ই-পেপার ভিডিও ছবি বিজ্ঞাপন কুমিল্লার ইতিহাস ও ঐতিহ্য যোগাযোগ কুমিল্লার কাগজ পরিবার
বাংলা ভাষার উদ্ভব, ৫২-এর ভাষা আন্দোলন এবং বাংলা ভাষার ভবিষ্যৎ
Published : Tuesday, 1 February, 2022 at 12:00 AM
বাংলা ভাষার উদ্ভব, ৫২-এর ভাষা আন্দোলন এবং বাংলা ভাষার ভবিষ্যৎশান্তিরঞ্জন ভৌমিক ||
“বাংলা ভাষার উদ্ভব”
ভাষা ঈশ্বরের দান। মানুষ সাধনা করে ঈশ্বরপ্রদত্ত দানগুলো যেভাবে আবিষ্কার করেছে তন্মধ্যে ভাষা মানুষের শ্রেষ্ঠতম আবিষ্কার, শ্রেষ্ঠতম জন্মগত ও মৌলিক অধিকার। ভাষা মানুষকে বাঁচিয়ে রাখে, তার অস্তিত্বকে বিঘোষিত করে। কবে, কখন, কিভাবে ভাষার মৌলিক রূপ লাভ করেছে-তার ইতিহাস জানা নেই। ভাষাবিজ্ঞানীরা খ্রীষ্টের জন্মের পাঁচ হাজার বৎসর পূর্বে পৃথিবীতে মৌলিক ভাষার রূপ পরিগৃহীত হয়েছে বলে অনুমান করে থাকেন এবং এ ভাষাকে নামকরণ করেন ইন্দো-ইউরোপীয়ভাষা। জ্যামিতিক হারে মানুষের সংখ্যাবৃদ্ধির ফলে জীবিকা নির্বাহের জন্য, প্রাকৃতিক দুর্যোগের কারণে, নিজেদের মধ্যে দ্বন্দ্বের ফলে বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়ে; তার ফলে ভাষার ভিন্নতা সৃষ্টি হয়। তবে সবচেয়ে মজার ব্যাপার হলো পৃথিবীতে বর্তমানে যে হাজার হাজার ভাষা রয়েছে, তা মাত্র দু’শাখায় বিভক্ত- কেন্তুম্ ও শতম্। অর্থাৎ কতকভাষা অন্তর্মুখীন তথা কেন্তুম্ এবং কতকভাষা শিস্ প্রধান তথা শতম। শিস্ প্রধান ভাষাই কালের বিবর্তনে বিভিন্ন ভাষা-সৃষ্টিস্রোতে এক সময় আমাদের মাতৃভাষা বাংলা ভাষায় এসে পৌঁছে। অর্থাৎ শিস্ প্রধান ভাষাসমূহের মধ্যে বাংলা ভাষাও একটি। এখানে উল্লেখ্য যে, ভাষা যতদিন মৌখিক ছিল বা থাকবে- তার পরিবর্তন অব্যাহতভাবে চলছে, চলবে। তাই বাংলা ভাষা কালস্রোতের এরূপ পরিবর্তনের ফসলস্বরূপ একটি ভাষা।
    অনেকের ধারণা- আর্য ভাষা ও অনার্য ভাষার সংমিশ্রণে বাংলা ভাষার উদ্ভব। আর্য ভাষা মার্জিত, রুচিসম্মত এবং পণ্ডিতজনের ভাষা। অনার্য ভাষা তার তুলনায় অমার্জিত এবং আঞ্চলিক। আর্যভাষার ফসল বৈদিক বা সংস্কৃত। আর এ সংস্কৃত ভাষা থেকেই বাংলা ভাষার উদ্ভব বলে অনেকে মনে করে থাকেন। কিন্তু এ ধারণা সত্যি নয়। সংস্কৃতজ্ঞপণ্ডিত দ্বারা অনেকদিন বাংলা ভাষা লালিত হয়েছে, শাসিত হয়েছে বলে এ ভাষার প্রভাব অপ্রতিহতভাবে বাংলা ভাষাকে নিজের মধ্যে নিমজ্জিত করে ফেলেছিল। বাংলা ভাষার শব্দসম্ভারে তৎসম, অর্ধতৎসম ও তদ্ভব শব্দের বহুল উপস্থিতিই তার প্রমাণ। সংস্কৃত ভাষা লিখিত ও সাহিত্যের ভাষা-সেজন্যই অপরিবর্তনীয় এবং এ ভাষা কোনকালেই কোন জাতি বা সম্প্রদায়ের মৌখিক ভাষা ছিল না। ড: মুহম্মদ শহীদুল্লাহ্র মতে বাংলা ভাষার সাথে সংস্কৃতভাষার সম্পর্ক হলো দূরসম্পর্কীয় আত্মীয়ামাত্র।
    সংস্কৃত ভাষা লিখিত ও সাহিত্যের ভাষা হওয়ায় সমসাময়িক কালে সর্বসাধারণের মৌখিক ভাষা হলো প্রাকৃত। আড়াই হাজার বৎসর পূর্বে ভগবান বুদ্ধের প্রচারিত ধর্মের অনুশাসন লিখিত হয়েছে পালি ভাষায়। এ ভাষা লিখিত রূপ পাবার ফলে অপরিবর্তনীয় হয়ে যায়। তারপর অঞ্চল ভেদে প্রাকৃত ভাষা নানা নামে সাতন্ত্রিক রূপ

