ই-পেপার ভিডিও ছবি বিজ্ঞাপন কুমিল্লার ইতিহাস ও ঐতিহ্য যোগাযোগ কুমিল্লার কাগজ পরিবার
রবিবাসরীয়........................
Published : Sunday, 5 June, 2022 at 12:00 AM, Update: 05.06.2022 12:30:40 AM
রবিবাসরীয়........................








‘মাখবো গায়ে ফুলের রেণু’
ছড়ার যাদুকর জহিরুল হক দুলালের ছড়ার বই-------
রবিবাসরীয়........................আনোয়ারুল হক ||
বলেছি, ছড়ার যাদুকর জহিরুল হক দুলাল। এবং তাঁর গ্রন্থের নামেও আছে প্রকৃতির সেরা উপহার ফুলের কৌস্তুরি সৌরভ। ‘মাখবো গায়ে ফুলের রেণু’- নারী পুরুষ নির্বিশেষে এই সময়ে এর চেয়ে মনোমুগ্ধকর বাঞ্ছিত প্রসাধন আর কী আছে জগতে ! অন্তত আমার কাছে তো নেই! আমাদের কালের, সবসময়ের প্রিয় ছাড়াকার তাঁর ছড়ার পরতে পরতে, শব্দে, পংক্তি বিন্যাসে এমন নিপুণ এবং ছন্দে এতই পারদর্শী যে, তিনি যখন লিখেন তখন তাঁর কলমের আঙুল থেকে শিশু হৃদয় কখনো সরে যায় না, নিরন্তর খেলা করে। পুরো ছড়ার অবয়বে মনে হয়, কোন চঞ্চলা বালিকার পায়ের ঘুংঘুর চলে বিমল উচ্চারণে, আগাগোড়া।
আমার এই বিশ্বাসী উপলব্ধি জহিরুল হক দুলালের উপর্যুক্ত ছড়া গ্রন্থটি হাতে নিয়ে প্রথমে এর নামে এবং তারপর ছড়াগুলো পড়তে পড়তে মনে হয়েছে । অন্যের কথা জানি না, শুধু নিজের কথা জানি, বালক বয়সে আমাদের ছড়ার কান তৈরি হয়েছে রবীন্দ্রনাথ, নজরুল, সত্যেন্দ্রনাথ দত্ত, সুকুমার রায় এঁদের ছড়া পাঠ করে, আর রূপকথার মন আকাশ-কুসুমে ভেলা ভাসিয়েছে ‘ঠাকুর মার ঝুলি’, ‘আরব্য রজনী’র রূপকথার গল্প পড়ে। অনুরক্ত, অনুরাগী, পোক্ত হয়েছি। ফলে হৃদ্য পাঠকের মন ভরানো, মন রাঙানোর কাজটি কাঁচা হাতের সহজ নয় কোন কালেই। কিন্তু এই কঠিন কাজটি জহিরুল হক দুলাল করে গেছেন, করে থাকেন অবলীলায়। তাঁর এই দক্ষতার স্বাদ আমাদের রসনাকে তৃপ্তি দিয়ে আসছে সত্তুরের দশক থেকে আজও। এবং তাঁর পাঠককেও।
এ কথা তো ঠিক, ছড়া তো কেবল ছড়া নয়। তার চেয়ে বেশি কিছু। এতে শিশুতোষ আনন্দ যেমন আছে, শাসক-শোসকের গায়ে জ্বালা ধরিয়ে দেওয়ার মতো হলুদ-মরিচের উপাদানও প্রয়োজনে থাকে ছড়ার গায়ে, যদি ছড়াকার সময় সমাজ সচেতন হয়ে থাকেন। বলাবাহুল্য, আলোচ্য ছড়াকার কেবল ছড়া আনন্দের জন্য লিখেন না, তিনি তাঁর সময়ের সচেতন রূপকারও বটে। আমাদের জানা আছে, ছড়াকার জহিরুল হক দুলাল বাংলাদেশের মহান স্বাধীনতার আগুনে সময়ে বেড়ে ওঠা সাহসী সন্তান। ‘ভীনদেশী এক দৈত্যের’ শাসন-শোষণ মুক্ত হবার ডাক দিয়েছিল যে ‘সোনার ছেলে’ যার নাম ‘শেখ মুজিবর’ তাঁর ডাকে যুদ্ধে যোগ দেওয়া বীর মুক্তিযোদ্ধা। ফলে তাঁর ছড়ার অস্তিত্বে সময়ের কালো দাগ লেগে থাকবে, তাতে কোন সন্দেহ নেই। যে কারণে এই গ্রন্থে কুড়িটি ছড়ার মধ্যে অধিকাংশ ছড়া শিশুতোষ হলেও একাধিক ছড়া (আদর আলী, দাম বেশি, বাঘ শিকার) বুদ্ধিদীপ্ত সময়ের ইংগিত বহন করে। মনে হতে পারে, এইসব ছড়ার অঙ্গ সৌষ্ঠব শুধু ছড়ার নুপুর বাজিয়ে গেল বুঝি। আসলে তা নয়, আমাদের অনভিপ্রেত, অপ্রত্যাশিত, অনাকঙ্ক্ষিত বিপরীত সময়ের ছাপ এইসব ছড়ার অন্তর থেকে ঝিলিক দিয়ে ঝাঁঝালো রোদের মতো ঝলসে ওঠে। নতুবা ‘আদর আলী (১ এবং ২) এমন বিপরীত আচরণ করে কেন ?
স্মর্তব্য, পত্রিকার পাতায় আমাদের রাজনীতিবিদদের যে বিপরীত আচরণ, কথাবার্তা প্রায়ই উঠে আসে তা লক্ষ করলেই আদর আলীকে চেনা যায় সহজেই। যে কারণে আদর আলী-
১. দুপুরের চড়া রোদে হাতে নিয়ে হাতে নিয়ে লন্ঠন
   ছুটে যায় চায়নিজে খাবে স্যুপ অন্থন। (পৃষ্ঠা-১৮)

