ই-পেপার ভিডিও ছবি বিজ্ঞাপন কুমিল্লার ইতিহাস ও ঐতিহ্য যোগাযোগ কুমিল্লার কাগজ পরিবার
বিশ্ব মেরুরজ্জু আঘাত দিবস
মোঃ রফিকুল ইসলাম সোহেল
Published : Wednesday, 7 September, 2022 at 12:00 AM, Update: 07.09.2022 1:52:38 AM

বিশ্ব মেরুরজ্জু আঘাত দিবসআন্তর্জাতিক মেরুরজ্জু (স্পাইনাল কর্ড) আঘাত সোসাইটি কর্তৃক ২০১৬ সাল থেকে প্রতি বছর ৫ ই সেপ্টেম্বর আন্তর্জাতিক মেরুরজ্জু আঘাতদিবস পালিত হয়ে আসছে । মেরুরজ্জু আঘাত দিবস কে আলাদা করে পালন করার উদ্দেশ্য হচ্ছে মূল ধারার জনসাধারনকে মেরুরজ্জুর (স্পাইনাল কর্ড) আঘাত সম্পর্কে সচেতন করা এবং মেরুরজ্জু আঘাত প্রাপ্ত ব্যক্তিদের পাশে দাড়ানোর জন্য সর্বসাধারনেরদৃষ্টি আকর্ষন করা।মেরুরজ্জু (স্পাইনাল কর্ড) আঘাত সম্পর্কিতযে কোন বিষয়আলোচনা করলেই চোখের সামনে ভেসে উঠেপরম শ্রদ্ধেয় সিস্টার ভ্যালেরি টেইলরেরনাম এবং তার প্রতিষ্ঠিত’’পক্ষাঘাতগ্রস্থদের পূর্নবাসন কেন্দ্রে” (সি আর পি) কথা। সিআরপি ১৯৭৯ সাল থেকে নিরিবিচ্ছিন্নভাবে মেরুরজ্জু আঘাতপ্রাপ্ত রোগী সহ সকল প্রতিবন্ধীদের চিকিৎসা ও পূর্নবাসন সেবা দিয়ে আসছে।
মেরুদন্ড কি:মেরুরুজ্জু কি জানতে হলে জানতে হবে মেরুদন্ড কি। প্রকৃতপক্ষে মেরুদন্ড হলো অনেকগুলো কশেরুকার উপর্যপুরি একটি বিন্যাস। কশেরুকার হলো অস্থি (হাড়) এবং হায়ালিন তরুণাস্থিও(নরম হাড়) সমন্বয়ে গঠিত জটিল কাঠামো।  মেরুদণ্ডের কাঠামোটিকে কে ৫ টি অঞ্চলে ভাগ কার হয়েছে। ক) গ্রীবাদেশীয়অঞ্চলে ৭টি, খ) বক্ষদেশীয় অঞ্চলে ১২টি, গ) কটিদেশীয় অঞ্চলে ৫টি, ঘ) শ্রোনীদেশীয় অঞ্চলে ৫টি (জন্মের সময়ে সংখ্যায় ৫টি অস্থি থাকলেও বয়ঃসন্ধিকালে তা পরষ্পর যুক্ত হয়ে ১টি অস্থিতে পরিণত হয়)ঙ) পুচ্ছদেশীয় অঞ্চলে ৪ টি (জন্মের সময়ে সংখ্যায় ৪টি অস্থি থাকলেও বয়ঃসন্ধিকালে তা পরষ্পর যুক্ত হয়ে ১টি অস্থিতে পরিণত হয়)সর্বমোট ৩৩ টি কশেরুকা বা হাড়নিয়ে মানুষের মেরুদণ্ডের কাঠামোটি গঠিত।
মেরুরুজ্জু কি :মেরুরজ্জু (স্পাইনাল কর্ড) একটি দীর্ঘ, সরু, নলাকার স্নায়ু(অনুভুতি)গুচ্ছ। এটি মস্তিষ্কে অবস্থিত কেন্দ্রীয় স্নায়ু (অনুভুতি)তন্ত্রের একটি সম্প্রসারণ এবং এটি অত্যন্ত সুরক্ষিতভাবে মেরুদণ্ডের ভিতরে অবস্থান করে।মেরুরুজ্জু খালি চোখেদেথতে সাদা রংয়ের দেখায়।
