ই-পেপার ভিডিও ছবি বিজ্ঞাপন কুমিল্লার ইতিহাস ও ঐতিহ্য যোগাযোগ কুমিল্লার কাগজ পরিবার
কমরেড জাকির হোসেন
Published : Tuesday, 18 October, 2022 at 12:00 AM
কমরেড জাকির হোসেনশান্তিরঞ্জন ভৌমিক ।।
‘ছাত্র-রাজনীতি’ ধারণাটা জন্মে কলেজে ভর্তি হওয়ার পর। আমি গ্রামের ছেলে, গ্রামের স্কুলে পড়াশুনা করেছি, স্কুলে শিক্ষকগণই সকল বিষয়ে নেতৃত্ব দিতেন। গ্রাম পর্যায় অর্থাৎ ইউনিয়ন পরিষদের যিনি প্রেসিডেন্ট (এখন চেয়ারম্যান) ও ওয়ার্ডভিত্তিক মেম্বার ছিলেন, তাঁদের চিনতাম। তাঁদের জীবনযাপন অন্য দশজন সাধারণ মানুষের মতো ছিলো। নিজের অবস্থান থেকে কোনো নেতৃত্ব দেয়ার আগে মুরুব্বিদের অভিমত নিতেন। এমনও দেখেছি- এলাকার মুরব্বিরাই ঠিক করে দিতেন কে মেম্বার-প্রেসিডেন্ট হবেন। তাও দেখেছি- মেম্বার হওয়ার পর দ্বিতীয়বার এরূপ দায়িত্ব নিতে অপারগতা প্রকাশ করতেন। কারণ, পরিবারের প্রতি যথাযথ দায়িত্ব পালন করতে পারেননি বলে। বিশৃঙ্খলা সৃষ্টি হতো। মনে পড়ে, দীনেশ দাসকে উড়োজাহাজ মার্কায় মেম্বার নির্বাচিত করা হয়েছিল। পরের বার অনেক অনুরোধেও রাজি করানো যায় নি।
১৯৬১ খ্রি, কুমিল্লা ভিক্টোরিয়া কলেজে ভর্তি হই। ক্লাশ করি, পাঠ্যবই পড়াশুনা নিয়ে ব্যস্ত। কয়েক মাস পর দেখতে পাই, কোনো কোনো ছাত্র-সহপাঠী ক্লাশে এসে পিছনে বসেন, নাম ডাকার পর এক ফাঁকে পিছনের দরজা দিয়ে বেরিয়ে যান। স্যারেরা দেখেও বাধা দেন না। কোনো কোনো স্যার অনুচ্চ কন্ঠে বলেন, ‘ঝামেলা খেকে বাঁচা গেল’। এরূপ ছাত্রসংখ্যা অতি নগণ্য এবং তারা সকলেই শহুরে। ১৯৬২ খ্রি. কুখ্যাত আইয়ূব খান আমলে পূর্ব পাকিস্তানের ছাত্র সমাজকে প্রদমিত করার জন্য হামিদুল হক শিক্ষা কমিশনের মাধ্যমে স্নাতক পর্যায় দুই বছরের স্থলে তিন বছর করে দেয়। শুরু হলো ছাত্র আন্দোলন। সামরিক শাসনের প্রচণ্ড রোষে ছাত্র ছাত্রসমাজ, পূর্ব পাকিস্তানের ছাত্রসমাজ, কিন্তু প্রদমিত করা গেলোনা। অনেক ছাত্রের বিরুদ্ধে হুলিয়া- প্রমাণহীন গ্রেফতারি পরোয়ানা দেখিয়ে ধরে নিয়ে গিয়ে নির্যাতনের সংবাদ পেতে থাকি। কী ভয়াবহ পরিস্থিতি। তখনই আমাদের তিন সহপাঠীর কথা শুনতে পাই ব্যাপকভাবে। তাঁরা হলেন সৈয়দ রেজাউর রহমান, আফজল খান ও হাবিবউল্লাহ চৌধুরী। তিনজনের মধ্যে প্রথমোক্ত দু’জনের বন্ধুত্ব প্রগাঢ়। তাঁরা একই এলাকার অধিবাসী, তবে মারমুখী টেরর হিসেবে আফজল খানের নামটি উচ্চারিত হতো ছাত্রদের মুখে মুখে। তখনই ছাত্র সংগঠনের নামগুলো জানতে পারি- ছাত্রলীগ-ছাত্র ইউনিয়ন ইত্যাদি। তবে কলেজে তখন ছাত্রলীগের দাপট বেশি। কারণ, এ সংগঠনটি ছিল আওয়ামী লীগের অঙ্গসংগঠন।
