
মানুষ
স্বল্পজীবী প্রাণী। আর প্রত্যেক সৃষ্টিরই ধ্বংস আছে। মানুষ তার নশ্বর
দেহের দ্বারা অবিনশ্বর কাজ করে জগতে প্রাতস্মরণীয় হতে পারে। স্কাউটের
প্রতিষ্ঠাতা লর্ড ব্যাডেন পাওয়েল বলেন তোমরা সকলে এমন কিছু করে পৃথিবী থেকে
বিদায় নিও যেন মৃত্যুর পরেও তোমাদের কথা লোকে স্মৃতিতে সোনার হরফে লিখে
রাখে।
মানব সমাজ উন্নয়নের জন্য দরকার মানসিক সচেতনতা আর আমরা খুঁজে পাই
না মানসিক সচেতনতা কিভাবে অর্জন করবো? লর্ড ব্যাডেন পাওয়েল এই সমস্যা
সমাধানে প্রতিষ্ঠা করলেন স্কাউটিং।
স্কাউট আন্দোলন কতগুলো মৌলিক বিষয়ের সমন্বয়ে প্রতিষ্ঠিত। তা হল স্কাউট প্রতিজ্ঞা, স্কাউট আইন, সালাম, চিহ্ন ও করমর্দন।
স্কাউট প্রতিজ্ঞা
আমি আমার আত্মমর্যাদার ওপর নির্ভর করে প্রতিজ্ঞা করছি যে-
- আল্লাহ্ ও আমার দেশের প্রতি কর্তব্য পালন করতে,
- সর্বদা অপরকে সাহায্য করতে
- স্কাউট আইন মেনে চলতে, আমি আমার যথাসাধ্য চেষ্টা করবো।
(অন্য ধর্মের অনুসারীগণ ‘আল্লাহ্’ শব্দের পরিবর্তে নিজ ধর্মীয় বিশ^াস মতে স্রষ্টার নাম উচ্চারণ করবে)।
একটু লক্ষ্য করলে স্কাউট প্রতিজ্ঞার কয়েকটি বাক্যাংশের প্রতি দৃষ্টি
নিবদ্ধ হয়। ‘আত্মমর্যাদা’, আল্লাহ্র প্রতি কর্তব্য’, ‘দেশের প্রতি
কর্তব্য’, ‘অপরকে সাহায্য’ এবং যথাসাধ্য চেষ্টা করা’- এগুলোকে ব্যাখ্যা
করলে দেখা যায়-
আত্মমর্যাদা
আত্মমর্যাদা একজন মানুষের একান্ত আপন
বিষয়। একজন মানুষের চরিত্রের সর্বাধিক গুরুত্বপূর্ণ বিষয়টিই হল
আত্মমর্যাদা। ছোট, বড়, ধনী সকল মানুষের মধ্যেই এই আত্মমর্যাদায় যে যত
বলীয়ান, সে তত উন্নত চরিত্রের অধিকারী। তাই একজন মানুষের কাছে আত্মমর্যাদা
সর্বাধিক পবিত্র ও নিজস্ব আমানত। আত্মমর্যাদা একজন মানুষের আচার আচরণকে
নিয়ন্ত্রণ করে। স্কাউটিংয়ে আত্মমর্যাদার অর্থ সৎ ও সত্যবাদী।
আল্লাহ্র প্রতি কর্তব্য পালন
আল্লাহ্র
প্রতি কর্তব্য কি? এই সম্পর্কে জানার জন্যই প্রথমে চিনতে হবে স্রষ্টাকে।
আর স্রষ্টাকে চিনতে হলে গভীরভাবে উপলব্ধি করতে হবে স্রষ্টার সৃষ্টিকে।
আকাশ, বাতাস, সাগর, পর্বত, গাছপালা, পশুপাখি, কীট-পতঙ্গ আমাদের চারপাশে
প্রকৃতির যা কিছু আছে সব কিছু স্রষ্টাই সৃষ্টি করেছেন মানুষের জন্য।
মানুষকে সৃষ্টি করেছেন সৃষ্টির সেরা জীব হিসেবে। একজন মানুষ হিসেবে তার
চিন্তার প্রসারতা, বুদ্ধিমত্তা ও অনুভূতি দিয়ে অনুধাবন করতে হবে। কেন তিনি
আমাদের সৃষ্টি করেছেন? নিশ্চয় এই উপলব্ধি জাগবে-সৃষ্টির একজন হিসেবে সমগ্র
সৃষ্টির কল্যাণ সাধন করা, বুদ্ধিমত্তার মাধ্যমে এর উন্নয়ন সাধন এবং সেই
