ই-পেপার ভিডিও ছবি বিজ্ঞাপন কুমিল্লার ইতিহাস ও ঐতিহ্য যোগাযোগ কুমিল্লার কাগজ পরিবার
রবিবাসরীয়......
Published : Sunday, 30 January, 2022 at 12:00 AM, Update: 30.01.2022 12:16:02 AM
রবিবাসরীয়......









অদ্বৈতবাদী কাজী নজরুল ইসলাম ও তাঁর বিদ্রোহী সত্তা

রবিবাসরীয়......আনোয়ারুল হক ||

বিদ্রেহী কবিতার শতবর্ষ  
( পূর্ব প্রকাশের পর )
 ঈশ্বর, ভগবান- যে যে নামেই ডাকুক, নজরুল তাতে কোন ফারাক উপলব্ধি করেন না। এই যে সার্বজনীন মিলন চেতনা নজরুলের-তার স্বরূপ অনুধাবনে ব্যর্থদের হাতেই কিন্তু বর্তমানে পাবলিক এবং প্রাইভেট বিশ্ববিদ্যালয়সহ শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের উচ্চতর পর্বে বাংলা ভাষা ও সাহিত্যের সিলেবাস তৈরি হয়, যেখানে নজরুল পাঠ্যসূচি যথাযোগ্য মর্যাদার সাথে অন্তর্ভুক্ত নয়।
বর্তমান বিভেদের পৃথিবীতে কাজী নজরুল ইসলামের কাব্য-সংগীতে, যাঁরা বিশ্বজনীন মানবিক, ধর্মীয় ঐক্য চেতনা খুঁজে পেতে ব্যর্থ, তাঁদের অন্তর্দৃষ্টির ঘাটতি রয়েছে বলে আমরা মনে করি। অনুভব করি, বিশ্বমানবের প্রতি দায়বোধের অন্তর্জাত প্রেরণা থেকে ‘বিদ্রোহী’র জন্ম হয়েছে। স্বর্গ মর্ত্য পাতালব্যাপী একক শক্তিকে সেখানে আহ্বান করেছেন কবি মানুষের ‘ভগবান’ হয়ে ঘাড়ে চেপে বসে থাকা ‘অসুর’ বিনাশের জন্য। সুফী চেতনার ভাব-দর্শন রসে সিক্ত হয়ে প্রেমভাবে যেমন লিখেছেন ইসলামী আদর্শ, ঐতিহ্য ও সংস্কৃতি বিষয়ক আধুনিক সংগীত, পাশাপাশি একই সময়ে লিখেছেন হিন্দু ধর্মীয় ভক্তিগীতি। স্বধর্মের না হয়েও বিস্ময়করভাবে তাঁর হিন্দু ধর্মীয় শাস্ত্রীয় জ্ঞান এত বিপুল ও ঐশ্বর্যমণ্ডিত যে, উভয়ক্ষেত্রে নজরুল পথিকৃত। হিন্দুদের মধ্যে যাঁরা শ্যামের গান লিখলেন, তাঁরা লিখেন নি শ্যামার গান। যাঁরা শ্যামার গান লিখলেন তাঁরা লেখেন নি শ্যামের গান। রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর মেতে রইলেন ব্রাহ্ম সংগীত নিয়ে। এই ভুবনে নজরুল ইসলাম স্বতন্ত্র, এককভাবে সফল এবং স্বার্থক।
‘বিদ্রোহী’ কবিতা রচনার একশত বছর পরে এককভাবে একটি কবিতার জন্যে এখানেও নজরুল হয়ে রইলেন স্বতন্ত্র। বিষয় চেতনায় কবিতাটি অভূতপূর্ব- বিদ্যমান সমাজ, রাষ্ট্র ও ধর্ম বিষয়ে যত অসংগতি ও শোষণ পুঁজিবাদী যন্ত্রের,  সেসবের বিরুদ্ধে এমন সোজা-সাপটা প্রতিবাদ, একই সাথে হিন্দু-মুসলিম-খ্রিস্টান পুরাণের মিশেলে সাধারণ অর্থের আড়ালে পারমার্থিক অদ্বৈতবাদী চেতনার উদ্ভাস আছে ব্যতিক্রম এই কবিতায়। যা এককথায় অসাধারণ, শ্রেষ্ঠ।