১৯৬৩ খ্রি. উচ্চমাধ্যমিক পাস করে বাংলা অনার্সে ভর্তি হই। সে বছর ছাত্র সংসদের ভিপি হলেন বন্ধুবর আবদুল মান্নান মজুমদার, ১৯৬৪ খ্রি. ভিপি হলেন বাংলায় অনার্স-এর ছাত্র মোঃ আবদুর রউফ। ছাত্র-রাজনীতির কারণে উল্লেখিত সৈয়দ রেজাউর রহমান ও আফজল খান পড়াশোনায় একটু পিছিয়ে পড়েন। তাই ১৯৬৫ খ্রি. ভিপি হলেন আফজল খান। পাশাপাশি প্রতিযোগিতায় ছাত্র ইউনিয়নও তাঁদের কর্মকাণ্ড চালিয়ে গেছেন সমানতালে ।
এখানে একটি কথা বলা দরকার। পাকিস্তান আমলে কমিউনিস্ট পার্টি নিষিদ্ধ ছিল। পার্টির নেতৃবৃন্দ মণি সিংহ, মোঃ ফরহাদ সহ অনেকেই আত্মগোপনে। এদিকে আওয়ামী মুসলিম লীগ যখন ১৯৫৫ খ্রি. কাউন্সিলের মাধ্যমে দলের সাধারণ সম্পাদক শেখ মুজিবুর রহমানের প্রস্তাবে ও  জোরালো ভূমিকার কারণে দলকে অসাম্প্রদায়িক করার লক্ষ্যে দলের নাম থেকে ‘মুসলিম’ শব্দটি বাদ দেওয়া হলো, তখন আওয়ামী মুসলিম লীগের প্রতিষ্ঠাকালীন সভাপতি মওলানা ভাসানী দলত্যাগ করে আওয়ামী ন্যাশনাল পার্টি গঠন করলেন, তাও পরবর্তীতে ভেঙ্গে ন্যাপ দু’ভাগ হয়ে যায়। দল একই নামে চললেও লেখা হতো ন্যাপ (ভাসানী), ন্যাপ (মোজাফফর)। এই ন্যাপ (মোজাফফর)-এর ছাত্র সংগঠনে কমিউনিস্ট পার্টি সমর্থক ছাত্ররা ছাত্র ইউনিয়ন (মতিয়া) পরিচিতিতে সংযুক্ত হয়ে যায়। আর ভাসানী ন্যাপের ছাত্র সংগঠন ছাত্র ইউনিয়ন (মেনন) পরিচিতিতে পদচলা শুরু করে। তবে বলতে দ্বিধা নেই যে, মোজাফফর- ন্যাপের ছাত্র সংগঠন ছাত্র ইউনিয়ন (মতিয়া) যেভাবে প্রভাব ও নেতৃত্ব দিতে সক্ষম হয়েছিলেন, ছাত্র ইউনিয়ন (মেনন) সেভাবে বিকশিত হতে পারেনি। ছাত্র ইউনিয়ন (মতিয়া) ছাত্রলীগের সঙ্গে মোটামুটি একটি সমর্থক প্রতিযোগিতায় এগিয়ে যেতে সক্ষম হয়েছিল। ফলে দেখি, এক বছর ভিক্টোরিয়া কলেজের ছাত্র সংসদের ভিপি হয়ে যান মোঃ ওমর ফারুক। বিকশিত ছাত্রনেতা হিসেবে আলোচনায় চলে আসেন সৈয়দ আহমদ বাকের, হুমায়ূন কবীর মজুমদার, জাকির হোসেন, নীলিমা পাল সহ অনেকে।
১৯৬৬ খ্রি. আমি বাংলা অনার্স পাস করে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হই, কেন্দ্রীয় ছাত্র নেতাদের দাপট ও প্রভাব স্বচক্ষে দেখেছি। রাজনীতি না করলেও অভিজ্ঞতা অর্জনে ঘাটতি ছিল না। জগন্নাথ হল ছিল ছাত্র ইউনিয়নের ঘাঁটি। আমি জগন্নাথ হলে থাকি। সাময়িকভাবে দু’মাস রুমমেট হিসেবে পেয়ে যাই সুরঞ্জিত সেনগুপ্ত মহোদয়কে। তিনি আমার এক বছরের সিনিয়র। তখন তিনি সাধারণ ইতিহাস বিষয়ে এম.এ পরীক্ষা দিচ্ছেন। তাঁর বদৌলতে পংকজ ভট্টাচার্য্য, মতিয়া চৌধুরী, বামন দাশ, কাশীনাথ দাশ আরও অনেক ছাত্রনেতার সাথে পরিচয় হয়। এই ইতিহাস ভিন্ন।
