ই-পেপার ভিডিও ছবি বিজ্ঞাপন কুমিল্লার ইতিহাস ও ঐতিহ্য যোগাযোগ কুমিল্লার কাগজ পরিবার
ডেঙ্গুর ভয়াল রূপ বন্ধে পদক্ষেপ গ্রহণ জরুরি
Published : Tuesday, 18 October, 2022 at 12:00 AM
ডেঙ্গুর ভয়াল রূপ বন্ধে পদক্ষেপ গ্রহণ জরুরিড. শফিকুল ইসলাম ।।
বাংলাদেশে ডেঙ্গু এক আতঙ্কের নাম। কারণ ডেঙ্গু সাধারণত বর্ষাকালে হয়। কিন্তু এখন বর্ষা শেষ। এর পরও এখন ডেঙ্গুর আক্রমণ ব্যাপকভাবে বেড়েই চলেছে। তা মানুষের কাছে ভয়াবহরূপ ধারণ করছে। সবাই এখন আতঙ্কে রয়েছেন। একটু জ্বর হলে মানুষ ভয় পেয়ে যায়। এখনো যদি ডেঙ্গুকে প্রতিরোধ করা না হয়, তা হলে ভবিষ্যতে আরও মারাত্মক আকার ধারণ করবে। তা নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যাবে। তাই কর্তৃপক্ষকে এখনই পদক্ষেপ নিতে হবে। চলতি বছর ডেঙ্গুতে আক্রান্ত হয়ে ৭৫ জনের মৃত্যু হয়েছে। তা খুবই দুঃখজনক। এ ছাড়া হাসপাতালে ভর্তি আছেন ২৩ হাজার ৫৯২ জন। যদি সামাজিক, পারিবারিক ও রাষ্ট্রীয়ভাবে আমরা সচেতন না হই- তা হলে বছরের বাকি সময়ে ডেঙ্গুতে আক্রান্ত ও মৃত্যুর সংখ্যা বাড়বে বলে মনে হচ্ছে। এভাবে ২০১৯ সালে ডেঙ্গু এক মারাত্মক ও ভীতিকর পরিস্থিতি সৃষ্টি করেছিল। ডেঙ্গু বিস্তার লাভ করে এডিস মশার মাধ্যমে। এডিস মশা রাতে আক্রমণ করে না। দিনে সূর্যোদয়ের পর দুই তিন ঘণ্টা ও সূর্যাস্তের আগের কয়েক ঘণ্টা এগুলোর আক্রমণ লক্ষণীয়। বাংলাদেশে ২০১৯ সালের আগস্টে একদিনে সর্বোচ্চ ১ হাজার ৭০০-এর বেশি রোগী ডেঙ্গুতে আক্রান্ত হয়েছিল। ডেঙ্গু নিয়ন্ত্রণে ঢাকার দুই মেয়র ও ডেঙ্গুতে আক্রান্ত জেলার অন্যান্য মেয়র কী করছেন, সেটি নিয়ে মানুষের কাছে নানা রকমের প্রশ্ন তৈরি হয়েছে। তাদের কাজে মানুষ বেশি খুশি না বলে মনে হচ্ছে। মেয়ররা উদ্যোগ নেন মাঝে মধ্যে। কিন্তু তা তেমন কাজে আসে না। উদ্যোগের ধারাবাহিকতা থাকতে হবে- যার সুফল পাবে জনগণ। প্রয়োজনীয় উদ্যোগ ও জনগণের সচেতনতার অভাবে আজ ডেঙ্গুর অবস্থা ভয়াবহ। ডেঙ্গুর ভয়ালরূপ থেকে মানুষকে কীভাবে রক্ষা করা যায়, সরকারকে সে বিষয়ে ভাবতে হবে।
জনসাধারণের ভূমিকাও সর্বদা ডেঙ্গু নিয়ন্ত্রণে প্রশ্নবিদ্ধ। আমরা সাধারণত সচেতন নই। পরিবেশ দূষণ করি এবং ড্রেনে পলিথিন ও অন্যান্য আবর্জনা ফেলে ড্রেনের স্বাভাবিক প্রবাহ নষ্ট করি। অতীতে ডেঙ্গু নিয়ন্ত্রণের ব্যর্থতার কারণ ছিল দীর্ঘকালীন বর্ষা ও গরম, সচেতনার অভাব, পরিকল্পনার অভাব, একই কীটনাশকের দীর্ঘমেয়াদি ব্যবহার, জরিপের ফল আমলে না নেওয়া, কারিগরি এবং সক্ষমতার অভাব ইত্যাদি অন্যতম। গত জুন থেকে আগস্ট পর্যন্ত সরকারি-বেসরকারি হাসপাতালে ডেঙ্গুতে মৃত্যুর সংখ্যা ছিল ২১। কিন্তু সেপ্টেম্বর মাসে বেড়ে ডেঙ্গুতে মানুষ মারা গেছেন ৩৫ জন। এ ছাড়া চলতি মাসে ইতোমধ্যে ১৯ জনের মৃত্যুর তথ্য পাওয়া গেছে। অর্থাৎ ডেঙ্গুতে আক্রান্ত রোগীর সংখ্যা এবং মৃত্যুর সংখ্যা- উভয় বেড়েই চলেছে। ডেঙ্গু প্রতিরোধ করতে হবে কঠোরভাবে। অন্যথায় মৃত্যুর সংখ্যা আরও বৃদ্ধি পাবে। তা কোনোভাবেই কাম্য নয়।
