
করোনা
মহামারির এ সময়ে বিদেশে বাংলাদেশের শ্রমবাজার সবচেয়ে বড় ধাক্কা খেয়েছে।
২০১৭ সালে বিভিন্ন দেশে বাংলাদেশি কর্মী ছিল ১০ লাখের ওপর। ২০২০ সালে সেই
সংখ্যা কমে হয় দুই লাখ ১৭ হাজার ৬৬৯ জন। শুধু বাংলাদেশেই নয়, জনশক্তি
রপ্তানিকারী প্রতিটি দেশেই এই সংখ্যা দ্রুত হ্রাস পেয়েছে।
একই সঙ্গে
কমেছে রেমিট্যান্স বা প্রবাস আয়ের প্রবাহ। কিন্তু সুখের বিষয়, কর্মী কমলেও
২০২০ সালে বাংলাদেশের প্রবাস আয় বৃদ্ধি পেয়েছে উল্লেখযোগ্য হারে। গত বুধবার
এশীয় উন্নয়ন ব্যাংক (এডিবি) প্রকাশিত এশিয়ান ইকোনমিক ইন্টিগ্রেশন রিপোর্ট
(এইআইআর) ২০২২ প্রতিবেদন অনুযায়ী, ২১.৭ বিলিয়ন ডলার আয় করে ২০২০ সালে এশিয়া
ও প্রশান্ত মহাসাগরীয় অঞ্চলের দেশগুলোর মধ্যে পঞ্চম স্থান অর্জন করেছে
বাংলাদেশ। প্রথম স্থানে আছে ভারত। এরপর চীন, ফিলিপাইন ও পাকিস্তান রয়েছে
যথাক্রমে দ্বিতীয়, তৃতীয় ও চতুর্থ স্থানে। প্রতিবেদন অনুযায়ী, সরকারের
গৃহীত কিছু পদক্ষেপ, বিশেষ করে প্রণোদনা প্রদানের ফলে বৈধ চ্যানেলে অর্থ
প্রেরণে উৎসাহিত হয়েছেন প্রবাসীরা।
বাংলাদেশে কর্মক্ষম অথচ বেকার তরুণের
সংখ্যা এখনো অনেক বেশি। দিন দিনই বাড়ছে এই সংখ্যা। দেশে উপযুক্ত
কর্মসংস্থান না হওয়ায় অনেকেই বিদেশে পাড়ি জমান। কিন্তু বৈধভাবে বিদেশে
যাওয়ার সুযোগ কম থাকায় অনেকেই দালাল বা মানবপাচারকারীদের খপ্পরে পড়েন। এতে
তাঁরা শুধু আর্থিকভাবেই ক্ষতিগ্রস্ত হন না, তাঁদের ও তাঁদের পারিবারিক
জীবনে নেমে আসে এক শোচনীয় পরিণতি। গত ২৫ জানুয়ারি নৌকায় ভূমধ্যসাগর পাড়ি
দিয়ে ইতালি যাওয়ার সময় অতিরিক্ত ঠাণ্ডায় সাত বাংলাদেশির মৃত্যু হয়েছে। জানা
যায়, দীর্ঘ সময় তীব্র শীতের মধ্যে থাকার ফলে ‘হাইপোথার্মিয়া’ হয়ে তাঁরা
মারা যান। নৌকাটিতে মোট ২৮৭ জন যাত্রী ছিলেন, এর মধ্যে ২৭৩ জনই ছিলেন
বাংলাদেশি। এর আগেও এমন মর্মান্তিক অনেক ঘটনা ঘটেছে। থাইল্যান্ডের জঙ্গলে
বাংলাদেশিদের গণকবরও পাওয়া গেছে। তাই বৈধ পথে বাংলাদেশিদের বিদেশে যাওয়ার
সুযোগ সৃষ্টির লক্ষ্যে আরো বেশি উদ্যোগ নিতে হবে। এ ক্ষেত্রে কিছু অগ্রগতিও
হচ্ছে। সম্প্রতি ইউরোপের দেশ গ্রিসের সঙ্গে জনশক্তি রপ্তানির বিষয়ে
বাংলাদেশ চুক্তি সই করেছে। প্রতিবছর চার হাজার করে শ্রমিক নেবে দেশটি। এর
আগে মালয়েশিয়ার সঙ্গেও নতুন করে শ্রমিক পাঠানোর চুক্তি হয়েছে। আমাদের
জনশক্তি মন্ত্রণালয় ও দূতাবাসগুলোকে এ ব্যাপারে আরো তৎপর হতে হবে।
করোনা
মহামারির সময় বিশ্বব্যাপী অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডে এক ধরনের স্থবিরতা নেমে
এসেছিল। সেই স্থবিরতা কমিয়ে অর্থনীতি আবার চাঙ্গা হচ্ছে। শ্রমশক্তি
আমদানিকারক দেশগুলোতে নতুন করে চাহিদা তৈরি হচ্ছে। এই সুযোগ আমাদের
যথাযথভাবে কাজে লাগাতে হবে। পাশাপাশি আমাদের দক্ষ জনশক্তি রপ্তানির ওপর আরো
বেশি গুরুত্ব দিতে হবে। আমাদের মনে রাখতে হবে, কায়িক শ্রমের চাহিদা ক্রমেই
কমছে। প্রায় সব ক্ষেত্রেই বাড়ছে দক্ষ জনশক্তির চাহিদা। তা ছাড়া দক্ষ
জনশক্তি রপ্তানি করা গেলে প্রবাস আয়েও উল্লম্ফন ঘটবে। যাদের শ্রমে-ঘামে
বাংলাদেশের বৈদেশিক মুদ্রার তহবিল ক্রমেই স্ফীত হচ্ছে, তাদের জন্য আরো
সুযোগ-সুবিধা বাড়ানোরও চিন্তা-ভাবনা করতে হবে।