
প্রভাষ আমিন ||
দু’দিন
বন্ধ থাকার পর নিউমার্কেট এবং সংলগ্ন এলাকার মার্কেটগুলো খুলেছে। খুললেও
আমার আশঙ্কা এই মার্কেট এলাকা জমে উঠতে সময় লাগবে। আবার কখন মারামারি লাগে
এই ভয়ে মানুষ সেখানে যেতে নিরুৎসাহিত হবে। সব মিলে এবারের ঈদে নিউমার্কেট
এলাকার ব্যবসায়ীরা তাদের প্রত্যাশিত ব্যবসা থেকে বঞ্চিত হবেন। করোনার কারণে
গত দুই বছর তারা ব্যবসা করতে পারেননি। গত দুই বছরের ক্ষতি পুষিয়ে নিতে
এবার তারা প্রস্তুতি নিয়েছিলেন জোরেশোরে। তবে সেই প্রস্তুতিতে বড় ধাক্কা
লাগলো সোমবার মধ্যরাত থেকে বুধবার গভীর রাত পর্যন্ত চলা সংঘর্ষ আর
অচলাবস্থায়। এই ঘটনায় ঢাকা কলেজের ছাত্রদের দায় নিশ্চয়ই আছে। তবে বড় দায়টা
আমি দেব ব্যবসায়ীদেরই।
নিউমার্কেটের দুই দোকানের কর্মচারির বাগবিতণ্ডা
থেকে এত বড় ক্ষতি হয়ে গেলো তাদের। সোমবার রাতেই যে সমস্যা মিটে যাওয়া উচিত
ছিল, ব্যবসায়ীদের আক্রমণাত্মক ভূমিকার কারণে বুধবার রাত পর্যন্ত গড়ালো।
বুধবার বিকেলে ব্যবসায়ীরা সাদা পতাকা উড়িয়েছেন, এটা যদি তারা সোমবার রাতেই
ওড়াতেন তাহলে এতকিছু হতো না। তাদের ঈদটাও ভালো কাটতো। নিউমার্কেট এলাকায়
মোট ২৯টি ছোট বড় মার্কেট আছে। মালিক, কর্মচারী মিলিয়ে লাখো মানুষের জীবিকা
নির্বাহ হয় এই মার্কেটগুলো থেকে। ঢাকা কলেজের ছাত্রদের সাথে সংঘর্ষে জড়ানোর
আগে, সাংবাদিকদের ওপর হামলা করার আগে, অ্যাম্বুলেন্স ভাঙার আগে
ব্যবসায়ীদের নিজেদের স্বার্থের কথা ভাবা উচিত ছিল।
তবে আগে হোক আর পরে
হোক নিউমার্কেট এলাকায় আবার জমজমাট বেচাকেনা হবে। ঢাকা কলেজের শিক্ষার্থীরা
আবার ক্লাস-পরীক্ষায় ব্যস্ত হয়ে যাবে। কিন্তু নাহিদ আর মুরসালিনের পরিবার
কোনোদিন এই সংঘর্ষের কথা ভুলতে পারবে না। এই ক্ষতি তাদের পরিবারের কোনোদিনই
পূরণ হবে না। দুই পক্ষের সংঘর্ষের ঘটনায় আহত নাহিদ মঙ্গলবার রাতেই মারা
গেছেন। আর মুরসালিন মারা গেছেন বৃহস্পতিবার ভোরে। নাহিদ ছিলেন এলিফ্যান্ট
রোড এলাকার একটি ক্যুরিয়ার সার্ভিসের ডেলিভারিম্যান। আর মুরসালিন ছিলেন নিউ
সুপার মার্কেটের একটি কাপড়ের দোকানের বিক্রয়কর্মী। দুজনই বয়সে তরুণ।
পরিবারের অনেক স্বপ্ন নিয়ে তারা স্বল্প বেতনের চাকরি দিয়ে জীবিকা নির্বাহ
করতেন। স্ত্রী মিতু আর এক ছেলে ও এক মেয়ে নিয়ে ছিল মুরসালিনের ছোট্ট সংসার।
আর পরিবারের বড় ছেলে নাহিদ বিয়ে করেছিলেন মাত্র সাত মাস আগে। তার স্ত্রী
ডালিয়ার হাত এখনও মেহেদি রাঙ্গা। তাতে লেখা, ‘আই লাভ ইউ নাহিদ।’ ডালিয়ার সব
ভালোবাসা আর স্বপ্ন নিয়ে চলে গেলেন নাহিদ। সবকিছু আবার স্বাভাবিক হবে
কিন্তু মিতু আর ডালিয়ার জীবন কীভাবে চলবে। স্বপ্ন দূরে থাক, এখন তো তাদের
বেঁচে থাকাই দায়। আমাদের সান্ত্বনা-সহানুভূতিতে তো তাদের পেট ভরবে না।
ঢাকা
কলেজের শিক্ষার্থী এবং নিউ মার্কেট এলাকার ব্যবসায়ীদের মধ্যে সমঝোতা
হয়েছে। কিন্তু সেখানে তিনদিন ধরে যা ঘটলো, তার অধিকাংশই ফৌজদারি অপরাধ।
