মানুষ ও প্রকৃতি ও পরিবেশ
Published : Sunday, 5 June, 2022 at 12:00 AM
মুহম্মদ শফিকুর রহমান ||
পরিবেশ
বলতে বোঝায় সমগ্র জীবজগৎ (মানুষকে বাদ দিয়ে) এবং প্রাকৃতিক পরিমণ্ডল, যাকে
আমরা বলি ঘধঃঁৎব বা প্রকৃতি। মাটি-জলাশয়, নদী-সাগর, বৃক্ষলতা-বন-বনানী,
পাহাড়-অরন্য, জীবজন্তু আর মাথার উপরে শূন্যে দিগন্ত বিস্তৃত নীলাকাশ -এ'
নিয়েই আমাদের পরিবেশ। বোবা প্রকৃতির অরণ্যভূমিই বিশ্বপ্রাণের মৌনমূক
ধাত্রী-মা আর মাটি হলো বিশ্বপ্রকৃতির প্রসূতি মায়ের সৃষ্টিশীল জঠরালয়। এক
সময় সৃষ্টির আদিতে পৃথিবী ছিল বন্ধ্যা-একটা নিষ্প্রাণ জড়পিণ্ড। কোনো
প্রাণের স্পন্দন ছিল না তখন । তারপর একসময় প্রাকৃতিক-নিয়মেই গজিয়ে উঠলো তৃণ
ও লতাগুল্ম, গাছপালা ও প্রাণীকূল । পৃথিবী ভরে গেল ফুল ও ফলের বিচিত্র্য
সম্ভাবে, আর গাছ-গাছালি-পাহাড়-অরণ্যে বিশাল সমারোহে। কত কোটি বছর পেরিয়ে
গেলো এভাবে। তার পূর্ব বিশ্ব প্রকৃতির আপন খেয়ালে পৃথিবীতে এলো প্রকৃতির
সর্বকনিষ্ঠ সন্তান এবং বিশ্বের সর্বশ্রেষ্ঠ বুদ্ধিমান জীব-মানুষ । আর এই
মনোমুগ্ধকর স্নিগ্ধ ১ আক্যক সৌন্দর্যস্নাত পাহাড়-পর্বত ঘেরা অরণ্যই ছিল
মানুষের আদি বসতি । এই স্নিগ্ধ শ্যামল, ছায়াশীতল শান্তির স্বর্গে মানুষ বাস
করতো নিরাপদে। পাহাড়, নদী-ঝর্নার কলগুঞ্জনে ও পাখীর কলকাকলিতে মুখরিত হতো
আকাশ-বাতাস-পুলকিত হতো মানুষের মন । বন্য প্রাণীরা ছিল মনের আদিম বাসিন্দা
এবং বনের পশু-পাখিরা বাস করতো স্বাধীনভাবে, অরণ্যের আড়ালে-আবডালে নিভৃত
প্রকৃতির সহজাত ভঙ্গিতে, স্বতঃস্ফুত মহিমায় । শত-সহস্র প্রজাতির নাম না
জানা পাখিরা গান গাইত আপন মনে।
সেই পশু-পাখিদের স্বাধীনতা ও নিরাপত্তা
আজ বিঘ্নিত। এদের অস্তিত্ব আজ বিপন্ন। কালের বিবর্তনে জন বিস্ফোরণের কারণে
মানুষের জীবনের তাগিদে কুঠারের আঘাত পড়লো সবুজ অরণ্যে। বনজঙ্গল, সাফ করে
মানুষ গড়ে তুললো বসতি রাস্তাঘাট, হাট-বাজার, শহর-বন্দর-নগর, লোকালয় ও
কল-কারখানা। ফলে এই যান্ত্রিক সভ্যতার যন্ত্রনায় আজ আর পাখির কিচির
মিচির,কুহু-কেকার কলকাকলিতে আমাদের ঘুম ভাঙ্গেনা, ঘুম ভাঙ্গেঁ যানবাহন ও