মেরুরজ্জেুর কাজ ঃমেরুরজ্জরু (স্পাইনাল কর্ড) মূল কাজ মস্তিষ্ক ও প্রান্তীয় স্নায়ুতন্ত্রের মধ্যে স্নায়ুবিক যোগাযোগ রক্ষা করা।মস্তিষ্কের সঙ্গে বিভিন্ন মাংশপেশি, ত্বক এবং অঙ্গপ্রত্যঙ্গের সঙ্গে যোগাযোগের মাধ্যম হিসেবে কাজ করেমেরুরজ্জু। নির্দিষ্ট উত্তেজনার প্রভাবে মানবদেহে যে তাৎক্ষণিক, স্বতঃস্ফূর্ত এবং অনৈচ্ছিক প্রতিক্রিয়ার সৃষ্টি হয় তাকে প্রতিবর্ত ক্রিয়া বলে। প্রতিবর্ত ক্রিয়ার ফলে সৃষ্ট নির্দিষ্ট উত্তেজনা মানব দেহের বিভিন্ন অংশে তাৎক্ষণিকভাবে পৌছে দেওয়ার কাজটি মেরুরজ্জেুর মাধ্যেমেই হয়ে থাকে।
মেরুরজ্জেুর আঘাত ও কারন : মস্তিষ্কের সঙ্গে বিভিন্ন মাংশপেশি, ত্বক এবং অঙ্গপ্রত্যঙ্গের সঙ্গে যোগাযোগের মাধ্যম হিসেবে কাজ করেমেরুরজ্জু।এই মেরুরজ্জু যখন কোনোভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়, তখন সে অবস্থাকে বলে মেরুরজ্জুর আঘাত।মেরুদন্ডে আঘাতের উপসর্গ দেখা দেয় যখন মেরুদন্ডীয় স্তম্ভের হাড়ের ক্ষতিসাধন হয়, মেরুদন্ডের অভ্যন্তরীণ চাকতিতে অথবা মেরুদন্ডীয় স্তম্ভের সহায়ক পেশী এবং লিগামেন্ট বা সন্ধিবন্ধনী ক্ষতি হলেমেরুরজ্জু ক্ষতিগ্রস্থ হতে পারে। সকলের বুঝার সুবিধার জন্যমেরুরজ্জুর আঘাতের কারণকে পরোক্ষ আঘাত এবং প্রত্যক্ষ বা সরাসরি আঘাত দুই ভাগে ভাগ করতে পারি।প্রত্যক্ষ আঘাতগুলো হলো- ভারী কিছু তুলে হঠাৎ সামনের দিকে ঝুঁকে পড়ে গেলে,উঁচু থেকে পড়ার সময় পিঠ মাটিতে পড়লে, পিঠের ওপর ভারী কিছু পড়লে, উঁচু স্থান থেকে পড়ে যাওয়া, শরীরচর্চা করতে গিয়ে বেঢপভাবে পড়ে যাওয়া, অগভীর পুলে ডাইভ দেয়া ও আঘাত পাওয়া, চলন্ত গাড়ি থেকে পড়ে যাওয়া (মোটর সাইকেল), ঘোড়ার পিঠ থেকে পড়ে যাওয়া, সড়ক দুর্ঘটনা, পিঠে ভারী কিছু পড়ে মাথায় বা মুখে আঘাত পাওয়া, রিকশা বা অটো রিকশায় ওড়না পেচিয়ে ঘাড়ে আঘাত পাওয়া, হাঁচি দেওয়ার সময় সাবধানতা অবলম্বন না করা, সেলুনে ক্ষৌরকর্মী কর্তৃক ঘাড়ের মটকা ফোটানো ইত্যাদি কারনে মেরুরজ্জু প্রত্যক্ষভাবে ক্ষতিগ্রস্থ হতে পারে।পরোক্ষ আঘাতগুলো হলো-মেরুদন্ড ও মেরুরুজ্জের নানাবিধ রোগ যেমনঃট্রানভার্স মাইলাইটিস(ঞৎধহংাবৎংব-গুবষরঃরং),মেরুদণ্ডের যক্ষ্মা(ঞই-ঝঢ়রহব),মাল্টিপল স্কেলেরেসিস (গঁষঃরঢ়ষব-ঝপষবৎড়ংরং),স্পাইনা বিফিডা (ঝঢ়রহব-ইরভরফধ),আর্থারাইটিস, প্রদাহ, সংক্রমণ, ক্যান্সার, চাকতির ক্ষয়জনিত কারণ। তাছাড়াও মেরুদন্ডে আঘাতের ফলে ফোলাভাব, প্রদাহ, পুঁজ জমা হওয়া এবং মেরুদন্ডের চারপাশে রক্তপাতের সম্ভবনা থেকে মেরুদন্ডের সংকোচন ঘটতে পারেফলে মেরুরজ্জু ক্ষতিগ্রস্থ হতে পারে।