অদ্বৈতবাদী চেতনার সংক্ষিপ্ত ব্যখ্যা এখানে প্রয়োজন মনে করি-িএই ভারতবর্ষে আওলিয়া পীর দরবেশ সুফিদের মাধ্যমে যে ইসলাম প্রচারিত হয়েছিল, সে ইসলাম স্থানীয় ধর্মীয় আচার বিশ্বাসের সঙ্গে সমন্বিত হয়ে এক ধাঁচের সহজিয়া রূপ পেয়েছিল। সুফিবাদী ইসলাম আর আরব দেশের ইসলাম- এই দুইয়ের মধ্যে পার্থক্য চোখে পড়ার মতো। মূল ইসলাম হলো দ্বৈতবাদী। আল্লাহ সেখানে প্রভু, মানুষ হলো বান্দা বা দাস। স্রষ্টা এবং সৃষ্টির সম্পর্ক প্রভু এবং দাসের। কিন্তু সুফিরা বিশ্বাস করেন অদ্বৈতবাদে।  অদ্বৈতবাদে স্রষ্টা ও সৃষ্টিতে কোন পার্থক্য নেই। অভিন্ন। সৃষ্টি স্রষ্টার অস্তিত্বে লীন হয়ে যেতে পারে। যাকে বলা হয়েছে, ‘ফানা ফিল্লাহ’। সুফিরা মনে করেন, স্রষ্টার সঙ্গে সৃষ্টির সম্পর্ক প্রেমের, প্রভু-ভৃত্যের নয়। এও বলা হয়ে থাকে, সুফিরা যে  ‘আনাল হক’ অর্থাৎ ‘আমিই সে’ – এই সাধন তত্ত্ব- এর তালাশ তাঁরা পেয়েছিলেন ভারতবর্ষের সাধকদের কাছ থেকে।
আর এই ভারতবর্ষেরই আসানসোল জেলার চুরুলিয়া গ্রামের প্রত্যন্ত অঞ্চলের এক মুসলিম পরিবারে কাজী নজরুল ইসলামের জন্ম। আমি দেখে এসেছি, একটি মাটির ঘরে, যার সন্নিকটে পীরপুকুর, মসজিদ, তার পাশে হাজী পালোয়ান নামক এক ওলির উন্মুক্ত মাজার, যে মাজারের খাদেম ছিলেন বালক নজরুল। নরম কাদামটির বয়স তখন তাঁর। যে বয়সে মানুষের মনে কৌতুহল এবং জিজ্ঞাসা জন্ম নিতে থাকে। সংবেদনশীল বালক নজরুলকে সংগত কারণেই ধারণা করি, বাড়ির পাশে শায়িত সুফি সাধক স্বাভাবিক ভাবেই অনুসন্ধিৎসু স্বভাবের জন্য আকৃষ্ট করে থাকবে।  এও মনে করি, পরিণত বয়সে নজরুল এই সমস্ত সুফি সাধক ‘অদ্বৈতবাদী’ প্রেমিকদের প্রেম চেতনায় ঋদ্ধ হয়েছেন, পাঠে অভিভূত হযেছেন ইরানি ফারসি কবি হাফিজ, ওমর খৈয়াম, উর্দু কবি মীর (মৃত্যু : ১৮১০), গালিবে (মৃত্যু : ১৮৭৯), যাঁরা তাঁর প্রিয় কবি ছিল। বলেছেন নজরুল,
আমি বেশি পড়েছি গালিবকে, তাকেই বেশি জানি এবং তার কাব্য ভালবাসি। কিন্তু মীরের কবিতা আমাকে পাগল করে দেয়। পাগল তো আল্লাহর ফজলে আমি আছিই। মীর আমার পাগলামিকে আরো প্রগাঢ় করে তোলে। আমার এক পুরনো পীর (কবি হাফিজ) আছেন, যাঁর শরাবখানার দরজা আমার জন্য খোলা সবসময় থাকে। (বতুল : ১৯৯৯ : ২৩৩)   
