ই-পেপার ভিডিও ছবি বিজ্ঞাপন কুমিল্লার ইতিহাস ও ঐতিহ্য যোগাযোগ কুমিল্লার কাগজ পরিবার
জীবনবোধ ও জীবনদর্শন
Published : Wednesday, 16 February, 2022 at 12:00 AM
জীবনবোধ ও জীবনদর্শনজুলফিকার নিউটন ||
(পূর্বে প্রকাশের পর)
১০
আমি কোনো এক জায়গায় লিখেছি যে আমি আমার মার ইচ্ছাকে পূর্ণ করতে পারিনি। আমি রক্ত গোলাপের উপর একটি প্রজাপতিকে দেখে মুগ্ধ হয়ে তার পেছনে ধাবমান হয়েছি। কিন্তু বিখ্যাত মানুষ হতে ভয় পেয়েছি। আমি সাধারণ মানুষের একজন হয়ে তাদের সৌভাগ্যে এবং বিনয়ে তাদের অসহায়তা এবং শ্রমে তাদেরই একজনহতে চেয়েছি। তবে হতে চাওয়া এক কথা আর যথার্থ হওয়া অন্য কথা। সন্ত কবীর বলেছেন, রুখাসুখা গমের রুটি তার স্বাদই বা কি। সুতরাং তাতে লবণ আছে কি নেই সেটা ভেবে কি কোনো লাভ আছে। শিরোদেশ যখন দান করেছি তখন রোদন করে তো লাভ নেই। কথাটির অর্থ হচ্ছে মানুষের প্রীতির মধ্যে, মানুষের আকাঙ্ক্ষার মধ্যে, মানুষের বেদনার মধ্যে, মানুষের অসহায়তার মধ্যে মানুষের চিত্তের শুভবুদ্ধির মধ্যে জাগ্রত হতে পারাই সবচেয়ে বড় কথা। যিনি কবি তিনি মানুষের বিভিন্ন অভিনিবেশের মধ্যে নিজেকে আবিষ্কার করবার চেষ্টা করেন। পৃথিবীতে জীবন ক্ষণকালীন এবং মৃত্যু অবধারিত। অকস্মাৎ একটি বজ্রপাতে একটি বৃক্ষ যেমন নিঃশেষ হয়ে যায় মৃত্যুও তেমনি মানুষের অপ্রস্তুতির মধ্যে তাকে নিঃশেষ করে। সুতরাং যতদিন আমরা জীবিত থাকি ততদিন আমাদের কর্তব্য হচ্ছে কর্তব্যবোধে মানুষে মানুষে সম্পর্কের একটি সর্বস্ব নির্মাণ করা। আমাদের মৃত্যু যদি কখনো না হতো আমরা তাহলে কি অনন্তকাল প্রেম ও মমতার মধ্যে বাস করতাম? ঘৃণা ভুলে যেতাম এবং ঈর্ষার চিহ্ন থাকতো না? ব্যর্থতায় ভীত না হয়ে অনবরত নতুন করে জীবন আরম্ভ করবার চিন্তা করতাম? এসব প্রশ্নের উত্তর কি জানি না, শুধু জানি এ পৃথিবীতে সময় নেই বলেই আমাদের এত ভয় বিদ্বেষ ও ঘৃণী। জীবনে এবং মৃত্যুতে পরিত্যক্ত হবে বলেই আমরা সবসময় ঈর্ষার মধ্যে বাস করি। জীবনের যাত্রা সুষম ও সুস্থ করতে হলে, সম্পূর্ণ করতে হলে আমাদের সকলকে প্রেমে ও বৈরাগ্যে একত্রিত হয়ে পথ চলতে হবে। আমাদের মমতার প্রয়োজন। মানুষের চরম অসহায়তা তখনই হয় যখন সে অনুভব করে যে কেউ তাকে ভালো বাসছে না। যে নিঃশ্বাসে আমাদের জীবন সচেতন তা প্রেমের নিঃশ্বাস, যে অন্ন গ্রহণ করছি তাও প্রেমে অভিষিক্ত। সর্বমূহুর্তের জন্য এ প্রেমকে আমাদের গ্রহণ করতে হবে। তখন শূন্যতায় ভীত না হয়ে মমতাবোধে অবসরকে সম্পূর্ণ করবো। সমৃদ্ধির পৃথিবীতে, সমাজে নিয়মিত পথযাত্রার পরিমাপসহ বাক্যালাপের বন্ধ্যাত্বে এবং সহনশীলতার