কলকারখানার ঘর্ঘর, ঝনঝন শব্দে। হারিয়ে গেছে সেই সব সোনালি দিন, যেদিন বাড়ির
আঙ্গিনায় গাছে পাতার আড়ালে নেচে নেচে ফুরফুর করে ঘুরে বেড়াত দোয়েল কোয়েল
ফিউে বুলবুলি । বাড়ি বাড়ি আম, জাম, পেপে, কলা ও কাঁঠালের বাগান আর নেই। নেই
পুকুর পাড়ে, ঝোপে ঝাড়ে, বাঁশ বাগানে ঝিঁ ঝিঁ পোকার ডাক আর রাতের আধারে
পদ্মদীঘিতে শতসহস্র জোনাকির আলো আজ শুধুই অতীতের স্মৃতি । ফলে বন ও বন্য
প্রাণিদের নিয়ে এতদিন যে প্রাকৃতিক ভারসাম্য বজায় ছিল তা আজ ধ্বংসের মুখে।
জনবিস্ফোরণের
কারণে আজকাল অরণ্যের মূল ভিত্তি গাছপালা যেভাবে উজাড় হয়ে যাচ্ছে, যেভাবে
ধ্বংস করা হচ্ছে বন-বনানী এবং যেভাবে অপ্রতিরোধ্য গতিতে কল-কারখানা গড়ে
উঠছে- এতে নিশ্চিহ্ন হয়ে যাচ্ছে পাখ-পাখালি, জন্তু-জানোয়ার ও সবুজ বনানী।
জনসংখ্যা ও জনবসতি বৃদ্ধির ফলে সীমিত প্রাকৃতিক সম্পদের উপর চাহিদাজনিত চাপ
পড়েছে প্রচন্ডভাবে। খাদ্য-বস্ত্র-বাসস্থান ও কর্মসংস্থান ইত্যাদির পরিমাণ
বর্ধিত জনসংখ্যার চেয়ে কম হবার ফলে ভূমিতে চাষের তীব্রতা, কৃত্রিম সার ও
কীটনাশক ইত্যাদির ব্যবহার মারাত্মক হারে বৃদ্ধি পাচ্ছে। এতে ক্রমাগত বিনষ্ট
হচ্ছে চাষযোগ্য জমির সঞ্জিবনী শক্তি, অপরদিকে নতুন নতুন বসতি আর
কল-কারখানা স্থাপনের মধ্য দিয়ে ক্রমশ শেষ হয়ে যাচ্ছে চাষযোগ্য জমি ও বনভূমি
। শিল্পজাত দ্রব্য ও পণ্য উৎপাদন তৈরীর কারখানার কালো ধোঁয়া, বিষাক্ত
গ্যাস ও বর্জ্য নির্গমনের পাশাপাশি রাসায়নিক শিল্পাঞ্চল থেকে প্রতিদিন নদী,
হ্রদ ও জলাশয়ে বিপুল পরিমাণ বিষাক্ত বর্জদ্রব্য মিশে আমাদের উদ্ভিদ, মাটি,
পানি, বাতাস ও প্রাণিজগতের উপর বিষক্রিয়ার সৃষ্টি করছে । ফলে প্রাকৃতিক
পরিবেশ হয়ে উঠছে ভারসাম্যহীন, দূষিত ও বসবাসের অযোগ্য। জনসংখ্যা বৃদ্ধির
কারণে বাংলাদেশে মুক্তাঞ্চল ও বনভূমির পরিমাণ অতি দ্রুত গতিতে সীমিত হয়ে
বাসস্থান ও চাষের জমির উপর ভীষণ চাপ পড়া জলাভূমি ভরাট করেও
আবাসস্থল-স্থাপনা ইত্যাদি নির্মিত হচ্ছে প্রতিনিয়ত। এতে জলাধার, জলভ উদ্ভিদ
ও জলজপ্রাণি বিশেষ করে মাছের অভয়ারণ্য দারুণভাবে বিঘ্নিত ও নিঃশেষ হয়ে
যাচ্ছে। ফলে মাছে-ভাতে বাঙালির মূল খাদ্য উপাদান দুটোতেই দিন দিন প্রচুর
