
গওহার নঈম ওয়ারা ||
ডেঙ্গু মৌসুমের শেষের দিকে পরিস্থিতি ভয়াবহ হতে পারে বলে বিশেষজ্ঞরা আগাম সতর্ক করেছিলেন। শরতে টানা বৃষ্টির চেয়ে থেমে থেমে বৃষ্টিপাতের প্রবণতা থাকে। এ রকম বৃষ্টিতে বাড়ির আশপাশে, ছাদের টবে ও চৌবাচ্চায় সহজেই পানি জমে যায়। এটা এডিস মশার বংশ বিস্তারের জন্য উপযোগী। তা ছাড়া স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের রোগ নিয়ন্ত্রণ শাখার নিয়মিত জরিপও জানিয়েছিল এবার মশা বেশি। গত দুই বছরের তুলনায় এডিস এবার প্রায় সারাদেশেই রাজত্ব করছে। বিশেষজ্ঞদের অভিযোগ, মশা দমনে দ্রুত ব্যবস্থা না নেওয়ায় দিন দিন পরিস্থিতির অবনতি হচ্ছে। এখন পরিস্থিতি মুঠোর বাইরে চলে যাওয়ার পথে।
প্রতিদিন কেউ না কেউ মারা যাচ্ছে হাসপাতালে, বাড়িতে, ক্লিনিকে। মৃত্যুর এই বেগতিক গতি সম্পর্কে মন্তব্য করতে গিয়ে ঢাকার একটি সরকারি হাসপাতালের সহকারী রেজিস্ট্রার জানালেন, ‘ডেঙ্গু আক্রান্ত রোগীদের বেশিরভাগই সংকটপূর্ণ অবস্থায় হাসপাতালে আসছেন বলেই ডেঙ্গুতে মৃত্যুর সংখ্যা বাড়ছে।’
ডেঙ্গুর নতুন ‘এপি’ সেন্টার কক্সবাজার!!
আত্মতুষ্টির ঢেঁকুর তুলে সম্প্রতি স্থানীয় সরকারমন্ত্রী বলেছিলেন, ‘২০২০, ’২১ ও ’২২- তিন বছর আমাদের পার্শ্ববর্তী দেশগুলোর তুলনায় সফলতা অর্জন করেছি।’ কিন্তু যতই দিন যাচ্ছে ততই ডেঙ্গু রোগীর সংখ্যা বেড়েছে। শুধু ঢাকা নয়, বরং সারাদেশে ডেঙ্গুর এখন রমরমা অবস্থা। এ বছর ডেঙ্গুতে প্রথম মৃত্যু হয় জুন মাসে। সে মাসে একজনেরই মৃত্যুর তথ্য দিয়েছিল স্বাস্থ্য অধিদপ্তর। জুলাই মাসে মৃত্যু বেড়ে নয়জনে দাঁড়ায়। পরের মাসে অর্থাৎ আগস্টে মৃত্যু হয় ১১ জনের। আর চলতি সেপ্টেম্বর মাসের প্রথম ১০ দিনে মৃত্যু হয়েছে ১১ জনের। এর মধ্যে একদিনে পাঁচজনের মৃত্যু হয়েছিল। গত ১০ সেপ্টেম্বর পর্যন্ত সরকারি হিসাবমতো ডেঙ্গুতে যে ৩২ জনের মৃত্যু হয়েছে তার প্রায় অর্ধেক মৃত্যু হয়েছে কক্সবাজার জেলায়। (সূত্র