
এ কে এম আতিকুর রহমান ||
রাশিয়ার প্রেসিডেন্ট পুতিনের ইউক্রেন অভিযানের এক মাস পেরিয়ে গেছে। তিনি ইউক্রেন আক্রমণের কারণ হিসেবে ওই দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে পীড়ন ও গণহত্যার শিকার হওয়া মানুষগুলোকে রক্ষা এবং ইউক্রেনকে ‘অসামরিকীকরণ ও নাৎসিকরণমুক্ত’ করার কথা উল্লেখ করেছিলেন। আমরা জানি, এ সবই ছিল পুতিনের মনগড়া কথা। তাঁর ছিল অন্য এক আশঙ্কা, নিরাপত্তার আশঙ্কা ইউক্রেনের ন্যাটো জোটে যোগদানের সম্ভাবনা ঘিরে।
এবার আর অপেক্ষা করার মতো সময় তাঁর হাতে ছিল না। তাঁর সেই আশঙ্কার ফলে ইউক্রেন রাশিয়ার আগ্রাসনের শিকার হলো। ইউক্রেনকে আক্রমণ করা হলো এবং সেই ফেব্রুয়ারির শেষ সপ্তাহে শুরু হওয়া যুদ্ধ এখনো ইউক্রেনজুড়েই চলছে।
প্রাপ্ত তথ্য মতে, উভয় পক্ষের সামরিক হতাহতের সংখ্যা কয়েক হাজার ছাড়িয়ে গেছে। হাজারের ওপর ইউক্রেনীয় বেসামরিক লোক, কয়েক শ শিশু এবং কয়েকজন সাংবাদিকের নিহত হওয়ার কথাও জানা গেছে। এ ছাড়া ইউক্রেনের লাখ লাখ মানুষ দেশ ছেড়ে প্রতিবেশী কয়েকটি দেশের শরণার্থী শিবিরে অবস্থান করছে। এমনকি বন্দরনগর মারিওপোল থেকে হাজার হাজার বেসামরিক লোককে রাশিয়ায় জোরপূর্বক সরিয়ে নেওয়ার কথাও উঠেছে। তবে সম্ভবত সবচেয়ে বেশি ইউক্রেন শরণার্থী রয়েছে পোল্যান্ডে। হয়তো এ কারণেই কয়েক দিন আগে যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট বাইডেন পোল্যান্ড সফরে যান এবং সেখানকার বিভিন্ন ইউক্রেন শরণার্থী শিবির পরিদর্শন করেন, শরণার্থীদের সঙ্গে কথা বলেন।
ইউক্রেনের প্রতি প্রথম থেকেই প্রেসিডেন্ট বাইডেনের দরদ উথলে উঠলেও রাশিয়াকে দেখে নেওয়ার হুমকি থেকে যুক্তরাষ্ট্র অনেক আগেই সরে গেছে। রাশিয়াকে অর্থনৈতিকসহ কিছু নিষেধাজ্ঞা, ইউক্রেনকে হয়তো কিছু অস্ত্র বা গোলাবারুদ সরবরাহ করা এবং পুতিনকে সরিয়ে দেওয়াসহ নানা প্রকারের হুমকি-ধমকি দেওয়ার মধ্যেই বাইডেন সীমাবদ্ধ রয়েছেন। এরই মধ্যে আবার ওয়ারশে ইউক্রেনের দুই মন্ত্রীর সঙ্গে বাইডেন বৈঠকও করেছেন। এসব বৈঠক আর হুমকি-ধমকি কি আদৌ ইউক্রেনকে বিদ্যমান অবস্থা থেকে উত্তরণে কোনো আলো দেখাতে পারছে? নাকি উল্টোটাই অর্থাৎ অন্ধকারের গভীরে টেনে নিচ্ছে? তবে এ কথা সত্য যে ইউরোপের অনেক দেশেই আমেরিকার অস্ত্র বিক্রি বেড়ে চলছে। আমেরিকার অস্ত্র ব্যবসার জন্যই কি তাহলে বাইডেনের এত লাফঝাঁপ? আর যদি যুদ্ধটা একটু দীর্ঘ সময় পর্যন্ত গড়িয়ে নেওয়া যায় অথবা যুদ্ধের আশঙ্কাটা জিইয়ে রাখা যায়, তাহলে বাইডেনের অস্ত্রের ব্যবসা ভালোই জমবে। করোনাকালে যুক্তরাষ্ট্রের অর্থনীতিতে যে বিরূপ প্রভাব পড়েছিল তা অনেকটাই কাটিয়ে ওঠা সম্ভব হবে। আসলে পশ্চিমা দেশগুলো রাশিয়ার ওপর যে অর্থনৈতিক নিষেধাজ্ঞা দিচ্ছে বা ইউক্রেনকে সামরিক সাহায্য দিচ্ছে, তা কি ইউক্রেনকে সাহায্য করার জন্য যথেষ্ট?