শিক্ষিত লোক অশিক্ষিতের মতো আচরণ করে, যেখানে যা হবার, তা হয় না। যা বলার তা তারা বলে না। যেমন, আদর আলী-
২. লেখাপড়ায় চৌকোষ
    বি কম
    রেজালায় তেল দেয়
    ঘি কম। (পৃষ্ঠা- ১৯)

     ‘দাম বেশি’ এবং ‘বাঘ শিকার’ ছড়া দুটো শিশুতোষ বটে, কিন্তু এর অবয়বে আছে বর্তমান বাজার পরিস্থিতি এবং রাজনীতির অস্থি-কংকাল চিত্র। স্বাধীনতার পর থেকে মুনাফালোভী লুটেরাদের নিয়ন্ত্রিত বাজার পরিস্থিতি কোন সরকারেরই নিয়ন্ত্রণে নেই। এর দায়ও যেনো নেই কারো। যেমন-

চাল ডাল তেল গম / কপি মুলা শালগম
কিছুই যায় না ছোঁয়া / দাম বেশি।
...  ...
কারো যেন নেই দায় / চলে যাবো সাহারায়
পার হয়ে মহানন্দ / জাম্বেসি। এদেশে যাবে না থাকা / দাম বেশি।  (দাম বেশি, পৃষ্ঠা-২০)
     আর সবকিছুতে নির্বকার, আড্ডা, গাল-গপ্পো মারা বাঙালির ‘গুলতি দিয়ে বাঘ শিকার’ করা স্বভাবের এক শ্রেণির মানুষের প্রহসনের জীবন থেকে ছড়াকার ইংগিতে তুলে আনেন সময়ের সংবাদ। তার হদিস আড়ালে থাকে না। শাসক-শোষকের রাজতন্ত্র বিদেয় করে এদেশে গণতন্ত্র চালু হয়েছে বলা হয়। কিন্তু গণতন্ত্র কোথায় ? পাহাড়ে ? রূপকের বাঘ গুলতি দিয়ে মারার গল্প আছে বিস্তর, কিন্তু বাঘ নেই!  এই অবস্থায় কে হারে আর কে জেতে বলা যায় না। যেমন-