স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের হেলথ ইমার্জেন্সি অপারেশন সেন্টার ও কন্ট্রোল রুম)। দেশের আর কোনো জেলায় এ বছর এত মৃত্যু হয়নি। কক্সবাজার জেলার সিভিল সার্জন অফিসের সূত্রে জানা যায়, সে জেলায় সেপ্টেম্বরের ১৫ তারিখ পর্যন্ত ১৩ হাজার ৮৬৫ জন ডেঙ্গুতে আক্রান্ত হয়েছে। অবশ্য এদের বড় অংশ রোহিঙ্গা শিবিরের বাসিন্দা। কক্সবাজার জেলার মধ্যে আবার টেকনাফ উপজেলায় ডেঙ্গুর প্রতাপ অনেক বেশি। সরকারি হিসাবে, পুরো কক্সবাজার জেলায় চিকিৎসা নিতে যত ডেঙ্গু রোগী হাসপাতালে ভর্তি হয়েছে, তার চারগুণের বেশি রোগী টেকনাফ উপজেলায় শনাক্ত হয়েছে। আরেকটি সূত্র জানাচ্ছে, কক্সবাজারের টেকনাফ উপজেলায় আন্তর্জাতিক উদরাময় গবেষণা কেন্দ্র বাংলাদেশের (আইসিডিডিআরবি) পরীক্ষাগারসহ মোট ১২টি সরকারি-বেসরকারি পরীক্ষাগারে গত সাড়ে তিন মাসে ৪ হাজার ২৯২ জন ডেঙ্গু রোগী শনাক্ত হয়েছে।
কক্সবাজারের পরিস্থিতি বোঝার জন্য সরকারের রোগতত্ত্ব, রোগনিয়ন্ত্রণ ও গবেষণা প্রতিষ্ঠানের (আইইডিসিআর) একাধিক দল এ জেলা পরিদর্শন করেছে। আইইডিসিআরের পরিচালক অধ্যাপক তাহমিনা শিরীন সংবাদমাধ্যমকে জানান, ‘চট্টগ্রাম বিভাগে, বিশেষ করে কক্সবাজার জেলায় ডেঙ্গুর প্রকোপ বেশি।
সেখানে এডিস মশার ঘনত্ব বেশি দেখা গেছে। অন্যদিকে এই জেলায় পরীক্ষা করানোর সুযোগ-সুবিধা বেশি থাকার কারণে বেশি মানুষ পরীক্ষা করাচ্ছে, বেশি শনাক্ত হচ্ছে। দেশের সব জেলায় এমন সুযোগ থাকলে দেখা যেত রোগীর সংখ্যা আরও বেশি।’ অধ্যাপক তাহমিনা শিরীনের পর্যবেক্ষণের ওপর নির্ভর করে বলা চলে পরীক্ষার সহজ সুযোগ থাকলে সারাদেশে শনাক্তের হার আরও বেশি হতো।
শেষ খবর (২১ সেপ্টেম্বর ২২) অনুযায়ী এখন পর্যন্ত যে ৪৬ জনের মৃত্যু নথিভুক্ত হয়েছে তার মধ্যে ২৫ জনই মারা গেছেন এই সেপ্টেম্বরে। সেপ্টেম্বর শেষ হতে এখনো এক সপ্তাহ বাকি, এর পরও কি আমরা দাবি করব আমরা অন্যদের থেকে ভালো আছি ? সবকিছু নিয়ন্ত্রণে!!
