ই-পেপার ভিডিও ছবি বিজ্ঞাপন কুমিল্লার ইতিহাস ও ঐতিহ্য যোগাযোগ কুমিল্লার কাগজ পরিবার
আত্মকথায় স্মৃতি ঃ আমার একাত্তর
Published : Tuesday, 19 April, 2022 at 12:00 AM, Update: 19.04.2022 1:41:48 PM
আত্মকথায় স্মৃতি ঃ আমার একাত্তরশান্তিরঞ্জন ভৌমিক ||
(পূর্বে প্রকাশের পর)
পিযুষকে নিয়ে একটু বলছি। ছোটবেলা থেকেই একটু ডানপিঠে, বেপোয়ারা। ছাত্র হিসেবে ভাল ছিল। বি এ পাশ করে টাকার জন্য কলকাতা গিয়ে উচ্চ শিক্ষা নিতে পারেনি। চাকুরিত পাচ্ছে না খোলারা থাকা সত্ত্বেও, তাই মনের মধ্যে প্রচন্ড ক্ষতি। তা অনেক সময় সংসারের মধ্যে ধরে রাখতে পারত না। দেরি করে সকালে ঘুম থেকে উঠত। টিফিন করে বের হয়ে যেতো। অপবচনায় অনেকগুলো রাস্তার চৌমুহনী। এক এক চৌমুহনী নিয়ন্ত্রণ করত এক একটি সন্তান গ্রুশ যুদ্ধও এরশ এক চৌমুহনীর মাস্তান। বিকেল করে ফিরত, স্নান সেরে ঢেকে রাখা খাবার খেতো। প্রায়ই আমার স্ত্রী পরিবেশন করত, বৌদি বা বোনটি তার কার জন্য পছন্দ করত না বলেই খাবার ঢেকে রাখত, পরিবেশন করে দিত না। সন্ধ্যায় আবার বের হয়ে যেতো। ফিরতে রাত হতো। নেশা করত কিনা জানি না। তবে প্রচুর ধূমপান করত। তার বন্ধু বান্ধবও একই স্বভাবের। একবার এক ঘটনা ঘটে। বিএ পরীক্ষা চলছে। পিযুষের দুজন বন্ধু পরীক্ষা দিবে, কিন্তু পড়াশোনা তো নেই। তাই নফল ভরসা। কিন্তু হলে সে একাজ করা সম্ভব নয়। তখন বুদ্ধি আটা হলো যদি শক (জল)-এর রোগী হওয়া যায়, তবে রোগীর জন্য আলাদা কক্ষ থাকবে, মশারি খাটানো থাকবে সুতরাং নবনা করতে সুবিধা হবে। এই বিবেচনায় একদিন এই দু'বন্ধুসহ ২/১ জন সকালেই পিযুষের কাছে চলে আসে। পিরুষের রুমটি প্রায়ই বন্ধ থাকভ। কেউ সেখানে ঢুকত না। পাশের রুমে সুভাস থাকত। তারা রুমে কী করছে তা কেউ জানে না। জানার আগ্রহও নেই। কেবল শোনা যাচ্ছিল দেয়াশলাইর কাঠি জ্বালানোর শব্দ এবং উঃ আঃ শব্দ। অনেকটাই নিম্নকণ্ঠে অনেকক্ষণ উঃ আঃ শব্দ হতেছিল। ঘণ্টা দুই পরে তারা বের হয়ে গেলো, এর মধ্যে দু'জন চাদর গায়ে দিয়ে বের হতে দেখা গেল। পরের দিন পরীক্ষা আরম্ভ। পরের দিন খুব সকালে পিযুষ টিফিন না করেই বের হয়ে গিয়েছে। সন্ধ্যায় মাথায় বেন্ডেজ ও কিছুটা আহত অবস্থায় বাসায় ফিরল। ব্যাপার কি কে প্রশ্ন করে। মাসীমা রাগারাগি শুরু করলেন । কীভাবে কী হয়েছে জানতে চাইলেন- আমরা তখন বাসায় আছি। বাসা থম থম অবস্থা। শেষ পর্যন্ত পিযুষ জানাল-বন্ধুরা পরীক্ষা দিতে গিয়ে পকসের রোগী হিসেবে আলাদা রুমে ব্যবস্থা হয়েছে। দেখা গেল- এখানে আসল পকসের রোগীও আছে কিন্তু বন্ধুরা তো আসল পকসের রোগী নয়। তাই আলাদা রুম দাবি জানাতে গিয়ে ঝগড়া লেগে যায় এবং বাড়াবাড়ি করায় কেন্দ্রের কর্তাব্যক্তিরা পুলিশ দিয়ে নকল পকসের রোগী ও তাদের বন্ধুদের লাঠি পেটা করে। এতে পিযুষের মাথা ফেটে যায়। শরীরে আঘাত প্রাপ্ত হয়। তা শুনে হাসব, না কাঁদব। আমি তো বাংলাদেশে একজন কলেজ-শিক্ষক, আমরাও তো