ই-পেপার ভিডিও ছবি বিজ্ঞাপন কুমিল্লার ইতিহাস ও ঐতিহ্য যোগাযোগ কুমিল্লার কাগজ পরিবার
তুমি কেমন করে গান লিখ হে গুণী!
Published : Monday, 5 September, 2022 at 12:00 AM
তুমি কেমন করে গান লিখ হে গুণী!আহসানুল কবীর ||
দেশবরেণ্য গীতিকার  কুমিল্লাবাসীর অহংকারের ধন গাজী মাজহারুল আনোয়ার আর নেই (ইন্নালিল্লাহে ওয়া ইন্না ইলাইহে রাজিউন), এই বিষাদ মাখা সংবাদটি দিয়ে সকালের ঘুম ভাঙ্গলো। তিনি বাংলা গানের সর্বকালের সেরা গীতিকারদের একজন। পুরোদিনটাই হাহাকার ময় হয়ে গেল। এই শুণ্যতা কখনো পূরণ হবার নয়। একটি দেশেএকজন গাজী মাজহারুল আনোয়ার শত বছরেও জন্ম নেয়না। তিনি ১৯৪৩ সনের ২২ ফেব্রুয়ারি ইলিয়টগঞ্জ তালেশ্বর গ্রামে জন্মগ্রহণ করেন। তার পিতার নাম মোজাম্মেল হোসেন। গাজী মাজহারুল আনোয়ারের বাবা কুমিল্লা শর্মা কেমিকেল এর একজন সম্মানিত পরিচালক ছিলেন। মোজাম্মেল হোসেনের চার কন্যা দুই পুত্র সন্তানের মধ্যে গাজী মাজহারুল আনোয়ার সবার বড়। তাদের নিজস্ব ঔষধ নির্মাণ প্রতিষ্ঠান ছিল। ঠাকুরপাড়া বেঙ্গল ড্রাগসের সাথে উনাদের পরিবারের সম্পৃক্ততা ছিলো।
অধুনালুপ্ত দিপীকা সিনেমা হল এখন যেখানে রুপায়ন শপিং মল নির্মাণ করছে এখানেই ছিল তাঁর শ্বশুর মরহুম বেলায়েত হোসেনের নিবাস। জোহরা গাজী এই বাড়িতেই বড় হয়েছেন। গাজী মাজহারুল আনোয়ার ছেলেবেলার অধিকাংশ সময় কেটেছে তালপুকুর পাড় ও মুন্সেফ বাড়ির ভাড়া বাসায়। তিনি কুমিল্লা জিলা স্কুল ও কুমিল্লা ভিক্টোরিয়া কলেজে লেখাপড়া শেষ করে ঢাকায় গেলেন ডাক্তারি পড়তে। তারপরের ইতিহাস সবার জানা।
মেডিকেলে পড়া বাদ দিয়ে তিনি পুরোপুরিভাবে গান লেখায় মনোনিবেশ করেছিলেন। তার হাতেই রচিত হয়েছে "জয় বাংলা বাংলার জয়" এর মত কালজয়ী গান। এই একটি গানের জন্যইতো তিনি বেঁচে থাকবেন হাজার বছর। দেশপ্রেমকে অন্তর থেকে ধারণ না করলে এমন গান লেখা অসম্ভব। স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্রের অন্যতম প্রধান গান ছিল এটি। তুমুল জনপ্রিয় দেশাত্মবোধক গান সমুহের অধিকাংশই তাঁর লেখা। সঙ্গীতের সকল শাখায় গাজী মাযহারুল আনোয়ারের অবাধ বিচরণ। বিবিসির শ্রোতা জরীপে শতাব্দীর সেরা বিশটি গানের তিনটিই ছিলো তার রচিত। সব্যসাচী এই মানুষটির চাইতে বেশি গান বাংলাদেশে আর কেউ লিখেননি। তাৎক্ষণিক লেখার অসাধারণ ক্ষমতা। একটি আড্ডায় বসে তাৎক্ষণিক লিখেছিলেন ‘যদি আমাকে জানতে সাধ হয় এমাটির শ্যামলিমায় এসো প্রিয়’। বাংলার প্রকৃতি আর গাজী মাজহারুল আনোয়ার এখানে একাকার হয়ে গেছেন। দেশপ্রেম, দ্রোহ, আধ্যাত্মিকতা সঙ্গীতের কোথায় তিনি নেই? তাঁর প্রেমময় সবগান  প্রেমিক-প্রেমিকার মুখে মুখে। ‘ইশারায় শীষ দিয়ে আমাকে ডেকোনা’, ‘এই