কয়েক দিন আগে চীনের পররাষ্ট্রমন্ত্রী ওয়াং ই এক দিনের জন্য ভারত সফরে এসেছিলেন। সফরকালে তিনি ভারতের পররাষ্ট্রমন্ত্রী জয়শঙ্কর এবং জাতীয় নিরাপত্তা উপদেষ্টা অজিত ডোভালের সঙ্গে বৈঠক করলেও প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির সঙ্গে সৌজন্য সাক্ষাৎ করতে পারেননি। যাই হোক, ২০২০ সালে লাদাখে চীনা আগ্রাসনের পর এই প্রথম চীনের পররাষ্ট্রমন্ত্রীর ভারত সফর দুই দেশের সম্পর্কের ক্ষেত্রে কূটনৈতিকভাবে অত্যন্ত গুরুত্ব বহন করে। এ ছাড়া ইউক্রেন-রাশিয়া পরিস্থিতির বিবেচনায় রাশিয়া-ভারত দীর্ঘ সম্পর্কের মাঝে চীনা কূটনীতির এই নতুন ভাবনা হয়তো ভারত-চীন সম্পর্ককে কিছুটা কাছে টানার একটা প্রয়াস হতে পারে। সে ক্ষেত্রে চীনের ভাবনাটি হতে পারে ভারত-রাশিয়া-চীন আঁতাত গঠনের মাধ্যমে যুক্তরাষ্ট্রকে চাপে ফেলার এক নতুন ফন্দি। কারণ তাইওয়ান নিয়ে চীনের ভাবনা রয়েছে। তবে ইউক্রেন ইস্যুতে ভারত ও রাশিয়ার সম্পর্কের কোনো হেরফের হয়নি। যাই হোক, রাশিয়ার পাশে চীনের দাঁড়ানো বা ভারতের সঙ্গে ঘনিষ্ঠ হওয়ার উদ্যোগ হয়তো প্রেসিডেন্ট বাইডেনকে অনেকটাই সীমিত করে রাখবে।
অতি সম্প্রতি অনুষ্ঠিত দোহা ফোরামে ইউক্রেনের প্রেসিডেন্ট বিশ্বের জ্বালানি উৎপাদনকারী দেশগুলোকে উৎপাদন বাড়াতে আহ্বান জানিয়েছেন। যাতে রাশিয়া তার তেল ও গ্যাস সরবরাহের মাধ্যমে অন্য দেশগুলোকে ‘ব্ল্যাকমেইল’ করতে না পারে, সেদিক চিন্তা করে এক ভিডিও কনফারেন্সিংয়ের মাধ্যমে তিনি এই আহ্বান জানান। তবে এই আহ্বান কতটুকু ফলপ্রসূ হবে সে বিষয়ে যথেষ্ট সন্দেহ রয়েছে। কারণ তেল বা গ্যাস উৎপাদনকারী দেশগুলোর মধ্যে কয়জন ইউক্রেনের এই আহ্বানে সাড়া দেবে সেটিই প্রশ্ন। এ ছাড়া প্রেসিডেন্ট জেলেনস্কি সাংবাদিকদের সঙ্গে সম্প্রতি এক আলাপকালে বলেন যে শান্তি স্থাপনে তাঁর দেশ নিরপেক্ষ আলোচনায় বসতে প্রস্তুত রয়েছে। আর সেই সিদ্ধান্ত হতে হবে গণভোটের মাধ্যমে এবং তৃতীয় কোনো পক্ষের উদ্যোগে। কিন্তু তৃতীয় পক্ষের মধ্যস্থতায় সমঝোতা হওয়ার সম্ভাবনা থাকলেও গণভোটের প্রসঙ্গটি গ্রহণযোগ্য হবে বলে মনে হয় না।