অভাবের নিঃসতায় আমরা হৃদয়কে হারিয়ে ফেলেছি। অভিমানের মূল্য নেই শোকের তাৎপর্য নেই শুধু প্রতিদিন অপরিসীমশূন্যতায় সূর্যোদয় ও সূর্যাস্ত। এভাবে সময় হারিয়ে কোনো কিছুই দেখতে পাই না। কখন যে চভূইগুলি এসে কলরব করে চলে যায় জানি না আমগাছের নতুন পাতাগুলি দেখতে চেয়েও দেখা হয় না। শুধু যখন শুকনো পাতায় শব্দ করে কাঠবিড়ালী গাছ বেয়ে ওঠে এবং একটি কাক হঠাৎ আর্তনাদ করে তখন মনে হয় আনন্দের সঞ্চয়গুলি বুঝি হারিয়ে গেল। তখন ভাবি দুপুরের রোদে চাঁপাফুল হয়তো মমতা ছড়িয়েছে, বটগাছ ছায়া বিছিয়েছে কিন্তু আমি সে মমতা এবং কোনোটাতেই নেই। আমি এ মুহূর্তে একটি বিরাট কর্মব্যস্ততার উচ্চকণ্ঠ মাত্র।
নদীপথে আমি যখন গ্রাম থেকে শহরে এলাম তখন শৈশবের গ্রামের সঙ্গী-সাথীদের হারানোর একটি বেদনা ছিল, কিন্তু নদীর স্রোত এবং পানিতে বৈঠার শব্দ আমাকে অনবরত সচকিত করছে এবং আমি সেই শৈশবেই একটি অবলম্বন সংগ্রহ করেছি। বৌদ্ধ শাস্ত্রে মানবচিত্রের অবলম্বন সংগ্রহের কথা আছে। বৌদ্ধ পণ্ডিতগণ মানবচিত্তকে বিভিন্ন অবলম্বন সংগ্রহ করে অগ্রসর হওয়ার হেতু হিসেবে বর্ণনা করে থাকেন। এই অবলম্বন অনেক প্রকার। তার মধ্যে প্রধান হচ্ছে রূপালম্বন এবং শব্দালম্বন। তাদের বিবেচনায় দৃশ্যমান বর্ণই রূপালম্বন এবং শ্রুত শব্দই শব্দালম্বন। আমাদের যে নয়ন আছে সেই নয়নের দ্বার প্রথম যখন উন্মুক্ত হয় তখন চিত্তের অবলম্বন থাকে শুধু রূপ এবং ধ্বনি। বৌদ্ধ পরিভাষায় এ গুলোকে বলা হয়েছে চক্ষু-দ্বারিক চিত্ত এবং শ্রোত দ্বারিক চিত্ত অর্থাৎ নয়ন দিয়ে আমরা রূপ নির্ণয় করি তেমনি শ্রুতির সাহায্যে শব্দকে গ্রহণ করি। নদীপথে যখন যাত্রা করেছিলাম তখন সকালবেলা। এখনও মনে আছে সূর্যকে পেছনে রেখে আমরা অগ্রসর হয়েছিলাম। সুতরাং সূর্যের দীপ্তি নয়নকে আচ্ছন্ন করেনি এবং বিফল করেনি। আমি চতুর্দিকে তাকিয়ে ক্ষীণ নদীপ্রবাহের দু'পাশের সবুজ ঘনবিন্যস্ত বৃক্ষরাজি এবং লতাকুঞ্জকে লক্ষ্য করেছিলাম। তখন মনে হয়েছিল এই যে চতুর্দিকে অগাধ সবুজের বন্যা এগুলো নিয়ে যদি চিরকাল মানুষ উজ্জ্বল থাকতে পারে তবে কতই না মধুর হয়। ঠিক এভাবে যে আমি সে সময় ভেবেছি তা নয়। বড় হয়ে যখন গ্রাম ছেড়ে নদীপথে এই যাত্রার কথা ভেবেছি তখনই নানাবিধ কুশলতায় সেই যাত্রাপথকে আমি বর্ণনা করবার চেষ্টা করেছি।
