
অগ্নিবীণা কাব্যগ্রন্থটি
প্রথম প্রকাশ: ১৩২৯ বঙ্গাব্দ
(১৯৯২) কার্তিক মাস।
লেখা আছে-
* ৭নং প্রতাপ চাটুর্য্যরে লেন থেকে গ্রন্থকার কর্তৃক গ্রন্থটি মুদ্রিত ও প্রকাশিত
* গ্রন্থের আরও লেখা আছে প্রাপ্তিস্থান আর্য পাবলিশিং হাউস, কলেজ স্ট্রীট মার্কেট (দোতলায়)
* দাম এক টাকা
* গ্রন্থটিকে উৎসর্গ করা হয়েছে- ‘বাংলার অগ্নিযুগের আদি পুরোহিত সাগ্নিক বীর শ্রীবারীন্দ্র কুমার ঘোষ শ্রী শ্রীচরণার বিন্দেষু।
* সাগ্নিক অর্থ- বৈদিক নিয়মে প্রত্যক হোমকারী, অগ্নিহোত্রী। অর্থাৎ যজ্ঞকারী।
* নীচে লেখা আছে- তোমার অগ্নি-পূজারী ¯েœহ মহিমান্বিত শিষ্য-কাজী নজরুল ইসলাম।
* উৎসর্গ পত্রের দু’লাইন: অগ্নি-ঋষি। অগ্নি-বীণা তোমায় শুধু সাজে।
তাইত তোমার বহ্নি রাগেও বেদন-বেহাগ বাজে।
আশ্চর্যের বিষয়- তখনও তাদের মধ্যে প্রত্যক্ষ যোগাযোগ হয়নি।
* বারীন্দ্রকুমারের প্রাথমিক পরিচয়:
তিনি ঋষি অরবিন্দ ঘোষের ভাই। ভারতের বিপ্লববাদী আন্দোলনের অন্যতম নায়ক।
বিপ্লবে
বিশ্বাসী নজরুল নিজেকে বারীন্দ্রকুমারের ¯েœহ মহিমান্বিত শিষ্য বলে উল্লেখ
করে তাঁকেই প্রথম কাব্যগ্রন্থ ‘অগ্নিবীণা’ উৎসর্গ করেছেন।
* উল্লেখ্য, উৎসর্গ গানটি ‘অগ্নি-ঋষি’ নামে ১৩২৮ বঙ্গাব্দের (১৯২১) শ্রাবণ মাসের উপাসনায় আত্মপ্রকাশ করেছিল।
* অগ্নিবীণার প্রচ্ছদপটের পরিকল্পনাটি চিত্রকর স¤্রাট অবনীন্দ্রনাথ ঠাকুরের এবং এঁকেছেন তরুণ চিত্রশিল্পী শ্রীধীরেশ্বর সেন।
নামকরণের বিষয়ে উল্লেখ আছে-
*‘অগ্নিবীণা’ নামটি সম্ভবত রবীন্দ্রনাথের ‘গীতালি’র ৫৫নং কবিতাটি থেকে নেয়া হয়েছে। কবিতায় আছে-
‘অগ্নিবীণা বাজাও তুমি
কেমন করে।
আকাশ কাঁপে তারার আলোর
গানের ঘোরে।’
*
অগ্নিবীণা কাব্যে বারোটি কবিতা আছে।-প্রলয়োল্লাস, বিদ্রোহী,
রক্তস্বর-ধারিনী মা, আগমনী, ধূমকেতু, কামালপাশা, আনোয়ার পাশা, রণভেরী,
শত-ইল-আরব, খেয়াপারের তরণী, কোরবানী ও মোহররম।
এছাড়া উৎসর্গটিও কবিতায় লেখা
* প্রলয়োল্লাস কবিতাটি গ্রন্থের প্রথম কবিতা। কবিতাটি কুমিল্লায় অবস্থানকালীন লিখিত।
*
দ্বিতীয় কবিতাটি ‘বিদ্রোহী’। বিখ্যাত কবিতা। একটি কবিতা প্রকাশের পর কাজী
নজরুল ইসলাম ব্যাপকভাবে পরিচিতি লাভ করেন এবং সারস্বত সমাজে কবি হিসেবে
নন্দিত হন। নজরুল ১৯২১-এ নভেম্বর কুমিল্লায় দ্বিতীয়বার এলেন জাগরণী গান...