ডেঙ্গু এখন আর মহানগরের জ্বর নয়। রোহিঙ্গা আশ্রয় শিবির ছাড়াও কক্সবাজারের উখিয়া ও টেকনাফে ডেঙ্গু আক্রান্তের সংখ্যা আশঙ্কাজনকভাবে বাড়ছে। চট্টগ্রাম ও বরিশাল থেকেও মৃত্যুর খবর আসছে। কমপক্ষে ৫০টি জেলায় ডেঙ্গু রোগী এখন নানা সরকারি স্থাপনায় চিকিৎসা নিচ্ছেন।
এডিস মশাকে চিনতে হবে
প্রাণিবিজ্ঞানীরা মনে করেন এডিস মশাকে ঠিকমতো চিনলে সতর্ক থাকা সহজ হবে। চেনার উপায় বলতে গিয়ে তারা বলেন, এই মশা অন্য মশাদের চেয়ে কালো ধরনের হবে। পায়ে এবং পাশে সাদা ডোরাকাটা থাকবে। এডিসের মাথার পেছনে ওপরের দিকে কাস্তে ধরনের সাদা দাগ থাকে। বাকি মশাদের মাঝ বরাবর সাদা দাগ চলে গেছে। এই দুটো দেখেই বোঝা যায় কোনটা এডিস আর কোনটা নয়। এডিস মশার ধরন ও তার আচার-আচরণ নিয়ে আমাদের হাল নাগাদ থাকতে হবে। আগে বলা হতো এডিস রাতে কামড়ায় না, দিনে কামড়ায়। এখন জানা যাচ্ছে এডিস মশা যদিও বেশি কামড়ায় দুপুরের দিকে (সূর্যোদয়ের ২ ঘণ্টা পর থেকে সূর্যাস্তের ১ ঘণ্টা আগে পর্যন্ত) তবে রাতেও কামড়াতে পারে। বিশেষ করে যেসব অঞ্চলে রাতে উজ্জ্বল আলো থাকে, সেখানে এডিস মশার সক্রিয়তা বেশি। অফিস, শপিংমল, ইনডোর অডিটোরিয়াম আর স্টেডিয়ামের মতো জায়গাগুলোতে এডিস মশার আনাগোনা বেশি। যেখানে উজ্জ্বল আলো সেখানেই এডিস দিন-রাতের পার্থক্য করে না।
প্রতিকারের চেয়ে প্রতিরোধই উত্তম
বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার (ডব্লিউএইচও) অন্যতম পরামর্শ হলো এর বাহক নিয়ন্ত্রণ বা সংক্রমণ বন্ধ করা। আজ থেকে পাঁচ বছর আগে ২০১৭ সালে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার রোগতত্ত্ববিদ কে কৃষ্ণমূর্তি ঢাকায় এসেছিলেন সরেজমিন পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ করে সরকারের পরামর্শ দেওয়ার জন্য। তিনি সবার সঙ্গে কথা বলে একটা মধ্যবর্তী পরিকল্পনার দলিল তৈরি করেন। এডিস জাত ডেঙ্গু ও চিকুনগুনিয়া নিয়ন্ত্রণ ও প্রতিরোধ মধ্যবর্তী পরিকল্পনা নামের ২২ পৃষ্ঠার সেই দলিলে কীভাবে ডেঙ্গু প্রতিরোধ করতে হবে তার দিকনির্দেশনা ছিল। কৃষ্ণমূর্তি তার প্রতিবেদনে রোগ প্রতিরোধ ও নিয়ন্ত্রণ কর্মসূচির পাশাপাশি একটা ‘র্যাপিড রেসপন্স টিম’ গঠনের কথা বলেছিলেন। সেই টিমে থাকবে রোগতত্ত্ববিদ, কীটতত্ত্ববিদ, অণুজীববিজ্ঞানী, তথ্য-শিক্ষা-যোগাযোগ বিশেষজ্ঞ এবং গণমাধ্যমকর্মী। এ ছাড়া ১২টি মন্ত্রণালয়কে স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের কাজের সঙ্গে যুক্ত হতে বলা হয়েছিল। কার্যত সেই দলিল আলমারিতেই তালাবন্দি আছে, এখন পর্যন্ত সেভাবে আলোচিতই হয়নি, বাস্তবায়ন অনেক দূরের কথা। কথা ছিল ২০১৯ সালের মধ্যে কথিত পরিকল্পনা বাস্তবায়িত হবে। শুধু বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার পরামর্শ নয়, অভিজ্ঞ দেশি বিশেষজ্ঞদের পরামর্শ ও আন্তরিকভাবে আমলে নেওয়া হয়নি তাই নিয়ন্ত্রণহীনভাবে ডেঙ্গুর প্রকোপ বাড়ছে বা কমছে।