শিল্পী মার্ক শাগাল তার মত্যুর কিছুদিন পূর্বে এক বান্ধবীকে একটি পত্র লিখেছিলেন আমি জানি আমি আর দীর্ঘদিন বাঁচবো না। ভাববার চেষ্টা করছি এটা কি কোনো দুঃখের কথা না অসহায়তার কথা? জীবন তো একটি উৎসব। যারা তাদের কর্মের উৎসাহের মধ্যে এ উৎসবকে উদযাপন করে তাদের দুঃখ কিসের। আমি তোপৃথিবীর সৌন্দর্যকে আমার দৃষ্টির ক্ষমতা যতটুকু সে ক্ষমতা দিয়ে দেখবার চেষ্টা করেছি, কখনো হলুদ রঙ দেখেছি কখনো নীল, কখনোবা একগুচ্ছ ফুলের তরঙ্গ। যা কিছুই আমি দেখেছি আমার নয়নকে উন্মুক্ত করে আমি দেখেছি। সুতরাং আমার দুঃখ নেই। আমি ক্লান্ত এটা সত্য, আমি বসে একাকী ফুলের মালা গাঁথতে চাই। মেঘঢাকা আকাশের নীচে তরুণ-তরুণীদের নৃত্য দেখতে চাই। এই উৎসবের জীবনযাত্রায় আমার জীবন অনন্তকালীন হবে। সুতরাং মৃত্যুর জন্য আমার কোনো দুঃখ নাই। পৃথিবীতে কোনটা বিপাক এবং কোনটাইবা অকুশল জানি না। বাবা-মা উভয়ের কাছেই শুনেছি জ্ঞান এবং প্রজ্ঞাই হচ্ছে যথার্থ কুশল। মানুষের চিত্ত ও কুশলগুলোকে সংগ্রহ করে। কখনো কখনো চক্ষুর দ্বারা সংগ্রহ করে কখনোশ্রুতির দ্বারা সংগ্রহ করে, কখনোঘ্রাণের দ্বারা সংগ্রহ করে, কখনো রসনার দ্বারা সংগ্রহ করে, কখনো কায়া দ্বারা এবং কখনো হৃদয় দ্বারা সংগ্রহ করে। অনবরত পৃথিবীর পথে জ্ঞানকে আশ্রয় করতে গিয়ে মানুষ তার হৃদয়কে উন্মুক্ত করে। প্রেমের প্রশান্তি উন্মুক্ত হৃদয়ের সাহায্যেই গড়ে উঠে। আমার সৌভাগ্য যে আমি আমার মাকে চিরদিন আশ্রয় করেছিলাম, কখনো অসম্ভবকে অনুভব করিনি। অভাব তো দু'রকম-বস্তুর অভাব এবং হৃদয়ের অভাব।কখনো কখনো বস্তুর অভাব হলেও আমার মা হৃদয় দিয়ে তা সম্পূর্ণ করতেন। ইংরেজ কবি ওয়ার্ডসওয়ার্থ লিখেছেন, এক সময় রশ্মি বিকিরণ খুব উজ্জ্বল ছিল, কিন্তু এখন তা আমার দৃষ্টির সম্মুখ থেকে সরে গেছে। সে সময়টি আর ফিরিয়ে আনা যাবে না যখন সবুজ ঘাসেও সমারোহ ছিলো এবং পুষ্পপল্লবে মহিমা ছিলো। তিনি তার শৈশবের কথা বলেছিলেন। কিন্তু আমার মনে হয় আমরা কোনও মুহূর্ত থেকেই নির্বাসিত নই। বিপুল মহিমান্বিত পৃথিবীতে প্রতিদিন সকাল বেলা যখন সূর্যের আশ্চর্য আলোকের অভ্যুদ্বয়ের মধ্যে জাগরিত হই তখন জন্ম থেকে মৃত্যু পর্যন্ত একটি মাত্র অস্তিত্বের সাড়া অনুভব করি। বিশ্বজগতে কোনও কিছুই হারায় না, কোনও কিছুই যথার্থভাবে বিস্মৃতির অতলে হারিয়ে যায় না। প্রতিদিন নানা কর্ম এবং প্রবৃত্তির মধ্যে আমরা বাস করি বলে অনেক মহিমা হয়তো স্মরণে আসে না। কিন্তু তাই বলে কোনও কর্মের আবেষ্টনে আমরা কখনো হারিয়ে যাই না। এটা অবশ্য সত্যি যে প্রতিদিনের কর্মকাণ্ড চিত্তের বিশ্রাম থেকে আমাদের দূরে রেখেছে, আমাদের চেতনাকে আড়াল করেছে, হয়তো আমরা অস্তিত্ব সম্পর্কে সংশয়িত হচ্ছি, কিন্তু অজস্র বিচ্ছিন্নতার মধ্যে স্মৃতি কিন্তু কখনো কখনো নির্মল উদার শান্তির মধ্যে আমাদের টেনে নিয়ে আসে। আমার মার ত্যাগের কথা বলছিলাম। তিনি