
শান্তিরঞ্জন ভৌমিক ||
(পূর্বে প্রকাশের পর)
এপ্রিলের
৯ তারিখ থেকে মে মাস পর্যন্ত বেকার ছিলাম। আমার মেসোতাতভাই দিলীপদা একসাথে
স্কুল জীবন কাটায়েছি এবং একই বছর (১৯৬১) মেট্রিক পাশ করেছি। তিনি আগরতলা
রাজবাড়ি কমপাউন্ডে টেলিগ্রাফ অফিসে চাকুরি করতেন। তিনি দৈনিক পাঁচ টাকা হাত
খরচ বাবদ আমাকে দিতেন । আমি সকালে টিফিন করে প্রথমে বিজয়নগর জয়বাংলা অফিসে
যেতাম, পরিচিত অপরিচিত লোকদের সঙ্গে কথা হতো। মুক্তিযুদ্ধের খবর কী, আদৌ
যুদ্ধ চলছে কী না, ভবিষ্যৎ কী এ সব নিয়ে আশা-নিরাশার কথা আলোচনা হতো। তারপর
চলে যেতাম কর্ণেল চৌমুহনীর জয়বাংলা অফিসে। সেখানে প্রায় একই ধরনের
কথাবার্তা এবং শরণার্থীদের জন্য কোনো সাহায্য পাওয়া যায় কীনা ইত্যাদি
খোঁজ-খবর নেয়া- এভাবে দুপুর পর্যন্ত সময় কেটে যেতো।
প্রসঙ্গত একটি
ঘটনার কথা বলছি এপ্রিলের প্রথম দিকে চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য ড.
এ আর মল্লিকসহ একদল শিক্ষক-কর্মচারী আগরতলায় চলে আসেন। অপরদিকে
রাঙ্গামাটির ডিসি জনাব এইচ টি ইমাম ও ব্রাহ্মণবাড়িয়ার এসডিও জনাব কাজী রকিব
উদ্দীন আহমদ সীমান্ত অতিক্রম করে আগরতলায় চলে আসেন। তাঁদেরকে সাময়িকভাবে
থাকার জন্য সিঙ্গারবিল পলিটেকনিক ইন্সটিটিউটে স্থান দেওয়া হয়। আগরতলায় তখন
বাসের টাউন সার্ভিস ছিল। বিকেলবেলা চার আনা দিয়ে সেখানে চলে যেতাম। সেখানে
আমার শিক্ষক ড. আনিসুজ্জামান সপরিবারে আছেন । একদিন হঠাৎ ড. ত্রিগুণা সেন
(প্রাক্তন শিক্ষামন্ত্রী) ও নন্দিনী সৎপতী, তথ্য ও বেতারের কেন্দ্রিয়
প্রতিমন্ত্রী এসে উপস্থিত। তাঁরা বাংলাদেশের বুদ্ধিজীবীদের সঙ্গে আলোচনা
করতে চান এবং তাৎক্ষণিকভাবে জনাব এইচ টি ইমামের নেতৃত্বে পলিটেকনিকেল
শিক্ষক পরিষদ কক্ষে সাক্ষাতের আয়োজন হয়। আমিও দৈবক্রমে উপস্থিত ছিলাম। ড.
ত্রিগুণা সেন তখন সত্তরোর্ধ স্মার্ট ও হাসি খুশি মজাদার ব্যক্তি। পরণে সাদা
ধুতি ও পাঞ্জাবী, মাথায় স্বাভাবিকভাবে একটিও চুল নেই । নন্দিনী সৎপতী
তাঁতের নীল রং এর শাড়ি পরেছেন, পায়ে সাধারণ সেন্ডেল, শান্ত ও ব্যক্তিত্বের
প্রতিভূ। সাংবাদিককেরা উপস্থিত। ড. সেন অনুরোধ করেলন একান্ত আলোচনা করতে
আগ্রহী, সাংবাদিকগণকে সহযোগিতা করার আহ্বান জানান । নমস্কার জানিয়ে তাঁরা
বের হয়ে গেলেন। প্রথমেই পরিচয় পর্ব। প্রথমেই ড. সেন ও নন্দিনী সৎপতী
নিজেদের পরিচয় দিলেন। পরে আমরা একে একে পরিচয় দিচ্ছি। যখনই প্রফেসর সৈয়দ
আলী আহসান নিজের পরিচয় দিলেন। ড. সেন বিস্ময়ের সাথে বলে উঠলেন- ণড়ঁ চৎড়ভ.
