
শাহজাহান চৌধুরী ||
রাষ্ট্রীয় সর্বোচ্চ খেতাব স্বাধীনতা ও ২১শে পদক প্রাপ্ত, বিবিসি শ্রোতা জরিপে তিন সেরা বাংলা গানের রচয়িতা, দেশ বরেণ্য গিতীকার, সুরকার, চলচিত্র নির্মাতা, কুমিল্লার কৃতি সন্তান গাজী আনোয়ার আর নেই। টেলিভিশনে সংবাদটা শুনেই মাথায় আকাশ ভেঙ্গে পড়লো। তিনি আজ ৭ সেপ্টেম্বর ভোর ৬টা ৩০ মিনিটে চিকিৎসাধীন অবস্থায় ঢাকা ইউনাইটেড হাসপাতালে ইন্তেকাল করেন (ইন্না লিল্লাহি ওয়া ইন্না ইলাইহি রাজিউন)। তাঁর বয়স হয়েছিল ৭৯ বছর। তাঁর আত্মার মাগফেরাত কামনা করি। গাজী মাজহারুল আনোয়ারের সাথে আমার এত স্মৃতি আমি কি করে ভুলি।
গাজী ভাইকে তেমন করে চিনতাম না। তবে নজরুল পরিষদের, রতন ভাই, ঝুনু দা, জহির ভাই, কুলেন্দু দাস এদের কাছ থেকে শুনেছি যে, তিনি কুমিল্লার একজন সাংস্কৃতিক কর্মী ছিলেন এবং আজ জাতীয় ভাবে প্রতিষ্ঠিত। হঠাৎ করেই সুইট হোমের এক আড্ডায় যাত্রীকের মন্টুর (মরহুম) কথায় গাজী ভাই আমার খুব কাছের লোক হয়ে গেলেন। জানলাম, তিনি লিটনের ভাই। লিটন আমি একসাথে উদীচী করতাম। ওর বোন নাসরিন আমাদের নাট্য সংগঠনের সদস্য। এই গাজী ভাই যে গাজী মাজহারুল আনোয়ার আমার জানা ছিল না। লিটনের কাছে শুনেছি, শিল্প সংস্কৃতিকে ভালবেসে মেডিকেলের কৃতি ছাত্র হয়েও তৃতীয় বর্ষে থাকাকালীন চলে আসেন এই জগতে। ইতোমধ্যে ২০ হাজারের মত গান লিখেছেন তিনি। তিনি একধারে গীতিকার, সুরকার, চলচ্চিত্র পরিচালক। তাঁর সহধর্মীনি জোহরা গাজীও একজন বিশিষ্ট সাংস্কৃতিক ব্যক্তিত্ব। তাদের ছেলে-মেয়ে দুজনই এ অঙ্গনে ওতপ্রোতভাবে জড়িত, যা আমাদের এই সমাজে বিরল।
গাজী ভাইয়ের সাথে এরপর আমার সম্পর্ক হয়ে যায় ছোট ভাইয়ের মতো। লিটন আমার বন্ধু হওয়াতে এ সম্পর্ক আরো গাঢ় হয়। ঢাকা গেলে মালিবাগের বাসায় যেতাম। যোগ্য লোকের যোগ্য সহধর্মীনি জোহরা গাজী কোনদিনই না খাইয়ে ছাড়তেন না। তখনও জানতামনা গাজী ভাইয়ের কল্যাণে আমার জীবনে আরো অনেক কিছু পাওয়ার আছে। একদিন জহির ভাই (এডভোকেট জহিরুল ইসলাম) বললেন, শাহজাহান রেডি হও, গাজী খবর দিয়েছেন টেলিভিশন নাটক করতে হবে। জহির ভাই মাঝে মাঝে ঠাট্টা করতেন, ভাবলাম তাই হবে, কিন্তু দেখলাম সত্যি বাংলাদেশ টেলিভিশনে হিরামন লোক কাহিনী ভিত্তিক একটি এপিসোড শুরু হবে যার প্রথম পর্বই হবে গাজী ভাইয়ের রচনা ও পরিচালনায় নাম “ময়নামতি”। গাজী ভাই আমাকে মতি চরিত্রে কাষ্ট করেন এবং বাবলীকে (ফিশারি অফিসার নুরুল ইসলাম সাহেবের মেয়ে) ময়না চরিত্রে।
ঢাকায় সংগীত পরিচালক রাজা হোসেন খান এর মতিঝিলের কোয়াটারে মহড়া। আমি সোনালী ব্যাংক বোর্ড অফিস শাখায় চাকুরী করি, প্রতিদিন বিকেল ২/৩ টার বাসে ঢাকা চলে যেতাম আর ঢাকা থেকে সকালে ভোরের বাসে কুমিল্লা এসে অফিস করতাম। এভাবেই মহড়া চালিয়ে গেছি। রাজা হোসেন খানের বাসায় এক লেপের নীচে একই রুমে আমাদের জীবনের সে সময়গুলো গাজী ভাই, রাজা হোসেন খাঁন, সুজয় শ্যাম (বিশিষ্ট মিউজিশিয়ান), জহির ভাইয়ের সান্নিধ্যে সোনার জীবন কেটেছে। তা আরেক ইতিহাস সাভারে একটি গ্রামে আমাদের স্যুটিং শুরু। টিভির সমির কুশারী ক্যামেরায়, প্রযোজকের নামটা ঠিক মনে আসছে না, তিনি মারা গেছেন। আশ্চর্য্য সেখানেও গাজী ভাই আমার হাতে শর্ট ডিভিশনের খাতাটা তুলে দিলেন। শর্টের ফাঁকে স্ক্রিপ্টও লিখে