
বৈশ্বিক
উষ্ণায়ন ও জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব এখন অত্যন্ত স্পষ্ট। এ কারণে আবহাওয়া
ক্রমেই চরমভাবাপন্ন হচ্ছে। বন্যা, ঝড়, জলোচ্ছ্বাসসহ প্রাকৃতিক দুর্যোগের
সংখ্যা যেমন বাড়ছে, তেমনি বাড়ছে তীব্রতাও। ক্রমেই বাড়ছে ক্ষয়ক্ষতির পরিমাণ।
জলবায়ু
পরিবর্তনের কারণে যে দেশগুলো সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে এবং হবে, তার
মধ্যে বাংলাদেশ অন্যতম। জাতীয় ও আন্তর্জাতিক বিভিন্ন পরিসংখ্যানেও উঠে আসছে
বাংলাদেশের ক্ষয়ক্ষতির চিত্র। গত মঙ্গলবার প্রকাশিত বাংলাদেশ পরিসংখ্যান
ব্যুরোর (বিবিএস) প্রতিবেদনেও উঠে এসেছে এক ভয়াবহ চিত্র। প্রতিবেদন অনুযায়ী
জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাবে ঘটে যাওয়া প্রাকৃতিক দুর্যোগে ২০১৫ থেকে ২০২০
সাল পর্যন্ত ছয় বছরে বাংলাদেশে ক্ষতি হয়েছে প্রায় এক লাখ ৭৯ হাজার কোটি
টাকার সম্পদের, যা মোট জিডিপির ১.৩২ শতাংশ। বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, প্রকৃত
ক্ষতি এর চেয়েও অনেক বেশি।
প্রতিবেদন অনুযায়ী এই ক্ষতির পরিমাণ শস্য
খাতে ২৮.৯০ শতাংশ, প্রাণিসম্পদে ৩.৯৮ শতাংশ, পোলট্রিতে ১.৫১ শতাংশ, মৎস্য
খাতে ৩.৭১ শতাংশ। এ ছাড়া জমি (ভূমি) অবক্ষয়েও বড় ধরনের ক্ষতি হচ্ছে
প্রতিবছর। বসতঘর, রান্নাঘর, গোয়ালঘর, অবকাঠামো প্রভৃতি খাতে ৭.৩৮ শতাংশ এবং
খানাভিত্তিক সামাজিক বনসহ উঠানের গাছপালার ১.৯৬ শতাংশ ক্ষতি হয়েছে।
বিভিন্ন সময়ে প্রকাশিত তথ্য থেকে জানা যায়, অন্য সব প্রাকৃতিক দুর্যোগ
মিলিতভাবে যে ক্ষতি করে কেবল বন্যায় তার চেয়ে অনেক বেশি ক্ষতি হয়। আর তার
একটি বড় কারণ আমাদের নদীগুলোর গভীরতা কমে যাওয়া। উজানে ভূমিধস ক্রমেই
বাড়ছে। সেই মাটি নেমে এসে জমা হচ্ছে আমাদের নদীগুলোর তলদেশে। নদী ভরাট হয়ে
যাচ্ছে। বর্ষায় বৃষ্টি ও উজানের ঢলের পানি নদীগুলো দিয়ে নামতে পারে না। তখন
আশপাশের ফসলি জমি, ঘরবাড়ি ভাসিয়ে নিয়ে যায়। এর একমাত্র সমাধান নিয়মিত নদী
খনন। এ জন্য কয়েক শ ড্রেজার দিয়ে সারা বছর কাজ করতে হবে। কিন্তু আমাদের
ড্রেজার ছিল না বললেই চলে। সাম্প্রতিক সময়ে কয়েক ডজন ড্রেজার সংগ্রহ করা
হলেও তা প্রয়োজনের তুলনায় খুবই কম।
নদীগুলো মরে যাওয়া বা নাব্যতা কমে
যাওয়ার ক্ষতিও অনেক বড়। অতীতে কুড়িগ্রাম, সুনামগঞ্জসহ দেশের উত্তর
সীমান্তসংলগ্ন অঞ্চলে বড় বড় নৌযান চলাচল করত। তাতে যাত্রী ও মালপত্র পরিবহন
অনেক সুলভ হতো। এখন বছরের বেশির ভাগ সময় যমুনায় পানি থাকে না বললেই চলে।
চিলমারীর বন্দর এখন কেবলই অতীত। এ সপ্তাহের খবর—ডুবোচর জেগে ওঠায়
সিরাজগঞ্জের বাঘাবাড়ী বন্দরেও বড় নৌযান চলাচল করতে পারছে না।
পাটুরিয়া-দৌলতদিয়া ঘাটে কয়েক দিন ধরেই ফেরি চলাচল ব্যাহত হচ্ছে। এমনকি
দক্ষিণাঞ্চলের অনেক নদীতেও ডুবোচরের কারণে নৌ চলাচল ব্যাহত হচ্ছে। এভাবে
নৌপথ কমে আসায় পরিবহন খাতে ক্রমেই ব্যয় বাড়ছে। বিজ্ঞানীরা আশঙ্কা করছেন,
সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা বৃদ্ধির কারণে বাংলাদেশের ১৯টি উপকূলীয় জেলা তলিয়ে
যেতে পারে। তারও আলামত স্পষ্ট হচ্ছে। নোনা পানির অনুপ্রবেশ ক্রমে
মধ্যাঞ্চলমুখী হচ্ছে।
জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব মোকাবেলায় আমাদের আরো
বেশি উদ্যোগী হতে হবে। ডেল্টা পরিকল্পনা বাস্তবায়নের গতি বাড়াতে হবে।
পাশাপাশি ক্ষতিগ্রস্তদের পুনর্বাসনের নিয়মিত কর্মসূচি নিতে হবে।