১.    সংস্কৃত = সংস্কার হয়েছে যে ভাষা-তা-ই সংস্কৃত ভাষা। এ ভাষায় বেদ লিখিত হয়েছে বলে তা বৈদিক ভাষা নামেও পরিচিত।
২.    প্রাকৃত =    প্রকৃতি থেকে জাত ভাষা।
৩.    পালি = যে ভাষার মাধ্যমে অনুশাসন পালন করা হয়। এ ভাষার শ্রেষ্ঠগ্রন্থ ত্রিপিটক।
লাভ করে।

১.    মহারাষ্ট্রী প্রাকৃত = শিষ্টজনের ভাষা, গানের ও সাহিত্যের মার্জিত ভাষা।
২.    শৌরসেনী প্রাকৃত = সৌর আঞ্চলের ভাষা।
৩.    শৈলাচী প্রকৃত = উত্তর ভারতের ভাষা।
৪.    মাগধী বা অর্ধমাগধী প্রাকৃত = মগধ অঞ্চলের ভাষা। ব্যবহারিকভাবে নিম্নশ্রেণির ভাষা। ড: সুনীতিকুমার চট্টোপাধ্যয়ের গবেষণালব্ধ ঙউইখ (ড়ৎরমরহ ধহফ উবাবষড়ঢ়সবহঃ ড়ভ ইবহমধষর খধহমঁধমব) এর অনুসরণে বলা যায় এই মাগধী প্রাকৃত থেকেই বাংলা ভাষার উদ্ভব। সংস্কৃত নাটকে (কালিদাসের ‘অভিজ্ঞান শকুন্তলম্’-এর নগররক্ষী, ধীবর-এর সংলাপ) নিম্নশ্রেণির চরিত্রের সংলাপ এই মাগধী প্রাকৃতে লিখিত। যদিও পরবর্তীতে ড: মুহম্মদ শহীদুল্লাহ তাঁর ‘বাংলা ভাষার ইতিবৃত্ত’ গ্রন্থে বাংলা ভাষার উদ্ভব সম্বন্ধে ভিন্নমত পোষণ করেছেন। তিনি গৌড়ী প্রাকৃতের পরবর্তী ভাষা গৌড়ী অপভ্রংশ-তার পরবর্তী বঙ্গকামরূপী এবং তা থেকে বাংলা এ আসামী ভাষার উদ্ভব বলে নির্দেশ করেছেন এবং এই বাংলা ভাষার উদ্ভবকাল ৬৫০ খ্রিস্টাব্দ বলে আজ ভাষার ইতিহাসে মোটামুটিভাবে স্বীকার করে নেয়া হয়।
যেহেতু বাংলা ভাষা মাগধী প্রাকৃত তথা নিম্নশ্রেণির ভাষা ছিল বলে বিবেচনা করা হতো, সেজন্য এ ভাষা ও এভাষাভাষীরা সব সময়ই অবহেলার পাত্র হিসেবে চিহ্নিত হয়েছে। তাই এ ভাষার জন্মলগ্ন থেকেই তার অস্তিত্ব রক্ষার জন্য সংগ্রাম, আন্দোলন এবং স্বাতন্ত্রিক অভিধা প্রতিষ্ঠার জন্য প্রত্যয়ী হতে হয়। ইতিহাস পর্যালোচনা করলে দেখা যায়-বাঙালি জাতি বাংলাদেশের অধিবাসী হওয়া সত্ত্বে কোনোকালেই নিজেদের ভাষার গৌরব সর্বজনীন করে তুলতে পারেনি। বাংলাদেশের রাজভাষা কখনো ফারসী, কখনো ইংরেজি। বাংলা ভাষার উপর ‘পশ্চিমীজাতি ও ভাষাভাষীরা প্রভাব বিস্তার করেছে অব্যাহতভাবে। মুসলিম শাসন আমলে বাংলা ভাষার পৃষ্ঠপোষকতা হয়েছে ঠিকই, কিন্তু বাংলাভাষাকে প্রতিষ্ঠা দিবার প্রয়াস ছিল না। উনবিংশ শতাব্দীতে একমাত্র প্রমথ চৌধুরীর নৈতিক সমর্থনের ফলে বাংলাভাষার একটি স্থায়ী প্রতিষ্ঠার উদ্যোগ নেয়া হয়। ড: জীবেন্দ্র সিংহ রায়ের ভাষায়-‘প্রমথ চৌধরী বাংলা ভাষার প্রথম ভাষা সৈনিক।’ যার প্রভাব রবীন্দ্রনাথের রচনায় প্রতিফলিত হয়। চলিত ভাষায় সাহিত্যরচনাই স্বাক্ষর বহন করে। ইংরেজ আমলে বাংলাভাষার চর্চা হয়েছে, মর্যাদা লাভ করেনি। পণ্ডিতি অভিধায় সংস্কৃতভাষা বিশেষজ্ঞরাই পারঙ্গম, ইংরেজি-ভাষা জানা লোকেরা শাসকের সুদৃষ্টিতে ভাগ্যবান হতেন, অভিজাত মুসলিম সমাজ আরবী-ফারসী ভাষা লালনে অহংকার বোধ করতেন। ফলে, জাতিগত বিশ্লেষণে দেখা যায় যে, সংস্কৃতজ্ঞ পণ্ডিত এবং পশ্চিমী মুসলমানরা এদেশের মূল অধিবাসী তথা বাঙালিকে অবহেলা বা করুণা করতেন এবং সাথে সাথে ঘৃণাও করতেন। বাংলাভাষী বাঙালিরা ব্রাহ্মণ্যবাদের চোখে অন্ত্যজশ্রেণির, তথাকথিত অভিজাত মুসলমান তাঁদেরকে খাঁটি মুসলমান হিসেবে বিবেচনা করতেন না।