গত আগস্টে ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশন কর্তৃক এডিস মাশার ওপর জরিপ চালানো হয়। এর পরও ডেঙ্গুর প্রকোপ এত কেন? তা হলে জরিপ অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি, না অন্য কোনো জায়গায় দায়িত্বে অবহেলা রয়েছে? বর্তমানে রাজধানী ও রাজধানীর বাইরে একদিনে প্রায় ৩১০ জন ডেঙ্গুজ্বরে আক্রান্ত হয়ে বিভিন্ন হাসপাতালে ভর্তি হয়েছেন। তাই এডিস মশা নিধনের জন্য অধিক জনসচেতনতামূলক কার্যক্রম সরকারের হাতে নিতে হবে। পরিকল্পনা দ্রুত নিতে হবে- যাতে তাড়াতাড়ি কার্যকর করা যায়। দেশের এই সংকটে ডেঙ্গু ও চিকুনগুনিয়ায় কারও যেন মৃত্যু না হয়।
কখনো বৃষ্টি, কখনো রোদ- এ রকম আবহাওয়া এডিস মশার বংশবিস্তারে সহায়ক ভূমিকা পালন করে। তাই ডেঙ্গু ও চিকুনগুনিয়া প্রতিরোধে সবাইকে সতর্ক থাকতে হবে। এ ছাড়া শুধু সরকারের একার পক্ষে এডিস মশা দূর করা সম্ভব নয়। সবার সম্মিলিত প্রচেষ্টায়, বিশেষ করে নিজের ঘরবাড়ি ও আশপাশের পরিবেশ পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন রাখার মাধ্যমে এডিস মশার বংশবিস্তার রোধ করতে হবে। নিজ নিজ অবস্থানে থেকে এ বিষয়ে সবাইকে দায়িত্ব পালন ও অন্যকে ঘরবাড়ি পরিষ্কার রাখতে উৎসাহিত করতে হবে।
এডিস মশা গরমের দিনে বেশি আক্রমণ করে। বর্তমানে মশার উপদ্রব যেভাবে বৃদ্ধি পাচ্ছে, এতে জনমনে আতঙ্ক সৃষ্টি করছে। বিশেষ করে মে-জুলাইয়ে বেশি প্রকোপ দেখা যায়। কিন্তু এই বছর সেপ্টেম্বর ও অক্টোবরে বেশি দেখা যাচ্ছে। এসব জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে হচ্ছে। আরেকটি আতঙ্কের বিষয় হলো, অতীতে শুধু ঢাকায় ডেঙ্গুর লক্ষণ ছিল। কিন্তু ২০১৯ থেকে সারাদেশে ডেঙ্গুর বিস্তার ঘটেছে। ডেঙ্গু নিয়ে এখনই দ্রুত পরিকল্পনা ও আরও সতর্কতামূলক প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ গ্রহণ করা অত্যন্ত জরুরি। কারণ এডিস মশার ডিম্বাণু এক বছর পর্যন্ত তাদের অনুকূল পরিবেশ পেলে প্রজনন ক্ষমতা বৃদ্ধি করতে পারে। তাই ডেঙ্গু প্রতিরোধে কার্যকর কর্মসূচি গ্রহণ ও বাস্তবায়ন নিশ্চিত করতে হবে। আশা করি, ঢাকার মেয়রদ্বয় তাদের নির্বাচনী ইশতেহার অনুযায়ী জনসাধারণের সঠিক আকাক্সক্ষা পূরণ করতে পারবেন।