মন তোমাকে দিলাম’, ও চোখে চোখ পড়েছে যখনই, তুমি সাত সাগরের ওপার হতে আমায় ডেকোছো, আমি সাত সাগর পাড়ি দিয়ে কেন সৈকতে, গীতিময় সেইদিন বুঝি আর'তুমি কখন এসে এই গানগুলি প্রেমিক হৃদয়কে উদ্বেলিত করেনি এমন বাঙালি প্রেমিক প্রেমিকা খুঁজে পাওয়া দুস্কর। আবার প্রমে ছ্যাকা খেয়ে হয় যদি বদনাম হোক আরো কিংবা পরবাসী মনটা আমার কেউ চিনলোনা জনম দুঃখি কপাল পোড়া আমি একজনারে  শুনেনি এরকম কে আছে! তিনি অসম্ভব মরমীসাধক ছিলেন। সেজন্যই লিখতে পেরেছেন সবাই বলে বয়স বাড়ে আমি বলি কমে,চক্ষের নজর এমনি কইরা একদিন ক্ষয়ে যাবে, আছেন আমার মোক্তার আছেন আমার ব্যারিস্টার এর মত অসংখ্য  ভাববাদী গান। গানকে ড্রইং রুম থেকে বস্তি,রাজপথ থেকে ধানক্ষেতে নিয়ে যাবার কৃতিত্ব একমাত্র তাঁর। একজন রিকশা চালক যখন ঘর্মাক্ত শরীরে গেয়ে উঠে ‘ও আমার রসিয়া তুমি কেন কোমড়ের বিছা হইলানা’, কিংবা ‘দোহাই লাগে একবার ফিরে চাও আবার তুমি আসবে ফিরে আমায় কথা দাও’ বা ‘ঢাকা শহর আইসা আমার আশা পুরাইছে’ তখন সেটাই তার বিনোদন। অনেকে হয়তো নাক সিটকাতে পারেন কিন্তু তিনি লিখেছেন সকল শ্রেণীর জন্য। এক জায়গায় থেমে থাকেননি। বাইশ হাজার গান আর কেউ লিখেছেন কিনা আমার জানা নেই।রবি ঠাকুর বেঁচে থাকলে নিশ্চয় বলতেন তুমি কেমন করে গান লিখ হে গুণী!
কুমিল্লার এই গর্বিত মানুষটিকে আমরা জীবদ্দশায় মূল্যায়ন করেছি কিনা কিংবা প্রাপ্য সন্মান দিয়েছি কিনা সে প্রশ্নের উত্তর ভবিতব্য দেবে। তবে তিনি ইতিহাসে অমর। মানুষের কন্ঠে তিনি  থাকবেন হাজার বছর। তিনি থাকবেন বাংলার পথে প্রান্তরে আর ছোট্ট সোনার গাঁয়ে "যেথায় কোকিল ডাকে কুহু, দোয়েল ডাকে মুহু মুহু, নদী যেথায় ছুটে চলে আপন ঠিকানায়"। গাজী মাজহারুল আনোয়ার থাকবেন গ্রাম বাংলার ফসলের মৌ মৌ গন্ধে। তিনি লিখেছিলেন "গানেরই খাতায় স্বরলিপি লিখে কি হবে,জীবন খাতার শুন্যপাতা শুধু বেহিসাবি পরে রবে" আমার বিশ্বাস তাঁর জীবন খাতা পরিপূর্ণতায় ভরপুর হয়ে গেছে আরো অনেক আগেই। আইয়ুব বাচ্চুর মৃত্যর পর চট্টগ্রামবাসী তার সম্মানার্থে তাদের ভালোবাসার অর্ঘ্য দিয়ে প্রবর্তক মোড়ে  রুপালী গিটার নামে একটি ভাস্কর্য স্থাপন করেছিল। কুমিল্লাতেও গাজী মাজহারুল আনোয়ারের নামে এরকম কিছু করা উচিত। আল্লাহপাকের নিকট তাঁর বিদেহী আত্মার মাগফেরাত কামনা করছি। নিশ্চয় তিনি ক্ষমা পাবেন।ওপারেও তিনি হয়তো বুক ফুলিয়ে বলবেন "আমায় যদি প্রশ্ন করে মায়াবতীর কোন দেশ বলবো আমি বাংলাদেশ"।কারন তিনিইতে বলেছেন"।  শেষ বিচারের হাইকোর্টেতে তিনি আমায় করবেন পার, আমি পাপি তিনি জামিনদার"।
লেখক পরিচিতি: ইতিহাস ঐতিহ্য বিষয়ক লেখক, সংস্কৃতিকর্মী
ইমেইল: ahkabir71@gmail.com
মোবাইল ০১৭১১৩৯৩৮৫৭