প্রেসিডেন্ট পুতিন ধারণা করেছিলেন, দু-এক সপ্তাহের মধ্যেই ইউক্রেন রাশিয়ার সেনাদের দখলে চলে আসবে। সে হিসাবে কিয়েভ এখনো দখল করা সম্ভব হয়নি। অবস্থার বাস্তবতায় আপাতদৃষ্টিতে পুতিনের আগ্রাসন লক্ষ্য এবং কৌশল পরিবর্তনের আভাস পাওয়া যাচ্ছে। এখন তারা রাশিয়ার সীমান্তবর্তী ইউক্রেনীয় এলাকাকে রাশিয়ার জন্য নিরাপদ করার প্রতি গুরুত্ব দিচ্ছে, বিশেষ করে পূর্বাঞ্চলকে বিচ্ছিন্নতাবাদীদের যোগসাজশে ইউক্রেন থেকে বিচ্ছিন্ন করে দোনেস্ক ও লুহানস্কের মতো তথাকথিত প্রজাতন্ত্র হিসেবে পুতিনের ঘোষণা বাস্তবায়নকে অগ্রাধিকার দিচ্ছে। এদিকে জাতিসংঘের কাছে অভিযোগ রয়েছে যে মারিওপোল খালি করা হচ্ছে। সেখানকার বেসামরিক লোকজনকে জোর করে রাশিয়ায় সরিয়ে নেওয়া হচ্ছে। বর্তমান পরিস্থিতি দেখে এমনও ধারণা করা হচ্ছে যে রাশিয়ার সেনাবাহিনী কিছু চিহ্নিত গুরুত্বপূর্ণ অবকাঠামো ও স্থাপনা ধ্বংস বা ক্ষতিগ্রস্ত করে (হয়তো এরই মধ্যে কিছুটা করতে পেরেছে), পূর্বাঞ্চলের দনবাস এলাকা নিজেদের নিয়ন্ত্রণে নিয়ে এবং ইউক্রেনের কাছ থেকে ন্যাটোতে যোগদান না করার অঙ্গীকার আদায় করে যুদ্ধবিরতিতে অর্থাৎ ইউক্রেনের সঙ্গে আপসে যাবে।
পুতিনের ইউক্রেন আক্রমণ করার অন্তর্নিহিত কারণটি কি অন্য রকম কিছু হতে পারে, যা আমরা ভাবছি না? আমাদের দেশে একটা কথা প্রচলিত আছে—ঝিকে মেরে বউকে শেখানো। যদিও এ ক্ষেত্রে প্রেসিডেন্ট পুতিন হয়তো দুজনকেই শেখানোর চেষ্টা করেছেন। রাশিয়ার ইউক্রেন দখলের উদ্দেশ্যে বর্তমানে যে পরিবর্তন লক্ষ করা যাচ্ছে তাতে কি আমরা ধারণা করতে পারি—ক. পশ্চিমাদের, বিশেষ করে আমেরিকাকে দেখিয়ে দেওয়া যে তোমরা রাশিয়াকে অতটা শক্তিহীন ভেব না, খ. ইউক্রেনকে বোঝানো যে ‘ন্যাটো, ন্যাটো’ করা মাথা থেকে বিদায় করে দাও এবং গ. ইউক্রেনকে সামরিক দিক থেকে শক্তিহীন করে রাখা, যাতে রাশিয়ার জন্য ভবিষ্যতে হুমকি হয়ে দাঁড়াতে না পারে।