ডেঙ্গু নিয়ন্ত্রণে ডেঙ্গুর হটস্পট বের করতে হবে। সেই অনুযায়ী ব্যবস্থা নিতে হবে। কারণ প্রায় আমরা ডেঙ্গুর হটস্পট ব্যবস্থাপনায় ব্যর্থ হয়। ফলে ডেঙ্গুর প্রকোপ নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব হয় না। যেসব এলাকায় ডেঙ্গু রোগী বেশি দেখা যায়, সেসব এলাকায় ক্র্যাশ প্রোগ্রাম নিতে ও উড়ন্ত মশাগুলো মেরে ফেলতে হবে বলে অভিমত দিয়েছেন বিশেষজ্ঞরা। ফলে এক রোগী থেকে অন্য রোগী আক্রান্ত হওয়ার ঝুঁকি হ্রাস পাবে।
ডেঙ্গু নিয়ন্ত্রণে সঠিক নির্দেশনা প্রয়োজন। যেমন- সংশ্লিষ্ট বিশেষায়িত হাসপাতাল পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন করা, ড্রেন পরিষ্কার রাখা, বাড়ির আঙিনায় ফুলের টবে পানি জমতে না দেওয়া, ঝোপঝাড় পরিষ্কার করা, রাস্তার আশপাশসহ খানা-খন্দ পরিষ্কার বা ভরাট করা, জনকল্যাণমূলক সচেতনতা বৃদ্ধি করা ইত্যাদি। ডেঙ্গু প্রতিরোধে স্বাস্থ্য অধিদপ্তর কর্তৃক বিভিন্ন ওয়ার্কশপ ও সেমিনারের মাধ্যমে সচেতনতামূলক আলোচনা করা জরুরি। ঢাকায় কিউলেক্স ও এডিস মশার প্রজনন অত্যন্ত বেশি। তবে কিউলেক্স মশার ঘনত্ব বেশি। তাই রেফ্রিজারেটর বা এসির পানি জমতে না দেওয়া, ড্রেন ও নর্দমার পানি যাতে না জমে- এসব বিষয়ে অতিদ্রুত কার্যকর পদক্ষেপ গ্রহণ এবং লার্ভা ধ্বংস করার কীটনাশক স্প্রে করা খুবই জরুরি বলে মনে করি। অন্যথায় ডেঙ্গু আরও মারাত্মক আকার ধারণ করে নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যেতে পারে। ২০২৩ সাল বিশ্বের সব মানুষের জন্য খারাপ পরিস্থিতি সৃষ্টি করতে পারে। দেখা দিতে পারে খাদ্যসংকট। এসব বিবেচনা করে ডেঙ্গুকে মোকাবিলা করতে হবে। এ বছরের বাকি সময় এবং ভবিষ্যতে ডেঙ্গুতে আক্রান্ত হয়ে কারও ছেলে-মেয়ে, মা-বাবা ও ভাই-বোন মৃত্যুবরণ যেন না করে- এটিই হলো আমাদের প্রত্যাশা।
এডিস মশা প্রতিরোধে শুধু সরকারই দায়িত্ব নেবে, তা ঠিক নয়। নাগরিক হিসেবেও আমরা আমাদের দায়িত্ব উপেক্ষা করতে পারি না। যথাযথ কর্তৃপক্ষের দিকে তাকিয়ে না থেকে পাড়া-মহল্লা, গ্রাম-গঞ্জ ও শহরের বিভিন্ন ওয়ার্ডে জনসচেতনতার মাধ্যমে ডেঙ্গু দুর্যোগ মোকাবিলা করা সম্ভব। তাই মশার আবাস ও প্রজননস্থল ধ্বংস করে এডিস মশা সমূলে নির্বংশ করে আমরা একটি সুন্দর দেশ, বাসযোগ্য পরিবেশ গড়ে তুলব। ডেঙ্গু প্রতিরোধে সরকার ও সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ সঠিক কর্মপরিকল্পনা এবং সতর্কতামূলক ব্যবস্থা গ্রহণ করবে- এটিই হোক আমাদের অঙ্গীকার।
ড. শফিকুল ইসলাম : সাবেক সভাপতি, শিক্ষক সমিতি, জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলাম বিশ্ববিদ্যালয় (জাককানইবি), ত্রিশাল, ময়মনসিংহ