মেরুরজ্জেুর আঘাত ও মানবদেহে এর প্রতিক্রিয়া ঃমেরুদন্ডে আঘাতের লক্ষণ এবং উপসর্গগুলি আঘাতের স্থান এবং মাত্রার উপর নির্ভর করে আঘাত কতটা গুরুতর। মেরুরজ্জেুর আঘাতের (স্পাইনাল কর্ড) সবচেয়ে বড় ঝুঁকি হলো মেরুরজ্জু অস্থায়ী বা স্থায়ীভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হওয়া।আঘাত পরবর্তী শরীরের ভিন্ন ভিন্ন অংশ অথবা নীচের দুই পা কিংবা একসাথে হাত এবং পা প্যারালাইসিস/পক্ষাঘাতে আক্রান্ত হয়ে চলাফেরার ক্ষমতা হারিয়ে ফেলা। আঘাতপ্রাপ্ত রোগীর শ্বাসকষ্ট ও অনুভূতিতে সমস্যা হতে পারে। শরীরে ভারসাম্যহীনতার সৃষ্টি হবে। ঘাড়ে অথবা পিঠে প্রচণ্ড ব্যথা অনুভব হবে। পায়খানা-প্রস্রাব নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যাবে।চেতনা হ্রাস বা চেতনার পরিবর্তন বিশেষত স্পর্শ, গরম বা ঠান্ডার অনুভূতি বুঝতে পারবেনা। অভিব্যক্তি ব্যক্ত করার ক্ষমতা কমে যাওয়া বা চলে যাওয়া।
মেরুরজ্জেুর আঘাত পরবর্তী করনীয় ঃপ্রত্যক্ষ আঘাতের শিকার ব্যক্তির ক্ষেত্রে প্রাথমিক ব্যবস্থাপনা একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ন বিষয়। প্রত্যক্ষ আঘাতের শিকারব্যক্তিকে প্রথমে আশ্বস্ত করুন পরবর্তীতে ক্ষতিগ্রস্থতা নিরুপনের জন্য অতি সাবধানে ব্যক্তির হাত ও পায়ের গতিবিধি পর্যবেক্ষন করুন। আঘাতের গুরুত্ব বিবেচনা করুনএবংআঘাত প্রাপ্ত ব্যক্তিকে মাথা বা ঘাড় নাড়াতে নিষেধ করুন যাতে পুনরায় ক্ষতি হতে না পারে। পরিস্থিতি বিবেচনায় রোগীর মাথার পেছনে গিয়ে হাঁটু গেড়ে ঝুঁকে বসুন। আপনার কনুই দুটো মাটিতে রাখুন। রোগীর মাথার দুই পাশে হাত নিয়ে ধরুন। কান দুটো খোলা রাখুন।রোগীর মাথা এমনভাবে ধরুন যাতে তার মাথা, ঘাড় ও মেরুদণ্ড সোজাসুজি লাইনে থাকে। জরুরি সাহায্য না আসা পর্যন্ত আপনি রোগীর মাথাকে সাপোর্ট দিয়ে রাখুন। যদি আপনার ধারে কাছে কেউ থাকে তাহলে তাকে বলুন রোগীর মাথার দুই পাশে কম্বল, তোয়ালে কিংবা কাপড় ভাঁজ করে সাপোর্ট দিতে। তাৎক্ষনিক এম্বুলেন্স ডাকার ব্যবস্থা করুন ্্্্্এবং রোগীকে হাসপাতালে নেয়ার ব্যবস্থা করুন।প্রত্যক্ষ আঘাতের শিকার ব্যক্তি যদি ব্যক্তি সাড়া না দেয় তাহলে রোগীর শ্বাসপথ খোলা রাখুন, এ ক্ষেত্রে রোগীর মুখে আঙুলের ডগা ঢুকিয়ে আস্তে আস্তে হাঁ করান, খেয়াল রাখবেন ঘাড় যেন বেঁকে না যায়। এবার শ্বাস নিচ্ছে কি না পরীক্ষা করুন। যদি শ্বাস নেয় তাহলে রোগীর মাথাকে অবিরাম সাপোর্ট দিয়ে যান এবং দ্রুত এাম্বুলেন্স ডাকুন।রোগী যদি শ্বাস না নেয় তাহলে রোগীকে কৃত্রিম শ্বাস-প্রশ্বাস দিতে শুরু করুন। এম্বুলেন্স না আসা পর্যন্ত রোগীর শ্বাস-প্রশ্বাস হৃদস্পন্দন ও প্রতিক্রিয়ার মাত্রা পরীক্ষা করতে থাকুন।

