
শান্তিরঞ্জন ভৌমিক ||
(পূর্বে প্রকাশের পর)
কুমিল্লা
ইউনাইটেড ব্যাংক অব ইন্ডিয়ায় (বর্তমান কান্দিরপাড়ের পূবালী ব্যাংক) হরিদাস
সেন মহাশয় চাকুরি করতেন। চিরকুমার ও কংগ্রেসী। তাঁর ভাই আশুতোষ সেন, তিনিও
চিরকুমার, আগরতলা দুর্গাচৌমুহনী এলাকায় বোনের বাসায় থাকতেন। তাঁর বোনের
পাশের বাসা আমার মেসোতাত বোনের। দু'পরিবারে খুবই সখ্যভাব। হরিদাস সেন-এর
বোনটি খুবই উদার মনের ও মাতৃস্বভাবের। তিনি বলতেন- 'ভারত স্বাধীনতায় আমারও
অবদান আছে। বলতাম- ‘আপনার কী অবদান?' তিনি গর্ব করে বলতেন- 'আমি ফয়জুন্নেছা
বালিকা বিদ্যালয়ে শান্তি-সুনীতির সহপাঠী ছিলাম, তাতে কম কী। আমরা হাসতাম ।
অথচ আজ অনুভব করি তাঁকে নিবিড়ভাবে জিজ্ঞাসা করে তখনকার ঘটনা,
শান্তি-সুনীতি বিষয় কিছুই জানতে চাইনি। হয়ত নতুন কোনো কথা বা তথ্য পাওয়া
যেত।
এখানে একটি কথা উল্লেখ করতে হয়। আগরতলায় অবস্থান করছি। শুনতে পেলাম
আমার কলেজের অধ্যক্ষ মহোদয় পরিবার পরিজনসহ অনেক কষ্ট স্বীকার করে অনেক
পাহাড়ী পথ অতিক্রম করে এসেছেন এবং শরণার্থী শিবিরে আছেন। খবর পেয়েই দেখা
করতে যাই। বিপদের সময় দেখা করতে গিয়েছি। এটাকে তিনি খুব বড় করে দেখলেন।
অনেক কথা হলো- সবই হতাশা ও অনিশ্চয়তার কথা। তিনি কলেজের ছাপানো লেটার পেড
নিয়ে এসেছেন, একটিতে আমার পরিচয়পত্র লিখে দিলেন ও দুটি কাগজে শুধু স্বাক্ষর
দিয়ে বললেন- 'যদি প্রয়োজন হয় তাহলে লিখে নিও। শুনেছি বিপদকালে একই গাছে
সাপ, পাখি, মানুষ, জন্তু সহাবস্থান করে হিংস্রতা পরিহার করে। আমার অধ্যক্ষ
অবশ্য কোনোকালেই নিষ্ঠুর ছিলেন না। তবে প্রশাসনিক কারণে এমনিতেই দূরত্ব
ছিল, আমরা সমীহ করতাম, না দেখা হলেই ভাল মনে করতাম। কিন্তু বিপদকালে মনে
হলো আমরা কত আপনজন, সমদুঃখী, সমভোগী, সমব্যথী। মনে হয়েছে মানুষের মাঝে আসল
একটি মানুষ বাস করে, তার খবর জানি না, পাই না। আমার অধ্যক্ষ সন্তোষভূষণ দাশ
(এস বি দাশ) সে সময় আমার কাছে নতুন মানুষ হিসেবে প্রতিভাত হলেন।
তখন
সমগ্র ভারতে আদমশুমারী কাজ শুরু হয়েছে। আশুতোষ সেন-এর বন্ধু ছিলেন অজিত
ভট্টাচার্য, তিনি ত্রিপুরা রাজ্যের সেনশাসের ডাইরেক্টর। সাময়িক ভাবে লোক
নিয়োগ করার দায়িত্ব তাঁর ক্ষমতার মধ্যে। আশুতোষবাবু একদিন সকালে আমাকে নিয়ে
অজিতবাবুর সরকারি বাসায় যান। আশুবাবুর উছিলায় ভালো জলযোগ হলো, তাঁদের
দুজনের মধ্যে নানা বিষয়ে কথাবার্তা হলো এবং একপর্যায় আমাকে কোনো কাজ দেয়া
যায় কী না কথা উঠালেন। অজিতবাবু ধৈর্য ধরে শুনলেন ও পরের দিন অফিসে যেতে
বললেন। আশুবাবু আমাকে নিয়ে পরের দিন অফিসে গেলেন। বাসা এবং অফিসের আচরণ
