বাংলাদেশ
পরিবেশ আন্দোলন (বাপা) কুমিল্লা আঞ্চলিক শাখার পর্যবেক্ষণ থেকে অত্যন্ত
উদ্ধেগের সঙ্গে লক্ষ্য করছি যে, গত একদশকে কুমিল্লার বিভিন্ন স্থানে রাস্তা
প্রশস্তকরণ বা অন্য কোনো না কোনো অজুহাতে দিঘী, পুকুর, নদী দখল ও ভরাটের
অপকান্ড ও প্রচেষ্টা অব্যাহত ভাবে চলছে। তারমধ্যে সম্প্রাতিক সময়ে
জেলার অতি প্রাচীন ও ঐতিহ্যবাহী নগরীর রানীর দিঘীর পশ্চিমপাড়ের পুরোটায়
ভেতরের দিকে ৫/৬ ফুট পর্যন্ত ভরাট করা হয়েছে। এভাবে তার আগেও এক, দুই বার
নগরীর নানুয়াদিঘী, ধর্মসাগর, রানীর দিঘী, তালপুকুরের মতো কয়েকটি বড় বড়
জলাধারের ক্ষেত্রে রাস্তা প্রশস্তকরণের নামে চারদিকে আয়তনে ছোট ও ভরাট
করা হয়েছে। গত কিছুদিন ধরে নগরীর রাজবাড়ি পুকুরটিও একই প্রক্রিয়ায়
চারদিকের প্রশস্ততা কমিয়ে ভরাট ও দেয়াল নির্মাণের কাজ চলছে। এভাবে চলতে
থাকলে একসময় হয়তো দিঘী, পুকুরের অবশিষ্ট আর কিছুই খুঁেজ পাওয়া যাবে না।
বাংলাদেশ পরিবেশ আন্দোলন কুমিল্লা শাখার সভাপতি অধ্যাপক ডাঃ মোসলেহ উদ্দিন
আহমেদ ও সাধারণ সম্পাদক আলী আকবর মাসুম এ প্রেক্ষিতে গতকাল এক বিবৃতিতে
অবিলম্বে এসব অপকান্ডের বন্ধের দাবি ও প্রতিটি পুকুর, দিঘীর যথাযথ সুরক্ষার
দাবি জানিয়েছেন। তাঁরা একইসঙ্গে বলেন, জাতীয় নদী রক্ষা কমিশনের প্রকাশিত
তালিকা অনুযায়ী গোমতী ও ডাকাতিয়ার মতো জেলার প্রায় সবগুলো নদ-নদী সংরক্ষণ ও
তত্ত্বাবধানে প্রাতিষ্ঠানিক চরম ব্যর্থতা ও দুবৃত্তদের দখল, ভরাটে দিনে
দিনে নাব্যতাহীন হয়ে পড়েছে আমাদের নদীগুলো। অথচ সরকারের এই সংক্রান্ত আইন ও
দেশের উচ্চ আদালতের নিদের্শনা অনুযায়ী কোনো নদী, পুকুর, দিঘী ভরাট বা
দখল যেমন সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ, আবার তার অমান্য বা লঙ্ঘনের সাথে
সম্পৃক্ততার বিষয়টি শাস্তিযোগ্য অপরাধ বলে বিবেচিত। এদিক থেকে নদী, দিঘী,
পুকুর সহ এমন যেকোনো প্রকৃতিক সম্পদ বা জলাধারের দখল, ভরাট, বিনিষ্ট করা
সম্পূর্ণভাবে নিষিদ্ধ ছাড়াও এসবের যথাযথ তত্ত্বাবধানের ক্ষেত্রেও রয়েছে
বিশেষ নিদের্শনা।
বিবৃতিতে বলা হয়, পরিবেশবিদ ও পরিবেশবাদীসহ কয়েকটি
নাগরিক সংগঠন দেশের প্রকৃতি ও পরিবেশের উন্নতির অপরিহার্যতায় সর্বত্র
নানা কর্মসূচি পালন ও এসবের যথাযথ রক্ষার দাবি জানিয়ে আসছেন বার বার।
কুমিল্লা জেলাতেও বাংলাদেশ পরিবেশ আন্দোলন (বাপা) গত একদশকে বিভিন্ন
শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের তরুণ, যুবরাসহ নাগরিকদের সম্পৃক্ত, সচেতন ও
