ই-পেপার ভিডিও ছবি বিজ্ঞাপন কুমিল্লার ইতিহাস ও ঐতিহ্য যোগাযোগ কুমিল্লার কাগজ পরিবার
জীবনবোধ ও জীবনদর্শন
Published : Thursday, 2 June, 2022 at 12:00 AM
জীবনবোধ ও জীবনদর্শনজুলফিকার নিউটন ||
পূর্বে প্রকাশের পর
২১
যে পর্যন্ত না আমরা অনুভব করতে শিখি যে কেউ না কেউ আমাদের কথা ভাবছে, ভালোবাসছে সে পর্যন্ত এ পৃথিবী আমাদের কাছে পত্রপুষ্পে সুশোভিত হয় না। মানুষ যদি জানে যে তাকে ভালোবাসবার কেউ আছে, তাকে গ্রহণ করবার কেউ আছে, তাকে আনন্দিত করবার জন্য কেউ অপেক্ষায় আছে তাহলেই মানুষ জীবনকে মূল্যবান ভাবতে পারে। আকাশে মেঘের বিভিন্ন আকৃতি, লতাপাতায় এবং বৃক্ষশাখায় নানাবিধ রূপের অভিব্যক্তি তখনই দৃষ্টিতে উজ্জ্বল দীপ্যমান হয় যখন আমাদের চিত্তে হর্ষ থাকে। আমার সবসময় একটি নির্ভরতা ছিল আমার গৃহের আপনজনের প্রতি বাইরে কোথাও গেলেও গৃহগত সৌজন্যের চিন্তায় আমি আচ্ছন্ন থাকতাম এবং প্রত্যাবর্তনের প্রত্যাশায় থাকতাম। কলেজে যদিও একটি মুক্ততা ছিল অর্থাৎ নিজেকে স্বাধীনভাবে চলমান করবার অভিপ্রায় ছিল, তাহলেও চিত্তের নিভৃতে আমি গৃহের নির্ভরতাকে লালন করেছি। বোধ হয় এই নির্ভরতাই আমাকে পরবর্তীতে কবিতা লেখায় উদ্বুদ্ধ করেছে।
এ সময় আমার প্রিয় কবিদের মধ্যে একজন ছিল জন কীটস। কলেজ জীবনে প্রবেশের মুখে জন্মদিনের উপহারস্বরূপ জন কীটসের কাব্যগ্রন্থ পেয়েছিলাম। এখানে একটি কবিতা ছিল, নির্জনতার প্রতি এই কবিতাটি বারবার পাঠ করেও আমার তৃপ্তির পূর্ণতা আসত না। মনে হত অনবরত পড়ি। কবিতাটিতে কীটস বলছেন, তুমি তোমার নির্জন বেদনাকে কারো কাছে প্রকাশ করো না অথবা এমন কোনো সঙ্গী খুঁজো না। যার সঙ্গে আলোচনায় তোমার নিঃসঙ্গতা দূর হবে। তোমার যে দুঃখ সে দুঃখ একান্ত তোমারই থাক। ছায়ায় ছায়ায় এমন একটি আচ্ছন্নতা আসবে যে আচ্ছন্নতায় বিমুগ্ধ হয়ে তুমি অচৈতন্য হয়ে পড়বে। নির্জন দুঃখটা অশ্রুসিক্ত মেঘের মতো আকাশ থেকে ঝরে পড়ে। তখন ফুলের পাপড়িগুলো নুয়ে পড়ে এবং পাহাড়ের সবুজে ঢেকে যায়। তুমি তোমার নির্জন বেদনাকে সকাল বেলার গোলাপের পাপড়িতে ধারালো করো এবং একান্তে বেদনার বল্লভ হও। আমাদের বেদনার বোধ সৌন্দর্যের মধ্যে বাস করে। যে সৌন্দর্য একদিন না একদিন মৃত্যুতে গত হবে। সুতরাং যতদিন এ সৌন্দর্য বিদ্যমান আছে ততদিন তাকে লালন করো এবং সমৃদ্ধ করো। রাত্রি যেমন অপরিসীম নৈপুণ্যের সঙ্গে সবকিছুকে নিজের পক্ষপুটে ধারণ করে তেমনি নির্জনতার পক্ষপুটে তুমি আশ্রিত হও'।
