ই-পেপার ভিডিও ছবি বিজ্ঞাপন কুমিল্লার ইতিহাস ও ঐতিহ্য যোগাযোগ কুমিল্লার কাগজ পরিবার
শিক্ষায় চাই একজন চেঞ্জমেকার
Published : Tuesday, 15 February, 2022 at 12:00 AM
শিক্ষায় চাই একজন চেঞ্জমেকারড. কাজল রশীদ শাহীন ||
এইচএসসি ও সমমানের পরীক্ষার ফল প্রকাশ হয়েছে, যারা কৃতকার্য হয়েছে- তাদের সবাইকে অভিনন্দন। যারা কৃতকার্য হতে কোনো কারণে ব্যর্থ হয়েছেন- তাদেরও হতাশ হওয়ার কিছুই নেই, কারণ ‘ফেইলার ইজ দ্য পিলার অব সাকসেস’। করোনার কারণে দীর্ঘ অপেক্ষার পর গত বছরের ডিসেম্বরে এইচএসসি পরীক্ষা অনুষ্ঠিত হয়, তবে সবকটি বিষয়ে নয়, নির্দিষ্ট কিছু বিষয়ে এবং সেসব বিষয়ের ভিত্তিতেই গতকাল রোববার ফল প্রকাশিত হয়।
ঘোষিত ফল অনুযায়ী, ১ লাখ ৮৯ হাজার ১৬৯ জন এইচএসসি ও সমমানের পরীক্ষায় জিপিএ-৫ পেয়েছেন। বিস্ময়কর ব্যাপার বটে। এ রকম ফলাফল সচরাচর নয়- কস্মিনকালেও হয়নি। পরীক্ষায় গড় পাসের হার ৯৫ দশমিক ২৬। দেশের ৯টা শিক্ষা বোর্ডের মধ্যে গড় পাসের হারের চেয়েও এগিয়ে রয়েছে যশোর বোর্ড। তাদের পাসের হার ৯৮ দশমিক ১১। সব থেকে পিছিয়ে রয়েছে চট্টগ্রাম বোর্ড, তাদের পাসের হার ৮৯ দশমিক ৩৯ শতাংশ। যদিও চট্টগ্রাম বোর্ডের পাসের হার নিকট ও দূর-অতীতের যে কোনো সময়ের তুলনায় পাসের এই হারকে ঈর্ষণীয় বললে অত্যুক্তি হয় না মোটেই।
এইচএসসির যে ফলাফল প্রকাশিত হলো, তাতে কতটুকু আত্মতৃপ্তি ও সন্তুষ্টির সুযোগ রয়েছে সেই প্রশ্ন ওঠা যৌক্তিক ও প্রাসঙ্গিক নিশ্চয়। একটা বিষয় তো আমাদের সমাজে নীরবে হলেও বেশ প্রবলভাবেই চাউর রয়েছে যে, সাম্প্রতিক সময়গুলোতে শিক্ষার্থীদের পাসের হার বেশি করে দেখানোর অলিখিত নির্দেশনা রয়েছে। এমনকি জিপিএ-৫ প্রাপ্তির হার যেন বেশি হয়- সেই ব্যাপারেও মৌখিক নির্দেশনা রয়েছে, মুখ ফস্কে কোনো কোনো শিক্ষক এসব কথা প্রকাশ করেও দিয়েছেন। বাস্তবিকই যদি এই অভিযোগ সত্যি হয়, তা হলে বিষয়টা শুধু লজ্জার নয়- চরম বেদনারও এবং এ কারণে নিকট-ভবিষ্যতে আমাদের এই হঠকারী ও আত্মঘাতী সিদ্ধান্তের জন্য কতটা মাশুল গুনতে হবে তা হয়তো আমরা কল্পনাও করতে পারছি না।
শিক্ষাসম্পর্কিত একটা প্রাচীন প্রবাদ নিশ্চয় সবারই জানা আছে, কোনো জাতির ধ্বংস যদি নিশ্চিত করতে হয় তা হলে সেই জাতির শিক্ষাব্যবস্থার মধ্যে গলদ ঢুকিয়ে দিলেই হয়। কেননা অন্য যে কোনো ক্ষতি কিংবা সর্বনাশ হয়তো উসুল করা সম্ভব হয়, কিন্তু শিক্ষার ক্ষেত্রে কোনো ক্ষতি একবার হলে তার মাশুল গুনতে হয় বছরের পর বছর ধরে। আর ক্ষতি কিংবা সর্বনাশ করা যদি জাতিগত অভ্যাসের অংশ হয়ে দাঁড়ায় তা হলে সেখান থেকে বেরিয়ে আসা দুরূহ শুধু নয়, ক্ষেত্র বিশেষে অসম্ভব হয়ে দাঁড়ায় বৈকি। আমরা কি সেই ক্ষতি ও সর্বনাশের পথে পা বাড়িয়েছি স্বেচ্ছায়?
