ই-পেপার ভিডিও ছবি বিজ্ঞাপন কুমিল্লার ইতিহাস ও ঐতিহ্য যোগাযোগ কুমিল্লার কাগজ পরিবার
শিক্ষাই শক্তি, শিক্ষাই মুক্তি
Published : Tuesday, 29 March, 2022 at 12:00 AM
রায়হান আহমেদ ||
আধুনিক পৃথিবীতে ভালোমতো টিকে থাকতে হলে শিক্ষা ছাড়া বিকল্প কিছুই নেই। তাই বাঁচতে হলে জানতে হবে, জানতে হলে শিখতে হবে। কারণ একমাত্র শিক্ষাই পারে আলোকবর্তিকা হয়ে জীবন চলার পথ দেখাতে। একটি দেশ, একটি জাতির অগ্রগতির মূল চালিকাশক্তি হলো শিক্ষা। এই বিবেচনায় বলা হয়, শিক্ষাই জাতির মেরুদ-। অর্থাৎ একজন মানুষ যেমন মেরুদ- সোজা করে স্থির দাঁড়াতে পারে- ঠিক তেমনি একটি জাতির ভিত্তিমূল, উন্নয়ন, অগ্রগতি ও সামনের দিকে এগিয়ে যাওয়া নির্ভর করে তার শিক্ষার ওপর। যে জাতি যত বেশি শিক্ষিত- সে জাতি তত বেশি উন্নত, সভ্য ও অগ্রসর। শিক্ষা অর্জন মানুষের জন্মগত মৌলিক অধিকারও বটে।
শিক্ষার প্রয়োজনীয়তা সর্বজনীন, অপরিহার্য, ব্যাপক। মানুষকে প্রকৃত মানবিক ও সামাজিক গুণাবলিসম্পন্ন ব্যক্তি হতে হলে শিক্ষার কোনো বিকল্প নেই। প্রকৃত শিক্ষা অর্জনের মাধ্যমে মানুষের মন-মানসিকতার উৎকর্ষ সাধন সম্ভব হয়। একটি কুপিবাতি যেমন তার পার্শ্ববর্তী এলাকাকে আলোকিত করে তোলে, ঠিক তেমনি একজন মানুষ যখন সমাজে বিকশিত হয়ে ওঠেন- তখন তার সঙ্গে তার পরিবার, সমাজ ও রাষ্ট্রও আলোকিত হয়ে ওঠে। এতে আরও সুবিধাবঞ্চিত মানুষ আলোকিত হওয়ার সুযোগ লাভ করে। শিক্ষা ও দারিদ্র্যের মধ্যে দ্বান্দ্বিক সম্পর্ক বিরাজমান। প্রজন্মের পর প্রজন্ম দরিদ্র জনগোষ্ঠী কি অশিক্ষিতই থাকবে? দারিদ্র্য দূর করার জন্য চাই শিক্ষা। তাই আর্থিক ও মানসিক দারিদ্র্য দূর করার জন্য আনুষ্ঠানিক বা অন্যান্য প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষার প্রকৃত ফলপ্রসূ সম্মিলন প্রয়োজন। বিশ্বায়ন এই ক্ষেত্রে বিশাল সুবিধা হিসেবে কাজ করার কথা থাকলেও নানা কাঠামোগত বাধার কারণে তা সম্ভব হচ্ছে না। অন্যদিকে উপযুক্ত কাজ ও উপযুক্ত শ্রমিক একে অন্যের নাগাল না পাওয়ায় তৈরি হচ্ছে এক ধরনের কূট অভ্যাসের। এই সমস্যা সমাধানের পথগুলো আমাদেরই খুঁজে বের করতে হবে।
শিক্ষা হচ্ছে এমন একটি সম্পদ- যার মালিকানা মালিকের শরীর থেকে বিচ্ছিন্ন করা যায় না। শিক্ষা এমন একটি সম্পদ- যা ব্যবহার করলে তার দক্ষতা ও দীপ্তি আরও বৃদ্ধি পায়। জ্ঞান বা শিক্ষা অর্জনের খরচ ক্রমেই কমছে। ইন্টারনেটের কল্যাণে শিক্ষা এখন নখাগ্রে এসে উপস্থিত হয়েছে। অন্যসব সম্পদের উৎপাদনশীলতা তাদের ক্রমপূঞ্জীভবনের সঙ্গে সঙ্গে হ্রাস পায়। অথচ শিক্ষা যত ব্যবহার করা হবে, তত তার দক্ষতা ও উৎপাদনশীলতা বৃদ্ধি পাবে। তাই অন্যান্য সম্পদের তুলনায় শিক্ষার নিম্নমুখী, মধ্যমুখী সম্প্রসারণ আমাদের জন্য বৈষম্য কমানোর বিষয়েও সহায়ক হতে পারে। যেহেতু দরিদ্রের জ্ঞানসম্পদকে ধনী ব্যবহার করতে পারে কিন্তু দখল বা লুট করে নিতে পারে