
শাহজাহান চৌধুরী ||
শব্দ মানুষের জীবনে অপরিহার্য। বাসর রাতে নবপরিণিতা বধুর মুখ থেকে একটি শব্দ বের করতে কত কসরত করতে হয়, কত কথার ফুলঝুরি ঝরাতে হয় বরকে। আতুর ঘর থেকে শিশুর কান্নার শব্দ শুনার জন্য অধীর আগ্রহে অপেক্ষা করে জন্মদাতা পিতাসহ আত্মীয়-স্বজন সবাই। সদ্য মৃত ব্যক্তির শিয়রে তার নিকট আত্মীয়রা কান্নায় ভেঙ্গে পড়ে বলে ‘কথা বল, কথা বল’। কিন্তু এই শব্দই অত্যাচারী ঘাতক হিসাবে উপস্থিত হয় আমাদের জীবনে। শব্দ অত্যাচার চলছে হোটেল-রেস্তোরাঁয়, ক্যাসেট আপালাম-ছাপালাম গান। ক্যাসেটের দোকানে পপ সংগীতের ত্রাহি চিৎকার তাও আর দোকানে কমপিটিশনের মাধ্যমে। রাস্তায় অলিতে-গলিতে ক্যানভেচার ফেরীওয়ালা, লটারীওয়ালা, বাস, ট্রাক, টেক্সীর মাধ্যমে। সবচেয়ে মারাত্মক শহরের প্রধান রাস্তায়, সিনেমা, রাজনৈতিক দলের জনসভা, ওয়াজ মাহফিলসহ বিভিন্ন পণ্যের বিজ্ঞাপনের মাইকিংয়ের মাধ্যমে। একই যানজট তার উপরে একহাত দূর থেকে আসছে গগণবিদারী শব্দ, ভাইসব ভাইসব আজ বিকেলে........। অথবা ওমুক ভাইয়ের চরিত্র ফুলের মতো পবিত্র। ইদানিং কুমিল্লা শহরের আরেক ধরনের শব্দ দূষণের শুরু হয়েছে। জনসভা টাউন হলে, মাইকে চুঙ্গা রাজগঞ্জ, বোর্ড অফিস, ঝাউতলা, জিলা স্কুল পর্যন্ত তাদের কথা হলো, যাইবি কই, আমাগো কথা হুনতেই অইব। শব্দ দূষণের আইন আছে প্রয়োগ নেই। শব্দ দূষণে শারীরিক মানসিকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে মানুষ। সবচেয়ে বেশী ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে শিশুরা।
পরিবেশ অধিদপ্তর সূত্রে জানা যায়, স্বাভাবিক অবস্থায় মানুষ ৫০ ডেসিবল শব্দ সহ্য করতে পারে। এর চেয়ে মাত্রা বেশী হলে দূষণের পর্যায়ে চলে যায়। আমাদের দেশে মোটরগাড়ি হর্ণের শব্দ ৯৫-১০০ ডেসিবল। মাইকের শব্দ ৯০-১০০ ডেসিবল। এই মাইকও গাড়ি হর্ণের শব্দ বড়দের কিছুটা হয়তো সহ্যের মধ্যে। কিন্তু শিশুদের নিয়ে যাচ্ছে ক্রমশ বধিরতার দিকে। অনেকেই বলে-ভাই আমার ছেলেটা জোরে জোরে কথা বলে। আসলে ঘটনা হচ্ছে ছেলেটা স্কুলে মাঠে ঘাটে রাস্তায় সবসময় চিৎকার চেঁচামেচি শুনতে শুনতে তার কান বধির হয়ে গেছে। সেজন্য সে জোরে কথা বলে কারণ বিজ্ঞান বলে মৃদু বধিররা শুনে কম, তাই সে মনে করে অন্যরাও বুঝ তার মত। সেজন্য সেও জোরে জোরে কথা বলে। তিন বছরের কম বয়সি একটি শিশু যদি খুব কাজ থেকে ১০০ ডেসিবল শব্দ শুনে তবে সে তার শ্রবণ শক্তি হারিয়ে ফেলতে পারে।
শব্দ দূষণের হার- মোটর গাড়ীর ৯৫-১০০ ডেসিবল, মাইকের শব্দ ৯০-১০০ ডেসিবল, বিমানের শব্দ ১২০-১৫০ ডেসিবল, কলকারখানার শব্দ ৮০-৯০ ডেসিবল, বাস-ট্রাকের ইঞ্জিনের শব্দ ৯০-৯৫ ডেসিবল, বেবী-মোটর সাইকেলের শব্দ ৮৫-৯০ ডেসিবল, উৎসব অনুষ্ঠানের শব্দ ৮৫৯৫ ডেসিবল, রাস্তার কোলাহল ৬০-৮০ ডেসিবল।
বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার মতে, মানুষ সবসময় ৬০ ডেসিবল শব্দের মধ্যে বসবাস করলে সাময়িক বধির হয়ে যেতে পারে। গর্ভবতী একজন মায়ের খুব কাছে বিকট শব্দ হলে গর্ভের সন্তান জন্মগতভাবে বধির হয়ে যেতে পারে।
মানুষের জন্য শব্দের মাত্রা-শয়ন কক্ষে ২৫ ডেসিবল, খাবার বসার কক্ষে ৪০০ ডেসিবল পর্যন্ত। স্কুলে ৩৫-৪০ ডেসিবল, হাসপাতালে ২০-৩৫ ডেসিবল।
শব্দ দূষণের ভয়াবহতা কমাতে সরকার কয়েক বছর আগে হাইড্রোলিক হর্ণ সম্পূর্ণভাবে নিষিদ্ধ করেছে। কিন্তু এরপরেও সারাদেশে গাড়ী চলে হাইড্রোলিক হর্ণ বাজিয়ে। দূর-পাল্লার কিছু বাস’তো মজার জন্যেও হাইড্রোলিক হর্ণ বাজায়। কিছু ড্রাইভার প্রতি মিনিটে হর্ণ না বাজালে তার ভাল লাগে না।
শব্দ দূষণে মানুষের কি কি ক্ষতি হতে পারে তার সংক্ষিপ্ত ধারণা- শ্রবণ শক্তি হারানো মানসিক ভারসাম্য হরানো, মেজাজ খিটখিটে, অনিদ্রায় ভোগা, হার্টের রোগীদের হার্টবিট বেড়ে যাওয়া, বদহজম, রক্তচাপ বাড়া, নাড়ীর স্পন্দন বেড়ে যাওয়া, গর্ভবর্তী মহিলাদের বিকলাঙ্গ শিশু জন্ম দেওয়া ইত্যাদি -- ইত্যাদি।
সম্প্রতি কুমিল্লা শহরে পরিবেশ অধিদপ্তর কুমিল্লা জেলা কার্যালয় হতে সদর উপজেলাধীন বিভিন্ন স্থানের শব্দের মানমাত্রা পরিমাপ করা হয়েছে তা নিম্নরূপ।
( ৩০/০৩/২০২২)
এই শব্দ দানব হতে শহরে মুক্ত করতে হলে আমাদের যে কাজ গুলো করতে হবে তা হচ্ছে প্রথমেই জনগণের মধ্যে শব্দ দূষণ এর ভয়াবহতা সম্পর্কে সচেতন করে তোলা, ট্রাফিক ব্যবস্থার উন্নতি। মোড়ে মোড়ে সি.সি ক্যামেরার মাধ্যমে ট্রাফিক নিয়ন্ত্রন করা, সারিবদ্ধ ভাবে যানবাহন চালানো ও ওভার টেক বন্ধ করা এই ওভার টেকের প্রতিযোগিতায় সবাই একসাথে হর্ণ বাজানোতে শব্দ দূষণ বেশী হয়। সারিবদ্ধ ভাবে গাড়ী চালানো, শহরে মাইকিং বন্ধ করা, রাস্তা প্রসস্ত করা, ফুটপাথ এবং রাস্তার পাথ থেকে অবৈধ দোকানপাঠ তুলে দেওয়া ইত্যাদি। সর্বপুরে চালকদের মোটিভেট করার ব্যবস্থা নেওয়া।
শব্দ দূষণের ব্যাপারে পরিবেশ অধিদপ্তর জানলেও এর প্রতিরোধে তেমন কোন প্রতিকার করতে সক্ষম হননি। জনগণের মাঝে এ ব্যাপারে কোন গণসচেতনতা গড়ে উঠেনি। এ বিষয়ে কারো কোন ধারণাই নেই। বিভিন্ন হাসপাতাল ও স্কুল কলেজের সামনে রাস্তায় সাইনবোর্ডে লালকালিতে বড় বড় অক্ষরে লেখা থাকে শব্দের সীমা ৪৫ ডেসিবল। কিন্তু কে শোনে কার কথা মোটরযান হর্ণ বাজিয়ে চলে যান। যেন চল পঞ্চি বেল ঘাড়িয়া।
শেষ কথা আসুন সবাই মিলে যেমন করোনা প্রতিরোধ করছি সেভাবে শব্দ দূষণকে প্রতিরোধ করি।