ই-পেপার ভিডিও ছবি বিজ্ঞাপন কুমিল্লার ইতিহাস ও ঐতিহ্য যোগাযোগ কুমিল্লার কাগজ পরিবার
সঙ্গীতজ্ঞ নজরুলের সূচনাপর্ব কুমিল্লা
Published : Thursday, 26 May, 2022 at 12:00 AM
সঙ্গীতজ্ঞ নজরুলের সূচনাপর্ব কুমিল্লাড. আলী হোসেন চৌধুরী ||
নজরুলের অন্যসব পরিচয়ের মধ্যে সঙ্গীতজ্ঞ নজরুল এ পরিচয়টিও অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। নজরুলের বহুমুখী সৃজনকর্মে বাংলা সঙ্গীতের ক্ষেত্রে তাঁরা উজ্জ্বলতর ভূমিকা ও অবিস্মরণীয় অবদান তাঁকে অমরতা দান করেছে। বাংলা সঙ্গীতের ইতিহাসের ধারাবাহিকতায় নজরুলের উপস্থিতি স্বতন্ত্র বৈশিষ্ট্য ও বৈচিত্র্যমণ্ডিত। নজরুল গানের মধ্য দিয়ে নিজেকে আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে নিয়ে আসেন। বাংলাগানের যে মৌল নান্দনিক ভিত্তি গড়ে গড়ে ওঠে সেই পঞ্চকবির একজন কাজী নজরুল ইসলাম। তাঁর গানে সুর, বাণী ও বিষয় বৈচিত্র্যে এক অনন্য উপমা। সম্পূর্ণ আলাদা, সম্পূর্ণ নতুন। তাঁর এ সঙ্গীতময় চরিত্রের সূচনাপর্ব কিংবা ভিত্তি বলা যেতে পারে কুমিল্লা।
কুমিল্লায় আসার আগে কোলকাতায় অবস্থানকালে তিনি কোলকাতায় কোনো কোনো বন্ধুমহলে সীমিত পর্যায়ে ঘরোয়া পরিবেশে গান পরিবেশন করেছেন বেশির ভাগই রবীন্দ্র সঙ্গীত।
কুমিল্লা এসেও প্রমীলাদের বাড়ি ও বসন্তকুমার মজুমদারের বাড়িতে ঘরোয়াভাবে রবীন্দ্রসঙ্গীত পরিবেশন করেছেন প্রথম প্রথম। এর আগে দৌলতপুরেও গান করেছেন। তাঁর গান শোনার জন্য সেখানে লোক জমায়েত হতো। পরবর্তী পর্যায়ে দেখা যায় তিনি কুমিল্লায় কংগ্রেস ও খিলাফতের জনসভায় প্রকাশে গায়করূপে আর্বিভূত হন। যার ফলে কুমিল্লাতেই তিনি যেমন প্রকাশ্যে গায়ক রূপে, তেমনি গীতিকার ও সুরকার রূপে আবির্ভূত হন। ২১ থেকে ২২ সালের মধ্যে কবি কুমিল্লায় ৮টি রাজনৈতিক বা গণসঙ্গীত রচনা করেন। তিনি এসবে সুরকার ও গায়ক। যদিও প্রথম গান লিখেন করাচিতে ‘বাজাও প্রভু বাজাও ঘন বাজাও’। এটা নজরুলের নতুন রূপ। কুমিল্লায় কবিকে পরিস্থিতি তৈরি করেছে গায়ক হতে, সুরকার হতে, গীতিকার হতে। যার ফলে পরবর্তীকালে এক আশ্চর্য সঙ্গীত স্রষ্টার প্রতিভাকে আমরা পাই।