সঙ্গে নিজের মনের প্রসারতা ঘটিয়ে অপরের প্রতি ভালোবাসা, শ্রদ্ধা ও
সহমর্মিতার মাধ্যমে সৃষ্টিকে ভালোবাসা এবং তার উৎকর্ষ সাধন করা একজন
মানুষের অন্যতম কর্তব্য। সৃষ্টিকে ভালোবাসার মাধ্যমে স্রষ্টাকে ভালোবাসা
যায়। এভাবে মানুষ এ বিষয়টি তখন উপলব্ধি করবে যখন তার মনে জেগে উঠবে
স্রষ্টার প্রতি গভীর কৃতজ্ঞাতা।
দেশের প্রতি কর্তব্য পালন
স্বাধীনতা
মানুষের জন্মগত অধিকার। যার ব্যপ্তি ব্যক্তি থেকে সমাজ ও জাতিতে মিশে আছে।
জাতির আবাসভূমি হল দেশ। ইসলামে মাতৃভূমিকে ভালোবাসা ইমানের অংশ হিসেবে
চিহ্নিত করা হয়েছে। সনাতন ধর্মে ‘‘জননী জন্মভূমি স্বর্গাদপি গড়িয়সী’’ এর
অর্থ- মা ও মাতৃভূমি স্বর্গের চেয়েও গর্বের বস্তু। দেশ ও জাতির প্রতি
ভালোবাসা যার যত গভীর সে তত দেশপ্রেমিক। এই দেশপ্রেমে উদ্বুদ্ধ হয়ে মানুষ
শাশ^তকাল থেকে অকাতরে হাসিমুখে নিজের জীবন পর্যন্ত বিসর্জন করেছেন। এরূপ
দেশপ্রেমিক ব্যক্তি দেশ ও জাতির গর্ব। যে জাতিতে বা দেশে দেশপ্রেমিক
মানুষের সংখ্যা যত বেশি, সে জাতি তত উন্নত।
একজন রোভার স্কাউট দেশের
প্রতি কর্তব্য পালনের মাধ্যমে সত্যিকারভাবে একজন দেশপ্রেমিক আদর্শ নাগরিক
হিসেবে নিজেকে গড়ে তুলতে সাহায্য করে।
সর্বদা অপরকে সাহায্য করা
স্রষ্টাকে
ভালোবাসতে হলে স্রষ্টার সৃষ্টিকে ভালবাসতে হয়। এরূপ ভালোবাসা ঐশ^রিক গুণ।
স্রষ্টার সৃষ্টির মধ্যে মানুষ শ্রেষ্ঠ। মানুষ মানুষকে ভালোবাসবে, একে
অপরের প্রয়োজনে এগিয়ে যাবে ও সাহায্য করবে। ‘‘মানুষ মানুষের জন্য’’ এটি
কেবলমাত্র চিরন্তন বাণী নয়, সভ্য মানুষের জন্য এটি একটি অঙ্গীকার বলা যেতে
পারে। মানুষ অপর মানুষের উপকার করবে, যার দ্বারা প্রস্ফুটিত হবে মানুষের
মানবতা। স্কাউট প্রতিজ্ঞায় তাই সর্বদা অপরকে সাহায্য করার কথা বলা হয়েছে।
যথাসাধ্য চেষ্টা করা
একটি
কাজ করতে গেলে নানা ধরনের বাধা-বিপত্তি দেখা দিতে পারে। ফলে আন্তরিকতা
থাকলেও অনেক সময় একজন যেভাবে কাজটি করতে চাচ্ছে, অবস্থার প্রেক্ষিতে সে সেই
কাজটি সুষ্ঠভাবে শেষ করতে পারে না। তবুও কাজটি সুন্দরভাবে শেষ করার জন্য
নিজের সাধ্যনুযায়ী আন্তরিকতা নিয়ে কাজটি শেষ করার উদ্যোগ গ্রহণ করতে হবে।
এরই অর্থ হল, যথাসাধ্য চেষ্টা করা।
স্কাউট আইন সাতটি
- স্কাউট আত্মমর্যাদায় বিশ^াসী।
- স্কাউট সকলের বন্ধু।
- স্কাউট বিনয়ী ও অনুগত।
- স্কাউট জীবের প্রতি সদয়।
- স্কাউট সদা প্রফুল্ল।
- স্কাউট মিতব্যয়ী।
- স্কাউট চিন্তা, কথা ও কাজে নির্মল।
স্কাউটিং
এর মাধ্যমে সহজে মানুষ তার ভেতরের সুপ্ত প্রতিভা বিকশিত করে ও মনুষ্যত্ব
অর্জনের মাধ্যমে সমাজ উন্নয়নে অন্যতম ভূমিকা পালন করতে পারে।
একটি শিশু
তার জন্মের পর থেকে প্রথমে তার পারিবারিক শিক্ষায় শিক্ষিত হয়। তারপর
পর্যায়ক্রমে স্কুল, কলেজ, বিশ্ববিদ্যালয় নির্দিষ্ট বই পড়ে থাকে। যা হাজার
বার মুখস্ত করলেও বাস্তব জ্ঞান প্রকৃতিগত ভাবে যে শিক্ষার প্রয়োজন তা লাভ
করে কম পরিমাণে। স্কাউটের প্রতিষ্ঠাতা স্কাউটিং শিক্ষাকে এমন একটি পন্থায়
পরিচালিত করেছেন যাতে সকল ছাত্র-ছাত্রী নিয়মিত পড়াশুনার পাশাপাশি জাতীয় ও
আন্তর্জাতিক জাম্বুরী, রোভার মুট, বেসিক কোর্স, মেট কোর্স, এ্যাডভান্স
কোর্স, হেলথ কোর্স, ফায়ার সার্ভিস কোর্স আবৃত্তি ও বিতর্ক কর্মশালা,
প্রকৃতি পর্যবেক্ষণ, প্রতিভা অন্বেষন প্রতিযোগীতা, মানবতার কল্যাণে
বৃক্ষরোপণ, টিকাদান ও স্বেছায় রক্তদান কর্মসূচী, লাইফ স্কীল বেসিক এডুকেশন
কোর্স, হজ¦ ক্যাম্পে হাজীদের সেবা দান, করোনা ভাইরাস ও ডেঙ্গু প্রতিরোধে
জনসচেতনতা তৈরি এ রকম প্রশিক্ষণ এ সেবামূলক কার্যক্রমের সাথে যাবে সকল
শিক্ষার্থীরা সম্পৃক্ত থাকতে পারে। তারা নিজের দক্ষতা বৃদ্ধি পাশাপাশি
নিজেদের মাঝে লুকিয়ে থাকা সুপ্ত প্রতিভা বিকাশের মাধ্যমে বাস্তবজ্ঞান ও
প্রকৃতিজ্ঞান সম্পর্কে ধারণা লাভ করে মানব সমাজ উন্নয়নে ভূমিকা রাখতে সক্ষম
হয়।
স্কাউটিং হচ্ছে বর্তমান সভ্যতার সংগ্রামের হাতিয়ার। স্কাউটিং
সম্প্রসারণের লক্ষ্যে এখন সারা পৃথিবীতে আলোড়ন সৃষ্টি হয়েছে। বিশ্বের
অধিকাংশ দেশে স্কাউটিং এখন পাঠ্যপুস্তকের মাধ্যমে সিলেবাসের সাথে সম্পৃক্ত
করে স্কুল কলেজ বিশ্ববিদ্যালয় স্কাউট দল বাধ্যতামূলক করা হয়েছে। কাব
স্কাউটের মূলমন্ত্র যথাসাধ্য চেষ্টা করা, স্কাউট মূলমন্ত্র হলো সদা
প্রস্তুত, রোভার স্কাউটদের মূলমন্ত্র হল সেবাদান করা। সেবামূলক কার্যক্রম
বাংলাদেশের স্কাউটরা অন্যান্য সংগঠনের তুলনায় অনেকাংশ এগিয়ে। প্রতি বছর
ঢাকা আশকোনায় হজ্জ্ব ক্যাম্পে শুধুমাত্র রোভার স্কাউটরা সম্মানিত হজ্জ্বে
যাওয়ার জন্য যাত্রীদের একমাস ব্যাপী সেবা প্রদান করে থাকেন। বর্তমানে
স্কাউট জীবন সম্পর্কে জেনে অনেকেই স্কাউটিং করতে আগ্রহী হয়ে উঠেছেন।
স্কাউটদের সংগ্রামী ও কর্মঠ জীবন সকলের কাছে প্রিয় ও সম্মানীয়। সুন্দর জীবন
গঠন ও আগামী সুন্দর পৃথিবীর জন্য স্কাউটরা দিন বদলে স্কাউটিং এই শ্লোগানকে
সামনে রেখে কাজ করে যাচ্ছে।
লেখক: প্রতিষ্ঠাতা অধ্যক্ষ, কুমিল্লা আইডিয়াল কলেজ।
