
শান্তিরঞ্জন ভৌমিক ||
(পূর্বে প্রকাশের পর)
দুর্গা
চৌমুহনীতে আমাদের এলাকার যতীন্দ্র দাস (বিপত্মীক) দেশত্যাগী হয়ে
হোমিওপ্যাথি করেন। এ পেশাটা তাঁর পারিবারিক বলা চলে। তাঁর বড়ভাই মনীন্দ্র
চন্দ্র দাস, তিনি কুমিল্লা চান্দিনা পাইলট স্কুলের সহকারী শিক্ষক ছিলেন। বি
এ পাশ। মনে প্রাণে হোমিওপ্যাথি করতেন, এতে সুনামও অর্জন করেছেন। এ
পরম্পরায় তাঁর অন্য ভাইরা এ পেশায় যোগ দেন। যতীন্দ্র ডাক্তার যতটা না
হোমিওপ্যাথিতে আন্তরিক, আড্ডাবাজ সেবে সমধিক পারঙ্গম। কল্পিত ও বানানো গল্প
বিশ্বাসযোগ্য করে বলতে পারতেন। এতে আকর্ষণ ছিল। কিন্তু কেউ আমলে নিতেন না।
শরণার্থী হয়ে বেকার। প্রায়দিন বিকেলবেলা সেখানে চলে যেতাম, যতীন্দ্র
ডাক্তার মুক্তিযুদ্ধকালীন দৈনন্দিন খবর এমনভাবে বানিয়ে বলতেন, তাতে আশা
নিরাশা নিয়ে সময় কাটাতে পারতাম। কিন্তু এভাবে কত দিন। অনেক চেষ্টা করে দুটি
টিউসনি জোগার করলাম। স্কুলের ৬ষ্ঠ শ্রেণির ছাত্র। বাংলার অধ্যাপক, স্কুলের
ছেলের অংক, ইংরেজি পড়াতে স্বাচ্ছন্দ্যবোধ করতাম না। একমাস কোনো প্রকারে
কাটিয়ে যখন বিদায় নিতে যাব, ছাত্রের অভিভাবকগণ বললেন, 'আপনি তো ভালোই পড়ান।
অসুবিধা না থাকলে যদি পড়ান তবে খুশি হবো। সপ্তাহে একদিন পর একদিন অর্থাৎ
তিন দিন মাসে বারোদিন। ঠিক হলো চল্লিশ টাকা করে। দু'টি টিউশনিতে আশি টাকা
কম নয়। তবে আরো একমাস পড়ালাম। এদিকে আমার একটি খণ্ডকালীন চাকুরি হয়।
ত্রিপুরা রাজ্যের রেডক্রস-এ সহকারী জনসংযোগ অফিসার (অচজঙ)। দৈনিক আট টাকা।
সপ্তাহে ছয়দিন। কাজ করলে টাকা অনুপস্থিতিতে নয়। নিয়োগকর্তা জি বি
হাসপাতালের সুপারিন্টেন্টেড বিখ্যাত শল্য চিকিৎসক ডাঃ রথীন দত্ত । কাজ হলো-
জিবি হাসপাতালের উত্তরাংশে বিরাট তাবু খাটিয়ে বাংলাদেশ থেকে আহত লোকদের
জন্য চিকিৎসার ব্যবস্থা করা হয়েছে। আহতরা কীভাবে আহত হয়েছে, তারা কীভাবে
আক্রান্ত হয়েছে ইত্যাদি ব্যাপারে ছক অনুযায়ী প্রতিবেদন তৈরি করা, সপ্তাহে
দুদিন রেডক্রস গাড়িতে করে বিভিন্ন শরণার্থী শিবিরে গিয়ে রেডক্রস থেকে যে
শিশু খাদ্য, পোষাক ও বৃদ্ধদের কাপড়, ঔষধ ইত্যাদি দেয়া হয় তা ঠিকমত দেয়া হয়
কীনা এবং কী পরিমাণ দেয়া হয়েছে তাদের নাম ধাম এবং চাহিদাপত্র তৈরি করে
প্রতিবেদন, সপ্তাহের শেষ দিন রেডক্রসের সভাপতি ডাঃ রথীন দত্তের কাছে জমা
দেয়া এবং সাপ্তাহিক বেতন গ্রহণ করতে হতো। কুঞ্জবন এ রেডক্রসের অফিস ছিল,
টাইপিস্ট ছিলেন কুমিল্লা কমার্সিয়াল টাইপ স্কুলের দীলিপ কুমার পাল
(ভুতুবাবু)। তিনি সুন্দর করে আমার প্রতিবেদনটি ইংরেজিতে টাইপ করে দিতেন।
আমি জুলাই-অক্টোবর এ চার মাস এ চাকুরিটি করেছিলাম।
সে সময় এ টাকাটা এবং
কর্মব্যস্ততা আমাকে অসহায় অবস্থা থেকে রক্ষা করেছিল। আমার টাকা বড় মাসীর
পরিবার গ্রহণ করেনি। শীতকালের জন্য লেপ-তোষক, গরম কাপড় তৈরি করতে হয়েছিল। এ
সুযোগে মাসীমার পরিবারের কোনো কোনো সদস্যকে সামান্য উপহার দিতে পেরেছিলাম।
খুবই নগণ্য কিন্তু তৃপ্তি ছিল।
