হয়, “ড. খলিল
বলেছেন, ‘বাংলাদেশ প্রথম’ নীতির আলোকে পররাষ্ট্রনীতি পরিচালনা করবে
প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের নেতৃত্বে সম্প্রতি নির্বাচিত নতুন সরকার এবং
তার ভিত্তি হবে পারস্পরিক আস্থা, সম্মান ও একে অপরের মঙ্গল।”
প্রধান
প্রধান দ্বিপক্ষীয় বিষয়গুলো নিয়ে পরবর্তী সময়ে মতবিনিময় সভা করার বিষয়ে
উভয়পক্ষের ‘একমত’ হওয়ার কথা বলা হয়েছে সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে।
এদিকে, ভারতের
পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের এক সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে পররাষ্ট্রমন্ত্রী জয়শঙ্করের
সঙ্গে পররাষ্ট্রমন্ত্রী খলিলের আলোচনার বিষয় তুলে ধরা হয়েছে। তবে, শেখ
হাসিনার প্রত্যর্পণ নিয়ে আলোচনার বিষয়ে সেখানে কিছু বলা হয়নি।
সেখানে
বলা হয়, বাংলাদেশের নতুন সরকারের সঙ্গে ‘গঠনমূলকভাবে আলোচনায় যুক্ত হতে’
এবং দ্বিপক্ষীয় সম্পর্ককে জোরদার করার বিষয়ে ভারতের ইচ্ছার কথা পুনরায়
বলেছেন পররাষ্ট্রমন্ত্রী জয়শঙ্কর।
ভারত বলছে, সংশ্লিষ্ট দ্বিপক্ষীয় ব্যবস্থাপনার অধীনে অংশীদারত্ব জোরদারের প্রস্তাবগুলো খতিয়ে দেখার বিষয়ে উভয়পক্ষ একমত হয়েছে।
“পরবর্তী
অফিসিয়াল বৈঠকগুলো দ্রুত সময়ের মধ্যে হতে পারে। পারস্পরিক স্বার্থ
সংশ্লিষ্ট আঞ্চলিক ও বৈশ্বিক ইস্যুতেও মতবিনিময় করেছে উভয়পক্ষ।”