যেহেতু ছাত্র রাজনীতি করিনি, পরবর্তীতে এম.এ পাশ করে কলেজে শিক্ষকতা শুরু করেছি চট্টগ্রামে রাঙ্গুনিয়া কলেজে, কুমিল্লা থেকে কিছুটা বিচ্ছিন্ন অবস্থা। ১৯৬৯-১৯৭২ খ্রি. পর্যন্ত মূলত কুমিল্লায় তেমনভাবে ছিলাম না। ১৯৭২ খ্রি. ১৫ ডিসেম্বর কুমিল্লা মহিলা কলেজে বাংলা বিভাগে শিক্ষক হিসেবে যোগদান করি এবং তারপর থেকে কুমিল্লার রাজনৈতিক অঙ্গনে যাঁরা স্ব স্ব অবস্থানে প্রতিষ্ঠিত এবং দলীয়ভাবে নেতৃত্বে রয়েছেন, তখন থেকে তাঁদেরকে চিনতে ও বুঝতে পারার সুযোগ পাই। কিন্তু সখ্যতা হওয়ার সুযোগ ঘটেনি।
ছাত্র ইউনিয়ন সম্পর্কে আমার স্বচ্ছ ধারণা না থাকলেও যাঁরা মোজাফফর ন্যাপ করতেন এবং এই ন্যাপের ছাত্র সংগঠন ছাত্র ইউনিয়নের অনুসারী ছিলেন, তাঁদের সম্পর্কে এক ধরনের শ্রদ্ধাবোধ জ্ঞাপন করতাম। তাঁদের চিন্তাভাবনায়, আচরণে, আদর্শযাপনে আন্তরিকতা ছিল নির্মোহভাবে। যদিও তাঁরা রাষ্ট্র ক্ষমতায় যেতে পারেননি, কিন্তু নিজের অবস্থান থেকে জনগণের সমর্থন আদায় করতে পেরেছেন। আদর্শচেতাদের মধ্যে কেউ কেউ যখন পথ হারিয়ে ফেলেছেন, তাঁদের আর আত্মপরিচয় রইল না। তা ভিন্ন প্রসঙ্গ।
জাকির হোসেনকে আমি কমই জানি। ব্যক্তিগত পরিচয় ছিল। স্বচ্ছ রাজনীতিবিদ হিসেবে তিনি আমার বিবেচনায় অনড় ব্যক্তি ছিলেন, নিজের ঠিকানাটা পৈত্রিক সম্পদের মতো আজীবন আঁকড়িয়ে ধরে নিজেকে আপসহীন করে তুলে নিজের স্থানটি অটুট রেখে গেছেন। তিনি ছিলেন আপাদমস্তক জনদরদী নির্ভেজাল রাজনীতিবিদ। তাঁর ত্যাগের ক্ষেত্রটি দৃশ্যমান না হলেও অবস্থানটি ছিল শক্তমাটির মধ্যে প্রোথিত। একসময় জাকির-শারমিন দম্পতি যখন আমাদের রাজনীতিচর্চায় আলোচ্য বিষয় হিসেবে দৃশ্যমান হলো, বুঝে গেলাম সংসার পাতলেন, সংসারি হলে যে অনুষঙ্গগুলো গাঁট বাঁধে, তার ধারেও গেলেন না, কাছেও ঘেঁষতে দিলেন না। যেমনটি অনেকটা মতিয়া-বজলুর রহমান দম্পতি স্বরূপ।
শারমিন জাকিরের সঙ্গে আমার কথা কম হয়েছে, দেখা হয়েছে কয়েকবার। একবার টাউন হলে এক অনুষ্ঠানে আমি বসে আছি, তিনি আমার কাছে এসে বসলেন এবং বললেন, ‘আমি আপনার লেখা পড়ি, ভাল লাগে’। আমার লেখক জীবনের সার্থকতা যদি কিছু থাকে, মৌখিক এই স্বীকৃতি কি বিরাট সনদ নয়? আমাদের চার চোখের মিলন হয়েছিল একটি নির্মল হাসির বিনিময়ে। তদ্রƒপ জাকির হোসেন যখন আমার মুখোমুখি হয়েছেন, কোনো কোনো প্রাসঙ্গিকতায়, তাঁর বিনম্র সম্ভাষণ আমাকে বিমোহিত করেছে। আমি স্পষ্ট দেখতে পেতাম- একজন নিরলস পথিককে, বুঝতে চাইতাম তাঁর চোখের ভাষা, পড়তে চেষ্টা করতাম তাঁর জীবনপাতায় কি লেখা আছে। এ পাতাগুলো সাদা ছিল না,  দুর্বোধ্যও ছিল না। ছিল সংরক্ষিত দলিল, যার জন্য কোনো সাক্ষীর প্রয়োজন পড়েনি।