দুজন মানুষের প্রাণহানী তো আছেই; হামলা, ভাংচুর, সাংবাদিকদের মারধোর,
অ্যাম্বুলেন্স ভাংচুর- সবগুলোই শাস্তিযোগ্য অপরাধ। আর সব অপরাধের জন্য
দায়ীরা যেন শাস্তি পায়। সমঝোতার আড়ালে যেন শাস্তিযোগ্য অপরাধ আড়াল না হয়ে
যায়।
অসংখ্য টিভি ক্যামেরা আর সিসিটিভির ফুটেজ বিশ্লেষণ করলেই অপরাধীদের
খুঁজে বের করা সম্ভব। যে দুই কর্মচারির বাগবিতন্ডায় এ ঘটনার শুরু, তারা
চিহ্নিতই। এক কর্মচারীর ডাকে মাস্তানি করতে ঢাকা কলেজের যারা গেলেন, তাদেরও
চিহ্নিত করা হয়েছে। এখন বাকি রইলো, ফুটেজ দেখে দেখে অন্য অপরাধীদের খুঁজে
বের করা। ব্যবসায়ী হোক, কর্মচারী হোক, ছাত্র হোক, মাস্তান হোক- সবাইকেই
আইনের আওতায় আনতে হবে। পুলিশের বিলম্ব এবং বাড়াবাড়ির জন্য দায়ীদেরও খুঁজে
বের করে জবাবদিহির আওতায় আনা জরুরি। কিন্তু অতীতে আমরা দেখেছি, এ ধরনের
ঘটনায় শেষ পর্যন্ত কোনও বিচার হয় না। আর বিচারহীনতার সংস্কৃতি আমাদের এক
ভয়ঙ্কর পরিস্থিতির দিকে নিয়ে যাচ্ছে।
নাহিদের মা তার ছেলের হত্যার
কোনও বিচার চান না। নাহিদের মা শোকবিহবল নার্গিস আক্তার সাংবাদিকদের
বলেছেন, ‘আমরা বিচার চাই না। নাহিদকে তো আর ফেরত পাব না। বিচার চেয়ে কী
হবে? বিচার চাইলেই তো আর বিচার পাব না। মামলা চালাতে টাকাপয়সা লাগে। এগুলো
করে লড়তে পারব না। মামলা করে কী করমু। এগুলো করলে কি আমার ছেলে ফেরত আসবে?’
নাহিদের মায়ের এই প্রশ্নের জবাব কি আমাদের কারো কাছে আছে?
একজন মা তার
সন্তান হত্যার বিচার চান না, এটা রাষ্ট্রের জন্য এক অশনি সংকেত। কদিন আগে
শাহজাহানপুরে দুর্বৃত্তের গুলিতে প্রাণ হারিয়েছেন আওয়ামী লীগ নেতা জাহিদুল
ইসলাম টিপু। সে সময় দুর্বৃত্তের গুলিতে প্রাণ হারান রিকশায় বসে থাকা নিরীহ
কলেজ ছাত্রী সামিয়া আফনান প্রীতি। সামিয়ার বাবাও তার কন্যা হত্যার বিচার
চাননি। নাহিদের মাও তার ছেলে হতার বিচার চান না। তাদের কারোই আসলে প্রচলিত
বিচার ব্যবস্থার ওপর আস্থা নেই। মামলা চালাতে টাকা লাগবে, বছরের পর বছর
আদালতের বারান্দায় ঘুরতে হবে। তারপরও সাক্ষীর অভাবে শেষ পর্যন্ত অপরাধী পার
পেয়ে যাবে। এটাই এখন বাংলাদেশের বিচার ব্যবস্থার ব্যাপারে মানুষের ধারণা।
এই ব্যবস্থা না বদলে আমরা একটা শর্টকাট বের করে নিয়েছিলাম। বিচারবহির্ভূত
কর্মকাণ্ড দ্রুত জনপ্রিয়তা পাচ্ছিল। কিন্তু একটা সভ্য, সুশীল, মানবিক
রাষ্ট্রের জন্য সেটা ছিল আত্মঘাতী প্রবণতা। বিচার বহির্ভূত তৎপরতা নয়,
মানুষ যেন বিচার ব্যবস্থার ওপর আস্থা ফিরে পায় তার ব্যবস্থা করতে হবে।
প্রীতি,
নাহিদ বা মুরসালিনের পরিবার যেন ন্যায়বিচার পায় তা নিশ্চিত করতে হবে।
তাদের পরিবার মামলা করতে না চাইলে, রাষ্ট্র তার বিচারের দায়িত্ব নিক।
কিন্তু ‘বিচার পাবো না, তাই বিচার চাইবো না’ এই ভয়ঙ্কর প্রবণতা থেকে যেন
আমরা বেরিয়ে আসতে পারি। আমরা ন্যায়বিচার চাই, আইনের শাসন চাই। কোনও অপরাধীই
যেন পার না পায়।
লেখক: হেড অব নিউজ, এটিএন নিউজ