মেরুরজ্জেুর আঘাত পরবর্তী চিকিৎসা ও পূর্নবাসন ঃ
মেরুরজ্জুতে আঘাতপ্রাপ্ত রোগীদের ক্ষেত্রে সবার সম্মিলিত চিকিৎসা দরকার।এই পর্যায়ে মেরুরজ্জেুর আঘাতপ্রাপ্ত একজন ব্যক্তি হিসাবে দূর্ঘটনার প্রেক্ষাপট,দূর্ঘটনা পরবর্তী উদ্ধার, হাসপাতালে গমন, চিকিৎসা ও পূর্নবাসন প্রক্রিয়ারটি নিজের অভিজ্ঞতার আলোকে আপনাদের সামনে তুলে ধরলে মেরুরজ্জেুর আঘাত পরবর্তী চিকিৎসা ও পূর্নবাসন প্রক্রিয়া বুঝতে সহজ হবে।
দূর্ঘটনার শিকার-পেশাগত জীবনে মানব সম্পদ ব্যবস্থাপক হিসাবে বাসা থেকে কর্মস্থল কুমিল্লা ই.পি.জেড এ যাবার পথে কুমিল্লা সদর উপজেলা অফিস গেইট সংলগ্ন একটি মেহগনি গাছের সাথেচলন্ত মোটর সাইকেল থেকে ছিটকে গাছের ্্্্্্্্উপর গিয়ে পরি। মাথায় প্রচন্ড আঘাতের ফলে জ্ঞান হারিয়ে ফেলি।উদ্ধার-্্্জ্ঞান ফিরার পর দেখি আমি লোকজন পরিবেস্টিত সেইসাথে মেরুরজ্জেুর আঘাত সংক্রান্ত বিষয়ে পূর্ব জ্ঞান থাকায় আমার আর বুঝতে বাকি রইলো না আমার জীবনের সাথে ঘটে যাওয়া দূর্ঘটনাটি কতটা মর্মান্তিক ছিল। আমার দূর্ঘটনাটি ছিলরক্তপাতহীন। স¦াভাবিক ভাবেই মানবিক উদ্ধারকর্মীরা আমার জীবনের সাথে ঘটে যাওয়া মর্মান্তিক দূর্ঘটনাটিকে অনুধাবন করতে পারেনি। তারা ভেবেছিল এটি সাধারন দূর্ঘটনা পাশাপাশি কুমিল্লা মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতাল খুব নিকটে হওয়ায় আমার কথাকে গুরুত্ব না দিয়ে আমাকে দ্রুত হাসপাতালে স্থানান্তরিত করে।দুর্ঘটনা পরবর্তী সবচেয়ে গুরুত্বপুর্ন বিষয় হলো দুর্ঘটনায় পতিত ব্যক্তির শারিরিক অবস্থা যাচাই করা ্এবং নিয়ম মেনে ব্যক্তিকে উদ্ধার করে হাসপাতালে প্রেরন করা।মানবিক উদ্ধারকর্মীদের প্রতি শ্রদ্ধা রেখেই বলছি ঘটনার প্রেক্ষাপটে অনিজ্ঞতার কারনে দূর্ঘটনা পরবর্তী যথাযত মূল্যায়ন ছাড়াই আমাকে হাসপাতালে স্থানান্তরিত করা হয় যা মেরুরজ্জেু আঘাতপ্রাপ্ত ব্যক্তি হিসাবে আমার জীবনের জন্য মোটেও সুখকর ছিল না।