রাজ্য শাসন করবে কে আজ / মানবে রাজা কাহারে
এসব ভেবে করলো চালু / গণতন্ত্র পাহাড়ে।
এখন কিছুই যায় না বলা / কে জিতে আর কে হারে। (বাঘ শিকার, পৃষ্ঠা-২১)

ছড়াকার জহিরুল হক দুলাল অন্তরাত্মায় একজন বয়স্ক শিশু। মনে রাখা দরকার, গোমতী নদী বিধৌত এই কুমিল্লার মাটি জল হাওয়া পলিমাটিতে তিনি বেড়ে ওঠেছেন। ইচ্ছে হলেই গোমতীর জলে দুরন্ত দামাল সময়ে স্নাত হয়েছেন। এই জলে তাঁর ভাললাগার আপন জীবন জড়িয়ে আছে বিধায় ছড়ায় ছড়ায় স্বচ্ছ্ব সলিলা গোমতী আয়নার মতো তাঁকে ধারণ করে। জলের আয়নায় নিজেকে দেখাবার জন্যেই তিনি তাঁর আত্মজা দুরদানা, গুনগুনকে এর স্বাদ, গন্ধ নিতে, নদীর টাটকা ক্ষিরের মতো জলে নাইতে আহ্বান করে নিয়ে আসেন। ভালবাসার কী এক আকুল মায়ায় একধিক ছড়ায় প্রিয় গোমতী (নদীর গান, অপরূপা গোমতী, নদী) ফিরে আসে আমাদের পাতার কুটিরে। যেমন,

সুন্দরী গোমতী / শান্ত সুধীর
তার তীরে আমাদের / পাতার কুটির। (নদীর গান, পৃষ্ঠা- ০৮)

দুরদানা গুনগুন
এসো ভাই চলে / আমরা নাইতে যাবো / গোমতীর জলে।
...  ...
একটানা গান গেয়ে / পাখিগুলি চুপ
আমাদের গোমতী নদী / এতো অপরূপ। (অপরূপা গোমতী, পৃষ্ঠা-০৯)

     আমরা জানি, এই ছড়াকারের চোখ পাখির চোখের মতো জলজ প্রকৃতির এবং হৃদয় কবির কোমলতায় মোড়া ও মন আনন্দিত শিশুর মতো বৈচিত্র্যের। যে কারণে কখনো ডানা থাকলে ‘পরীর দেশে’ উড়ে যাওয়ার বাসনা তাঁর। ‘উদাস দুপুর’ এ ‘সবুজ গাঁয়ে’ হারিয়ে যেতে যেতে লাল ‘করমচা’ বনে পেয়ে যান আমাদের চিরকালের ঠাকুর মাকে। যার ঝুলিতে আমাদের কালে সবসময় গল্প থাকতো। যন্ত্র ও প্রযুক্তির যুগে আজ কোন শিশুর ঘরে দু:খজনক হলেও সত্য, ঠাকুর মার প্রবেশাধিকার নেই, আরব্যরজনী উধাও। কিন্তু ছড়াকারের ফিরে দেখা মন, ঠাকুর মাকে ছাড়া যে ছড়ার বয়ান শেষ হতেই পারে না। তাই তিনি জিজ্ঞেস করেন,

