
শান্তিরঞ্জন ভৌমিক ||
এখন অনেক কথা বলতে গিয়ে কেন জানি বলতে বা লিখতে মন চায় না। তার কারণগুলো খুঁজে দেখেছি- সময়টা ভালো নয়, মানুষগুলোও উদার নয়। সকলেই আত্মপক্ষ সমর্থনে নির্মম, যুক্তি বা বাস্তবতা মানতে রাজি নয়। অনেকক্ষেত্রে বেপোয়ারা। সকলেই প্রশংসা প্রত্যাশী, কিন্তু কাউকে সম্মান করতে যেমন ভুলে গেছে, তেমনি ইতিবাচক মূল্যায়ন করতেও কৃপণতায় আপ্লুত।
মানুষ ও পশুকুলের মধ্যে স্পষ্ট যেমন বিভাজন রয়েছে, গুণগত পার্থক্যও পরিলক্ষিত হয়। বাড়ির পোষমানা কুকুরটি যতবাবেই অবহেলিত হোক না কেন, মনিবের বাড়ি ছেড়ে কখনো যায় না। এমনকি অন্য কেউ ভালো খাবার-দাবার দিলেও তা গ্রহণ করলেও মূল মনিবের বাড়ি চলে আসে, কোথাও যায় না। কিন্তু মানুষ যখন আদর্শহীন হয়ে পড়ে, তখন তার ঠিকানা পরিবর্তন করতে দ্বিধা করে না। স্বামী বিবেকানন্দের অসারণ একটি উক্তি আছে- ‘সত্যের জন্য সব ত্যাগ করা যায়, কিন্তু কোনকিছুর জন্য সত্যকে ত্যাগ করা যায় না।’ এই সূত্র ধরে বলছি- ‘আদর্শের জন্য সব ত্যাগ করা যায়, কিন্তু কোন কিছুর জন্য আদর্শকে ত্যাগ করা যায় না।’ অথচ কী দেখছি। কোন কিছুর জন্য আদর্শ ত্যাগী মানুষের ভিড়ে তো বেড়েই চলেছে। এক্ষেত্রে পশু ও মানুষের চরিত্র নিয়ে ভাববার অবকাশ রয়েছে।
স্কুল জীবনে রচনা বই-এ গরু--ঘোড়া-কুকুর-বিড়াল-হাতি ইত্যাদি প্রাণিদের সম্বন্ধে রচনা পড়েছি। পরীক্ষার খাতায় লিখে নম্বরও পেয়েছি। এজন্য সারাজীবন তাদের চিনতে ভুল হয়না। কিন্তু রচনা বই-এ ‘মানুষ’ সম্বন্ধে কোনো রচনা ছিল না। তাই সারাজীবন আর মানুষ চেনা হলো না।
সত্যি কথা বললে অনেক গোস্যা হবে জানি, বলতে তো হবে। যেমন বাঙালির সংস্কৃতিকে মূলত কারা বিতর্কিত ও ধ্বংস করেছে ? আমি বলব-হিন্দু ব্রাহ্মণবাদ।তথাকথিত হিন্দুরা। তারা পূজা করতে অভ্যস্ত কারণে-অকারণে। বড় একটি বৃক্ষ দেখলে পূজা করা শুরু করে, পুকুর-দিঘি বা নদীতে বড় মাছ ধরতে পারলে কলাপাতায় শুইয়ে সিঁদুর-ধান দুর্বা দিয়ে উলুধ্বনি দেয়, পেটমোটা বিরাট বপু বিশিষ্ট ব্যক্তি দেখলে চেয়ারে বা বিশেষ আসনে বসিয়ে পা ধুইয়ে পবিত্রপালে চরণামৃত (জল) খেতে থাকে, লোল্যসান্দু কাপড় পরিহিত লম্বাচুল বিশিষ্ট গাঁজাসেবকনকারীকে ‘সাধুবাবা’ বলতে বলতে পিছু নেয়। বিচিত্র সব ব্যাপার।