হাসপাতালে প্রেরন-পারিবারিক সীদ্ধান্তে কুমিল্লা মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতাল থেকে আমাকে স্থানান্তরিত করা হয় কুমিল্লার একটি বেসরকারী হাসপাতালে। সার্বিক অবস্থা বিবেচনা করে বিশেষজ্ঞ চিকিৎসক অধিকতর নিরিক্ষনের জন্য এম.আর.আই করতে দেয়। এম.আর.আই রিপোর্ট থেকে জানতে পারি মেরুদন্ডের গ্রীবাদেশীয় অঞ্চলে ৬ ও ৭ নং কশেরুকা বা হাড় ভেংগে সেই অঞ্চলেরমেরুরজ্জু গুরুতরভাবে ক্ষতিগ্রস্থ হয়। পরবর্তীতে তাৎক্ষনিকভাবে চিকিৎসক অপারেশনের মাধ্যেমে মেরুদন্ডের ভংাগা হাড় জোড়া দেওয়ার কাজটি সম্পূর্ন করতে পারলেও ক্ষতিগ্রস্থ মেরুরজ্জুর কোন চিকিৎসা না থাকায় আমাকে মেরুরজ্জুর আঘাত পরবর্তী পক্ষাঘাতগ্রস্থ অবস্থার পূর্নবাসনের জন্য ঢাকার অদুরে সাভারে অবস্থিত”পক্ষাঘাতগ্রস্থদের পূর্নবাসন কেন্দ্রে” (সি আর পি) প্রেরন করা হয়।
পক্ষাঘাতগ্রস্থদের পূর্নবাসন কেন্দ্রে পূর্নবাসন প্রক্রিয়া শুরু-সাভার সি আর পি তে অকুপেশনাল থেরাপি,ফিজিওথেরাপী ও মেনটাল থেরাপী এই তিনটি ধাপে পূর্নবাসন প্রক্রিয়া শুরু হয়। ফিজিওথেরাপী সম্পর্কে আমাদের সমাজে কিছুটা ধারনা থাকলেও অকুপেশনাল থেরাপি ও মেনটাল থেরাপীর বিষয়ে আমাদের সমাজে তেমন একটা ধারনা নেই।মেরুরজ্জুতে আঘাতের ফলে ব্যক্তির  হাত ও পায়ের সক্রিয় কার্যকারিতা নষ্ট হয়ে যেতে পারে কিংবা আঘাতের স্থান থেকে নীচের দিকে অবশ হয়ে যেতে পারে।অকুপেশনাল থেরাপির মাধ্যমে মেরুরজ্জুর আঘাতে ব্যক্তির হারিয়ে ফেলা  কার্যক্ষমতা ফিরিয়ে আনার চেষ্টা করা হয়। সেই ক্ষেত্রে পুরোপুরি কার্যক্ষমতা ফিরিয়ে আনতে না পারে তবে বিভিন্ন ডিভাইস ব্যবহার করে রোগীকে যতটা সম্ভব স্বাভাবিক প্রক্রিয়ায় আনার চেষ্টা অকুপেশানাল থেরাপিস্টরা করে থাকেন।মেরুরজ্জু আঘাত প্রাপ্ত ব্যক্তির হারিয়ে যাওয়া চলাচলের অনুভূতি কখনো কখনো ফিরে আসতে পারে। যদি ফিরে না আসে তখন অকুপেশানাল থেরাপিস্ট তার জন্য হুইলচেয়ার নির্ধারণ করেন। আর তাই দূর্ঘটনা পরবর্তী আমার চলন ক্ষমতা ফিরে না আসায় অকুপেশানাল থেরাপিস্টের পরামর্শে হুইলচেয়ার নিয়েই চলাচল করতে হচ্ছে।মেরুরজ্জু আঘাত প্রাপ্ত ব্যক্তি হিসাবে অংগ সঞ্চালন প্রক্রিয়া স্বাভাবিক রাখা জন্য আমাকেফিজিওথেরাপী চিকিৎসা জীবনের শেষ দিন পর্যন্ত চালিয়ে যেতে হবে।মেনটাল থেরাপীর মাধ্যেমে আমাকে বুঝাতে সক্ষম হয়েছিল আমি আর কখন হাটতে পারবেনো। পাশাপাশি আরো শারিরিক অক্ষমতা নিয়ে আমাকে জীবনের  অবশিষ্ট সময় পার করতে হবে। তাছাড়াও অল্প আঘাতের জন্য যেমন মেরুদন্ডের স্নায়ুর চারপাশে ফোলাভাব এবং প্রদাহের জন্য ওষুধ প্রয়োগ। মেরুদন্ডীয় স্তম্ভের হাড়কে স্থিতিশীল করতে দীর্ঘদিনের বিছানার বিশ্রাম। মেরুদন্ডীয় স্তম্ভের সন্ধিবন্ধনী বা লিগামেন্ট এবং হাড়ের আঘাত সারাতে অস্ত্রোপচার করার পরামর্শ দেওয়া হয়ে থাকে।