এ জন্যিই আমাদের চেতনায় নজরুলের সৃষ্টি সুখের উল্লাস ‘বিদ্রোহী’ কবিতা হলো সমন্বিত মহাশক্তির ‘আমি’ সত্তার নান্দনিক মহাকাব্য। অদ্বৈতবাদী চেতনার স্বতন্ত্র উদ্ভাস। এবং এই অদ্বৈতবাদী চেতনার সঙ্গে মূল ইসলামের ফারাক থাকলেও প্রেমিক চেতনার সঙ্গে কোন পার্থক্য নেই। স্রষ্টার সঙ্গে সম্পর্কের ক্ষেত্রে মূল ইসলামে কোন মধ্যস্থতাকারি নেই। পীর-মুরশিদ বর্জনীয়। কিন্তু অদ্বৈতবাদী সুফিরা পীর-মুরশিদের মাধ্যমেই স্রষ্টার সান্নিধ্য কামনা করেন। বিশ্বাস করেন, নজরুলের গানে আছে, যেমন,-
‘আল্লাহকে যে পাইতে চাহে, হযরতকে ভালোবেসে’ (৯৪ নং ইসলামী সংগীত), ‘তৌহিদেরই মুর্শিদ আমার মোহম্মদের নাম’ (৫৪ নং), ‘ত্রিভুবনের প্রিয় মোহাম্মদ এলো রে দুনিয়ায়’- (৭২ নং), ‘খোদার রহম চাহ যদি নবীজীরে ধর, নবীজীরে মুর্শিদ কর নবীর কলমা পড়।’-(১৬১ নং), ‘তোমার নামে একি নেশা হে প্রিয় হজরত’-২৫ নং) ইত্যাদি ছাড়াও নজরুলের অসংখ্য অনুরাগের গান রয়েছে, যার মাধ্যমে নব আঙ্গিকে তাঁর প্রেমিক সত্তাকে তুলে আনা যায়। (ইসলাম : নজরুল সমগ্র : অষ্টম খণ্ড) এ কারণে নজরুলের আগ্নেয় উৎসের জ্বালামুখ থেকে দ্রোহীর প্রথম উদগীরণ ‘বিদ্রোহী’ কবিতার অর্থ কেবল জাগতিক নয়, পারমার্থিকও বটে। যার অর্থ অনুধাবন জরুরী। যে জন্য মধ্যযুগে বঙ্গদেশে আগত উপর্যুক্ত ‘অদ্বৈতবাদী’ চেতনার ইতিহাস জানা আবশ্যক।
প্রকৃতই তা না হলে সহজ নয় ‘বিদ্রোহী’ কবিতার সমগ্র অন্তর স্পর্শ করা, যেখানে রয়েছে ত্রিভুবনের আদি থেকে অন্তে সকল শক্তির সমাহার। মুসলিম হিন্দু ও গ্রীক পুরাণের সমন্বিত সহবস্থানের অসামান্য উদাহরণ হয়ে আছে কবিতাটি, যে পুরাণ নজরুল রূপকার্থে ব্যবহার করেছেন। প্রকৃতপক্ষে, বিভিন্ন পৌরাণিক চরিত্র সমূহ ব্যবহার করে কবি একক ‘আমি’র বহুবিধ তাৎপর্য তুলে ধরেছেন। লক্ষ করার বিষয়, পৌরাণিক যে চরিত্রটি নজরুল বেশি ব্যবহার করেছেন, সেটি দেবতা ‘শিব’। অনার্য বঙ্গের প্রাচীন ইতিহাস সূত্রে জানা যায়, শিব হচ্ছে প্রাকৃত জনতার, অনার্য দেবতা। আর্যরা যখন এই অনার্য উপমহাদেশে আসে এবং সারা ভারতবর্ষকে তাদের উন্নত সাংস্কৃতিক প্রভাব বলয়ে গ্রাস করে ফেলে, তখন তারা আর্য দেবতাদের পাশাপাশি প্রাকৃত জনগণের দেবতা ‘শিব’কে গ্রহণ না করে পারেনি। ‘শিব’ হচ্ছেন সৃষ্টি ও ধ্বংসের দেবতা, নজরুলের প্রিয় চরিত্র। চরিত্র বৈশিষ্ট্য অনুসারে ‘শিব’কে নজরুল ভিন্ন ভিন্ন নামে কবিতায় স্থান দিয়েছেন, যেমন, ব্যোমকেশ (গঙ্গা ধারণকালে শিবের জটা সারা আকাশে পরিব্যপ্ত হয়ে গিয়েছিল বলে তাঁর নাম ব্যোমকেশ, ঈশান (শিব, বিষাণবাদক, পশুর শিং দিয়ে তৈরি বাদ্যযন্ত্র যা ফুঁ দিয়ে বাজানো হয়), পিনাক-পাণি ( ত্রিশূলধারী, পণি অর্থ হাত, যার হাতে ত্রিশূল শোভা পায়। আবার এই ত্রিশূলের