ও ঠাকুর মা ও ঠাকুর মা
তোমার ঝোলায় গল্প আছে ?
সিঁদুররাঙা আমের মতো
ঝুলছে তারা অল্প কাছে ?
...  ...
ও ঠাকুর মা ও ঠাকুর মা
অল্প সল্প গল্প আছে ?    (ঠাকুর মার ঝুলি, পৃষ্ঠা- ৬)

     শিশু তো মায়ের কাছে শিশুই। বয়স হলেও সে শিশু। দৃশ্যত মানুষ শরীরে বড় হয়। কেউ কেউ প্রকৃতির এই নিয়মকে মেনে নিলেও মনে মনে অনেকেই আছে, সে কখনও বড় হয় না। জহিরুল হক তেমনই একজন হার না মানা বয়সী ছড়াকার। তাঁর সবসময় ‘ইচ্ছে’ করে যদি পাখির মতো দুটি পাখা তাঁর থাকতো (আমার যদি) তাহলে সে মেঘের মতো উড়ে উড়ে, রঙিন ঘুড়ি যেমন, হাওয়ায় ভেসে ভেসে বেড়ায়, তেমনি তাঁর মন খেলতে খেলতে সন্ধ্যা হলে আকাশ থেকে নেমে আসতো মাটির মায়ায়। ছড়াকারের এই স্বপ্নের জগত আমাদের প্রতিটি শিশুর মন জুড়ে বাস করে সন্দেহ নেই। তাদের তুলতুলে শরীর ও মননে ফুলের রেণু মেখে তার অনুপম গন্ধ নিতে  এই গ্রন্থটি পাঠ জরুরি। প্রিয়পাঠ হোক ছড়ার এই বইটি আমাদের, যাদের ঘরে আছে ছোট থেকে বয়স্ক শিশুর বাস। কেননা, ছন্দ নিপুণ, শব্দ প্রেমিক, কোমল হৃদয় ছড়াকার জহিরুল হক দুলাল সকাল সন্ধ্যা ছড়া নিয়ে খেলেন।

ছড়া বুকে নিয়ে তিনি ঘুমান, ঘুম ভেঙে প্রতিদিন সকালে উঠে প্রার্থনার মতো মনে মনে বলেন,

সকালে উঠিয়া আমি মনে মনে বলি
সারাদিন আমি যেনো / ছড়া নিয়ে খেলি।
সারাদিন খেলি আমি / ছড়া নিয়ে হোলি
সকালে উঠিয়া আমি / মনে মনে বলি।  ( ছড়া নিয়ে, পৃষ্ঠা-২২)

     এমন নিষ্ঠাবান, হৃদয় সংবেদী ছড়াকারের ছড়াপাঠ থেকে, আনন্দের অবগাহন থেকে নিজেকে মুক্ত রাখা আমার অনুভবে, পড়ুয়াদের জন্য কঠিন। বিশ্বাস করি, আপনার আমার শিশুদের এইসব সরল আনন্দ বিলিয়ে দিতে ‘মাখবো গায়ে ফুলের রেণু’ ছড়া গ্রন্থটি হোক কচি-কাঁচা শিশুদের পাঠশালায় নিত্যপাঠ।

জহিরুল হক দুলালের ‘মাখবো গায়ে ফুলের রেণু’ গ্রন্থটির চমৎকার প্রচ্ছদ এঁকেছেন শিল্পী আইনুল হক মুন্না। প্রকাশক : রোকসানা ইসলাম দুলালী, দ্বিতীয় সংস্করণ এপ্রিল ২০২২, মূল্য : একশত পঞ্চাশ টাকা। মজার মজার ছড়াগুলো যে পাঠকপ্রিয়তা পাবে- গত দুই মাসে গ্রন্থটির দ্বিতীয় সংস্করণ প্রকাশে এটি সহজেই অনুমেয়। অগ্রজ ছড়াকার, কবি জহিরুল হক দুলালের জন্য আমাদের নিরন্তর শুভকামনা।

