
গত দুই
বছরে করোনার সংক্রমণে প্রায় বিধ্বস্ত অর্থনীতি যখন ঘুরে দাঁড়াতে শুরু
করেছে, তখনই জনজীবনে দ্রব্যের মূল্যবৃদ্ধির খাঁড়া এসে পড়ল। করোনার অভিঘাত
সব শ্রেণি ও পেশার মানুষের ওপরই পড়েছে। তবে সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছেন
প্রান্তিক ও সীমিত আয়ের মানুষ। অনেকে চাকরি হারিয়েছেন, অনেকের আয়রোজগার
কমে গেছে। এ অবস্থায় চালসহ নিত্যপ্রয়োজনীয় প্রায় সব পণ্যের দাম বেড়ে যাওয়ায়
মানুষ খুবই অনিশ্চয়তার মধ্যে দিন কাটাচ্ছেন।
গত বৃহস্পতিবার টেকসই
উন্নয়ন লক্ষ্য (এসডিজি) নিয়ে নাগরিক প্ল্যাটফর্ম আয়োজিত সেমিনারেও টেকসই
উন্নয়নের লক্ষ্য অর্জনে স্থানীয় টাকার মান স্থিতিশীল রাখা, সুদের হার
সমন্বয় করা, নিত্যপণ্যের শুল্ক-কর কমানো, করপোরেট কর হ্রাস, দাম নিয়ন্ত্রণে
টিসিবির কর্মসূচি বিস্তৃত করা, বিদ্যুৎ, জ্বালানি, খাদ্যপণ্য ও সারের মতো
ভর্তুকি পাওয়া খাতগুলোর পুনর্বিন্যাস, সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচি
সম্প্রসারণ, বার্ষিক উন্নয়ন কর্মসূচিতে (এডিপি) টাকা খরচে সাশ্রয়ী হওয়া এবং
শিক্ষা ও স্বাস্থ্য খাতে বিনিয়োগ বাড়ানোর ওপর জোর দেওয়া হয়েছে। অর্থাৎ
প্রান্তিক মানুষের জীবনমান উন্নত করা না গেলে টেকসই উন্নয়নের লক্ষ্য পূরণ
অধরাই থেকে যাবে।
আন্তর্জাতিক বাজারের ওপর আমাদের হাত নেই সত্য; কিন্তু
যেসব পণ্য দেশে উৎপন্ন হয়, সেসব পণ্যের দাম কেন অস্বাভাবিক হারে বেড়ে গেল,
সেটাই বড় প্রশ্ন। দ্বিতীয়ত, আমদানি পণ্যের দাম আন্তর্জাতিক বাজারে কত
বেড়েছে, আর অভ্যন্তরে কত বাড়ানো হয়েছে, সেসব মিলিয়ে দেখা সরকারের দায়িত্ব।
মুক্তবাজার অর্থনীতির অর্থ এই নয় যে যার যা খুশি তা করা। সরকার দুই উপায়ে
পণ্যের দাম নিয়ন্ত্রণে আনতে পারে। প্রথমত, বাজারে কোনো কারসাজি হচ্ছে কি
না, তা পর্যবেক্ষণ করা। দ্বিতীয়ত, নিজস্ব চ্যানেলে পণ্যের সরবরাহ বাড়ানো।
দেরিতে হলেও টিসিবির মাধ্যমে এক কোটি পরিবার, তথা পাঁচ কোটি মানুষকে কম
দামে ভোজ্যতেল, চিনি, মসুর ডাল ও ছোলা সরবরাহ করার সিদ্ধান্ত হয়েছে। এ ছাড়া
সয়াবিন, চিনি ও ছোলার ওপর থেকে ভ্যাট প্রত্যাহার করা হয়েছে; যদিও কত ভাগ
প্রত্যাহার করা হয়েছে এবং এর কার্যকারিতা নিয়ে প্রশ্ন আছে।
আমরা সরকারের
এ সিদ্ধান্তকে স্বাগত জানিয়েও বলতে চাই, করোনাকালে সরকারের আর্থিক সহায়তার
অভিজ্ঞতা সুখকর নয়। অনেক গরিব মানুষই সরকারের সহায়তা থেকে বঞ্চিত হয়েছেন।
আবার ক্ষমতার ছায়াতলে থাকার কারণে অনেক সচ্ছল মানুষও সহায়তা পেয়েছেন। কম
দামে নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্য বিক্রির ক্ষেত্রে যেন এর পুনরাবৃত্তি না হয়।
সরকারের কাছে সঠিক তথ্য-উপাত্ত না থাকায় স্থানীয় জনপ্রতিনিধিদের ওপরই ভরসা
করতে হয়। কেন সরকার এত দিনেও একটি ডেটাবেইস তৈরি করতে পারল না? সরকারের সেই
সক্ষমতা না থাকলে বেসরকারি কোনো সংস্থার সহায়তাও চাইতে পারত। প্রতিদিন
টিসিবির ট্রাক ঘিরে যেভাবে মানুষের হুড়োহুড়ি দেখা যাচ্ছে, তাতে এ পদ্ধতি
কাজে আসবে বলে মনে হয় না। এর বিকল্প খুঁজে বের করতে হবে। অন্যদিকে
ব্যবসায়ীদের পক্ষ থেকে পণ্য সরবরাহে পথে পথে চাঁদাবাজি ও হয়রানির যেসব
অভিযোগ আছে, তা-ও খতিয়ে দেখা প্রয়োজন। কঠোর হাতে চাঁদাবাজদের দমন করতে হবে।
নীতিনির্ধারকদের মনে রাখতে হবে, ক্ষমতার আশ্রয়পুষ্ট কতিপয় সুযোগসন্ধানী
গরিবের হক মেরে খেলে সরকারের সব অর্জনই ধুলায় মিশে যাবে।