ই-পেপার ভিডিও ছবি বিজ্ঞাপন কুমিল্লার ইতিহাস ও ঐতিহ্য যোগাযোগ কুমিল্লার কাগজ পরিবার
আত্মকথায় স্মৃতি ঃ আমার একাত্তর
Published : Tuesday, 29 March, 2022 at 12:00 AM
আত্মকথায় স্মৃতি ঃ আমার একাত্তরশান্তিরঞ্জন ভৌমিক ||
(পূর্বে প্রকাশের পর)
সোনামূড়ায় আমার জ্যেঠা মশায় (বাবার জ্যেঠতাতো ভাই) থাকেন, সামান্য খোঁজ নিয়েই বাসা খুঁজে পেলাম, তিনি তখন ছিলেন না। সন্ধ্যায় দেখা হলো। তিনি প্রথমেই জানতে চাইলেন- 'বৌমা কোথায়'। বললাম- কুমিল্লায় রেখে এসেছি।' তা শুনেই গর্জে উঠলেন- 'বাড়ির বৌকে ফেলে তুই প্রাণ বাঁচাতে আসলি কিভাবে।' বলেই হাতে লাঠি নিলেন। মাথা নীচু করে রইলাম। এতক্ষণ বৌয়ের কথা মনে ছিল না বা মনে হয় নি। তখন থেকে ভিতরে কাঁপন শুরু হলো। এ কী করলাম আমি। আমি একজন কাপুরুষ। নিজের প্রাণের মায়ায় স্ত্রীকে ফেলে এভাবে পালিয়ে এলাম। আমি কী মানুষ। নিজের প্রতি ধিক্কার চলে এলো। কী করি এখন। সিদ্ধান্ত নিলাম- মরি আর বাঁচি পরের দিন কুমিল্লায় চলে যাব, স্ত্রী-সহ বাসার সবাইকে নিয়ে আসব, না হয় তাঁদের সাথে থাকব। মরতে হয় মরব। পরের দিন সকালে সোনামূড়া বাজারে ঢুকেই বাদল হাজরা ও জোয়েলদাকে দেখলাম। তাঁরা শুধু পরিচিতজনই নন, আপনজন। তাঁদের কাছে আমি কুমিল্লায় ফিরে যাব জানালাম। তাঁরা জানতে চাইলেন, 'কেন'? বিস্তারিত বললাম। এ দুজন কুমিল্লা স্টেডিয়ামের কর্মকান্ডের সঙ্গে ওতপ্রোতভাবে জড়িত। রশীদ ও তার ভাই সীমান্ত এলাকার লোক, স্টেডিয়ামের পিয়ন। তাদের মাধ্যমে বাদল হাজরা ও জোয়েলদার পরিবারের লোকজন, জিনিসপত্র আনার ব্যবস্থা করেছেন। আমাকে বললেন- “আপনি চিঠি লিখে দেন- রশীদ বা তার ভাই, বোরখা পরিয়ে মেয়েলোকদের নিয়ে আসবে।' বেনু গুহ (অশোক গুহ) ছিলেন তাঁদের অন্তরঙ্গ বন্ধু। বাদল হাজরা বেনুদাকে পরিবারসহ আসার জন্য চিঠি দিলেন রশীদ আমার স্ত্রী ও বেনুদার বড় ছেলেকে পরের দিন সন্ধ্যায় সোনামুড়া নিয়ে এলো। বেনুদা এলেন না। এ কথা পরে লিখছি। আমি স্ত্রী ও বেনুদার ছেলে তাপসকে নিয়ে কিশোরগঞ্জ কাঁকড়াবনের কাছে মামাবাড়ি চলে যাই। মামা ১৯৬৪ সালে বিনিময় প্রক্রিয়ায় এ দেশবাসী হয়েছেন।
পরের দিন সোনামূড়া যাই। রশীদের মাধ্যমে বেনুদাকে চিঠি পাঠাই। জিনিসপত্র কাপড়চোপর ইত্যাদি পাঠায়, আসতে সাহস করেন না। ২১ এপ্রিল রাতে পাকহানাদার বাহিনি বাসায় ঢুকে তাঁকে ধরে নিয়ে যায়। পরের দিন (২২ এপ্রিল) বৌদি, মেয়ে ও কোলের ছেলেকে নিয়ে রশীদের সঙ্গে চলে আসেন। বেনুদার কোনো খোঁজ নেই নেই। কলকাতা থেকে ফণিভূষণ সাহা (সাহা মেডিকেল হলের অন্যতম মালিক) ভাই নিতাই সাহা যাঁকে ২৬ তারিখ রাত্রে বাসা থেকে ধরে নিয়ে যায় তাঁর খোঁজ নিতে এসেছেন- আমাকে বললেন- ‘পরিস্থিতি কী তা বুঝিয়ে বল তো। আমি যা দেখেছি, শুনেছি