দায়িত্বশীল ভূমিকা পালনে নানা কর্মসূচি পালন করে আসছে । গণমাধ্যাম ও
সাংবাদিকদের মাধ্যমেও বিভিন্ন সময়ে প্রকাশিত হয়েছে দখল, দূষণ, ভরাটের
খবরাখবর। কুমিল্লা সিটি কর্পোরেশন, জেলা ও পুলিশ প্রশাসন, পরিবেশ অধিদপ্তর ও
বন বিভাগকে বাপার পর্যবেক্ষণ ও জেলার প্রকৃতি ও পরিবেশের ক্ষতিকর দিকগুলো ও
তার উন্নতির স্বার্থে নির্দিষ্ট কিছু প্রস্তাবনা একাধিক বার অনুষ্ঠানিক
ভাবে জানানো হয়েছে। তা সত্ত্বেও তার কোনো রূপ অগ্রগতি ও পরিস্থিতির উন্নতির
উল্লেখ করার মতো কোনো কিছু নেই বললেই চলে। নাগরীতে পরিবেশ অধিদপ্তরের
কার্যালয় সংলগ্ন পুকুরটিসহ নগর ও অন্যান্য শহরে একের পর এক পুকুর, দিঘী,
নদী দখল, ভরাট ও পরিবেশ দূষণের মতো বিষয়গুলো প্রকাশ্যে দৃশ্যমান থাকলেও এই
অধিদপ্তর কার্যতঃ এসব ক্ষেত্রে কোনো ব্যবস্থা নিতে পারছে না। জেলা ও
উপজেলা প্রশাসনও বছরের পর বছর নানা অজুহাত ও স্থানীয় ভাবে প্রশাসনের শীর্ষ
কর্মকর্তাগণ তাঁদের দায়িত্বের কার্যকাল পার করার কৌশল অবলম্বনের কারণে
পর্যায়ক্রমে পরিস্থিতির উন্নতি বা এসব ক্ষেত্রে কার্যক্রমের কোনো
ধারাবাহিকতাও নেই।
বাপার সভাপতি ও সম্পাদক বলেন, লালমাই পাহাড়ের
ক্ষেত্রেও পাহাড় কেটে স্থাপনা নির্মাণ ও পাহাড় ধ্বংস করে মাটি বেচা- কেনার
কারণে ভারসাম্যহীন হয়ে পড়েছে এ অঞ্চলের পরিবেশ ও প্রকৃতি। শব্দ ও বায়ূ
দূষণের মাত্রাও সব বয়সী মানুষের স্বাস্থ্যের জন্য মারাত্মক ক্ষতিকর
পর্যায়ে এসে পৌছেছে। পুরো নগরী জুড়ে বহুতল ভবণ নির্মাণে বাণিজ্যিক দিকটি
গুরুত্ব পেলেও দূষণ বৃদ্ধি ও পরিবেশের ক্ষতির দিকটি গুরুত্ব পায়নি একখনোই।
অদক্ষ চালক, অনুমোদনহীন অতিরিক্তি নানা ধরনের বাহন চলাচল, উচ্চ মাত্রার
মাইক, হর্ণ ব্যবহারের পরও দূষণ ও বিশৃঙ্খলা রোধে নগর কর্তৃপক্ষের প্রথম
থেকে উদাসীনতা ও অদূরদর্শী নগরায়নে পুরো পরিস্থিতিকে অত্যন্ত জটিল এক
অবস্থায় উপনিত করেছে। যা কুমিল্লা জেলার নগর-শহরে বসবাস করা কোনো একজন
নাগরিকের জন্যও স্বাস্থ্যসম্মত ও নিরাপদ বলে বলা যায় না। এমন দুঃসহ
পরিস্থিতির দিকটি সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিয়ে পরিবর্তিত রাজনৈতিক ও প্রশাসনিক
ব্যবস্থায় এসব ক্ষেত্রে সংশ্লিষ্ট প্রতিটি সরকারি কর্তৃপক্ষের প্রতি
বাংলাদেশ পরিবেশ আন্দোলন (বাপা) কুমিল্লা আঞ্চলিক শাখার পক্ষ থেকে অবিলম্বে
কার্যকর ব্যবস্থা গ্রহণের জোর দাবি জানানো হয়। একই সঙ্গে দল-মত নির্বিশেষে
নগর, শহরের সকল নাগরিকদেরও এব্যাপারে সহায়ক ও দায়িত্বশীল ভূমিকা পালনের
আহ্বান জানান বাপা নেতৃবৃন্দ।