চাকুরির উপলক্ষে আমার অভিজ্ঞতার কথা
অবশ্যই বলতে হয়। জিবি হাসপাতালে যখন আহতদের কাছে যেতাম দেখতাম কারো হাত নেই
পা নেই। কুমিল্লার দীনেশ কর, তিনি পাসপোর্টের প্রতিনিধি (দালাল) ছিলেন।
পরিচিত ব্যক্তি, রকেট শেলে এক পা বিচ্ছিন্ন হয়ে গেছে। দেবিদ্বারের এম সি এ
ক্যাপ্টেন সুজাত আলী সম্মুখ যুদ্ধে তলপেটে গুলিবিদ্ধ হয়ে হাসপাতালে
চিকিৎসাধীন, কোনো শিশুর পিঠে গুলির চিহ্ন যন্ত্রণায় কাঁদছে নানা ধরনের আহত
মানুষ ছোট বড় বৃদ্ধ । যতবার তাদের কাছে গিয়েছি ততবার কেঁদেছি। রেডক্রসের
গাড়িতে শরণার্থী শিবিরে গেলে প্রথমই কতগুলো প্রশ্নের সম্মুখীন হতাম। যুদ্ধ
কী শেষ হয়ে গেছে? আমরা কী বাড়ি-ঘরে যেতে পারব? আত্মীয় স্বজন মা-বাবার খোঁজ
পাই না আপনারা কী ঠিকানা দিলে খবর এনে দিতে পারবেন? মিথ্যা আশ্বাস বাণী
শুনিয়ে সান্ত্বনা দিতে চেষ্টা করতাম। রেডক্রস যে সব জিনিস দিত তা আগ্রহ ভরে
শৃংখলা মত গ্রহণ করত। কোনো কোনো পরিবারের সদস্য দূরে দাঁড়িয়ে থাকত এসব
জিনিস নিতে লজ্জাবোধ করত, অবশ্যই সম্ভ্রান্ত পরিবারের লোকজন, কাছে গিয়ে
তাদের প্রয়োজন জানতে চেয়েছি। প্রয়োজন তো আছেই, কিন্তু মুখ ফুটে বলা যে অতি
কষ্টকর। অপমানজনক। চোখের জলে মা-বোনদের বুক ভিজানো কান্না দেখেছি। কতটা
নিরুপায় হয়ে হাত বাড়িয়েছে, না জানি উপোস করেও হাত পাততে পারেনি। রেডক্রসের
সামান্য চাকুরির অছিলায় আমি মুক্তিযুদ্ধের ভয়াবহ চিত্র স্বচক্ষে দেখেছি।
অসহায় মানুষের চিৎকার, আহাজারি এবং বাংলাদেশ নামক মাতৃভূমির জন্য আকুতি ও
প্রার্থনা শরণার্থী শিবিরে শিবিরে ঘুরে প্রত্যক্ষ করেছি, যাপন করেছি। তারা
আমার মতো অস্ত্রধারী মুক্তিযোদ্ধা নয়, স্বাধীনতার জন্য তাদের আত্মত্যাগকে
এবং দুঃসহ জীবনযুদ্ধকে অস্বীকার অবহেলা করা হবে চরম অন্যায় ও অমানবিক।
শরণার্থীরা পরোক্ষভাবে মুক্তিযোদ্ধা, এ কথাটা ভুললে তাদের প্রতি অসম্মান
জানানো হবে।
পিছনের কথা বলতে হয়, আমাদের গ্রামের বাড়িতে বাবা-মা
ভাইবোনদের নিয়ে কীভাবে আছেন তা কিছুই জানতাম না। এলাকা থেকে কেউ এলে তার
কাছে যেতাম, খবর নিতে চাইতাম, ভাসা ভাসা খবর পেতাম। কারণ, সকলেই জীবনমরণ
সন্ধিক্ষণে কালাতিপাত করতে হয়েছে কার খবর কে রাখে। যে-ই সুযোগ পায় তারাই
কোনোভাবে চলে আসে। পরে শুনেছি বাবা পরিবার পরিজনসহ দেশত্যাগী হতে উদ্যোগ
নিয়েছিলেন। ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান সিদ্দিকুর রহমান মিঞা, তিনি
পাশ্ববর্তী চিনামূড়া এল এন স্কুলের প্রধান শিক্ষক ছিলেন চেয়ারম্যান হওয়ার
পর চাকুরি ছেড়ে দেন। বাবা বরকোটা স্কুলের প্রধান শিক্ষক- তাঁদের পরিচয় ও
ঘনিষ্ঠতা ছিল। চেয়ারম্যান সিদ্দিক মিঞা যখন শুনলেন। বাবা দেশত্যাগী হতে
চান, আমাদের বাড়ি এসে বাবাকে বলেন- আপনি যাবেন না, আমি আপনার পাশে থাকব।
যেতে চাইলে মেলিটারির হাতে তুলে দিব। বাবা আর সাহস করেন নি।
(ক্রমশঃ)
লেখক: সাহিত্যিক, গবেষক ও সাবেক অধ্যাপক
মোবাইল: ০১৭১১-৩৪১৭৩৫