অন্যান্য দেশে কী হচ্ছে
কলকাতার কোনো এলাকায় ডেঙ্গুর উপস্থিতি পাওয়া গেলে ওই এলাকা বন্ধ বা লকডাউন করা হয়। উদ্দেশ্য আক্রান্ত এলাকার সব মশা আর তাদের উৎপত্তিস্থল ধ্বংস করে পরিস্থিতি সম্পূর্ণ নিয়ন্ত্রণে আনা। এক এলাকার মশা অন্য এলাকায় চলে যাওয়ার সুযোগ দেওয়া হয় না। অন্যদিকে ঢাকায় দেখি এক এলাকায় ফগার মেশিনে ওষুধ ছিটানো হলে মশাগুলো অন্য এলাকায় চলে যায়। ফলে ডেঙ্গু নিয়ন্ত্রণে আসে না। আমাদের মশা মারার কর্তারা যদি এই বিষয়ে একটু আমল করতেন। কলকাতা মডেল এখানেও কাজ করবে যদি নিয়ত ঠিক থাকে। কলকাতার আলো, বাতাস, পরিবেশ ও মানুষের সংস্কৃতির সঙ্গে আমাদের অমিলের চাইতে মিলই বেশি।
কলকাতার কোনো এলাকায় ডেঙ্গু রোগী পাওয়া গেলে সঙ্গে সঙ্গে র্যাপিড অ্যাকশন চিকিৎসা টিম ওই রোগীকে হাসপাতালে ভর্তি করে দেয়। তিনি কীভাবে আক্রান্ত হলেন তার বিবরণ জেনে ডেঙ্গুর উৎপত্তিস্থল খুঁজে নির্মূল করা হয়।
অস্ট্রেলিয়ার মেলবোর্নের মোনাশ বিশ্ববিদ্যালয়ের মশা নিয়ে গৃহীত একটি গবেষণা কর্মসূচির মাধ্যমে ২০১৪ সাল থেকে ‘ভালো মশা’ দিয়ে ক্ষতিকর মশা মারার এক কার্যক্রম শুরু করেছে। ২০১৪ থেকে ২০১৬ সাল পর্যন্ত অস্ট্রেলিয়ার টাউন্সভিলি শহরে ভালো মশা ছেড়ে দেয়। এ কর্মসূচির সময় দেখা যায়, শহরে বসবাস করা নাগরিকদের মধ্যে যারা ওই সময়ে শহরের বাইরে অন্য কোথাও যাননি তাদের মধ্যে মাত্র চারজনের ডেঙ্গু ধরা পড়ে। কর্মসূচি শুরুর আগে এ সংখ্যাটি ছিল ৫৪। অস্ট্রেলিয়া, ভিয়েতনাম, ইন্দোনেশিয়া, ব্রাজিল, কলম্বিয়া এবং শ্রীলংকাসহ ১২টি দেশের সরকার মাঠ পর্যায়ে পরীক্ষামূলক এ কর্মসূচি চালাচ্ছে। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা বলছে, মশার সংখ্যা কমাতে এটি একটি নতুন কার্যকর পদ্ধতি। অভিজ্ঞতা অর্জনের জন্য বিদেশ ভ্রমণের সুযোগ রেখে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা বাংলাদেশকে এই গবেষণার অন্তর্ভুক্ত করলে আমাদের আমলারা সানন্দে রাজি হবেন।
মোদ্দা কথা চলমান প্রক্রিয়ায় বাতাসে কীটনাশক ছিটিয়ে এডিস মশা তথা ডেঙ্গু নিয়ন্ত্রণে আনা যাচ্ছে না, যাবে না। মশার প্রজননস্থলে মশার লার্ভা নষ্ট করতে পারলেই ৮০ শতাংশ সফলতা অর্জন সম্ভব। ডেঙ্গুর মূল মৌসুমের চার মাস জোরালোভাবে কাজ করা ছাড়াও সারা বছর ডেঙ্গু প্রতিরোধ অভিযান চালাতে হবে। মনে রাখতে হবে বর্ষা যেমন মৌসুম হারাচ্ছে ডেঙ্গু তেমন যে কোনো ঋতুতেই হানা দিতে পারে।
গওহার নঈম ওয়ারা : লেখক ও গবেষক