ঘাটতি পরিলক্ষিত হচ্ছে। গ্রামপ্রধান কৃষি নির্ভর বাংলাদেশের জন্য এহেন
সংকটাপন্ন পরিস্থিতি কোন অবস্থাতেই কাম্য নয়।
অপরদিকে মানুষ তার
নিগৃহনির্মাণ, শিল্প কারখানার কাঁচামাল ও জ্বালানি কাঠের প্রয়োজনে প্রতিদিন
উজাড় করছে বনভূমি । জ্বালানি হিসেবে কাঠ কমলার প্রয়োজনে মানুষ অনেক সময়
অবৈধভাবে বনভূমিতে আগুন ধরিয়ে সংগ্রহ করে কাঠ কয়লা। এই প্রেক্ষাপটে এসব
উপযোগের চাহিদা বৃদ্ধির কারণে প্রতিদিনই কমে যাচ্ছে মুক্তভূমিও বনাঞ্চল।
ভারসাম্যমূলক প্রাকৃতিক পরিবেশ রক্ষার জন্য দেশে মোট আয়তন দ্বাভূখণ্ডের ২৫%
শতাংশ বনভূমি থাকা প্রয়োজন। বাংলাদেশে সরকারি হিসেব মতে বনভূমির পরিমাণ
১৬% শতাংশ ধরা থাকলেও বাস্তবে আছে নয় শতাংশ। জনসংখ্যা বৃদ্ধির চাপে প্রতি
বছর বন উজাড় হচ্ছে ৯:৪ শতাংশ পাহাড় কেটে বসতবাড়ি তৈরিতে প্রাকৃতিক ভারসাম্য
নষ্ট হচ্ছে। শহরের ভাসমান জনগোষ্ঠির কারণে এবং বিপুলসংখ্যক বস্তিবাসির
চাপেও পরিবেশ দুষিত হচ্ছে। ফলে ভূমিক্ষয়ের মাত্রা বাড়ছে, বনাঞ্চল ও ফসলি
জমি কমছে তথা বন্যা প্রতিরোধ ও ক্ষমতা হ্রাস পাচ্ছে এবং দেশের গড় তাপমাত্রা
ক্রমাগত বেড়েই চলেছে।
প্রাকৃতিক ও ভারসাম্য রক্ষার জন্য কমপক্ষে ২৫
শতাংশ বনভূমি থাকা প্রয়োজন হলেও বাংলাদেশ বিশ্বের সবচেয়ে কম বনভূমি
পরিবেষ্ঠিত দেশগুলোর মধ্যে একটি যেখানে বনভূমির হার মোট ভূমির মাত্র ৬.৭
শতাংশ। আইন প্রয়োগের ঘাটতির কারণে নির্বিচারে বন-ধ্বংশের ফলে প্রতি বছর
প্রায় ২০০০ হাজার হেক্টর বনভূমি উজার হয়ে যাচ্ছে। এর মাঝে সবচেয়ে বেশি
ক্ষতিগ্রস্থ শালবন প্রায় নিঃশেষ হবার পথে। এমনকি প্রত্যক্ষ তদারকি ও সঠিক
রক্ষণাবেক্ষণের অভাবে বাংলাদেশের মধ্যে প্রাকৃতিক দুর্যোগ ও ঘূর্ণিঝড়
প্রতিরোধে সক্ষম পৃথিবীর বৃহত্তম ম্যানগ্রোভ সুন্দরবন বনাঞ্চলে নির্বিচারে
চলছে বৃক্ষ নিধন। এছাড়া লবণাক্ততা বৃদ্ধি ও জলবায়ুর পরিবর্তনের কারণেও
ইতোমধ্যে সক্ষমতা হারাচ্ছে তথা হুমকির সম্মুখিন। বিশ্বব্যাপী নির্বিচারে
বনভূমি ধ্বংসের পাশাপাশি শিল্পোন্নত দেশগুলোর অনিয়ন্ত্রিত শিল্পায়নের