পহেলা বৈশাখ, বর্ষাবরণ, শরৎ-উৎসব, নবান্ন উৎসব, বসন্ত উৎসব ইত্যাদি তো বাঙালির সংস্কৃতি চর্চার অনুষঙ্গ। কিন্তু তথাকথিত হিন্দুরা এসব উৎসব-অনুষ্ঠানকে বর্ষায় অন্যসব বাঙালি মুসলমান-বৌদ্ধ-খ্রিস্টান এসব দেখে শুনে নিরুৎসাহিত হয়ে পড়ে, পড়েছে। এরূপ তো হওয়ার কথা ছিল না। আমি এটআকে সংস্কৃতি চর্চার ক্ষেত্রে বড় বাধা বলে মনে করি। তদ্রƒপ বাংলাদেশ স্বাধীনতার ৫০ বছর পর প্রজ্ঞাপন জারির মাধ্যমে যখন ‘জয় বাংলা’ স্লোগানকে জাতীয় স্লোগান হিসেবে আইন করা হলো, তাও আমার কাছে বিষয়টি স্বচ্ছ মনে হলো না। কারণ, আমি বিংশশতাব্দীর ষাটের দশকে কলেজ-বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র ছিলাম। ১৯৬৮ খ্রি: থেকে কলেজ শিক্ষক। ‘জয় বাংলা’ স্লোগানটি ব্যাপকভাবে ১৯৬৯খ্রি: গণ-অভ্যত্থানের সময় উচ্চারিত হয়েছে। ১৯৭০-এর নির্বাচনে এই স্লোগানটি আন্দোলনের অন্যতম প্রধান হাতিয়ার ছিল পাকিস্তান আমলে- আল্লাহু আকবর, নারায়ে তাকবির ইত্যাদি ধ্বনি শুনে শুনে বড় হয়েছি, কিন্তু ষাটের দশকে পূর্ববঙ্গে সেসব স্লোগান হারিয়ে না গেলেও উচ্চাতি হতো না, ক্ষেত্রে ‘জয়বাংলা’ জয়ধ্বনি দিয়ে প্রতিটি বাঙালির কন্ঠে শুধু উচ্চারিতই হতো না, শক্তি সঞ্চারের মোক্ষম অস্ত্র হিসেবে আবির্ভূত হলো। আর ১৯৭১ খ্রি: মুক্তিযুদ্ধ বা স্বাধীনতা যুদ্ধ তো হয়েছে এই ‘জয়বাংলা’ ধ্বনি দিয়েই। কাজেই ‘জয়বাংলা’ ছিল বা আছে বাঙালি জাতির কন্ঠভেদী শক্তিশালী ধ্বনি বা অস্ত্র হিসেবে। ৭ই মার্চ বঙ্গবন্ধু তাঁর ঐতিহাসিক ভাষণ শেষ করে উচ্চারণ করলেন- ‘জয়বাংলা’। সুতরাং ‘জয়বাংলা’ একক কোনো ব্যক্তি বা গোষ্ঠি অথবা দলের নয়। কিন্তু পরবর্তীতে দেখলাম- আওয়ামীলীগ ‘জয়বাংলা’ স্লোগান ও ‘জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান’- এ দুটি জাতীয় সম্পদকে তাদের দলের সম্পত্তি হিসেবে দৃঢ়ভাবে ধরে রাখতে চেয়েছে। ফলে এই দুটি জাতীয সম্পদ সার্বজনীন হতে পারেনি বা পারছে না। তাই প্রজ্ঞাপন জারি করতে হলো। আমার মন বড় সন্দেহ প্রবণ। কারণ, শুধুই প্রশ্ন জাগে- এখন থেকে কী সকল বাঙালি বা বাংলাদেশি এই সার্বজনীন স্লোগানটি উচ্চারণ করবেন ?