৫২-এর ভাষা আন্দোলন
    বাংলা ভাষার প্রতিষ্ঠা ও স্বীকৃতির আন্দোলন পাকিস্তান প্রতিষ্ঠা বা দেশ বিভাগের পূর্বেই শুরু হয়। লাহোর প্রস্তাব গৃহীত হওয়ার পূর্বে কংগ্রেসের সর্ব্বোচ্চ নেতৃবৃন্দের পক্ষ থেকে ‘হিন্দী’কে সমগ্র ভারতের রাষ্ট্রভাষা করার জোর প্রচেষ্টা ও তৎপরতা চলে। হিন্দীকে রাষ্ট্রভাষা করার পাল্টা দাবী হিসেবে ভারতের উর্দু সমর্থক মুসলমানদের পক্ষ থেকে উর্দুকে সমগ্র ভারতের রাষ্ট্রভাষা করার যৌক্তিকতা ও দাবী উত্থাপিত হয়।
    ১৯৪৭ সালের জুলাই মাসে পাকিস্তান প্রতিষ্ঠার প্রাক্কালে আলিগড় বিশ্ববিদ্যালয়ের ভাইস চ্যান্সেলর ড. জিয়াউদ্দিন আহমদ অভিমত ব্যক্ত করেন, ‘হিন্দীকে ভারতের রাষ্ট্রভাষা করার সিদ্ধান্ত নেওয়ার পর যুক্তিসঙ্গত কারণে উর্দুকে পাকিস্তানের রাষ্ট্রভাষা করা উচিত।’
    পাকিস্তানের স্বপ্নদ্রষ্টা ইকবালের দৃষ্টিভঙ্গি ছিল একেবারেই ভিন্ন। তিনি মনে করতেন, ‘আমাদের জাতীয়তার ভিত্তি দেশ ও ভাষার ঐক্য নয়, বিশ্ববীক্ষার বিশিষ্টতা, ঐতিহাসিক উত্তরাধিকার এবং বিশেষ সমাজ ব্যবস্থাই এর মূলনীতি।’ ইসলামে ধর্ম ও রাজনীতিকে পৃথক করা যায় না, এই দৃঢ় ধারণার বশবর্তী ছিলেন তিনি।
    মুহম্মদ আলী জিন্না চেয়েছিলেন, যেকোন মানদণ্ডে মুসলমানেরা এক জাতি এবং তাদের আধ্যাত্মিক, সাংস্কৃতিক, অর্থনৈতিক, সামাজিক ও রাজনৈতিক জীবনের পূর্ণতম বিকাশ ঘটাতে হলে প্রয়োজন নিজস্ব এলাকা, বাসভূমি ও রাষ্ট্রের। তিনি কখনো বলেননি-পাকিস্তান হবে ইসলামী রাষ্ট্র। তিনি পাকিস্তানকে কল্পনা করেছিলেন আধুনিক রাষ্ট্র হিসেবে। তাই মাওলানা মদনি জিন্নাকে অভিহিত করেছিলেন ‘কাফেরে আজম।’ সৈয়দ আবুল আলা মওদুদী পাকিস্তানের নাম দিয়েছিলেন ‘নাপাকিস্তান’, কারণ তাঁর ধারণা ছিল, প্রতিষ্ঠিত হলে ওটি হবে ‘কাফেরানা রাষ্ট্র।’