৩.৬.২০২২
বনশ্রী, রামপুরা, ঢাকা।


সৌন্দর্য
রবিবাসরীয়........................হাসিব উল ইসলাম ||
হেসিয়ড মতে, থিবিসে ক্যাডমাস আর হারমোনির বিয়ের সময়  মিউজেরা বর কনের সম্মানে গান গেয়েছিলেন। বিয়ের আসরে উপস্থিত দেবতারা সেই গানের একটি পঙক্তি তখুনি মুখে মুখে তুলে নেন: 'যাকিছু সুন্দর শুধু তা-ই ভালোবাসা হয়, যাকিছু অসুন্দর তা নয়। ' এই প্রবাদতুল্য চরণ থিয়োগনিস এবং ইউরিপিদিসসহ পরবর্তী কবিদের লেখায় বারবার এসেছে। প্রাচীন গ্রিসে অধিকাংশ ক্ষেত্রেই সৌন্দর্যের ধারণায় এই চরণ-ই ছিল সাধারণ অভিব্যক্তি। প্রকৃতপক্ষে সেই সময় গ্রীসে সৌন্দর্যের কোন ধরাবাঁধা লিখিত আদর্শ বা মানদণ্ড ছিল না। অন্তত পেরিক্লিসের সময় পর্যন্ত গ্রীকদের সত্যিকারের  নন্দনতত্ত্ব এবং সৌন্দর্য সম্পর্কিত সুসমন্ধ জ্ঞানের অভাব ছিল।
সৌন্দর্যকে সংশ্লিষ্ট অনান্য গুণের সাথে খুঁজে পাওয়াও কোন কাকতালীয় ব্যাপার নয়। যেমন, সৌন্দর্যের মূল্য নিরুপণের মানদণ্ডের প্রশ্নে ডেলফির ওরাকল বলেছিল : ' সবচেয়ে সুন্দর হচ্ছে সবচেয়ে ন্যায়পরায়ন। 'এমনকি গ্রীক শিল্পের স্বর্ণযুগেও সৌন্দর্যকে সবসময় পরিমিতি, সুষম সমন্বয়, এবং গঠনের সাথে সংশ্লিষ্ট করা হতো। কবিতায় গ্রীকদের সুপ্ত অবিশ্বাস ছিল। ব্যাপারটা স্পষ্ট  হয় মহামতি প্লেটোর কথায় : শিল্প এবং কবিতা (এবং ফলশ্রুতিতে সৌন্দর্য) চোখ আর মনের আনন্দের খোরাক হতে পারে, কিন্তু এসব সরাসরি সত্যের সাথে সংযুক্ত নয়। এ ব্যাপারটাও কোন কাকতাল নয় যে সৌন্দর্যের প্রসঙ্গকে প্রায়শই  ট্রয়ের যুদ্ধের সাথে জুড়ে দেওয়া হয়।
সৌন্দর্যের কোন সংজ্ঞা হোমারে খুঁজে পাওয়া যায় না; কিন্তু তা সত্ত্বেও, ইলিয়াডের এই কিংবদন্তি রচয়িতা ট্রয়ের যুদ্ধের একটি গুঢ় কারণ প্রদান করেন।   সোফিস্ট জর্জিয়াস তাঁর কলঙ্কে ভরা হেলেনের গুণকীর্তন  গ্রন্থে  হেলেনের অপ্রতিরোধ্য সৌন্দর্য -এর কথা বলেন। হেলেন ট্রয়ের যুদ্ধের কারণ হলেও তাঁর এই অপ্রতিরোধ্য সৌন্দর্য তাঁকে দায়মুক্তি দেয়।  ঝড়ের বেগে ট্রয় দখলের পর, মেনেলস যেই না তাঁর বিশ্বাসঘাতক স্ত্রীকে হত্যার জন্য তরবারি হাতে তুলে নেন, তখুনি হেলেনের সুন্দর  অনাবৃত  স্তনের ওপর তাঁর দৃষ্টি পড়ে, আর হাত অসাড় হয়ে যায়।