এবং কী হতে পারে বিস্তারিত বললাম। তিনি 'আঃ' বলে আর্তচিৎকার করে 'ভাইরে' বলেই স্তব্ধ হয়ে গেলেন। বললেন- '১৯৬৫ সালে যখন আমি চলে যাব ঠিক করি, নিতাইকেও প্রস্তাব দেই, সে আমার অংশের টাকা পরিশোধ করে বাড়ি ও সাহা মেডিকেল হলের মালিক হয়ে থেকে যায় । আমার ভাই হয়ত বেঁচে নেই।' অঝোরে কাঁদতে লাগলেন। সে এক দীর্ঘ ইতিহাস। এ ইতিহাস লিখে শেষ করা যাবে না। বলে রাখি আমি ১৯৭২ সালের ১৫ ডিসেম্বর রাঙ্গুনীয়া কলেজের চাকুরি ছেড়ে কুমিল্লা মহিলা কলেজে যোগদান করি। সেদিন থেকে একটানা ১১ বছর ৭ মাস নিতাই সাহার বাসায় ভাড়া ছিলাম এবং সে সুবাদে অনেককিছু জানতে পারি। আমিতো নিজের কথাই বলতে চাচ্ছি মামা পূর্ববঙ্গে গ্রামের একজন ধনী ব্যক্তি ছিলেন। এল এম এফ ডাক্তার ছিলেন। বিষয় সম্পত্তি প্রচুর ছিল- অভাব শব্দটির সঙ্গে পরিচিত ছিলেন না। ১৯৬৪ সালে বিনিময়ে বাড়ি জায়গা জমি পেয়েছেন। তা কেবলই পাহাড় টিলা কাঁঠাল-আনারসের বাগান, ধানীজমি টিলার ঢালে, বন্যায় ফসল কেড়ে নেয়। ফলে মামা হয়ে যান অভাবী মানুষ। আমি আমার স্ত্রী, বেনুদার ছেলে সঙ্গে অশোকবাবু এ চারজন মামা বাড়িতে প্রথম আশ্রয় নেই। পরে উদয়পুর মামাত বোনের বাসায় ভগ্নিপতি ছিল বিখ্যাত বইয়ের লাইব্রেরী 'বাণী মন্দির'- এর মালিক। হীরালাল দাস। সপ্তাহ খানেক থাকার পর আগরতলায় বড় মাসী মেসোতাতভাই সুভাসকে পাঠিয়ে আমাদের নিয়ে আসেন কৃষ্ণনগর বাসায় মেসোমশায় শ্রদ্ধাভাজন ললিতবিহারী সরকার আমার হেডমাস্টার, জীবনের অন্যতম আদর্শবান ব্যক্তি। বাসায় চারভাই এক বোন, বড় ভাইয়ের স্ত্রী ও শিশুকন্যা লিলি- মেসোমশায়-মাসীমা এবং আমরা চারজন। ত্যাগী হয়েছিলেন শূন্য হাতে। দু'ভাই মনোজদা ও দিলীপদা চাকুরি করেন, মেসোমশাই টিউশনি করেন, অন্য দু'ভাই বি এ পাশ করে বেকার, মেসোতাতবোন কলেজে পড়ে। এতটুকু বললাম- কী অসীম মমতায় ও মানবিক বিবেচনায় আমাদের চারজনকে আশ্রয় দিলেন। এর মধ্যে বেনুদার স্ত্রী দু'শিশু সন্তানসহ এসেছেন, তাদেরও আশ্রয় এ বাসায়। বৌদি স্বামীর জন্য পাগল প্রায়, সন্তানদের যত্নাদি করার প্রতি নজর নেই, শিশু খাদ্যের ব্যবস্থা করাও অকল্পনীয়, আমি বেকার ও শূন্যহাতে অসহায় দিশাহীন অথর্ব ব্যক্তি। অকূল পাথার। কেবলই অন্ধকার, অনিশ্চয়তার ধুধু করা সীমাহীন প্রান্তর, মৃত্যুকামনায় বিভোর বিলাসী অন্ধকূপ এ অবস্থা দেখে অশোকবাবু চলে গেলেন মে মাসের কোনো একদিন, বৌদির জামাইবাবু (বিমানবন্দরের গ্রাউন্ড ইঞ্জিনিয়ার) এসে বৌদি ও ছেলেমেয়েকে কলকাতা নিয়ে গেলেন। সেখানে পূর্বেই বৌদির মা-বাবা থাকতেন। আমি ও আমার স্ত্রী উপায়হীন অবস্থায় বড়মাসীর আশ্রয়ে থেকে গেলাম এবং মুক্তিযুদ্ধের নয় মাস পর্যন্ত।

(ক্রমশঃ)
লেখক: সাহিত্যিক, গবেষক ও সাবেক অধ্যাপক
মোবাইল: ০১৭১১-৩৪১৭৩৫