একরূপ নয়। অফিসের একটা শৃঙ্খলা আছে। দর্শনার্থী হিসেবে অপেক্ষা করতে হলো
এবং এক সময় ডাক পড়ল। গেলাম- অজিতবাবু 'প্রশাসক-অফিসার'। দুটি শব্দ সমমানের
বা সমার্থ হলেও লক্ষ করলাম অফিসের লোকজনের সঙ্গে যে আচরণ, দর্শনার্থীদের
সঙ্গে যে আচরণ, বন্ধু আশুবাবুর সঙ্গে অফিসে যে আচরণ একজন আইসিএস অফিসারের
কথায় এবং বাক্য প্রয়োগে খুবই প্রাসঙ্গিক ও সংক্ষিপ্ত। বললেন, ‘আশুবাবু, আমি
দুঃখিত। ত্রিপুরায় অনেক শিক্ষিত বেকার যুবক রয়েছে, তাদের ব্যাপারে
অগ্রাধিকার ভিত্তিতে নিয়োগ বিষয়টি বিবেচনায় আনা হয়েছে। জয় বাংলার লোক নিয়োগ
দেয়া যাবে না। আমি কোনো সহযোগিতা করতে পারছি না।' তিনি অন্য কাজে মন
দিলেন। আমরা নমস্কার জানিয়ে উঠে আসলাম। আশু বাবুকে এক কাপ চা খাওয়ার জন্য
আমন্ত্রণ জানালেন না। আমি অবাক ও বিব্রত হলেও আশুবাবু কিছুই মনে করলেন না।
আমাকে সান্ত্বনা না দিয়ে বরং দেশ প্রেমে অফিসারের সিদ্ধান্ত যে কত আন্তরিক এ
বিষয় নিয়ে দীর্ঘ বক্তৃতা দিলেন। ভাবলাম- এটাই হয়ত সঠিক মেসোতাত দু'ভাই
সুভাস ও পিযুষ বি এ পাশ করে বেকার। সুভাষ ২/১টি টিউশনি করে, শান্ত
স্বভাবের। পিযুষ একটু বেপোয়ারা, বেকার হয়েও পরিবারে সুখ সুবিধা একটু বেশি
দাবীদার এবং কর্তৃত্ব করার মানসিকতা প্রবল। পরিবারে উদ্বৃত্তভাবে আমরা
দু'জন আছি। তা তার পছন্দ নয়। আমরা না থাকলে পারিবারিক আরো স্বাচ্ছন্দ্য হতে
পারে। আমি প্রথম বুঝতে পারিনি। এর মধ্যে আমার স্কুল জীবনের বন্ধু
তেলিয়ামৃড়া থাকে সে খবর পেয়ে আমাদের নিতে এসেছিল, সে পি ডাবুতে চাকুরি করে।
মাসীমা আমার স্ত্রীকে কোথাও দিতে রাজী নন। আমি গেলাম ও সাতদিন পর ফিরে
এলাম। রাতে আমার স্ত্রী বলল, ‘আমাদের আর এখানে থাকা উচিত নয়। চল শরণার্থী
শিবিরে চলে যাই।'
বললাম 'কেন, কোনো কিছু কি হয়েছে, মাসীমা কিছু বলেছেন?'
যে আমতা আমতা করে বলল, 'না মাসীমা কিছু বলেননি। পিযুষ নানা কথা বলেছে, তা
অপমানকর । আমি সাত দিন পর এসেছি। একথা শুনে ঠান্ডা হয়ে গেলাম এবং নিজের
ব্যর্থতা আমাকে যেন বিষধর সাপের মত কামড় দিয়ে ধরল। পরের দিন এক ফাঁকে
মাসীমাকে বললাম- 'আমরা ক্যাম্পে চলে যাই। তিনি সব বুঝতে পারলেন। কঠিনভাবে
বললেন, 'তোর যেতে হলে যেখানে খুশি যেতে পারিস, বৌমা যাবেনা। আমি এখন কী
করব। তিনি বললেন, 'আমি মরি নাই, বোনের সন্তান আমার সন্তান আমি যেখানে
যেভাবে থাকি ও এভাবেই থাকবে। আমি কি একটা কথা বলতে যাব, তিনি ধমক দিয়ে
বললেন, 'একটি কথাও বলবি না এখান থেকে যা।' আজ ভাবি, আমার মাসীমা 'মাসী' বাদ
দিলে 'মা'। আমার জীবনের এক গর্বিত মহীয়সী মা।
(ক্রমশঃ)
লেখক: সাহিত্যিক, গবেষক ও সাবেক অধ্যাপক
মোবাইল: ০১৭১১-৩৪১৭৩৫