*
বিদ্রোহী কবিতাটি ১৯২১ খ্রি: ডিসেম্বর মাসের শেষ দিন রাত্রে কলকাতায়
লিখেন। উল্লেখ্য, কবি এই ডিসেম্বর শেষে কুমিল্লা থেকে কলকাতা গিয়েই কবিতাটি
লিখেছেন। এজন্য অনেকেই মনে করেন- এই কবিতাটির অন্তর্নিহিত তাৎপর্যের সঙ্গে
কুমিল্লার নানা ঘটনাপ্রবাহ ওতোপ্রোতভাবে জড়িত।
* ‘প্রলয়োল্লাস’ কবিতার প্রথমেই লেখা আছে-
‘তোরা সব জয়ধ্বনি কর,
তোরা সব জয়ধ্বনি কর,
ঐ নূতনের কেতন ওড়ে কালবোশেখীর ঝড়।’
‘বিদ্রোহী’ কবিতায় লিখলেন-
বলবীর
বল উন্নত মম শির
শির নেহারি ওই শিখর হিমাদ্রির
যবে উৎপীড়িতের ক্রন্দন রোল
আকাশে বাতাসে ধ্বনিরে নয়,
অত্যাচারীর খড়্গ কৃপাণ ভীম
রণভূমি রনিবেনা
বিদ্রোহী রণক্লান্ত
আমি সেইদিন হব শান্ত।।
*
বিস্তৃতভাবে বলার অবকাশ নেই, এতটুকু বলা যায়- অগ্নিবীণার কোনো কোনো কবিতায়
ব্রিটিশ সরকার দেশদ্রোহীতার গন্ধ অনুসন্ধান করে কাব্যগ্রন্থটিকে বাজায়েপ্ত
করতে চেয়েছিলেন। এ বিষয়ে এখন প্রচুর গোয়ান্দা রিপোর্টির কাগজ পাওয়া গেছে।
অবশ্যই গবেষণার দাবি রাখে।
কবি মন্তব্য:
‘আজ নিখিল বন্দী গ্রহে গৃহে ঐ
মাতৃ-মুক্তিকামী তরুণেরই অতৃপ্ত কাঁদন ফরিয়াদ করিয়া ফিরিতেছে। যেদিন এ
ক্রন্দন থামিবে সে কোন অচিন দেশে থাকিয়া গভীর তৃপ্তির হাসি হাসিব, জানিনা।
তখন হয়ত হারা মা আমার আমায় ‘তারার পানে চেয়ে চেয়ে’ ডাকিবেন। আমিও হয়ত
আসি,....
বলেছেন-‘আমার চোখ জলে ভরিয়া উঠিতেছে, আর কেন যেন মনে হইতেছে, ‘আসিবে সেদিন আসিবে।’
কবি
জাতির মুক্তিকামনাকে নিখিলের পটভূমিকায় উপলব্ধি করে শান্তি ও মুক্তির দিন
অবশ্যই আসবে, এই বিশ্বাসের কথা উচ্চারণ করেছেন। কাজী নজরুল ইসলামের এই
মুক্তিকামী পরবর্তী সাগ্নিক পুরুষটি কি আবির্ভূত হয়েছিলেন ?
অবশ্যই
আবির্ভূত হয়েছিলেন- তিনি হলেন হাজার বছরের শ্রেষ্ঠ বাঙালি, বাঙালি জাতির
মুক্তিদাতা, বাংলাদেশের স্থপতি, জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান।
কীভাবে ?
* এই ইতিহাস দীর্ঘ ও গবেষণা প্রসূত।
* কবি জানতেন একজন
মুক্তিকামী নেতার জন্ম হবে। আর নেতা জানতেন তাঁর আত্মগত জীবন পরিক্রমায়
একজন কবি পথ দেখিয়ে গেছেন। তাই তো ১৯৭২ খ্রি: ২৪ মে দু’জনের সাক্ষাৎ হলো এক
মহেন্দ্রক্ষণে।
* সে অনেক কথা, অনেক পূর্বাপর ইতিহাস।
* অগ্নিবীণার প্রত্যেকটি কবিতাই বীরত্বব্যঞ্জক মরণোম্মুখ জাতির প্রাণে নব উদ্দীপনার সঞ্চার করেছেন।
তাই
কাব্যগ্রন্থের কবিতাগুলো পড়তে পড়তে মনে হয়- প্রতিটি কবিতায় রয়েছে
বঙ্গবন্ধুর চেতনায় শানিতরূপের প্রতিভাস। এ এক অভিনব সংযোগ, অভিনব সম্মিলন।
‘আজ রণরঙ্গিনী জগৎমাতার দেখ
মহীরণ,
দশদিকে তাঁর দশহাতে বাজে
দশ প্রহরণ।
পদতলে লুটে মহিষাসুর,
মহামাতা ঐ সিংহ-বাহিনী জানায়
আজিকে বিশ্ববাসীকে-
শাশ্বত নহে দানব শক্তি
পায়ে পিশে যায় শির,
পশুর।।’
বঙ্গীয়
মুসলমান সাহিত্য পত্রিকা ১৩২৯ (১৯২২) মাঘ সংখ্যায় লিখেছে- ‘হিন্দু ও
মুসলমান শাস্ত্রসিন্ধুমন্থন করিয়া কবি যে সব অনুপম উপমা সংযোজন করিয়াছেন
তাহাতে মুগ্ধ হইতে হয়।’
*অগ্নিবীনার কবিতা জাতির মর্মমূলে আস্থাভাজন হয়ে অনুরণিত হয়েছে।
*অগ্নিবীণা অসাম্প্রদায়িক চেতনায় জাতিকে পথ দেখিয়েছে।
* অগ্নিবীণা স্বাধীনতার মূল মন্ত্রে দীক্ষিত করেছে।
* অগ্নিবীণা সর্বকালের মানবিক মূল্যবোধকে জাগরিত করেছে।
*
অগ্নিবীণায় যে শাণিতরূপ আদর্শিক চৈতন্যে উদ্বুদ্ধ করেছে, তারই পরিণতি
হিসেবে দেখতে পাই যোগ্য নেতার নেতৃত্ব, আত্মপ্রত্যয়ী জীবনবাজী রাখার
সর্বকালের মাথা উঁচু করা মহানায়ক।
সুতরাং অগ্নিবীণা কোনোকালের নির্ধারিত রক্ষা কবচ নয়-সর্বকালীন বাঙালি জাতির সংরক্ষিত সংবিধান।
*জয় হোক কবির অগ্নিবীণা
জয় হক বঙ্গবন্ধুর স্বপ্ন সাধনার বাংলাদেশের
জয় বাংলা। জয় বঙ্গবন্ধু।।