মাধ্যমে অবাধে কার্বন নিঃসরনের ফলে শুধু জলবায়ু পরিবর্তনই হয়নি, বিশ্বের
বিভিন্ন অঞ্চলের বন ও বন্যপ্রাণি হুমকির মুখে পড়েছে। এবং বিভিন্ন প্রজাতির
প্রাণিকুল আজ ধ্বংসের বিলুপ্তির পথে। শিল্পায়ন ও অর্থনৈতিক উন্নয়নের
স্বার্থে একের পর এক প্রাকৃতিক বনাঞ্চল উজাড় করে দেয়ার ফলে ক্রমশঃ
মাত্রবৃদ্ধি এবং অনিয়মিত বৃষ্টিপাতের জন্য পানি নির্ভর প্রধান খাদ্যশস্য ও
কৃষিপণ্য উৎপাদনে দক্ষিণ অনিষ্কয়তাজনিত নেতিবাচক প্রভাব পড়ছে।
বিশ্ব
গবেষণা ইনস্টিটিউট এর মতে বিশ্বের বনভূমি উজাড় হতে হতে প্রায় অর্ধেকে এসে
দাঁড়িয়েছে, ফলে বিশ্ব-পরিবেশ এখন হুমকির মুখে মানুষের বসবাসের উপযোগি
ভারসাম্যপূর্ণ পৃথিবীর অস্তিত্বের প্রয়োজনে গাছপালা-বৃক্ষরাজি অপরিহার্য।
বনবনানিসমৃদ্ধ অরণ্যানির বৃক্ষসমূহ -শুধুই নিসর্গ-প্রকৃতির শোভাবর্ধকই নয়,
তা মানুষের তথ্য, জীববৈচিত্র্যে অপরিহার্য অংশ। জন্ম থেকে মৃত্যু পর্যন্ত
মানুষের জীবনে বৃক্ষরাজির এই অনিবার্য ভূমিকা এমনই যে, বৃক্ষহীন পৃথিবীতে
প্রাণের অস্তিত্বই কল্পনা করা যায়না। অক্সিজেন দিয়ে গাছপালা কেবল আমাদের
জীবন রক্ষাই করেনা, প্রাকৃতিক ও জাগতিক ভারসাম্য রক্ষায় বৃক্ষ পালন করে
অভাবনীয় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা। দেশের অর্থনীতিতে যেমন বনাঞ্চলের ভূমিকা আছে
তেমনি আবহাওয়া-জলবায়ুসহ প্রাকৃতিক পরিবেশের ভারসাম্য রক্ষায় বনজ সম্পদের
প্রয়োজনীয়তা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। কিন্তু অতীব দুঃখের বিষয়, গত একশ বছরে
প্রাকৃতিক ও নৈসর্গিক ঐশ্বর্যে সমৃদ্ধ বাংলাদেশের বনাঞ্চল প্রায় উজাড় হয়ে
গেছে। উপরন্তু জনসংখ্যার নিয়ন্ত্রণহীন ক্রমবর্ধমান চাপ গ্রাম ও শহরাঞ্চলে
ব্যাপকহারে নির্বিচারে বৃক্ষনিধনের ঘটনা ঘটে চলেছে এবং অপরিকল্পিতভাবে
পাল্লা দিয়ে নগরায়নের ফলে ক্রমশ বহু এলাকা বৃক্ষহীন হিসেবে পরিগণিত হচ্ছে।
দেশের প্রধান প্রধান শহরগুলো অনেকটা বৃক্ষহীন ইটের স্তূপের আকার ধারণ
করেছে। নাগরিক জীবনে যন্ত্রযান ও কল-কারখানায় থেকে পরিত্রাণের উপযোগি
গাছ-গাছালির ছায়া শীতল স্নিগ্ধতা নগরজীবন থেকে যথারীতি হারিয়ে যেতে বসেছে।
