
এক
অনুকরণীয় দৃষ্টান্তের মানুষ তিনি। নিজস্ব সচেতনতা, বাস্তবতা বোধ এবং
চিন্তা-চেতনায় সময়কে উপলব্ধি করার অসম্ভব ক্ষমতা ছিল তাঁর। স্বামী ও
সন্তানের জন্য ত্যাগ ও কষ্ট স্বীকার করেছেন। এটা সব বাঙালি নারীর চিরন্তন
বৈশিষ্ট্য।
কিন্তু তিনি তাঁর কষ্টসহিষ্ণু আত্মত্যাগের কাহিনি নিজের
বাড়ির সীমানা পেরোতে দেননি। এ কারণেই তিনি মহীয়সী। সব কষ্ট, বেদনা, দুঃখ,
যন্ত্রণার গরল নিজে ধারণ করেছেন। ইতিহাসের প্রেক্ষাপটে তা নিঃসন্দেহে ভিন্ন
মাত্রা লাভ করে।
আজ মহীয়সী নারী বঙ্গমাতা বেগম ফজিলাতুন নেছার জন্মদিন।
তাঁকে আমরা গভীর শ্রদ্ধার সঙ্গে স্মরণ করছি। তিনি ছিলেন আধুনিক, রুচিশীল ও
সংস্কৃতিপ্রেমী। কিন্তু শুধুই একজন আধুনিক নান্দনিক রুচিবোধসম্পন্ন
পরিশীলিত নারী নন, জাতীয়তাবাদী দৃষ্টিভঙ্গির আলোকে বেগম ফজিলাতুন নেছা একজন
দৃঢ়চেতা, আত্মপ্রত্যয়ী, দেশপ্রেমিক বীর নারীযোদ্ধা। তিনি লড়াই করেছেন
নিরলসভাবে। কারারুদ্ধ স্বামীকে বারবার সাহস জুগিয়েছেন বাঙালির মুক্তির
আন্দোলনকে এগিয়ে নিয়ে যাওয়ার জন্য। প্রেরণা দিয়েছেন নিজের আত্মজীবনী লিখতে।
পাকিস্তান
আমলে তাঁর স্বামী মন্ত্রী ছিলেন, এমপি বা এমএলএ ছিলেন। প্রধানমন্ত্রী শেখ
হাসিনা তাঁর লেখায় উল্লেখ করেছেন বঙ্গমাতা জীবনে এক দিনও করাচিতে যাননি,
কোনো দিন যেতেও চাননি। স্বাধীনতার পর প্রধানমন্ত্রীর স্ত্রী হিসেবে তিনি
বিলাসী জীবন যাপনও করেননি। ধানমণ্ডির বাড়িতে থেকেছেন। জীবনের চলার পথে
সীমাবদ্ধতা থাকা বা সীমিতভাবে চলা—সব কিছুতে সংযতভাবে চলা শিখিয়েছেন
সন্তানদের। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার লেখায় আমরা পাই জীবনে যেভাবে চলা
উচিত, ঠিক সেভাবেই তিনি চলেছেন। বেগম ফজিলাতুন নেছা সম্পর্কে বঙ্গবন্ধু
বলেছেন, ‘রেণু আমার পাশে না থাকলে এবং আমার সব দুঃখ-কষ্ট, অভাব-অনটন,
বারবার কারাবরণ, ছেলে-মেয়ে নিয়ে অনিশ্চিত জীবন যাপন হাসিমুখে মেনে নিতে না
পারলে আমি আজ বঙ্গবন্ধু হতে পারতাম না। বাংলাদেশের স্বাধীনতাসংগ্রামেও
যুক্ত থাকতে পারতাম না। আগরতলা ষড়যন্ত্র মামলার সময় সে আদালতে নিত্য হাজিরা
দিয়েছে এবং শুধু আমাকে নয়, মামলায় অভিযুক্ত সবাইকে সাহস ও প্রেরণা
জুগিয়েছে। আমি জেলে থাকলে নেপথ্যে থেকে আওয়ামী লীগের হালও ধরেছে।’
আগরতলা
মামলায় অপরাধ প্রমাণিত হলে সর্বোচ্চ শাস্তির বিধান ছিল মৃত্যুদণ্ড, তখনো
সামরিক শাসকের কোনো আপস প্রস্তাবে স্বামীকে রাজি হতে দেননি বেগম ফজিলাতুন
নেছা। উনসত্তরের গণ-আন্দোলনের মুখে যখন প্রেসিডেন্ট আইয়ুব রাওয়ালপিণ্ডিতে
রাজনৈতিক নেতাদের গোলটেবিল বৈঠক ডেকে তাতে বঙ্গবন্ধুকে যোগ দিতে প্যারোলে
মুক্তি দেওয়ার প্রস্তাব দিয়েছিলেন, তখন আওয়ামী লীগের অনেক প্রবীণ নেতা রাজি
হলেও তিনি রাজি হননি। তিনি চাননি গণমুক্তির অধিনায়কের মাথা সামরিক শাসকের
কাছে নত হোক। তাঁর পরামর্শেই বঙ্গবন্ধু প্যারোলে মুক্তি পেতে অসম্মতি
জানান।
দেশের স্বাধীনতাযুদ্ধেও বেগম মুজিবের অবদান কম নয়। তিনি
পাকিস্তানি হানাদারদের হাতে বন্দি থেকেও দুই ছেলে শেখ কামাল ও শেখ জামালকে
যুদ্ধে পাঠাতে দ্বিধা করেননি। জীবনের শেষ মুহূর্ত পর্যন্ত তিনি বঙ্গবন্ধুর
পাশে ছিলেন। তাঁরই সঙ্গে জীবন দিয়েছেন। সংকটে নির্ভীক বঙ্গমাতা এক অনুসরণীয়
জীবনাদর্শের প্রতীক।