সিন্ডিকেটের কব্জায় দ্রব্যমূল্যের বাজার
Published : Tuesday, 5 April, 2022 at 12:00 AM
সুধীর বরণ মাঝি ||
দ্রব্যমূল্যের
ঊর্ধ্বগতিতে জীবন আজ প্রায় অতিষ্ঠ, দিশাহারা, সংসারজীবন ও পারিবারিক জীবনে
তৈরি হয়েছে নানা সংকট। এই সংকট থেকে উত্তরণের জন্য অনেকেই জীবন থেকে
পালিয়ে বেড়াচ্ছেন আবার অনেকে ঋণের দায় থেকে মুক্তি পেতে আত্মহত্যার পথ বেছে
নিচ্ছেন।
দ্রব্যমূল্যের প্রতিদিনের এই ঊর্ধ্বগতিতে মনে হচ্ছে আমরা
যুদ্ধের বাজারে আছি। যুদ্ধের বাজারেও দ্রব্যমূল্যের এত ঊর্ধ্বগতি হয় না।
যতটুকু জানা গেছে, আমাদের মুক্তিযুদ্ধের সময়ও দ্রব্যমূল্যের ঊর্ধ্বগতি
হয়নি। বর্তমানে খোলাবাজারে প্রতিকেজি মোটা চালের মূল্য ৫০ ও খুচরা বাজারে
বিক্রি হচ্ছে ৫০ থেকে ৬৫ টাকায়। দফায় দফায় বাড়ছে চালসহ নিত্যপ্রয়োজনীয়
দ্রব্যের। এসবের মধ্য দিয়ে জনগণের প্রতি সরকারের দায়বদ্ধতার বিষয়টি
পরিষ্কার হয়ে ওঠে। দ্রব্যমূল্যের আর কতটা ঊর্ধ্বগতি হলে সরকার এসব
সিন্ডিকেটের বিরুদ্ধে শক্ত অবস্থান নেবে জিরো টলারেন্স নীতিতে?
দ্রব্যমূল্যের এই অসহনীয় অবস্থায় একটি গল্প মনে পড়ে গেল। এক দেশে এক সরকার
ছিল। ওই সরকার ধনী, মালিক শ্রেণি ও ব্যবসায়ীদের জন্য যা কিছু ভালো- সেটিই
করতেন। জনগণের আশা-আকাক্সক্ষার কোনো তোয়াক্কা করতেন না। জনগণ সরকারের এই
অনৈতিক কার্যক্রমের বিরুদ্ধে আন্দোলনে নামে এবং ওই সরকারকে ক্ষমতাচ্যুত
করে। পরবর্তী নির্বাচনে তাদের পছন্দের নেতাকে ভোটের মাধ্যমে ক্ষমতায় বসান।
দেশ এবার ভালোভাবেই চলছে। জনগণও বেশ খুশি। এখন ওই দেশের ব্যবসায়ী, মহাজন,
সুদিকারবারি ও মুনাফাকারী সিন্ডিকেট ব্যবসায়ীরা বিপাকে পড়ে যায়। আগের মতো
মুনাফা করতে পারছে না। তাই তারা নতুন কৌশল অবলম্বন করে এবং সব ব্যবসায়ী
মিলে সিন্ডিকেট গড়ে তোলে। নতুন কৌশল অবলম্বন করে ব্যবসায়ী সিন্ডিকেট নতুন
সরকারের সঙ্গে দেখা করে। তারা সরকারকে নানা প্রলোভন দেখা এবং প্রস্তাব দেয়-
আপনি আমাদের সঙ্গে থাকলে আমরা আপনার সরকারকে অনেক সুযোগ-সুবিধা দেব। সরকার
তাদের সরাসরি না বলে জানিয়ে দিল- আমরা ভেবে দেখি, আপনারা আরেকদিন আসুন।
ব্যবসায়ী সিন্ডিকেট যেদিন সরকারের সঙ্গে দেখা করল, এর কয়েকদিন পর তারা