অপ্রাসঙ্গিক হলেও বলছি আমার জেঠিমা দিনের বেলায় জেঠামশায়কে ‘আপনি’ বলে সম্বোধন করতেন, রাত্রে ‘তুমি’। যে জেঠিমা দিনের বেলায় জেঠামশায়কে ভয় বা সমীহ করে চলতেন, রাত্রের বেলায় খুবই স্বাভাবিক। এমনকি দুষ্টুভাষায় গালি দিওে কুন্ঠাবোধ করতেন না।
আমরা শখ করে টিয়াপাখি, ময়না পাখি খাঁচায় রেখে যত্নসহকারে পালন করি। কষ্ট করে কত কথা শিকাই। বাড়িতে অতিথি এলে পাকিটি বৃদ্ধের মতো, গলা পরিষ্কার করে বলে ওঠে- ‘তুমি কেগো। ভালো আছ’। ইত্যাদি। কিন্তু যখনই সুযোগ বুঝে বিড়াল পাখির খাঁচায় আক্রমণ করে, তখন পাখিটি তার জন্মগত ধ্বনি দিয়েই আর্তচিৎকার করতে থাকে।
যে কথাটি বলতে চাইছি, তাহলো- সবকিছুই হলো আত্মগত উপলব্ধি ও শ্রদ্ধা আবেগের বিষয়। সেখানে প্রজ্ঞাপন শক্তিশালী ভূীমকা নিতে পারবে না, পারে না। ৭ই মার্চ, ২ শে মার্চ, ১৬ই ডিসেম্বর তো কোনো দলীয় দিবস নয়। যদিও ২১ ফেব্রুয়ারি জাতীয় শহীদ দিবস, ২৬ মার্চ জাতীয় স্বাধীনতা দিবস, ১৬ ডিসেম্বর জাতীয় বিজয় দিবস- তা কতটা সার্বজনীন ? এ বিষয়গুলো পীড়াদায়ক।
স্বাধীনতার ৫০ বছর পরও মুক্তিযোদ্ধা বিষয়ে ফয়সালা হয়নি, হচ্ছে না। পত্রিকায় খবর হয় ২০০০ জন মুক্তিযোদ্ধার বয়স পঞ্চাশ। অথচ দেশ স্বাধীন হয়েছে পঞ্চাশ বছর হলো। তারা কারা ? এসব দরকার আছে কি ? জাতির শ্রেষ্ঠ সন্তান হিসেবে মুক্তিযোদ্ধাদের আমরা সম্মান জানাই। আজ তাঁরা সরকারি ভাতা ও জাতীয় অনুষ্ঠানে গালভরা প্রশংসা বাণী ছাড়া কী পাচ্ছেন ? অথচ এতটুকু পাবার জন্য চোরাগলিতে নিরন্তর সুবিধাবাদী ও ক্ষমতাবানরা হেঁটেই চলেছেন অর্ধশতাব্দী ধরে। অনেকে মিথ্যা সনদে সরকারি সুবিধা ভোগের পর যখন আসল লাল বিড়ালটি ধরা পড়ল, তাদের খবর আছে কি ? দেশের জন্য প্রাণদানকারী মুক্তিযোদ্ধাদের নিয়ে এ রসিকতা কতদিন চলবে ? কষ্ট হয়, স্বাধীনতার পঞ্চাশ বছর পর নতুন মুক্তিযোদধার জন্মগ্রহণ, সামগ্রিকভাবে বাংলাদেশের স্বাধীনতাকে কটাক্ষ করার শামিল। যাঁরা প্রকৃত মুক্তিযোদ্ধা, যাঁরা জীবনবাজী রেখে ১৯৭১ সালে রণাঙ্গনে ঝাঁপিয়ে পড়ে কেউ শহিদ হয়েছেন, কেউ পঙ্গুত্ব বরণ করছেন, কেউ সৌভাগ্যক্রমে বেঁচে গেছেন, তাঁরা এই ত্যাগের বিনিময়ে কী পেলেন- একবার ভেবে দেখা দরকার। আমার জানা মতে অনেক মুক্তিযোদ্ধা এখন শুধুমাত্র ভাতার উপর নির্ভর করে বেঁচে-বর্তে আছেন। আর