১. বাংলাদেশে ধর্ম, রাজনীতি ও রাষ্ট্র-ড: আনিসুজ্জামান, শিক্ষাবার্তা, ডিসেম্বর ১৯৯৬।
    ড. মুহম্মদ শহীদুল্লাহ তখন থেকেই প্রতিবাদ করে আসছিলেন। প্রথমে ড. জিয়াউদ্দিন আহমদকে, পরে সামগ্রিক বাংলাভাষা বিরোধী চক্রকে। তিনি ‘পাকিস্তানের রাষ্ট্রভাষা সমস্যা’ শীর্ষক প্রবন্ধে লিখেন-“কংগ্রেসের নির্দিষ্ট হিন্দীর অনুকরণে উর্দু পাকিস্তানের একমাত্র রাষ্ট্র ভাষারূপে গণ্য হইলে তাহা শুধু পশচাদ্গমনই হইবে। ------ যদি বিদেশী ভাষা বলিয়া ইংরেজী ভাষা পরিত্যক্ত হয়, তবে বাংলাকে পাকিস্তানের রাষ্ট্রভাষারূপে গ্রহণ না করার পক্ষে কোন যুক্তি নাই।” (কারণ উর্দু পাকিস্তান ডোমিনিয়নের কোন অঞ্চলের ভাষা নয়। এই অর্থে উর্দুও বিদেশী ভাষা)। “যদি বাংলা ভাষার অতিরিক্ত কোন রাষ্ট্রভাষা গ্রহণ করিতে হয় তবে উর্দু ভাষার দাবী বিবেচনা করা কর্তব্য।”
    “পূর্ব পাকিস্তানের কোর্ট ও বিশ্ববিদ্যালয়ে বাংলার পরিবর্তে উর্দু বা হিন্দীকে গ্রহণ করা হইলে ইহা রাজনৈতিক পরাধীনতার নামান্তর হইবে।”
(দৈনিক আজাদ-২৮শে জুলাই ১৯৪৭)
    সে সময় ‘পাকিস্তান; রাষ্ট্রভাষা ও সাহিত্য” শীর্ষক প্রবন্ধে কবি ফররুখ আহমদ লিখেন-“পাকিস্তানের অন্তত: পূর্বপাকিস্তানের রাষ্ট্রভাষা যে বাংলা হবে এ কথা সর্ববাদিসম্মত হলেও আমাদের এই পূর্ব পাকিস্তানেরই কয়েকজন তথাকথিত শিক্ষিত ব্যক্তি বাংলা ভাষার বিপক্ষে এমন অর্বাচীন মত প্রকাশ করেছেন যা নিতান্তই লজ্জাজনক। বাংলাভাষাকে রাষ্ট্রভাষায় রূপান্তরিত করলে ইসলামী ঐতিহ্যের সর্বনাশ হবে এই তাদের অভিমত। কী কুৎসিত পরাজয়ী মনোবৃত্তি এর পেছনে কাজ করছে এ কথা ভেবে আমি বিস্মিত হয়েছি। (মাসিক সওগাত, আশ্বিন সংখ্যা ১৩৫৪ বাং)
    কবি ফররুখ আহমদ মাসিক মোহাম্মদী ১৩৫২ বাং সংখ্যার ‘উর্দু বনাম বাংলা’ শীর্ষক একটি ব্যাঙ সনেট লিখেন।
    “দুইশ’ পঁচিশ মুদ্রা সে অবধি হয়েছে বেতন
    বাংলাকে তালাক দিয়া উর্দুকে করিয়াছি নিকা
    বাপান্ত শ্রমের ফলে উড়িছে আশার চামচিকা
    উর্দু নীল আভিজাত্যে জানে তা নিকট বন্ধুগণ।”