মাথায় তিনটি ফলার অর্থ আছে, অর্থাৎ, ত্রিজগত, ত্রিনয়ন, ত্রিভূবন। শিব ত্রিনয়নধারী, বিশ্বাধিপতি), ধূর্জটি (ছাইরংয়ের জটাধারী), নটরাজ (নৃত্যরত শিব) ইত্যাদি। এছাড়া হিন্দু পৌরাণিক চরিত্র ও অনুষঙ্গ কবিতায় আছে, যা দিয়ে নজরুল তাঁর চিত্রকল্প তৈরি করেন। যেমন, হোমশিখা (অগ্নিশিখা, দেবতার উদ্দেশে নিবেদিত ঘৃতাগ্নি), জমদগ্নি (ঋষি, পরশুরামের পিতা যিনি পুত্রকে আদেশ করেছিলেন তার মাতাকে হত্যা করার জন্য, কঠোর চরিত্রের প্রতীক), ইন্দ্রাণী-সূত (ইন্দ্রপত্নী শচীদেবীর পুত্র, ইন্দ্র হলেন দেবরাজ), প্রণব-নাদ (ঈশ্বরের গূঢ় নাম, নাদ হলো ওঁ, ওংকার ধ্বনি), দুর্বাসা (ক্ষ্যাপা মুনি ঋষি, কোপণ স্বভাব, স্বেচ্ছাচারী), উচ্চৈঃশ্রবা (দেবরাজ ইন্দ্রের ঘোড়া, সমুদ্রমন্থনে যার উৎপত্তি), বাসুকি (নাগরাজ), শ্যাম (কৃষ্ণ ভগবান, প্রেমের-‘শ্যামের হাতের বাঁশরি’-কৃষ্ণের হাতের বাঁশি), বিষ্ণু ( নারায়ণ, হরি, সৃষ্টির পালনকর্তা, দেবতা শ্রেষ্ঠ), যুগল কন্যা (বিষ্ণুর দুই স্ত্রী-লক্ষ্ণী বা কমলা এবং সরস্বতীবা বীণাপাণি) চণ্ডি (আরেক নাম দুর্গা, প্রধান দেবী, হিন্দু বাঙালিদের প্রধান পূজা বা পার্বণ হয় যাঁকে কেন্দ্র করে), পরশুরাম ( যে রাম ‘পরশু’ অর্থ কুঠার, কুঠারধারী), বলরাম (কৃষ্ণের বৈমাত্রেয় জ্যেষ্ঠ ভ্রাতা, যার হাতিয়ার ছিল লাঙ্গল), ভৃগু (বিষ্ণু পত্নী লক্ষ্ণীর পিতা, ধনুর্বিদ্যার প্রবর্তক, ‘ভগবান বুকে এঁকে দিই পদচিহ্ন’- অর্থাৎ, মুনি ঋষিরা ব্রহ্মা, বিষ্ণু, শিব এই তিনজনের মধ্যে কে শ্রেষ্ঠ, তা জানবার জন্য ভৃগুকে তাঁদের কাছে পাঠান। ব্রহ্মা, শিব এঁদের কাছ থেকে হয়ে ভৃগু যখন বিষ্ণুর কাছে গেলেন, তখন বিষ্ণু ছিলেন নিদ্রিত। ভৃগু তাঁর বুকে লাথি মারলে বিষ্ণুর ঘুম ভেঙে যায়। কিন্তু লাথি মারার কারণে বিষ্ণু রাগ করা দূরে থাক, ভৃগু পায়ে ব্যথা পেয়েছে কিনা জানতে চান। কিন্তু শিব ও ব্রহ্মাকে ভৃগু যথাযথ সম্মান না করায় তাঁরা রাগ করেছিলেন। তখন ভৃগু সিদ্ধান্তে পৌঁছান যে, বিষ্ণুই শ্রেষ্ঠ)।
মুসলিম পুরাণ কিংবা ঐতিহ্যের ব্যবহার, যেমন-‘খোদার আাসন আরশ ছেদিয়া’, ‘ইস্রাফিলের শিঙ্গা (কেয়ামতের দিন স্রষ্টার আদেশে এই ফেরেশতা যিনি বাঁশিতে ফুঁ দেবেন), জিব্রাইল (আল্লাহর ফেরেশতা বা স্বর্গীয় দূত, যিনি ইসলামের মহানবীর কাছে ওহি বা বার্তা নিয়ে আসতেন), হাবিয়া দোজখ (সপ্তম নরক, যেটি সবচেয়ে ভয়াল এবং ভীষণতম),