চালসহ সব খাদ্যদ্রব্য কেজিপ্রতি দুই টাকা বাড়িয়ে দিল। জনগণ এতে ক্ষিপ্ত হয়ে
উঠল। তারা সরকারের সঙ্গে দেখা করল। সরকার তাদের আশ্বাস দিয়ে বলল- ঠিক আছে,
বিষয়টি দেখছি। পরদিন তিনি ব্যবসায়ীদের ডাকলেন। ব্যবসায়ীরা বলল- ঠিক আছে,
আমরা কেজিপ্রতি এক টাকা কমিয়ে দিই। সরকার বলল- না, আপনারা কেজিপ্রতি আরও
সাত টাকা বাড়িয়ে দিন। সরকারের এই প্রস্তাব শুনে খুশিতে ব্যবসায়ীদের চোখ
কপালে উঠে গেল। তারা মহাখুশি। তারা যেখানে কমানোর প্রস্তাব করল, সরকার
সেখানে তাদের আরও সাত টাকা বাড়িয়ে দিল। পরদিন চাল, ডাল, তেলসহ অন্যান্য
খাদ্যদ্রব্যের মূল্য কেজিপ্রতি সাত টাকা বেড়ে গেল। এবার জনগণ আরও ক্ষিপ্ত
হয়ে গেল এবং সরকারের সঙ্গে দেখা করল। দেখা করে সরকারের আশ্বাস নিয়ে ফিরে
এল। পরদিন সরকার ব্যবসায়ী সিন্ডিকেটকে ডেকে বলল দ্রব্যমূল্য কেজিপ্রতি দুই
টাকা কমিয়ে দিতে। ব্যবসায়ীরা সরকারের কথামতো দুই টাকা কমিয়ে দিয়ে মিডিয়ায়
প্রচার করে দিল নিত্যপ্রয়োজনীয় দ্রব্যমূল্য এখন নিয়ন্ত্রণে। জনগণও খুশি হল।
কেজিপ্রতি দুই টাকা কমিয়ে দিয়েছে। আমরা দ্রব্যমূল্যের এ রকম নিয়ন্ত্রণ চাই
না। এভাবে দ্রব্যমূল্যের এমন ঊর্ধ্বগতি আর নিয়ন্ত্রণ খেলা আমরা চাই না।
আমরা চাই সামাজিক ও অর্থনৈতিক ন্যায়বিচার। ২০ টাকা বৃদ্ধি করে তিন টাকা
কমানো- এটি দ্রব্যমূল্য নিয়ন্ত্রণের মধ্যে পড়ে না। এভাবে নিয়ন্ত্রণের মধ্য
দিয়ে অর্থনীতি সঠিক পথে চলতে এবং দেশের অর্থনীতিও মজবুত ভিতের ওপর দাঁড়াতে
পারে না, বরং এটি জনগণকে শোষণের একটি কৌশল মাত্র। সরকার যদি দ্রব্যমূল্যের
ঊর্ধ্বগতি রোধ করতে ব্যর্থ হয়, তা হলে আগামী নির্বাচনে জনগণ এই সরকার থেকে
মুখ ফিরিয়ে নেবে। আমরা চাই, সরকার দ্রব্যমূল্যের ঊর্ধ্বগতি কঠোরহস্তে দমন
করবে। সরকার না চাইলে কোনো কিছুই রাষ্ট্রে টিকে থাকতে পারে না। চালসহ
নিত্যপ্রয়োজনীয় দ্রব্য নিয়ে সিন্ডিকেটের চালবাজির কাছে সরকারের সব অর্জন
ভূলণ্ঠিত- তা কোনোভাবেই কাম্য হতে পারে না। আমরা চাই, সরকার আমাদের মতো
সাধারণ জনগণের কথা চিন্তা করে অতিদ্রুত সিন্ডিকেটের বিরুদ্ধে কার্যকর
পদক্ষেপ প্রহণ করবে। আমরা চাই, জনগণের আশা-আকাক্সক্ষার বাস্তবায়নের মধ্য
দিয়ে আমাদের প্রাণের বাংলাদেশ সোনার বাংলায় গড়ে উঠবে।
সুধীর বরণ মাঝি : হাইমচর, চাঁদপুর