    ১৯৪৭ সালের ১৫ই সেপ্টেম্বর তমদ্দুন মজলিস ‘পাকিস্তানের রাষ্ট্রভাষা বাংলা না উর্দু’ নামে একটি পুস্তক প্রকাশ করে। ঐতিহাসিক রাষ্ট্রভাষা আন্দোলনে এই পুস্তিকাটি জনমত গঠনে সুদূরপ্রসারী অবদান রাখে। রাষ্ট্রভাষা বাংলার দাবী সম্বলিত এটাই ছিল প্রথম পুস্তিকা। নিম্নরূপ প্রস্তাবগুলো সুধীসমাজের নিকট পেশ করা হয়।

১। বাংলা ভাষাই হবে
    (ক) পূর্ব পাকিস্তানের শিক্ষার বাহন,
    (খ) পূর্ব পাকিস্তানের আদালতের ভাষা,
    (গ) পূর্ব পাকিস্তানের অফিসাদির ভাষা,

২। পাকিস্তানের কেন্দ্রীয় সরকারের রাষ্ট্রভাষা হবে দুটি- উর্দু ও বাংলা।

৩।    (ক) বাংলাই হবে পূর্বপাকিস্তানের শিক্ষা বিভাগের প্রথম ভাষা। ইহা পূর্ব পাকিস্তানের শতকরা একশ জনই শিক্ষা করবেন।
    (খ) উর্দু হবে দ্বিতীয় ভাষা বা আন্ত:প্রাদেশিক ভাষা। যাঁরা পাকিস্তানের অন্যান্য অংশে চাকরি ইত্যাদি কাজে লিপ্ত হবেন তাঁরাই শুধু ও ভাষা শিক্ষা করবেন। ইহা পূর্ব পাকিস্তানের শতকরা ৫ হতে ১০ জন শিক্ষা করলেও চলবে। মাধ্যমিক স্কুলের উচ্চতর শ্রেণীতে এই ভাষা দ্বিতীয় ভাষা হিসেবে শিক্ষা দেয়া যাবে।
    (গ) ইংরেজী হবে পূর্ব পাকিস্তানের তৃতীয় ভাষা বা আন্তর্জাতিক ভাষা। পাকিস্তানের কর্মচারী হিসেবে পৃথিবীর অন্যান্য দেশে চাকরি করবেন বা যাঁরা উচ্চতর বিজ্ঞান-শিক্ষায় নিয়োজিত হবেন তাঁরাই শুধু ইংরেজী শিক্ষা করবেন। তাঁদের সংখ্যা পূর্ব পাকিস্তানে হাজারে ১ জনের চেয়ে কখনো বেশী হবে না।
        ঠিক একই নীতি হিসেবে পশ্চিম পাকিস্তানের প্রদেশগুলোতে স্থানীয় ভাষা বা উর্দু প্রথম ভাষা, বাংলা দ্বিতীয় ভাষা, আর ইংরেজী তৃতীয় ভাষার স্থান অধিকার করবে।

৪। শাসন কাজ ও বিজ্ঞান শিক্ষার সুবিধার জন্য ইংরেজী ও বাংলা উভয় ভাষাতেই পূর্বপাকিস্তানের শাসনকাজ চলবে। ইতিমধ্যে প্রয়োজনানুযায়ী বাংলাভাষার সংস্কার সাধন করতে হবে।

    দ্বিজাতিতত্ত্বের ভিত্তিতে দেশ ভাগ হলো, বাংলাদেশ ভাগ হলো। পাকিস্তানের পূর্বাংশ তথা পূর্ববঙ্গ হলো পূর্ব পাকিস্তান এবং ভারতের পূর্বাঞ্চল হলো পশ্চিমবঙ্গ। দেশ ভাগ হলো, ভাষা ভাগ হলো দৃশ্যত, সংস্কৃতি ভাগ হলো- বাঙালি বা বাংলা ভাষার অস্তিত্ব বিলুপ্তের জন্য পাকিস্তান শাসকবর্গ বাংলাভাষার মর্যাদা রক্ষার বিপক্ষে অবস্থান নিল। পশ্চিমবঙ্গ রাজনৈতিক সূক্ষ্মকূটচালের মধ্যে হাবুডুবু খাচ্ছিল বা খাচ্ছে।