পরীক্ষা পরিচালনা করি । কই, কোনোদিন কোনো ছাত্র এরূপ কাজ করেছে বা করতে পারে তা যেন বিশ্বাস করতে কষ্ট হয়েছে। এ ঘটনাটি বললাম এজন্য যে তখন ত্রিপুরায় এরূপ মাস্তানী ঘটনা নানা পদ্ধতিতে ঘটত এবং এক এলাকার মাস্তান অন্য এলাকায় যাতায়াত করতে পারত না। উভয় পক্ষে মারামারির খবর প্রায়ই শোনা যেত, দেখা যেত। এছাড়া মোড়ে মোড়ে কালীমন্দির-অন্য মন্দির, উপলক্ষ ছাড়া পূজার আয়োজন, চাঁদাবাজি ব্যাপক এবং মাদক সেবনের মহামারী এ এক ব্যতিক্রর্মী অসামাজিক অধর্মীয় অমানবিক উৎসব-আয়োজন। বাধা দিলে বাঁধবে লড়াই লড়াই হতোই, বিপক্ষের সঙ্গে নিজেদের মধ্যে, পাড়ায় পাড়ায় ইত্যাদি। এত কথা লিখলাম এজন্য যে, সুভাষ সেনসাসে সাময়িক কাজ পেলেও পিযুষ চেষ্টা করেনি। সে স্বেচ্ছাচার জীবনটাকে আপন ঔদার্যে তখন বরণ করে নিয়েছিল।

এ সব ব্যর্থতা বা অপমান মনে কোনো দাগ কাটেনি। তবে মন সবসময় খারাপ হয়ে থাকে। মা-বাবা ভাইবোন সব পূর্ববঙ্গের গ্রামের বাড়িতে, বাবা স্কুলের প্রধান শিক্ষক, কত প্রকারের ভয়াবহ ঘটনার কথা কানে আসে, শিহরিত হই। সত্যি কথার চেয়ে কল্পিত কাহিনিই বিশ্বাসযোগ্য হয়ে প্রচার হতে থাকে। কেউ বলে বঙ্গবন্ধু আগরতলা হয়ে দিল্লি গেছেন। একই ধরনের ২/৩ জনকে সাজিয়ে রাখা হয়েছে। বলা তো যায় না কে কখন তাঁকে মেরে ফেলতে পারে । জয় বাংলা রেডিও নিয়মিত নানা ধরনের বার্তা জানায়, আকাশবাণীর খবরের জন্য উন্মুখ হয়ে থাকি । ভয়েস অব আমেরিকা না শুনলে অস্থির হই, সংবাদপরিক্রমায় দেবদুলাল বন্দ্যোপাধ্যায়ের কণ্ঠ শুনে উজ্জীবিত হই, নিত্যদিন জয়লাভ করি, পরাজিত ও হই। আর দলে দলে শরণার্থী আসছে। শুনতে পাই- ত্রিপুরার লোকসংখ্যা দশ লক্ষ, শরণার্থী এসেছে পনের লক্ষ। শরণার্থী শিবিরগুলোতে লোক ঠাসা। হিন্দু জনসংখ্যাই বেশি। আমি ছাড়া সকলেই শরণার্থী শিবিরে বসবাস করছে। বড় মাসীমা কিছুতেই বোনপোকে নতুন বৌ নিয়ে শিবিরে যেতে দেবেন না। মাথা নীচু হয় মন ছোট হয় অসহায় বোধ করি। কিন্তু মেসোতাত ভাইরা আপন ভায়ের মতো আচরণ ও সহযোগিতা করছেন। হাত খরচ দিচ্ছেন।
একদিন কর্ণেল চৌমুহনী জয় বাংলা অফিসে যাই, বাংলাদেশের দায়িত্বপ্রাপ্ত অফিসার আমাকে একটা নিয়োগ পত্রের মতো অধিকার পত্র লিখে দেন। লিখেন আমি বাংলাদেশী। মুক্তিযুদ্ধের পক্ষে কাজ করার জন্য যে কোনো জায়গায় যাতায়াত করতে অনুমতি দেয়া হলো। পত্রটি নিম্নরূপ-




এই পত্রের আলোকে আমার চলাফেরা অনেকটা অধিকারপ্রাপ্ত স্বাধীন হলো। নিজেকে জয়বাংলার লোক হিসেবে পরিচয় এবং যাপিত আদর্শ সচেতনতায় বাংলাদেশের স্বাধীনতার পক্ষে যৌক্তিক বিচার বিশ্লেষণ ইত্যাদি বিষয়ে আগ্রহের সঙ্গে কিছুটা কাজ করেছিলাম। মনে হলো প্রাণ বাঁচানোর তাগিদে দেশত্যাগী হলেও ভিনদেশে অনুপ্রেবেশ করার মত ভীতি বা হীনমন্যতার বিপরীতে এ অধিকার পত্রটি রক্ষা কবচের মতো কাজ দিয়েছিল।
(ক্রমশঃ)
লেখক: সাহিত্যিক, গবেষক ও সাবেক অধ্যাপক
মোবাইল: ০১৭১১-৩৪১৭৩৫