মেরুরজ্জেুর আঘাতপ্রাপ্ত ব্যক্তি ও তাদের আর্থ সামাজিক অবস্থা ঃসমাজেমেরুরজ্জেু আঘাত প্রাপ্ত ব্যক্তিরা ভীষনভাবে অবহেলিত। এক্ষেত্রে সবচেয়ে বড় সমস্যটি হলো অপর্যাপ্ত চিকিৎসা ও পুর্নবাসন ব্যবস্থা। সারাদেশেসাভার, ঢাকার মীরপুর-১৪ সহ সি আর পি পরিচালিত ১২টি কে›দ্রে ”মেরুরজ্জেুর আঘাতপ্রাপ্তদের চিকিৎসা ও পূর্নবাসনে অভিরাম কাজ করে যাচ্ছে  সি আর পি। কিন্তু দুঃখজনক হলেও সত্য সরকারি এবং বেসরকারি পর্যায়ে মেরুরজ্জেু আঘাত প্রাপ্ত ব্যক্তিদের চিকিৎসার বিষয়ে উপজেলা,জেলা এবং বিভাগীয় পর্যায়ে তেমন কোনো উদ্যোগ লক্ষ্য করা যাচ্ছে না।সেই সাথে মূলধারার যেসববিশেষজ্ঞ চিকিৎসক সাধারণ মানুষদেরকে চিকিৎসা সেবা দিয়ে থাকেন তাদের কাছে মেরুরজ্জু আঘাতপ্রাপ্ত ব্যক্তিরা চিকিৎসার জন্য গেলে সেখানে সঠিক চিকিৎসা সেবা পাওয়া যায়না। আমার ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতা থেকে মনে হয়েছে বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকরা মনে করে মেরুরজ্জেুর আঘাত নিরাময় যোগ্য নয় পাশাপাশি ঝুকিপূর্নও বটে। নিরাময় যোগ্য নয় ও ঝুকিপূর্ন বিধায় তারামেরুরজ্জেুর আঘাতপ্রাপ্ত ব্যক্তিদের চিকিৎসা সেবা কিংবা পরামর্শ দিতে তেমন আগ্রহ প্রকাশ করেন না।
প্রতিটি মানুষের সামাজিক অবস্থান তৈরি হয় তার পরিবার থেকেই কিন্তু মেরুরজ্জেুর আঘাতপ্রাপ্ত প্রতিবন্ধীদের পরিবার থেকে শুরু করে প্রায় সর্বত্রই তাদের খাটো করে দেখা হয়। মেরুরজ্জেুর আঘাতপ্রাপ্ত প্রতিবন্ধীদের অধিকাংশেরই আয়ের পথ বন্ধ হয়ে ষায়। খুব অল্প সংখ্যক ব্যক্তির পক্ষে উপার্জনে ফিরে আসা সম্ভব। ফলে অবহেলার কারণে প্রতিবন্ধীতাকে অভিশাপ মেনে নিয়ে তারা অবহেলিত বঞ্চিত জীবনযাপনে বাধ্য হয়।দরিদ্র পরিবারগুলোতে প্রতিবন্ধীদের অবস্থা আরও করুণ। অনেক সময় তাদের অনাহার-অর্ধাহারে থেকে দিন পার করতে হয়। স্বাভাবিক মানুষের মতো সামাজিক সব অধিকার ভোগ করার কথা থাকলেও বরাবরই তারা তা থেকে বঞ্চিত। আত্মীয়স্বজন সামাজিক মানমর্যাদার ভয়ে তাদের দূরে সরিয়ে রাখেন। সমাজে তাদের অবাধ চলাচল বাধাগ্রস্ত হয়। শিক্ষা, চাকরি, কর্মসংস্থান, বিয়ে, প্রভৃতি ক্ষেত্রে তারা বৈষম্যের শিকার হয়। বিভিন্ন ধরনের বৈষম্যের শিকার হয়ে তারা সমাজে নিজেদের সম্পৃক্ত করতে পারে না।
