
নিরঞ্জন রায় ||
আগামী
৯ জুন জাতীয় সংসদে ২০২২-২৩ অর্থবছরের বাজেট পেশ করা হবে। সেই বাজেট
প্রস্তুতির কাজ বেশ জোরেশোরেই শুরু হয়েছে। কয়েক বছর ধরে বঙ্গবন্ধুকন্যা শেখ
হাসিনার নেতৃত্বে আওয়ামী লীগ সরকার যেভাবে বাজেট দিয়ে আসছে তাতে প্রতিবছরই
এই জাতীয় বাজেট নিয়ে এক ধরনের বিশেষ আগ্রহের সৃষ্টি হয়েছে। বিশেষ করে
মেগাপ্রকল্পগুলোর বাস্তবায়ন কিভাবে এগিয়ে চলেছে, নতুন কোন কোন
মেগাপ্রকল্পের কাজ শুরু হবে এবং সামাজিক নিরাপত্তার ক্ষেত্রে কী কী নতুন
বরাদ্দ আসছে ইত্যাদি বিষয় দেশের মানুষের মধ্যে আগ্রহের জায়গা করে নিয়েছে।
অবশ্য
সেই সঙ্গে দ্রব্যমূল্যের বৃদ্ধি নিয়ে শঙ্কাও থাকে। বাজেট প্রস্তুত সরকারের
নিয়মিত ও গতানুগতিক কাজ মনে হলেও কয়েক বছর ধরে এই কাজটি এক ভিন্ন মাত্রা
পেয়েছে। বিশেষ করে দুই বছর ধরে করোনা মহামারির কারণে সরকারকে বাজেট বরাদ্দ
দিতে বেশ হিমশিম খেতে হয়েছে। একদিকে করোনার কারণে মাত্রাতিরিক্ত অনির্ধারিত
ব্যয়, জান-মাল রক্ষা করা এবং একই সঙ্গে অর্থনীতির চাকা সচল রাখতে গিয়ে
সরকারকে যেভাবে বাজেট বরাদ্দ নিশ্চিত করতে হয়েছে তা এককথায় অসম্ভবকে সম্ভব
করার শামিল। এর মধ্যে নতুন করে যোগ হয়েছে রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধ, যা বিশ্ব
অর্থনীতির গতি-প্রকৃতিই বদলে দিতে শুরু করেছে। এক অনিশ্চিত বিশ্ব
পরিস্থিতির মধ্যে সরকারকে এই বছর বাজেট দিতে হবে। ফলে কাজটা যে এবার অনেক
বেশি কঠিন তা আর বলার অপেক্ষা রাখে না।
আমাদের জাতীয় বাজেটের সব সময়ই
দুটি দিক থাকে। একটি রাজস্ব বাজেট এবং আরেকটি অংশ হচ্ছে ক্যাপিটাল বা মূলধন
বাজেট। অতীতে সব সময়ই দেখা গেছে, রাজস্ব বাজেটে কিছুটা হলেও উদ্বৃত্ত
থাকে; কিন্তু মূলধন বাজেটে সব সময়ই থাকে ঘাটতি, ফলে সার্বিকভাবে একটি ঘাটতি
বাজেট হিসেবেই উপস্থাপন করা হয়। এর কারণ বার্ষিক উন্নয়ন প্রকল্পের ব্যয়
বরাদ্দ থাকে এই মূলধন বাজেটে, যা কখনোই নিজস্ব অর্থায়নে করা সম্ভব নয়।
পৃথিবীর সব দেশের উন্নয়ন প্রকল্পের বরাদ্দের বৃহৎ একটি অংশ সংগ্রহ করতে হয়
দীর্ঘমেয়াদি ঋণ গ্রহণের মাধ্যমে। তাই বাংলাদেশও এর কোনো ব্যতিক্রম হবে
না—এটাই স্বাভাবিক। বাংলাদেশের বর্তমান সরকার দীর্ঘমেয়াদি অবকাঠামো
নির্মাণের উদ্দেশ্যে অনেক মেগাপ্রকল্প হাতে নিয়েছে এবং এসব প্রকল্পের কাজ
দ্রুতগতিতে এগিয়ে চলেছে। দেশের উন্নয়নের অগ্রযাত্রা ধরে রাখতে হলে আরো নতুন
নতুন মেগাপ্রকল্প গ্রহণ অব্যাহত রাখতে হবে, আগামী দিনে তাও অনস্বীকার্য।
এসব কারণে বর্তমান সরকারের বাজেটের আকার একদিকে যেমন বাড়তে থাকবে, অন্যদিকে
তেমনি বাজেট ঘাটতির পরিমাণও যে বৃদ্ধি পাবে, তা নিশ্চিত করেই বলা যায়। আর
এই ঘাটতি মেটাতে গিয়ে সরকারকে যে অধিক মাত্রায় ঋণ করতে হবে তাতে কোনো
সন্দেহ নেই। আর এখানেই এবারের জাতীয় বাজেট তৈরির ক্ষেত্রে বিশেষ নজর দেওয়ার