না, সেহেতু বিশেষত ইস্ট এশিয়ার মডেলে শিক্ষা ও সম্পদপ্রবাহকে বাজার এবং রাষ্ট্রীয় নিয়ন্ত্রণের যুগপৎ ব্যবহারে দরিদ্র ও ধনী উৎপাদনশীল খাত অভিমুখে এমনভাবে পরিচালনা করা সম্ভব হয়েছিল যে, সেখানে একই সঙ্গে সমতা এবং প্রবৃদ্ধি দুই-ই অর্জন করা সম্ভব হয়েছিল। তবে শিক্ষার বৈষম্যহীন বিকাশকে থামানোর জন্য আমাদের দেশে শিক্ষাকে শাসককুল প্রথমে সুযোগে পরিণত করে ফেলেছে। তার পর আর্থিক বাধ্যবাধকতার দরুন বেশিরভাগ জনগণের জন্য নির্ধারিত করা হয়েছে এক বিশেষ ধরনের নিম্নমানের শিক্ষা ও ধর্মীয় শিক্ষা। শিক্ষার মধ্যে এই বিভাজন, সমাজের মধ্যেও বিভাজন ও বৈষম্যকে ত্বরান্বিত করছে। আধুনিক বিশ্বায়নের ফলে মানুষের অবাধ গতি বৃদ্ধি পেয়েছে। ফলে পুঁজি ও পণ্যের পাশাপাশি শ্রমেরও আদান-প্রদান বৃদ্ধি পেয়েছে। এটি যদি আরও অবাধ হতো, সত্যি সত্যিই আমরা একটি ভিসামুক্ত পৃথিবী পেতাম- তা হলে জনসংখ্যা কোথাও কোনো সমস্যা হিসেবে বিরাজ করত না। বাংলাদেশের নীতিনির্ধারকদের অনুধাবন করতে হবে, দারিদ্র্য ও অশিক্ষার এই মেলবন্ধন ভাঙতে না পারলে আমরা প্রজন্মের পর প্রজন্ম দরিদ্র এবং অশিক্ষিতই থেকে যাব। তাই এ বিষয়ে গভীর মনোযোগ দিতে হবে।
প্রকৃতপক্ষে শিক্ষাই শক্তি, শিক্ষাই মুক্তি। মেরুদ- ছাড়া দেহ অচল। তবে মেরুদ- দৃশ্যমান বস্তু। অন্যদিকে শিক্ষা বা শক্তি অদৃশ্য ক্ষমতা। শক্তিকে আমরা তিন ভাগে ভাগ করতে পারি- প্রাণশক্তি, দৈহিক শক্তি ও মেধাশক্তি। প্রাণশক্তি ও দৈহিক শক্তির মাধ্যমে মেধাশক্তির বিকাশ হয়। বিকশিত শক্তি এক চলমান প্রক্রিয়া। তা কোনো অবস্থাতেই থেমে থাকে না। শিক্ষা মেধাশক্তি বিকাশের চলমান ধারা অব্যাহত রাখে। মূলত মেধাশক্তিই মানবজাতির সর্বশ্রেষ্ঠ সম্পদ। আদিকাল থেকে মানবজাতি মেধাশক্তিতে বলীয়ান হয়ে অন্যান্য প্রাণীর ওপর প্রাধান্য বিস্তার করে চলেছে। মানবজাতির মধ্যেও শ্রেষ্ঠত্বের প্রতিযোগিতায় মেধাশক্তিই মুখ্য ভূমিকা পালন করে থাকে। শিক্ষা মেধাশক্তির উৎকর্ষ ঘটায়। ফলে দেখা গেছে- পৃথিবীতে যে জাতি শিক্ষায় যত বেশি অগ্রগামী, সে জাতি মেধাশক্তিতে তত বেশি বলীয়ান। এ কারণে শিক্ষার উৎকর্ষ ঘটিয়ে সংখ্যালঘিষ্ঠ ইহুদি জাতি পৃথিবীতে পুরো মানবজাতির ওপর সার্বিক শ্রেষ্ঠত্ব অর্জন করে চলেছে। মূল কথা- শক্তি অদৃশ্য, মেরুদ- দৃশ্যমান। দৃশ্যমান বস্তু সহজে ধ্বংস করা যায়। অদৃশ্য শক্তির বিরুদ্ধে যুদ্ধ করা যায় না, ধ্বংস করা যায় না। ভঙ্গুর মেরুদ- নিয়ে অসুস্থ প্রাণী বেঁচে থাকতে পারে, চলৎশক্তিহীনভাবে অন্যের মাধ্যমে প্রয়োজনীয় কাজকর্ম সম্পাদন করতে পারে। অথচ শিক্ষাবিহীন মেধাশক্তিহীন মানুষ পৃথিবীতে অগ্রগতি লাভ করতে পারে না। অনেক ক্ষেত্রে মানসিক রোগী হিসেবে পরিচিতি পায়। সমাজে সে অবহেলিত ও অবাঞ্ছিত। এ কারণে শিক্ষাকে মেরুদ-ের সঙ্গে তুলনা না করে মেধাশক্তির সঙ্গে তুলনা করা অধিক বাঞ্ছনীয়।
রায়হান আহমেদ : গবেষক ও কলাম লেখক