নজরুলের সঙ্গীত নির্মাণের সূচনা গণসঙ্গীত তথা দেশচেতনামূলক হলেও পরে তা বিচিত্র ধারায় প্রবাহিত হয়েছে। সঙ্গীতের ক্ষেত্রটিকে নজরুল নবীনতার সজীবতায় নবধারার সূচনা করেন। তাঁর গানে যেমন সংগ্রামও চেতনা বিষয়ে গণসঙ্গীত আছে তেমনি আছে রাগ ভিত্তিক গান, আছে রোমান্টিক গান, লোকধারার গান, রঙ্গ ব্যঙ্গভরা গান, প্রকৃতি ও নানা বিষয়ে গান।সঙ্গীতজ্ঞ নজরুলের সূচনাপর্ব কুমিল্লাসঙ্গীতের বহুমুখী পথে প্রবেশের প্রাক্কালে কুমিল্লায় সঙ্গীত শিল্পিদের সান্নিধ্য তাঁকে সঙ্গীতের ক্ষেত্রে উদ্দীপিত করে ভীষণভাবে। কবি কুমিল্লায় প্রমীলাদের বাড়ি, বসন্ত মজুমদারের বাড়ি, ওস্তাদ মোহাম্মদ হোসেন খসরু’র (১৯০১-১৯৫৯) বাড়ি, শহীনদের বর্মণের বাড়ি, জানে আলম চৌধুরীর বাড়ি, উকিল অখিল দত্তের বাড়ি, অতীনরায়ের বাড়ি, ভিক্টোরিয়া কলেজ হোস্টেল, ইয়ংম্যানস ক্লাব এসব স্থানে গান করেছেন। ইয়ংম্যান্স ক্লাবে আড্ডা দিতেন শচীনদেব বর্মণ হিমাংশু দত্ত ছাড়াও পরবর্তী সময়ে আড্ডায় অংশ নিতেন প্রখ্যাত কবি সঞ্জয় ভট্টাচার্য, অজয় ভট্টাচার্য ও সুবোধ পুরকায়স্থ। এরা তিনজনই পরে প্রখ্যাত কবি ও গীতিকার।
মোহাম্মদ হোসেন খসরু নজরুলের চাইতে বয়সে ছোট হলেও সঙ্গীত ক্ষেত্রে তিনিছিলেন দীর্ঘ অভিজ্ঞ সঙ্গীত প্রতিভা। নজরুল প্রায়ই অংশ নিতেন মোহাম্মদ হোসেন খসরুর দারোগা বাড়ি’র গানের আসরে। এ আসরে যোগদানের ফলে সঙ্গীত বিষয়ে নজরুলের ধারণার ব্যাপ্তি ব্যাপকভাবে বৃদ্ধি পায়। ফলে উৎসাহ উদ্দীপনাও বৃদ্ধিপায়। তৈরি হয় সঙ্গীতের প্রতিপ্রবল আকর্ষণ। তাই উচ্চতর সঙ্গীত জ্ঞানে কবি আগ্রহী হয়ে ওঠেন। পরবর্তীকালে নজরুল কোলকাতায় ক্লাসিক্যাল সঙ্গীতে শিক্ষাগ্রহণ করেন। কোলকাতায় ওস্তাদ জমির উদ্দিন খানের কাছে নজরুল তালিম নেন। এছাড়া সুরেশ চক্রবর্তী, মাস্তান গামা, কাদের বক্স। মঞ্জু সাহেবের কাছেও গান শেখেন। যার ফলে সঙ্গীতজ্ঞ নজরুল হয়ে ওঠার পথ প্রশস্ত হয়। কুমিল্লার সঙ্গীত আসরগুলোতে থাকতেন জানে আলম চৌধুরী (জানু মিয়া) তিনি ছিলেন ক্লাসিক্যালে অভিজ্ঞ। মোহাম্মদ হোসেন খসরু কৈশোরেই রাগ রাগিণিতে অভিজ্ঞতা ও পারদর্শিতা অর্জন করেন। তাঁর কাছ থেকেই কবি প্রথম গানের  তালিম নেন। তিনি কবির গয়েকটি গানের সুরারোপ করেন।
দারোগা বাড়িতে গানের আসরেই সুরারোপ করেন কবির ‘বাদল কালো স্নিগ্ধা আমার’ গানটি এবং ‘সোহাগ’ নামে আরেকটি গান। পরবর্তী জীবনে মোহাম্মদ হোসেন খসরু লৌক্ষè’র মরিস সঙ্গীত কলেজে সহ অধ্যক্ষের দায়িত্ব পালন করেন। ১৯৬১ সালে পাকিস্তান সরকার তাঁকে ‘প্রাইড অব পারফরমেন্স’ সম্মানে ভূষিত করে। ১৯৭৮ সালে শিল্পকলা একাডেমি পদকে ভূষিত করে। তাঁর সঙ্গীত প্রতিভায় মুগ্ধ হয়ে বিশ^বরণ্যে সঙ্গীতজ্ঞ ওস্তাদ আলাউদ্দিন খাঁ তাঁকে ‘দেশমনি’ উপাধি দেন। তিনি দীর্ঘদিন ঢাকার বুলবুল ললিত কলা একাডেমি’র অধ্যক্ষের দায়িত্ব পালন করেন। সঙ্গীতজ্ঞ শচীনদেব বর্মণ সম্পর্কে এবং উপমহাদেশে তাঁর জনপ্রিয়তা সম্পর্কে সবর্জনবিদিত। পরে কোলকাতায় শচীনদেব বর্মণ নজরুলের ৪টি গানের রেকর্ড করেন। দারোগাবাড়ি গানের আসরে আরো যাঁরা আসতেন তাঁরা হলেন- সাহিত্যিক মোতাহের হোসেন চৌধুরী (১৯০৩-১৯৫৫) ও আলী নূর।
নজরুল জানে আলম চৌধুরী ও মোহাম্মদ হোসেন খসরুর সঙ্গীত জ্ঞানে অত্যন্ত মুগ্ধ হন। কোলকাতাতে মোহাম্মদ হোসেন খসরু ও শচীনদেব বর্মণের নজরুলের যোগাযোগ ছিল। কুমিল্লা ইয়ংম্যানস ক্লাবের আড্ডাতেও নজরুল কুমিল্লায় থাকলে অংশ নিতেন এখানে নজরুলের বয়সের অনেক ছোট হলেও কিশোর সঙ্গীত প্রতিভা পরবর্তীকালে কোলকাতার প্রখ্যাত সঙ্গীত পরিচালক যাঁর উপাধি ছিল ‘সুর সাগর’ তিনি হিমাংশু দত্ত (১৯০৭-১৯৪৪)। তাঁর সাথেও নজরুলের ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক গড়ে ওঠে। সঙ্গীতে উপরে উল্লিখিত সঙ্গীত ব্যক্তিত্বের  সান্নিধ্য ও প্রভাব নজরুল কে নব প্রাণশক্তিতে প্রত্যয়দীপ্ত করে তোলে।
এছাড়া দৌলতপুরে গ্রাম্যগায়ক জনার্দন দত্ত, সাদত আলী মাস্টার, জলধর মাস্টার ও গাবুদ্দিন। তাঁদের সাথে ঘনিষ্ঠতার কারণে লোকগান ও লোক সংস্কৃতি সম্পর্কে ও নজরুলের ব্যাপক ধারণা হয়।
নজরুলের সারাজীবন বিভিন্ন কর্মে জড়িত থাকলেও সঙ্গীত থেকে কখনো বিচ্ছিন্ন থাকেননি। কুমিল্লায় রচিত গণসঙ্গীতগুলো  ভাবে ভাষায় এবং উপস্থাপনায় নতুন ধারা তৈরি করে। এর আগে মুকুন্দ দাস (১৮৭৮-১৯৩৪), স্বদেশি আন্দোলনকে ভিত্তি করে সঙ্গীত সৃষ্টি করেন। এছাড়া দ্বিজেন্দ্র লাল রায় (১৮৬৩-১৯১৩), রজনীকান্ত সেন (১৮৬৫-১৯১০) রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর তাদের গানে দেশাত্মবোধ, প্রকৃতি ও গণ মানুষের কথা ছিল। তার চাইতে অন্যরকম ভাবদ্যোতনা, ছন্দ ও সুরের ধ্বনি সমষ্টি, তেজ ও উদ্দীপক বাণী বলিষ্ঠভাবে প্রকাশিত হয়েছে নজরুলের গানে। কুমিল্লা ও কুমিল্লার বাইরে রচিত গণ সঙ্গীতগুলোই তার প্রমাণ বহন করে।
সার্বিকভাবে একটা কথা বলা যায় কুমিল্লার সাঙ্গীতিক পরিবেশ, বিরজা সুন্দরী দেবী ও বসন্ত মজুমদারের বাড়িতে সাংস্কৃতিক বাতাবরণ কবিকে ঋদ্ধ করেছে, উদ্দীপিত করেছে সঙ্গীতজীবনের সূচনা পর্বটি সহায়ক হয়েছে। সঙ্গীত নজরুলের সূচনা পর্ব কুমিল্লায়, সঙ্গীত ভিত্তিটিও কুমিল্লায়।