প্রয়োজন রয়েছে। সাধারণত সরকার বাজেট ঘাটতি মেটানোর জন্য দেশের অভ্যন্তরীণ ও
আন্তর্জাতিক উভয় সূত্র থেকে ঋণ গ্রহণ করে থাকে। এ বছর এই দুই খাত থেকে ঋণ
গ্রহণের ক্ষেত্রে সরকারকে যথেষ্ট মুনশিয়ানার পরিচয় দিতে হবে এবং সর্বাধিক
হিসাব-নিকাশ করে অগ্রসর হতে হবে পরিবর্তিত বিশ্ব পরিস্থিতির কারণে।
উন্নয়নকাজ
অব্যাহত রাখার স্বার্থে বিদেশি সংস্থা থেকে ঋণ গ্রহণ করতেই হবে। কিন্তু এই
বিদেশি সংস্থা থেকে ঋণ গ্রহণের কারণে যাতে কোনো রকম চাপে থাকতে না হয় সে
জন্য বিকল্প ব্যবস্থা হিসেবে নিজস্ব উদ্যোগে দীর্ঘমেয়াদি একটি তহবিলের
ব্যবস্থা রাখা যেতে পারে। বিদেশি ঋণের টাকা আকস্মিক ফেরত চেয়ে বসলে যাতে
বিপাকে পড়তে না হয় সে জন্য নিজস্ব ব্যবস্থাপনায় স্থায়ী ও দীর্ঘমেয়াদি
বৈদেশিক মুদ্রার একটি বাফার রিজার্ভ সৃষ্টি করে রাখতে হবে। আমাদের দেশ
চাইলে এই কাজটি খুব সহজেই করতে পারে, কারণ প্রায় এক কোটি বাংলাদেশি প্রবাসে
বসবাস করেন। এর অর্ধেক প্রবাসী অর্থাৎ ৫০ লাখ প্রবাসী বাংলাদেশির কাছে
জনপ্রতি ২৫ হাজার ডলার মূল্যের ১০-২০ বা ৩০ বছরমেয়াদি প্রবাসী ডলার বন্ড
বিক্রি করতে পারলে বাংলাদেশ এখান থেকেই প্রায় ১২৫ বিলিয়ন ডলার মূল্যের
তহবিল সংগ্রহ করতে পারবে, যা বর্তমান রিজার্ভের তিন গুণ। এত বিশাল অঙ্কের
নিজস্ব বৈদেশিক মুদ্রার তহবিল সংরক্ষণের কারণে কোনো রাষ্ট্রের ওপর বৈদেশিক
ঋণ পরিশোধের চাপ সৃষ্টি করা যায় না। তাই দেশ যাতে বৈদেশিক ঋণ নিয়ে কোনো রকম
চাপের মধ্যে না থাকে সে জন্যই প্রবাসী ডলার বন্ড বিক্রি করে ভালো অঙ্কের
বৈদেশিক মুদ্রার বাফার তহবিল গড়ে তোলা সম্ভব। যদিও বর্তমানে ইউএস ডলার বন্ড
ও ওয়েজ আরনারস ডেভেলপমেন্ট বন্ড চালু আছে; কিন্তু এগুলো প্রবাসীদের মাঝে
বিক্রির জন্য জনপ্রিয় করে তোলার কোনো রকম প্রচেষ্টা নেই। উল্টো সব কিছুতে
জাতীয় পরিচয়পত্রকে একমাত্র বাধ্যতামূলক আইডি করে প্রবাসীদের এসব বৈদেশিক
বন্ড ক্রয়ের পথ বন্ধ করে দেওয়া হয়েছে। এমনকি জাতীয় পরিচয়পত্রের অভাবে
প্রবাসীরা এরই মধ্যে ক্রয় করা বন্ড নবায়ন করতে না পেরে সেই ডলার বিদেশে
ফিরিয়ে নিয়ে যেতে বাধ্য হবেন। সরকার যদি জাতীয় পরিচয়পত্রের পাশাপাশি বিকল্প
আইডি, বিশেষ করে পাসপোর্ট গ্রহণের সুযোগ না দেয়, তাহলে এর মারাত্মক
নেতিবাচক প্রভাব পড়বে দেশের বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভের ওপর। কারণ বেশির ভাগ
প্রবাসী বাংলাদেশির জাতীয় পরিচয়পত্র নেই এবং সরকার এখনো প্রবাসীদের মাঝে
জাতীয় পরিচয়পত্র প্রদানের কাজ শুরুই করেনি।
এ কথা ঠিক যে বিদেশি সংস্থা,
বিশেষ করে বিশ্বব্যাংক, এশিয়ান উন্নয়ন ব্যাংক, আন্তর্জাতিক ফিন্যানন্স
করপোরেশন থেকে যে ঋণ পাওয়া যায় তার ওপর নামমাত্র হারে সুদ দিতে হয়।