আমি বিচিত্র কোলাহলের মধ্যে আমার চিত্তের জন্য এক প্রকার নির্জনতা এবং নিভৃতি নির্মাণ করে নিয়েছিলাম। এটা সম্ভবপর হয়েছিল গৃহগত নির্ভরতার জন্য। অর্থাৎ যেখানে যে অবস্থায়ই থাকি না কেন একটি নিভৃতলোক আমার চিত্তের মধ্যে বিদ্যমান থাকতো।
কুমিল্লা শহরে তখন প্রচুর গাছ ছিল। আজকের তুলনায় সেদিনের শহর ছিল একটি বনভূমির মতো। আমরা কয়েকজন ছাত্র সন্ধ্যার সময় বেড়াতে বেরোতাম। আজ যেখানে ময়নামতি বাংলাদেশ পল্লী উন্নয়ন একাডেমী, কুমিল্লা তার পিছনে ঘন বিন্যস্ত বনভূমি ছিল। সেই বনভূমির পাশ দিয়ে হাঁটতে আমাদের ভালো লাগতো। সন্ধ্যাকালে গাছের পাতার সাড়া, পাখির ডাক এবং বাতাসের দোলায় শিহরিত ডালপালাগুলো আমাকে আনন্দ দিত। মাঝেমাঝে ভাবতাম এই বনভূমির আচ্ছন্নতার মধ্যে যদি বৃষ্টি নামে তাহলে খুব ভালো হয়।
কেন ভাবতাম জানি না। তবে মনে হয় চিত্তের সকল প্রকার ইচ্ছা বৃষ্টিতে রূপান্তরিত হোক এই সম্ভবত চাইতাম। কোনো কোনো দিন বৃষ্টির মধ্যে যে পড়িনি তা নয়। অপূর্ব মৃদঙ্গ বাজিয়ে বৃষ্টি নেমেছে, আমরা অর্ধসিক্ত অবস্থায় গাছের তলায় গিয়ে দাঁড়িয়েছি এবং পর্যাপ্ত সময়ের মধ্যে জীবনের উচ্ছলতাকে প্রত্যক্ষ করেছি। তখন গৃহের কথা যে না ভেবেছি তা নয়, গৃহে প্রত্যাগমনের ইচ্ছা জেগেছে কিন্তু সেই ইচ্ছাকে শাসন করে বৃষ্টির প্রতাপ দেখতে চেয়েছি। আমার মনে হয়, আমি সে সময় আমার নবোদ্ভিন্ন যৌবনের কামনা এবং ইচ্ছাকে বৃষ্টির মধ্যে প্রত্যক্ষ করতাম। তাই বোধ হয় যুবতী রমণীর প্রতি আকর্ষণ প্রকাশ্যে প্রশমিত রাখতে সমর্থ হয়েছিলাম।
প্রকৃতিকে ভালোবাসা যৌবনের ধর্ম, কেননা মানবজীবনের দুঃখ এবং পাপবোধ প্রকৃতির প্রতি আকর্ষণকে বিলুপ্ত করে দেয়। যৌবনে রক্তের উচ্ছলতা থাকে, আশা থাকে, চিত্তের পরিচ্ছন্নতা থাকে এবং মৃত্যুর জন্য অপেক্ষা থাকে না। তাই তখন প্রকৃতির কাছে আমরা সব সমর্পণ করতে পারি। আমার কাছে বন্য প্রকৃতি সবচেয়ে ভালো লাগতো। সুতরাং যেখানে প্রকৃতি তার স্বাভাবিকতায় বিকশিত সেখানকার প্রকৃতির কাছেই আমি যেতে চাইতাম। তাই সুযোগ পেলেই কুমিল্লার সেই সমস্ত অঞ্চলে বেড়াতে যেতাম, যেখানে বৃক্ষরাজি আপন ইচ্ছায় আকাশের দিকে ডানা মেলেছে। কয়েকবার