যারা মুক্তিযুদ্ধ করেননি, স্বাধীনতার বিরোধিতা করেছেন, তাদের জীবনমান এতটাই উন্নত, এমন কি তাদের হাতে মুক্তিযোদ্ধাদের ভাগ্য পরিবর্তনের দন্ডটি শোভা পাচ্ছে। যারা যে কোনভাবে ক্ষমতার কাছাকাছি অবস্থান করছেন, তারাই মুক্তিযোদ্ধাদের কুর্নিশ পেয়ে থাকেন। সোজা কথাটা হলো-মুক্তিযুদ্ধ বা স্বাধীনতা যুদ্ধের বিরোধিতা যারা করেছিল তাদেরকে কোনো সুযোগ দেয়াই জাতির জন্য হুমকি ও লজ্জাজনক।
জীবনযাপনের জন্য টাকার দরকার, সেজন্য অবৈধভাবে তা উপার্জন করতে হবে, এমনটি বাঞ্ছনীয় নয়। টাকা দেখলে নাকি কাঠের বাঘও হা করে, বাস্তবে তা তো দেখতে পাচ্ছি। আদর্শহীনতার জন্ম তো সেখান থেকেই। দুর্বলচিত্তের হাপোষা মানুষ আমি, তাই নাম জানা সত্ত্বেও কারও নাম উচ্চরণ করতে পারি না। স্বাধীনতা পূর্ব এমন আদর্শবাদীদের দেখেছি- সকালবেলা বুর্জোয়া-সাম্রাজ্যবাদ-আমেরিকাকে দশটি গালি না দিলে নাস্তা হজম হতো না, স্যাবাদ বা সমাজতন্ত্রের খাতা খুলে বসে থাকতেন, তারাই আজ আদর্শহীনতার বদৌলতে বাড়ি-গাড়ি-ব্যবসা-ব্যাংক এর মালিক বনে আছেন। তাহলে রুদ্র মোহাম্মদ শহীদুল্লাহর কথাই ঠিক। তিনি লিখেছেন- ‘বেশ্যাকে বিশ্বাস করা যায়, রাজনীতিবিদকে কখনো নয়।’ কারণ, তারা কেবল রং বদলায়। সুবিধাবাদী হওয়ার জন্য পোষাক পরে ঘুরে বেড়ায়। আজ সমাজে কী দেখছি। প্রখ্যাত অভিনেতা সৌমিত্র চট্টোপাধ্যায় লিখেছেন-
‘আত্মসম্মান নিয়ে বেঁচে তাকা মানুষগুলো গ্রহণযোগ্যতা হারাচ্ছে, আর তেলমারা মানুষগুলো সকলের কাছে গ্রহণযোগ্য হয়ে উঠছে।’
বাংলাদেশের জাতীয় ফল কাঁঠাল। তা খেতে হলে হাতে তেল মাখতে হয়। এজন্যই কী সকল কাজে এত তেলের ব্যবহার।
মানুষ রচনা তো স্কুল জীবনে পড়িনি, তাই যেমন মানুষ চিনতে পারি না, তেমনি আবার জীবন-অভিজ্ঞতায় মানুষ চরিত্র যে বুঝিনা, তাও নয়, সমাজে একশ্রেণি লোক আছে-
‘লেখা নাই পড়া নাই
সমাজের সরদার।
জ্ঞানী গুণী চুপচাপ
বিচার করে বাটপার।’
বর্তমানে আদর্শহীন রাজনীতিচর্চা ও যুক্তিহীন ধর্মীয় আগ্রাসনবাদই মৌলিক জাতিসত্তাকে গ্রাস করে ফেলেছে। একটি জাতি যদি তার সংস্কৃতিচর্চায় সর্জজনীনতা হারিয়ে ফেলে, তবে পরিচয়টা থাকে কোথায় ? তাই বিশেষ করে বাঙালিয়ানায় যে সংকট দেখা দিয়েছে। তার উত্তরণের পথ খুঁজে বের করতে হবেই।
লেখক: সাহিত্যিক, গবেষক ও সাবেক অধ্যাপক
মোবাইল: ০১৭১১-৩৪১৭৩৫