পক্ষান্তরে ডলার বন্ড বিক্রি করে অর্থ সংগ্রহের জন্য তুলনামূলক বেশি হারে
সুদ দিতে হয়। কিন্তু উভয় সূত্র থেকে অর্থ সংগ্রহ করে গড় সুদের হার কমিয়ে
রাখা সম্ভব এবং সেই অর্থ দেশের বাণিজ্যিক ব্যাংকসহ বিভিন্ন ব্যাবসায়িক
প্রয়োজনে বিনিয়োগ করে এই ঋণের খরচ অনেকটাই উঠিয়ে আনা সম্ভব। এ ক্ষেত্রে
তেমন কোনো লাভ না হয়ে যদি কিছুটা খরচও হয় তার পরও দেশ বৈদেশিক মুদ্রার
তারল্য ও স্থায়িত্বের দিক থেকে সব সময় সুবিধাজনক অবস্থানে থাকবে। কোনো
অবস্থায়ই বৈদেশিক ঋণ নিয়ে চাপে থাকা যাবে না, কারণ এতে যেকোনো সময় আকস্মিক
সমস্যার সৃষ্টি হতে পারে, যা কোনো অবস্থায়ই কাম্য নয়। এ ক্ষেত্রে শ্রীলঙ্কা
কোনো উদাহরণ নয়। তবে গত শতাব্দীর নব্বইয়ের দশকে ‘এশিয়ার উদীয়মান ব্যাঘ্র’
হিসেবে খ্যাতি পাওয়া কয়েকটি দেশ, বিশেষ করে দক্ষিণ কোরিয়া, থাইল্যান্ড,
তাইওয়ান, মালয়েশিয়া, ইন্দোনেশিয়া অতিরিক্ত বৈদেশিক ঋণ নিয়ে তাদের উন্নয়ন
কর্মকাণ্ড ত্বরান্বিত করেছিল এবং সমগ্র বিশ্ব তাদের প্রশংসায় পঞ্চমুখ ছিল।
উন্নয়নের শীর্ষে থাকা সত্ত্বেও সেই দেশগুলো বিদেশি ঋণের চাপে পড়ে কী ভয়ংকর
বিপদে পড়েছিল তা আমাদের সবারই মনে থাকার কথা। এ কারণেই উন্নতি করতে হবে এবং
উন্নতি করতে গেলে ঋণ নিতেই হবে। কিন্তু বিদেশি ঋণ নিয়ে যেন কোনো রকম চাপে
থাকতে না হয় সে জন্য সব ধরনের সতর্কতামূলক ব্যবস্থা অবশ্যই গ্রহণ করতে
হবে।
এই সতর্কতামূলক ব্যবস্থা তখনই নিশ্চিত হবে যখন বিদেশি ঋণের
পরিমাণ সর্বনিম্ন পর্যায়ে রাখা সম্ভব হবে এবং নিজস্ব উদ্যোগে দীর্ঘমেয়াদি
বিকল্প তহবিলের ব্যবস্থা থাকবে। দেশের অভ্যন্তরীণ খাত থেকে যতটা সম্ভব বেশি
পরিমাণে ঋণ গ্রহণ করতে পারলে স্বাভাবিকভাবেই আন্তর্জাতিক সংস্থা থেকে
গৃহীত ঋণের পরিমাণ কমে আসবে। কোনো প্রকল্প বাস্তবায়নে বিদেশি সংস্থাকে
দায়িত্ব দিলে তাদের অর্থ আন্তর্জাতিক মুদ্রায় পরিশোধ করতে হবে—এটাই
স্বাভবিক। কিন্তু তাদের যদি এ রকম শর্ত দেওয়া সম্ভব হয় যে তাদের স্থানীয়
ব্যয়ের পরিমাণ স্থানীয় মুদ্রায় পরিশোধ করা হবে এবং বাকিটা বৈদেশিক মুদ্রায়
পরিশোধ করা হবে, তাহলে বিদেশি ঋণের পরিমাণ উল্লেখযোগ্য হারে কমিয়ে রাখা
সম্ভব। প্রত্যেক প্রকল্প বরাদ্দে এবং প্রকল্প কাজের চুক্তিপত্রে এসব শর্ত
এমনিতেই অন্তর্ভুক্ত থাকে। যেহেতু বর্তমান বিশ্ব পরিস্থিতি একটি ভিন্ন ও
অনিশ্চিত রূপ ধারণ করেছে। তাই এসব বিষয় এখন আরো বেশি বিস্তারিতভাবে
বিশ্লেষণ করে অধিক সতর্কতা অবলম্বনের কোনো বিকল্প নেই। সব অনিশ্চয়তা মাথায়
রেখে এবারের বাজেট প্রণয়ন করতে হবে। সে কারণে সবচেয়ে নিরাপদ থাকাই হবে
সর্বোৎকৃষ্ট পন্থা। আর সেটা তখনই সম্ভব হবে যখন বাজেট ঘাটতি মেটানোর জন্য
বৈদেশিক ঋণের পরিমাণ সর্বনিম্ন পর্যায়ে রাখা সম্ভব হবে।
লেখক : সার্টিফায়েড অ্যান্টি মানি লন্ডারিং স্পেশালিস্ট ও ব্যাংকার টরন্টো, কানাডা