আমরা জানি, চলমান যুদ্ধের মধ্যেও শান্তি স্থাপনে আলাপ-আলোচনার প্রয়াস ও উদ্যোগ বন্ধ থাকেনি। ফেব্রুয়ারি মাসে তিনবার এবং গত ১৪ মার্চ রাশিয়া ও ইউক্রেন আলোচনায় বসেছিল; যদিও সেসব আলোচনার কোনো অগ্রগতি দেখা যায়নি। এদিকে তুরস্কের প্রেসিডেন্ট এরদোয়ান ১০ মার্চ তুরস্কের আনাতোলিয়ায় রাশিয়া ও ইউক্রেনের পররাষ্ট্রমন্ত্রীদের মধ্যে এক বৈঠকের আয়োজন করেন। সেই বৈঠকটিও আমাদের তেমন কোনো ভালো সংবাদ দিতে পারেনি। দুই দেশের মধ্যকার আলোচনাটি এগিয়ে নিয়ে যাওয়ার জন্য গত ২৭ মার্চ তুরস্কের প্রেসিডেন্ট আবার কূটনৈতিক উদ্যোগ নেন এবং ২৮-৩০ মার্চ তুরস্কের ইস্তাম্বুলে দুই দেশের মধ্যে বৈঠক অনুষ্ঠানের ব্যাপারে প্রেসিডেন্ট পুতিনের সঙ্গে টেলিফোনে কথা বলেন। দুই নেতা যুদ্ধের সার্বিক পরিস্থিতি পর্যালোচনা করে যত শিগগির সম্ভব যুদ্ধবিরতি এবং শান্তি স্থাপনের লক্ষ্যে পৌঁছানোর প্রতি গুরুত্ব দেন। এ ব্যাপারে তুরস্কের পক্ষ থেকে সব ধরনের সহযোগিতার আশ্বাসও দেওয়া হয়।
তুরস্কের প্রেসিডেন্ট আরো বলেন, দুই দেশের মধ্যে সমঝোতার ব্যাপারে মোট ছয়টি শর্তের মধ্যে চারটি শর্ত মেনে নিতে উভয় পক্ষ সম্মত হয়েছে। ওই চারটি শর্ত হচ্ছে—ইউক্রেনকে ন্যাটোর বাইরে থাকতে হবে, ইউক্রেনে রুশ ভাষা ব্যবহার করা হবে, নিরস্ত্রীকরণ ও নিরাপত্তার নিশ্চয়তা দিতে হবে। যদিও অন্য দুটি শর্তের কথা প্রেসিডেন্ট এরদোয়ান প্রকাশ করেননি। অনুমান করা যায়, ওই দুটি শর্ত ইউক্রেনের সার্বভৌমত্বে আঘাত হানতে পারে এমন কোনো প্রস্তাব বা বর্তমান প্রেসিডেন্টকে পদত্যাগ করিয়ে রুশপন্থী প্রেসিডেন্টকে বসানোর বিষয়ও হতে পারে। অবশ্যই আশা করা যায়, ইস্তাম্বুল বৈঠকে সব ইস্যু নিয়েই বিস্তারিত আলাপ-আলোচনা করা হবে এবং উভয় পক্ষ একটি গ্রহণযোগ্য সমাধানে পৌঁছাতে সক্ষম হবে।
অনেকেরই ধারণা, রাশিয়া নানা দিক বিবেচনা করে ইউক্রেন ছেড়ে চলে আসতে চাইছে। প্রেসিডেন্ট পুতিন যে উদ্দেশ্যে ইউক্রেন আক্রমণ করেছিলেন তা প্রায় পূর্ণ হওয়ার পথে। যদি বাকি কিছু থাকে তা আলাপ-আলোচনার মাধ্যমে পূরণ হয়ে যাবে। ইস্তাম্বুল বৈঠক সফল হলে রাশিয়া হয়তো সপ্তাহ দুয়েকের মধ্যেই যুদ্ধবিরতিতে যাবে। এবারের উদ্যোগ যদি ফলপ্রসূ কোনো সিদ্ধান্ত দিতে ব্যর্থ হয়, তাহলে যুদ্ধ হয়তো আরো চলবে এবং তা দিন দিন ভয়াবহ রূপ নিতে পারে।
লেখক : সাবেক রাষ্ট্রদূত ও সচিব