ময়নামতি গিয়েছি। তখন ময়নামতি ছিল একটি বিস্তৃত বনাঞ্চল। বর্তমানের মতো শিল্পসমৃদ্ধ এলাকা নয়। সেখানে প্রচুর শালবৃক্ষ, আম্রবৃক্ষ এবং বটগাছ ছিল। এক জায়গায় প্রচুর বাবলা গাছ ছিল। বাবলা গাছগুলো ছেয়ে থাকতো উদ্দীপ্তকান্তি স্বর্ণলতায়। অবশ্য তখন ময়নামতিতে প্রচুর বানর ছিল। কিন্তু এ বানরগুলো বনভূমির শোভা বর্ধন করতে সৌন্দর্যের হানি করতো না। তারা আনন্দিত উল্লাসে গাছের শাখা ধরে ঝুলতো। লাফিয়ে লাফিয়ে এক শাখা থেকে অন্য শাখায় যেতো এবং মানুষ দেখলে শব্দ করে উঠতো।
এখনকার দিনে আমরা বৃক্ষ কর্তন করে প্রশস্ত এলাকা তৈরি করে নেই। কিন্তু অতীতে এটা ছিল না। পাহাড় পাহাড়ের মতোই থাকতো। নদী তার নিজস্ব গতিতেই চলতো। বনভূমিতে গাছগুলো শ্রেণীবদ্ধভাবে নিশ্চিন্তে দাঁড়িয়ে থাকতো। এগলোকে নিয়েই মানুষের বসবাস ছিল। এখন আমরা সবকিছুতেই হাত লাগিয়েছি। মানুষের নিষ্ঠুর করস্পর্শে প্রকৃতি আহত হয়েছে।
আমাদের পরিবারে প্রকৃতি প্রেমটি অত্যন্ত নিবিড় ছিল। আমার নানা ছিলেন একজন সুফী সাধক। তিনি মাঝে মাঝে নির্জন বনভূমি দেখলেই সেখানে চলে যেতেন এবং মনুষ্য কোলাহলের বাইরে সুগভীর নির্জনতায় আল্লাহর ধ্যানে বসতেন। আমার এক মামা অল্প বয়সে মারা যান কিন্তু শৈশব থেকেই তাঁর বনভূমির প্রতি আকর্ষণ ছিল। তিনি সকাল, বিকাল দুবেলাই বাড়ির কাছে বাগান অথবা নদীর তীরের গাছপালার মধ্যে ঘুরে বেড়াতে ভালোবাসতেন। গাছের ফল খেতেন এবং কখনো কখনো পাখিদের ধান গম খাওয়াতেন। মার কাছে শুনেছি যে বনের পাখিরা নাকি তাকে চিনতো। অর্থাৎ প্রতিদিন তার কাছে খাবার পেয়ে পাখিদের একটি অভ্যাস হয়ে গিয়েছিল। পাখিরা তাঁকে দেখলেই সাড়াশব্দ করে তার আশপাশে ঘুরতো এবং তিনি হাতের মুঠোয় গম কিংবা চাল ছিটিয়ে দিলে সেগুলো তারা ঠোট দিয়ে তুলে নিত। আমার এই মামার জীবনের ওপর অনেক অলৌকিকতা আরোপ করা হয়েছে। মার মুখেই তার জীবনের অনেক অলৌকিক অবাস্তব ঘটনার কথা শুনেছি। কিন্তু আমার কাছে এসব অলৌকিক ঘটনার চাইতে প্রকৃতির সঙ্গে তাঁর একাত্মতাই মূল্যবান বলে মনে হয়েছে। শুনেছি তিনি উজ্জ্বল দীপ্তিমান ছিলেন, তিনি ঘোড়ায় চড়তেন, তাঁর একটি সাদা ঘোড়া ছিল। আমাদের জীবনে অতীতে প্রকৃতির পৃষ্ঠপোষকতা ছিল কিন্তু দুর্ভাগ্যক্রমে এখন আর নেই। এখন নির্জনতাকে কামনা করা যায়। কন্তু পাওয়া যায় না।
চলবে.....