তদুপরি আমাদের দেশে বর্মাঞ্চল পাহাড় সীমিত হয়ে আসার কারনে প্রাকৃতিক আজ
ধ্বংসের পথে। এই ভারসাম্য ফিরিয়ে আনতে হলে অবশ্যই সামাজিক, সতেনতা সৃষ্টির
মাধ্যমে বিপন্ন পরিবেশের ভয়াবহতা সম্পর্কে জনগণকে অবহিত করে বনায়নে
উদ্বুদ্ধ করতে হবে। সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারি থেকে শুরু করে দেশের শিক্ষিত
সচেতন জন প্রতিনিধি ও জনগোষ্ঠি পর্যন্ত এ দায়িত্ব আমাদের সকলের মানুষের
সৃষ্ট যন্ত্রসভ্যতার গোড়াপত্তন থেকেই চলছে প্রাকৃতিক পরিবেশের উপর মানুষের
নির্মম কুঠারাঘাত। ভোগলালসা চরিতার্থ করার জন্য ভোগবাদি বিচার বিবেচনাহীন
মানুষ উজাড়, করছে বনবনানি পাহাড়-অরণ্য, ধ্বংস করছে জীববৈচিত্র্য আর দূষিত
করছে জীবনের অপরিহার্য উপাদান পানি ও বায়ু। ভূবিজ্ঞানিদের মতে দেশে
অনাবৃষ্টি ও বহুল ব্যবহারজনিত কারণে সামগ্রিকভাবে দেশের ভূগর্ভস্থ পানির
স্তর দিনের পর দিন অতি দ্রুত নীচে নেমে যাচ্ছে। এই বিপর্যয় ও পর্যাপ্ত
পরিমাণে বনভূমি ও যথেষ্ট পরিমাণে গাছপালা না থাকারই ফল। এই প্রেক্ষাপটে
দেশের উত্তর ও উত্তর পশ্চিমাঞ্চলে অবস্থিত জেলাগুলোর আবহাওয়ায় অনেকদিন ধরেই
বিরূপ প্রতিক্রিয়ার সৃষ্টি হয়েছে। ফলে দিনের বেলায় দুঃসহ গরম আর রাতে
প্রচন্ড শীত অনুভূত হচ্ছে। পরিবেশ বিজ্ঞানিদের মতে, এ লক্ষণ মরুকরণ
প্রক্রিয়ার আশঙ্কাজনক পূর্বাভাস। এমতাবস্থায় প্রাকৃতিক ভারসাম্য বজায় রাখতে
হলে বৃক্ষরাজির ভূমিকা অপরিসীম। যেমন প্রস্বেদন-প্রক্রিয়া এবং বাষ্পীভবনের
মাধ্যমে বৃক্ষ আবহাওয়া মণ্ডলকে বিশুদ্ধ রাখে তেমনি জলীয় বাষ্প তোর করে
বাতাসের আর্দ্রতা বাড়িয়ে বায়ুমণ্ডলকে রাখে শীতল বৃক্ষকুলবাজি বৃষ্টি ঝরিয়ে
ভূমিতে পানির পরিমাণ বাড়ায় এবং মাটির জলধারণে সক্ষমতা সৃষ্টি করে। তাই
বৃক্ষ তথা বনভূমিকে গণ্য করা হয় বায়ুমণ্ডলের বিশুদ্ধকরণ ও শীতলিভবনের
অন্যতম অনুঘটক হিসেবে । এছাড়া গাছপালা মাটির উর্বরতাশক্তি যেমন বাড়ায়,
তেমনি মাটির ক্ষয়রোধ করে এবং ঝড়-ঝঞ্ঝা-বন্যা রোধেও পালন করে সহায়ক ভূমিকা।
নদী-সাগরের ছাপিয়ে আসা বন্যার তোড়-জৌড় আঘাতকে ঠেকায় বনভূমি। আর মাটির উপর