অষর অযংধহ, ঐড়ি ঈধহ ও নবষরবাব ঃযধঃ ুড়ঁ ধৎব যবৎব? সকলেই মাথা নিচু করে
থাকলাম। পরে পরিচয়ের পর সামগ্রিক বিষয়টি জানতে চাইলেন। জনাব এইচ টি ইমাম
সবিস্তারে বাস্তব চিত্রটি তুলে ধরলেন এবং বাংলাদেশের স্বাধীনতা যুদ্ধের
পক্ষে প্রচারের জন্য একটি পৃথক বেতার কেন্দ্র স্থাপনের অনুরোধ জানানো হয়।
মে
মাসের প্রথম দিকে অশোকবাবু বললেন, 'চল, আমরা শিক্ষামন্ত্রী শ্রীযুক্ত
কৃষ্ণপদ ভট্টাচার্য এর সঙ্গে দেখা করি। আমরা তো কলেজ শিক্ষক ছিলাম, যদি
তিনি আমাদের কোনো ব্যবস্থা করে দেন। তাই একদিন সকালে আখাউড়া রোডে মন্ত্রী
মহোদয়ের নিজস্ব বাসায় উপস্থিত হই। তখন তিনি অর্থ মন্ত্রণালয়েরও দায়িত্বে
আছেন । আমরা যখন তাঁর বাসায় পৌছি একজন পুলিশ এসে জানতে চাইল আমরা কে এবং কী
চাই। আমরা পরিচয় দিয়ে মন্ত্রী মহোদয়ের সাক্ষাৎ প্রার্থী এ অভিপ্রায় জানাই।
পুলিশ বাড়ির ভিতরে গেলো ও বের হয়ে জানাল 'মন্ত্রী মহোদয় স্নান সেরেছেন।
এখন পুজোর ঘরে যাবেন, আপনারা বাড়ির বারান্দায় দাঁড়ান, তিনি দেখা করবেন।
আমরা দাঁড়ালাম। তিনি ধুতি ও চাদর গায়ে খালি পায়ে চশমা চোখে পঞ্চাশোর্ধ
ব্যক্তিটি দুহাত জোড় করে নমস্কারের ভঙ্গিতে আমাদের সামনে দাঁড়ালেন। আমরা
বিনীতভাবে হাতজোড় করে প্রতি নমস্কার জানালাম। তাঁর তাড়া আছে। সংক্ষেপে
আমাদের কথা জানাতে বললেন । অশোকবাবু অত্যন্ত বিনয় ও নম্রভাবে আমাদের দৈন্য
অবস্থা তুলে ধরে কোনো ব্যবস্থা নেয়া যায় কীনা বিনীত অনুরোধ জানালেন।
মন্ত্রীমহোদয় ধৈর্য ধরে শুনলেন এবং বললেন- 'শরণার্থী বিষয়টি ভারতের এখন
জাতীয় সমস্যা এবং অত্যস্ত মানবিক দৃষ্টিতে কেন্দ্রিয় সরকার বিষয়টি দেখছেন
এবং কী করা যায় এনিয়ে শীঘ্রই সিদ্ধান্ত নিবেন। রাজ্য সরকারের এটা বিবেচ্য
বিষয় নয় বলেই আমার সম্পূর্ণ সহানুভূতি থাকা সত্ত্বেও এখন এই মুহূর্তে
আপনাদের জন্য কোনো কিছু করা আমার পক্ষে সম্ভব হচ্ছে না। আপনারা অপেক্ষা
করুন। কেন্দ্রিয় সরকার সহসাই করণীয় বিষয়ে রাজ্য সরকারকে কোনো নির্দেশ দিলে
আমার সঙ্গে যোগাযোগ করবেন। আমি বিষয়টি আন্তরিকতার সঙ্গে বিবেচনা করব।
নমস্কার ।' একথা বলেই তিনি ভিতরে চলে গেলেন। আমরা ফিরে এলাম। নিরাশ হয়ে নয়
আশ্বস্তও বলব না একটা অনাবিল তৃপ্তি নিয়ে। মাননীয় শিক্ষামন্ত্রী ধৈর্য ধরে
আমাদের কথা শুনেছেন। রাগঢাক না করে নির্মোহভাবে বাস্তব বিষয়টি জানিয়ে
দিলেন। ভালো লাগল দু'জনেরই। পরের কথা আগে বলে নেই। বাংলাদেশ স্বাধীন হওয়ার
পর অশোকবাবু ফিরে এসেছিলেন, ভিক্টোরিয়া কলেজে যোগদান করেছেন। অল্পদিন পর
আগরতলা চলে যান। তিনি এই শিক্ষামন্ত্রী শ্রীযুক্ত কৃষ্ণপদ ভট্টাচার্যের
সঙ্গে দেখা করেন। তিনি তখন মন্ত্রী নন। অশোকবাবুকে ঠিকই চিনে ফেলেন এবং
তাঁর সুপারিশে আগরতলা রামঠাকুর কলেজে সংস্কৃত বিভাগে চাকুরি পেয়ে যান
অশোকবাবু। এখনও অধ্যাপনা শেষ করে বাড়ি করে আগরতলায় বসবাস করছেন। ১৯৭২ সালে
অবিবাহিত ছিলেন, পরে বিয়ে করেন এবং সন্তান সন্ততির পিতা হয়েছেন। অশোকবাবুর
পর্ব এখানেই শেষ। তারপরও দুঃখের সাথে বলতে হয়। তিনি যখন আমার মেসোমশায়ের
বাসায় গিয়েছিলেন এবং চরম দুঃসময়ে দু'মাস সে বাসায় অবস্থান করেছিলেন,
পরবর্তিতে রামঠাকুর কলেজে যোগদান করে একদিনের জন্যও ঐ বাসায় যাননি ১ তাঁদের
সঙ্গে যোগাযোগও রাখেন নি। অথচ একই শহরে তিনি এবং মেসোমশায়ের পরিবার
দীর্ঘদিন অর্থাৎ এখনও বসবাস করছেন।
(ক্রমশঃ)
লেখক: সাহিত্যিক, গবেষক ও সাবেক অধ্যাপক
মোবাইল: ০১৭১১-৩৪১৭৩৫