স্বার্থের বন্ধন ছেড়েছিলেন অহংকারে নয় কুহেলিকা থেকে মুক্তি পাবার জন্য। তিনি যে বিত্তকে ত্যাগ করেছিলেন অত্যন্ত সহজেই তা ত্যাগ করেছিলেন। বিত্তের অহংকার তার ছিলো না প্রয়োজনের তাগিদ ছিলো। অত্যাচার থেকে তাঁর সন্তানদের তিনি সরিয়ে আনতে পেরেছিলেন এখানেই তার জয়। তার চরম লক্ষ্য ছিলো স্বাধীন পরিচর্যার নিজস্ব ক্ষমতার আবরণে আমাদের জড়িয়ে রাখা। রবীন্দ্রনাথ বলেছেন যে মানুষের কর্তব্য হচ্ছে অনবরত শুভ কর্মের মধ্যে আপনাকে বিকশিত করা এবং আপনাকে সমর্পণ করা এবং অনির্বচনীয়র প্রতি আপনাকে একেবারে উন্মুক্ত করে ধরা। প্রত্যেক মানুষের মধ্যে একটি অনন্ত জীবন রয়েছে। সে অনন্তের পরিমাপ কে করবে অর্থাৎ সে অনন্তের পরিমাপ কে করতে পারে? একটি পুষ্পের সম্পূর্ণতা ক্ষণকালীন কিন্তু তার শোভা সম্পদ আমার দৃষ্টিতে চিরকালীন। নদী যেমন তার বহু দীর্ঘ ধারাবাহিক বৈচিত্র্যের মধ্য দিয়ে স্রোত বহন করে কত পর্বত প্রান্তর মরু নগর গ্রামকে স্পর্শ করে। আপন সুদীর্ঘ যাত্রার বিপুল সঞ্চয়কে প্রতি মুহূর্তে নিঃশেষে মহাসমুদ্রের নিকট উৎসর্গ করতে থাকে যখন তার অবিশ্রাম ধারার প্রবাহেরও অন্ত থাকে না এবং সঙ্গে সঙ্গে তার চরম বিরামেরও সীমা থাকে না-মানুষকেও তেমনি একইভাবে বৈচিত্র্যের মধ্য দিয়ে বিপুলভাবে মহৎ সার্থকতা লাভ করতে হয়। তার সফলতা সহজ নয়। নদীর মত প্রতি পদে সে নিজের পথ আপন কর্মবেগ রচনা করে চলে। কখনো ভাঙ্গে কখনো গড়ে, কখনো বিভক্ত হয় কখনো সংযুক্ত হয়, যখন বাধা উপস্থিত হয় তখন সে বাধাকে অতিক্রম করে সে আপনার সীমাহীন পরিণামে এসে উপস্থিত। যখন সত্যি সে পরিণাম সে পায় তখন বহু বিচিত্রকে অতিক্রম করে এসেছে বলেই মহান একের সঙ্গে তার মিলন সম্পূর্ণ হয়। যদি কোথাও কোনো বাধা না থাকতো তবে মানুষ মহৎ হতে পারতো না। বাধাই তো মানুষকে সম্পূর্ণ করে বিরাটের মধ্যে তাকে বিকশিত করে। পৃথিবীতে দুঃখ আছে এবং সে দুঃখের পরিসীমা নেই আমরা বলি। কিন্তু বিস্ময়ের কথা এই যে বিশ্বব্যাপী দুঃখ সেই দুঃখের আঘাতেই সংসারে ভাঙ্গাগড়া চলছে। এই ভাঙ্গাগড়া কি আর্তনাদের? আমার তো মনে হয় এই ভাঙ্গাগড়ার জন্যই পৃথিবীতে অহরহ বিচিত্র তরঙ্গ আমরা লক্ষ্য করি। সে তরঙ্গ ধ্বনি বিভঙ্গের বর্ণবিভার এবং উন্মুক্ত যাত্রার। মানুষ তোক্ষুদ্র নয়, তাই ক্ষুদ্রতাতে মানুষের শেষ নয়। ক্ষুদ্রতা নিয়ে জীবন নিঃশেষ করলে আমরা অসঙ্গত হতাম। দুঃখের মহিমায় মানুষ মহীয়ান হয়েছে। দুঃখের অভিষেকে মানুষ অনির্বচনীয়কে পেয়েছে। সুতরাং যিনি বেদনার সীমা অতিক্রম করে চলেন তিনিই আনন্দলোককে আবিষ্কার করেন।             (চলবে...)