শীতল ছায়া বিছিয়ে দিয়ে ঠেকায় মরুকরণ। জীবন ও জীবিকার প্রশ্নে সবুজ
শ্যামলিমা এবং পরিবেশবান্ধব বিশ্বজগৎ শান্তিস্নিগ্ধ ও সুন্দর রাখার
প্রয়োজনে তথা প্রকৃতি ও জীবজগৎ সুরক্ষায় জনসচেতনতা সৃষ্টির লক্ষ্যে ১৯৭৩
সাল থেকে বিশ্বব্যাপী প্রতিবছর ৫ জুন বিশ্ব পরিবেশ দিবস হিসেবে পালিত হয়ে
আসছে। প্রতি বছরের মতো এবারও 'বিশ্ব পরিবেশ দিবস ২০২২ উপলক্ষ্যে প্রতিপতে
বিষয় হিসেবে আমাদের অঙ্গীকার হবে ধরিধীর পরিবেশ প্রতিবেশ এবং জীববৈচিত্র্য,
ও বন্যপ্রাণিকে সুরক্ষার মাধ্যমে বাসযোগ্য পৃথিবী গড়ে তোলার স্বপক্ষে
দেশের মানুষকে ব্যাপকভাবে সচেতন করে গড়ে তোলা। সুনির্দিষ্টভা দিবসের
তাৎপর্য হলো এর মাধ্যমে জীববৈচিত্র্য সংরক্ষণ, বন উজাড় বোধ করার মাধ্যমে
মরুকরণ ঠেকানো ও ভূমিক্ষয় কমানোর উপর গুরুত্ব প্রদান । কারণ ধন ও বন্য
প্রাণির সাথে মানুষের জীবন ও জীবিকার যেমন প্রত্যক্ষ যোগাযোগ তেমনি
বনরক্ষার সাথে জীববৈচিত্র্য ও পরিবেশ রক্ষা অঙ্গাঙ্গীভাবে জড়িত। মানুষ
প্রকৃতির সন্তান প্রকৃতির মাঝেই আমাদের জন্ম এবং বেড়ে উঠা। তাই প্রকৃতির
সাথে মানুষের জীবন অঙ্গাঙ্গীভাবে জড়িত। আমাদের মূল স্বত্ত্বা ও অস্তিত্বের
সাথে প্রকৃতি উৎপ্রোতভাবে সম্পৃক্ত। সুতরাং যেকোন মূল্যে প্রকৃতিকে ধ্বংসের
হাত থেকে রক্ষা করা আমাদের সকলেরই দায়িত্ব। বর্তমান বিশ্বে নগরায়ন ও
শিল্পায়ন সমৃদ্ধ দেশসমূহের বিষাক্ত শিল্পবর্জ্য ও বিষাক্ত গ্যাস এবং দূষিত
বায়ুদূষণের বিষক্রিয়ায় ফলে প্রকৃতি ও পরিবেশ ক্রমশ ধ্বংসের দিকে ধাবিত
হচ্ছে। যদিও বাংলাদেশসহ স্বল্পোন্নত ও উন্নয়নমুখি দেশ সমূহে কর্মসংস্থানের
জন্য শিল্পায়ন অতীব প্রয়োজন অথবা জরুরি হিসেবে গুরুত্ব পাবে যদি তা পুঁজি
বিনিয়োগের চেয়ে কর্মসংস্থান তথা বেকারত্ব নিরসন করেন জনশক্তির প্রয়োগ
হিসেবে প্রাধান্য পায়। প্রকৃতি ও সমাজযন্ত্রকে শোষন না করে, প্রকৃতিকে তার
স্বরূপ রেখে উন্নয়ন, শিল্পায়ন ও মানবতার বিকাশ তথা মানবিকতার মূলবোধকে
সমুন্নত রেখে এগিয়ে যাওয়াই হলো গণতন্ত্র, স্বচ্ছতা, দেশপ্রেমের নিবেদিত
স্বাধীনতার মূল্যবোধ ও প্রগতির মূলভিত্তি।