এবং গ্রীক পুরাণ, যেমন-অর্ফিয়াস (গ্রীক পুরাণে ‘অর্ফিয়ুস’ নামে অভিহিত, কবি ও গায়ক। এ্যাপোলো দেবতা তাঁকে একটি বীণা উপহার দিয়েছিলেন। যে বীণা বাজালে প্রাণি ও প্রকৃতি সকলেই আনন্দিত ও সচল হয়ে উঠতো।
বিশ্বকাব্য সাহিত্যের ইতিহাসে এই একটি মাত্র কবিতাই আছে, যাতে উপর্যুক্ত পৌরাণিক চরিত্রের রূপক ব্যবহার নজরুল এমন অবলীলায় করেছেন, বলার কথাটি এত ইংগিতময়, অর্থবোধক হয়ে উঠেছে, যা কিনা পারস্পরিক সম্পর্কে মহামানবের মহামিলনের মহাশক্তি হয়ে উঠেছে। সমকালে সাম্রাজ্যবাদী ঔপনিবেশিক রাষ্ট্রের স্বৈরাচারী শাষকের শোষণ, পশ্চাৎপদ সমাজের পিছুটান, ধর্মান্ধতার  যাঁতাকলে পিষ্ট সাধারণ মুক্তিকামী জনগণের সামনে ব্যক্তিত্বহীন রাজনীতির অপশাসন, প্রকৃতপক্ষে, এই অমা থেকে বেরিয়ে আসার কোন পথ ছিল না। রাষ্ট্র তখন জনগণের নয়, রাষ্ট্র শোষক এবং নিষ্পেষণকারী। সমাজ কূপমণ্ডুক, প্রচলিত ধর্মের নিয়ম, কানুন আচার-আচরণে ধর্মান্ধতা, বিভেদ মানসিকতার ধূম্রজাল বিস্তার করে আছে, যেখানে প্রেম নেই, নেই মিলন, মানবিক বোধ। নেতাদের রাজনীতি পরমুখাপেক্ষী, নতজানু, বিভেদী। সুতরাং এই অবস্থা থেকে উত্তরণের একমাত্র উপায় সেই অতিমানব হয়ে ওঠা, যে ‘মানুষ’ সর্বশক্তির আধার। বিভেদের রাষ্ট্র, সমাজ, ধর্ম এবং রাজনীতি যে মানুষকে আলাদা করে রেখে ফায়দা লুটতে চাইছে, তার বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়াবার মহাশক্তি।
আগামী দিনের মঙ্গল এবং কল্যাণের স্বপক্ষে তৃতীয় নয়নে মানবতাবাদী নজরুল অবলোকন করলেন, সারা জাহানের মানুষের যিনি একক স্রষ্টা, সকলের-সেই পরিপূর্ণ সত্তার শক্তি নিয়ে মানুষ যেদিন জেগে উঠবে, সেদিন কোন অপ-শাসন, কু-শাসন, অত্যাচার শোষণ টিকবে না। মহাকবি মাইকেল মধুসূদন দত্তের পরে আবার নজরুল ইসলামে সেই একই পৌরাণিক চরিত্রের আড়ালে অন্যরূপে একক ব্যক্তিসত্তার জয়গান উন্মোচিত হলো। যার মূলে আছে প্রেম। দেবতাদের চেয়ে শ্রেষ্ঠ ‘মানুষ’ হয়ে উঠলো মানুষের সম্মিলিত শক্তি। যাঁর শির হিমাদ্রি শিখর ছাড়িয়ে সীমাহীন আকাশ। এতে স্রষ্টা মনোক্ষুণ্ণ হোন না, কেননা, এতো তাঁরই সৃষ্টি মানুষ, তাঁরই প্রদত্ত ক্ষমতা। কবির পারমার্থিক চৈতন্য যা অতিক্রম করে যায় জল, স্থল, অন্তরীক্ষ- ত্রিভুবন। এই শক্তি কবি ধারণ করেন কবি নজরুল নিঃশংশয় রোমান্টিকতায়। চৈতন্যই এখানে সর্বভূতে প্রতিভূ। ইতিহাসে, পুরাণে, বর্তমানে, প্রাত্যহিকে, ভবিষ্যতে।
উপস্থাপনায় প্রমুক্ত ও স্বাধীন। বলেই স্বর্গ, মর্ত্য, পাতাল ‘তুরিয়ানন্দে ছুটে’ চলেন কবি। কোমলে কঠোরে ১৪১ পংক্তিজুড়ে বাঙ্ময়। যে কবির সেজদার জায়নামাজ সবসময় পাতা আছে মানুষের হৃদয়ে-