একজন মানুষকে চিনতে-জানতে হলে গভীরভাবে অবলোকন করতে হয়, অন্তর চক্ষু দিয়ে দেখতে হয়, একসাথে অনেকটা পথ চলতে হয়। এক্ষেত্রে আমি পিছিয়ে পড়া একজন ভিন্ন জগতের মানুষ। কিন্তু চোখ বুঝে তো পথ চলিনি। কুমিল্লায় যাঁরা স্বচ্ছ রাজনীতিচর্চা করছেন, করেছেন; নির্লোভ থেকে নিজেকে উজাড় করে বিলিয়ে দিয়েছেন, দিচ্ছেন, তাঁদেরকে তো চিনতে ভুল হয় না। তারপরও জাকির হোসেনকে কি তেমনভাবে আমরা চিনতে-জানতে-বুঝতে পেরেছি? তিনি তো অনেকটা পথ একাই চলেছেন, একসাথে অনেকেই ম্যারাথনে যোগ দিয়েছিলেন, একসময় তিনি দম নিতে গিয়ে দেখলেন- একপাশে শারমিন জাকির, অন্যপাশে তাঁরা কোথায়? সুতরাং কুমিল্লায় জাকির হোসেন একজনই ছিলেন- যাঁর বন্ধু অনেক, বান্ধবের ঘর-শূন্য। তিনি হয়ত সে অর্থে বিখ্যাত কেউ নন, কিন্তু রাজনীতিতে আদর্শ  যাপনের ক্ষেত্রে তাঁর উপস্থিতি ছিল অনিবার্য।
জাকির হোসেন জীবিত অবস্থায় সংগঠনের নানা পদে থেকে দায়িত্ব পালন করেছেন, সর্বক্ষেত্রে নিষ্ঠা ও যোগ্যতার পরিচয় দিয়েছেন। তারপরও যে রাজনীতিচর্চায় দেশকালে নানা প্রতিকূলতা দেখা দেয়, তখন নিজেকে স্বস্থানে টিকিয়ে রাখতে সংগ্রাম করতে হয়। বিশেষত ব্যক্তিজীবনে কোনো চাওয়া পাওয়া না থাকলে তিনি কখনও বিভ্রান্ত হননা। জাকির হোসেন জীবনের শেষ দিন পর্যন্ত এক্ষেত্রে অকৃত্রিম ছিলেন। তাঁর সহকর্মীরা যখন আদর্শচ্যুত হয়েছেন, তিনি প্রতিবাদ করেননি, কিন্তু তা মেনেও নেননি। যারা আদর্শচ্যুত হয়ে ভিন্ন বলয়ে সংযুক্ত হয়েছেন, তারা কিন্তু কোনোভাবেই বিকশিত হতে পারেননি। এটা বাস্তবতা। আপন শাশুড়ি-পিসি শাশুড়ি এককথা নয়। এতে আদর্শবাদী দলের তেমন ক্ষতি না হলেও একটা দাগ তো পড়ে? একবার বঙ্গবন্ধু অধ্যাপক মোজাফফর আহমদকে বলেছিলেন, ‘তুমি কর্মী ধরে রাখো আদর্শ দিয়ে- আমাকে পারমিট-লাইসেন্স দিয়ে ধরে রাখতে হয়’ ইত্যাদি। এই ন্যাপের আদর্শবাদিতা, তা সারা জীবন পালন করে গেছেন জাকির হোসেন। তাই দায়িত্ব নিয়েই বলতে পারি- কুমিল্লায় একজনই আদর্শবাদী জাকির হোসেন ছিলেন- তিনিই প্রকৃত কমরেড জাকির হোসেন।
লেখক: সাবেক অধ্যাপক ভিক্টোরিয়া সরকারি কলেজ, লেখক, গবেষক।