মেরুরজ্জেুর আঘাতপ্রাপ্ত ব্যক্তি ও তাদের প্রতি সমাজের দায়বদ্ধত্ াঃমেরুরজ্জেুর আঘাতপ্রাপ্ত প্রতিবন্ধীরা আমাদের সমাজের অবিচ্ছেদ্য অংশ। সমাজের যাবতীয় সুযোগ-সুবিধা ভোগের ক্ষেত্রে তাদের গুরুত্ব প্রদান করতে হবে। প্রত্যেকটি ক্ষেত্রে তাদের অগ্রাধিকার দেওয়ার ব্যবস্থা করতে হবে।  চিকিৎসা ও পূর্নবাসন প্রক্রিয়ার পরিধি সারাদেশে ছড়িয়ে দেওয়ার পাশাপাশি সকল সেবা বিনামূল্যে নিশ্চিত করা, বিশেষজ্ঞ চিকিৎসদেরমেরুরজ্জেুর আঘাতপ্রাপ্ত প্রতিবন্ধীদের চিকিৎসা ও পরামর্শের ক্ষেত্রে আরো মানবিক হতে হবে। সরকারের সামাজিক সুরক্ষার আওতা বৃদ্ধি করে প্রতিবন্ধীদের মাসিক বৃদ্ধি সহ সকলকে ভাতার আওতায় আনা। বর্তমানে প্রদেয় ভাতা সময়ের তুলনায় অনেক কম। তাই এ ভাতার পরিমাণ বৃদ্ধি করে প্রতিবন্ধীদের অর্থনৈতিকভাবে সহযোগিতার পরিধি বাড়ানো দরকার। মেরুরজ্জেুর আঘাতপ্রাপ্ত প্রতিবন্ধীদের আঘাতের ধরন অনুযায়ী বৃত্তিমুলক প্রশিক্ষনের ব্যবস্থা করা ও সে অনুযায়ী চাকুরী দাতাদের প্রশিক্ষিত প্রতিবন্ধীদের চাকুরী প্রদানে মানসিকভাবে উদ্বুদ্ধ করা।আামাদের চলার পথে প্রতিবন্ধীদের দেখতে পেলে মানবিক আচরন করবো। মনে রাখবেন আপনার হাসিমাখা দৃষ্টি তাদেরমানসিক শক্তি বৃদ্ধিতে ব্যাপক ভ’মিকা রাখবে।তাছাড়াও সামাজিক গণসচেতনতা বৃদ্ধি, প্রতিবন্ধী ব্যক্তিদের কর্মসংস্থানে আলাদা শিল্পকারখানা স্থাপন করা, শিক্ষা ক্ষেত্রে প্রতিবন্ধীদের বিশেষ সুযোগ-সুবিধা বৃদ্ধি, বিনোদনের জন্য তাদের উপযোগী খেলাধুলা বা সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানের আয়োজন করা, চাকরি ও অন্যান্য ক্ষেত্রে প্রতিবন্ধী কোটা বৃদ্ধি করা, সুরক্ষার জন্য প্রনিত আইনের যথাযথ প্রয়োগ করা।
একজন মেরুরুজ্জে আঘাতপ্রাপ্তপ্রতিবন্ধী হিসেবে আমি মনে করি উপরে বর্নিতবিষয়গুলো যদি যথাযথভাবে বাস্তবায়ন করা যায় তাহলে আমরা প্রতিবন্ধীবান্ধব আলোকিত সমাজ গড়ে তুলতে পারব। সেইসাথে মেরুরুজ্জে আঘাতপ্রাপ্ত প্রতিবন্ধী সহ সকল প্রতিবন্ধী মানুষকে ধারাবাহিকভাবে মূল ধারায় ফিরিয়ে আনার কাজটি অনেক সহজ হবে।
তথ্যসুত্রঃ একজন মেরুরুজ্জে আঘাতপ্রাপ্ত  প্রতিবন্ধী হিসেবেজীবন থেকে নেয়া অভিক্ষতা ও নেটিজেন থেকে প্রাপ্ত তথ্য