এই হৃদয়ই সে নীলাচল, কাশী, মথুরা, বৃন্দাবন
বুদ্ধ-গয়া এ, জেরুজালেম এ, মদিনা, কাবা-ভবন,
মসজিদ এই, মন্দির এই, গির্জা এই হৃদয়,
এইখানে বসে ঈসা মুসা পেল সত্যের পরিচয়।

এই রণ-ভূমে বাঁশির কিশোর গাহিলেন মহা-গীতা (কৃষ্ণ)
এই মাঠে হল মেষের রাখাল নবীরা খোদার মিতা। (মোহাম্মদ)
এই হৃদয়ের ধ্যান-গুহা মাঝে বসিয়া শাক্যমুনি (বেদ)
ত্যজিল রাজ্য মানবের মহা-বেদনার ডাক শুনি। (বুদ্ধ)
এই কন্দরে আরব দুলাল শুনিতেন আহ্বান,
এইখানে বসি’ গাহিলেন তিনি কোরানের সাম-গান।
                               মিথ্যা শুনিনি ভাই
এই হৃদয়ের চেয়ে বড়ো কোন মন্দির-কাবা নাই। (সাম্যবাদী/ সাম্যবাদী)

বলার অপেক্ষা রাখে না, হৃদয় তো মানুষেরই হয়। যে মানুষ স্রষ্টার প্রতিনিধি, আয়না। আর উপর্যুক্ত কবিতায়ও আছে ‘বিদ্রোহী’ কবিতার মর্মবাণী। খাঁচা ছেড়ে উড়ে যাবার আগে খাঁচা-মুক্ত হওয়া। আত্মজয় করে বন্ধনমুক্তির পংক্তিমালা।
যে ঢেউ রুঁষে ওঠে, ফুঁসে ওঠে বেলাভুমে আছড়ে পড়ে আবার মিলিয়ে যায় সাগরে। যেখান থেকে শুরু সেখানেই ফিরে যাওয়া।
     সমকালে নন্দিত ও নিন্দিত, সর্বধিক আলোচিত, পঠিত, আবৃত্তি শিল্পের পথিকৃত কবিতা ‘বিদ্রোহী’। শতবছরে যার গুরুত্ব এতটুকুও হ্রাস পায়নি, সে তার বড়ত্বের জন্য নয়, বহুমাত্রিকতার জন্য। চিরকালের প্রাণ স্পর্শ করতে পারার জন্য। ছাপাবার পর থেকে আজ পর্যন্ত সারা পৃথিবীতে অনুমিত তিরিশ কোটি বাঙালির আত্মপরিচয় উদ্দীপনার স্মারক হয়ে আছে এই কবিতা। এত যে বিপুল প্রাণশক্তি, আত্মজয়ী আত্ম-আবিষ্কার আছে তাতে, যে কারণে এই কবিতার ‘বিজয় রথ’ থামিয়ে রাখা যায়নি। রবীন্দ্রনাথসহ সমকালের অন্যান্য কবিদের কোমলে-নমনীয়তা জমিনে বীর-রসের দীপ্তি নিয়ে এসেছিল ‘বিদ্রোহী’ কবিতা। যে যেদিক থেকে দৃষ্টির আলোকচ্ছটা ফেলবে এ প্রজন্মেও, সে সেভাবেই খুঁজে পাবে তাকে। রাজনৈতিক, সামাজিক, সাহিত্যিক, পারমার্থিক আগুনের পরশমনির ছোঁয়া আছে ‘বিদ্রোহী’র অন্তরে।  যার শিখর হিমাদ্রিসম শির উঁচু করা মেরুদণ্ডী মানবের হৃদয়ে। যে হৃদয় দিয়ে আর একটি হৃদয়কে যুক্ত করার প্রত্যয়ে ‘অভেদ সুন্দর’ এসে দাঁড়ায় সামনে, ‘বিদ্রোহী’ কবিতা তারই নির্মেদ উচ্চারণ। চিরকালের শ্রেষ্ঠ কবিতা, বাংলা সাহিত্যের অনন্য সম্পদ, শতাব্দীর পর শতাব্দী পার হয়ে যাবে তবুও ‘বিদ্রোহী’র প্রাসঙ্গিকতা লোপ পাবে না। জনপ্রিয়তার নিরিখেও যা অনতিক্রম্য হয়ে থাকবে।
১০. ০১. ২০২২
বনশ্রী, ঢাকা।

রবিবাসরীয়......