চললেন। ব্যাপারটা এমন-নাটক লেখাও হচ্ছে, স্যুটিং চলছে। তখন বোঝার বয়স হয়নি। কিন্তু এখন বুঝি একজন লোক কতটুকু মেধা সম্পন্ন হলে এমন হতে পারে। আর গাজী ভাই আমাকে কতটুকু মূল্যায়ন করে ছিলেন, কতটুকু সুযোগ দিয়েছিলেন তা বুঝিনি। যদি বুঝতাম আজ হয়তো আমার অবস্থান এখানে নয়, অন্য কোনখানে হতো। “ময়নামতি’র” কল্যাণেই বাংলাদেশ টেলিভিশনে নবকল্লে¬াল নাট্য বিভাগে ১৯৮৩ সালে আমার অন্তর্ভূক্তি। “ময়মনাতি” “হিরামন” অনুষ্ঠান লোক কাহিনী হিসাবে তখন হিট করেছিল। বাংলাদেশ টেলিভিশন তখন গাজী ভাইকে অনেক অনুরোধ করেছিলেন টেলিভিশনের হয়ে আরো অনুষ্ঠান করতে। কিন্তু তিনি হলেন বড় পর্দার মানুষ, ছোট পর্দায় কাজ করা গাজী ভাইয়ের জন্যে সত্যি কষ্টসাধ্য।
১৯৮৪ সাল। একদিন সকালে অফিসে যাচ্ছি, হঠাৎ করে পেড়া ভান্ডারের সামনে আসতেই ঝুনুদা (এডভোকেট) ডাকলেন এবং বললেন কোটবাড়ীতে গাজীর ‘শাস্তি’ ছবির সুটিং চলছে। গাজী তোমাকে সেখানে যেতে বলেছেন ক্যামেরা নিয়ে। সাংবাদিক চরিত্রে অভিনয় করতে হবে। বাসায় এসে ক্যামেরা নিয়ে কোটবাড়ী এসে ‘শাস্তি’ ছবিতে সাংবাদিকের ভূমিকায় অভিনয় করলাম।
১৯৮৭ সালে জহির ভাই বললো শাজান-গাজী তোমাকে ঢাকা যেতে বলেছে তার ‘সন্ধী’ ছবিতে ছোট একটি চরিত্রে অভিনয় করতে হবে। দে ছুট, ঢাকা যেয়ে পৌঁছাতে রাত হয়ে গেল তবুও রাত প্রায় ৯টা সাড়ে ৯টায় গাজী ভাইয়ের মালিবাগের বাসায় হাজির। দেখা হতে বললো, সকালে স্যুটিং এ যাচ্ছি সাভারে। আমি চলে আসতে চেয়েছিলাম, তিনি জিজ্ঞেস করলেন, কোথায় উঠেছ? আমি বললাম, রাতে কোন হোটেলে থেকে যাব। গাজী ভাই অনেকটা রাগই করলেন এবং আমাকে মৃদু ধমক দিয়ে ভাবীকে ডেকে বললেন, আমার থাকার ব্যবস্থা করতে। রাতে খেয়ে শুয়ে গাজী ভাইয়ের স্নেহের পরশ এর কথা ভাবছিলাম।
ভাবছিলাম এমন মন এবং প্রাণের মানুষ বলেই আজ গাজী ভাই দেশের একজন প্রতিষ্ঠিত শিল্পী। “সন্ধী” ছবিতে নায়ক রাজ রাজ্জাকের অনেক বন্ধুর একজন হিসাবে অভিনয় করলাম। নায়িকা খ্যাতিমান অভিনেত্রী শবনম। আমার ৩/৪টি ডায়লগ ছিল দুই সিকোয়েন্সের একটা সাভারে আরেকটা এফ.ডি.সিতে। এফ.ডি.সিতে স্যুটিং শেষ করে বিকেল বেলা আমি বললাম, গাজী ভাই আমি তাহলে চলে যাই কুমিল্লা। তিনি অনুমতি দিলেন এবং প্রডাকশন ম্যানেজারকে বললেন, আমাকে এক হাজার টাকা দিয়ে দিতে। আমি লজ্জায় অবনত হয়ে তাকে সালাম করতে গেলাম তিনি বুকে জড়িয়ে ধরলেন।
অনেক বছর পর ২০০২ সালে ২১শে পদক পাওয়ায় প্রেক্ষিতে কুমিল্লা ক্লাবের পক্ষ থেকে ক্লাব সদস্য গাজী মাজহারুল আনোয়ারের সংবর্ধনা অনুষ্ঠানের আয়োজন করে। সে অনুষ্ঠান আমার তোলা কিছু ছবি দিয়ে একটি পোষ্টার করে গাজী ভাইয়ের বারিধারার বাসায় যাই এবং গাজী ভাইকে ছবি দেওয়ার সাথে সাথে ভাবী এবং গাজী ভাই দুজনেই অভিযোগ করেন যে, আমি তাদের ভুলেই গেছি, অনেকদিন তাদের বাসায় যাই না। আসলে সময় এবং সুযোগ ও বয়স সর্বোপরি গাজী ভাইয়ের বারিধারার বাসা অনেক দূরে বিধায় সেখানে যাওয়া হয়ে ওঠেনা। ফিরে আসার সময় গাজী ভাই একটা প্যাকেট এগিয়ে দিলেন, আমি জানি প্যাকেটে কি আছে তাই ইতস্ত করছি, ভাবী ধমক দিলেন নিতে। নিলাম, স্নেহের কাছে পরাজিত হওয়ার মাঝেও আনন্দ আছে।
বারিধারা থেকে ফিরে আসতে আসতে আমার অনুভূতি এমন হলো- আহ্ আমার যদি এমন একটি আপন বড় ভাই থাকতো।