হেলেনের অনাবৃত স্তনের সৌন্দর্যসহ নারী-পুরুষের শরীরী আরো অনেক সৌন্দর্যের বিবরণ হোমারে পাওয়া যায়। তবে  একথা বলা যায় না যে হোমারের লেখায় সচেতন সৌন্দর্যবোধ আছে। একই কথা —তাৎপর্যপূর্ণভাবে স্যাফো বাদে — পরবর্তী সব গীতিকবিদের ক্ষেত্রেও প্রযোজ্য। তাঁদের কবিতায় সৌন্দর্যের থিমকে প্রাসঙ্গিক বলে মনে হয় না। কিন্তু, আমরা যদি সৌন্দর্যকে আধুনিক চোখ দিয়ে দেখি, আগেকার দিনের দৃষ্টিভঙ্গি আমরা পুরোপুরি বুঝতে পারবো না; যেরকমটা আমরা প্রায়ই করে থাকি বিভিন্ন যুগের ক্ষেত্রে যাকিছু সৌন্দর্যের নির্ভরযোগ্য এবং প্রকৃত ক্ল্যাসিকাল উপস্থাপন হিসেবে মনে করা হয় সেসব আসলে অতীতে আধুনিক দৃষ্টি ফেলে দেখার দরুণ সংকটাপন্ন অবস্থায়  ছিল। 


গ্রীক kalon শব্দটি  অনুচিতভাবেই সম্ভবত শুধুমাত্র সুন্দর হিসেবে অনূদিত হয়েছে। শব্দটি  আমাদের সতর্ক করে দেয় : সৌন্দর্য তা-ই যাকিছু আমাদেরকে আনন্দ দেয়, প্রশংসার উদ্রেক করে, অথবা দৃষ্টি কাড়ে। সুন্দর বস্তু হচ্ছে সেই বস্তু যা তার গঠনের গুণে আমাদের ইন্দ্রিয়সমূহকে, বিশেষ করে চক্ষু ও কর্ণকে, পুলকিত করে। কিন্তু শুধুমাত্র ইন্দ্রিয়গোচর বিষয়সমূহই কোন বস্তুর সৌন্দর্য প্রকাশক নিয়ামক নয়, যেমন মানব শরীরের ক্ষেত্রে তার মন এবং ব্যক্তিত্বের গুণাবলি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। এইসব গুণাবলি আমরা মনের চোখ দিয়ে দেখি, চর্মচক্ষু দিয়ে নয়।

এই বক্তব্যগুলোর ভিত্তিতে, আমরা বলতে পারি আগেকার দিনে সৌন্দর্য বলতে কি বোঝাত। সৌন্দর্য ছিল বিভিন্ন শিল্প এবং শিল্পের প্রকাশের সাথে গাঁথা : বন্দনা সংগীতের সৌন্দর্য প্রকাশিত হতো মহাবিশ্বের ঐক্যতানে, কবিতায় প্রকাশিত হতো মানুষের আনন্দে এবং মুগ্ধতায়, ভাস্কর্যে সৌন্দর্যের ব্যঞ্জনা ছিল বিভিন্ন অংগের যথাযথ মাপ এবং নির্মিতে, আর অলংকারশাস্ত্রে সঠিক ছন্দে। তখন সৌন্দর্যের সুসম্বদ্ধ লিখিত কোন আদর্শ বা মানদণ্ড ছিল না।
[উমবের্তো একোর On Beauty পুস্তকের প্রথম অধ্যায়ের প্রথম অংশ অবলম্বনে।]
লেখক: শিক্ষক, বাংলাদেশ আর্মি ইন্টারন্যাশনাল ইউনিভার্সিটি অভ সায়েন্স এন্ড টেকনোলজি, কুমিল্লা সেনানিবাস।