এবারের ফলাফলের আরেকটি বিস্ময় জাগানিয়া ও কৌতূহলোদ্দীপক দিক হলো, সারাদেশের ১ হাজার ৯৩৪টি শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের পাসের হার শতভাগ, এর বিপরীতে মাত্র ৫টি শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের কোনো শিক্ষার্থী পাস করেননি। এই ৫টি শিক্ষা প্রতিষ্ঠান দুর্ভাগা নিশ্চয়। প্রশ্ন হলো এসব শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের শিক্ষার্থীরা কি পরীক্ষায় অংশগ্রহণ করার পর অকৃতকার্য হয়েছে, নাকি তারা ফরমফিলাপ করলেও পরীক্ষায় অংশগ্রহণই করেনি কিংবা একটা-দুইটা বিষয়ে অংশগ্রহণ করলেও বাকি বিষয়গুলোতে অংশগ্রহণই করেনি। এসব বিষয়ের সুষ্ঠু অনুসন্ধান জরুরি। কেননা শিক্ষার্থীদের অকৃতকার্য হওয়ার তো যৌক্তিক কোনো কারণ নেই।
উপর্যুক্ত প্রসঙ্গের অবতারণা এই কারণে যে, এসএসসির ফলাফলে দেখা গেছে, কোনো কোনো শিক্ষার্থী পরীক্ষায় অংশগ্রহণ না করেই কৃতকার্য হয়েছে, বিশেষ করে যারা এক বিষয়ে অকৃতকার্য হয়েছিল- তারা শুধু ওই বিষয়ে পরীক্ষা দেওয়ার জন্যই ফরমফিলাপ করেছিল। বোর্ড কর্তৃপক্ষ এবার যেহেতু সব বিষয়ে পরীক্ষা নেয়নি, নির্দিষ্ট কিছু বিষয়ে নিয়েছে- এখন ওই নির্দিষ্ট বিষয়ের মধ্যে এক বিষয়ে অকৃতকার্য শিক্ষার্থীর বিষয় না থাকায় তার পরীক্ষায় বসার সুযোগ না হলেও পাসের ক্ষেত্রে কোনো অসুবিধা হয়নি, যথারীতি পাস করেছেন। এইচএসসিতেও কি এসব হলো, নাকি ভেতরে আরও গলদ রয়েছে, যা হয়তো কেবল কানাঘুষা হয়, কিন্তু কোনো সমাধান হয় না।
উচ্চতর শিক্ষার ক্ষেত্রে এইচএসসির ফল মুখ্য ভূমিকা পালন করে, যদিও এসএসসি ও এইচএসসির ফলাফল ও ভর্তি পরীক্ষার ওপরই নির্ভর করে উচ্চশিক্ষার ক্ষেত্রে কোথায়, কিসে- কী বিষয়ে লেখাপড়া ও ক্যারিয়ার গঠনের সুযোগ পাবে, অর্থাৎ শিক্ষার্থীদের জীবনে গেটকিপারের ভূমিকা পালন করে এইচএসসির ফলাফল। এখন এই ফলাফল এবং পরীক্ষাগুলো যদি সুষ্ঠুভাবে সম্পন্ন না হয় তা হলে তার চেয়ে বেদনার আর কী হতে পারে?
২০১৯ সালের একেবারে শেষাশেষি বিশ্বে করোনার প্রাদুর্ভাব ঘটে এবং পরের বছরের ফেব্রুয়ারি-মার্চেই বিশ্বজুড়ে তা ছড়িয়ে পড়ে। বাংলাদেশও করোনা প্রাদুর্ভাবের বাইরে ছিল না, এখনো নেই। তবে আমাদের এখানে করোনার আক্রমণ ওইভাবে ভয়ঙ্কর হয়ে ওঠেনি- যেমনটা হয়েছিল যুক্তরাষ্ট্র-যুক্তরাজ্য-ইতালিসহ বেশ কয়েকটি দেশে। এমনকি আমাদের সবচেয়ে নিকটতম প্রতিবেশী ভারতেও করোনার হানা আমাদের তুলনায় ছিল ভয়ঙ্কর ও বিপদসংকুল পর্যায়ের। অথচ শিক্ষা প্রতিষ্ঠান বন্ধ রাখার ক্ষেত্রে আমরা বিশ্বজুড়ে রীতিমতো রেকর্ড করেছি।
ইউনেস্কোর এক গবেষণা বলছে- যেসব দেশে করোনার থাবা সর্বগ্রাসী পর্যায়ের ছিল, তাদের তুলনায়, এমনকি সবার থেকেই বেশিদিন শিক্ষা প্রতিষ্ঠান বন্ধ রেখেছি। অথচ যে যুক্তরাষ্ট্রে করোনার বিস্তার ছিল ভয়াবহ পর্যায়ের, তারা পর্যন্ত একটা দিনের জন্য শিক্ষা প্রতিষ্ঠান বন্ধ রাখেনি, এমনকি দক্ষিণ এশিয়ার কোনো দেশই শিক্ষা প্রতিষ্ঠান বন্ধের ক্ষেত্রে আমাদের পথে পা বাড়ায়নি। তা হলে আমরা কেন শিক্ষা প্রতিষ্ঠান বন্ধে এতটা গুরুত্ব দিলাম- এ প্রশ্নের যুতসই কোনো উত্তর নেই।
সরকারের শিক্ষা প্রতিষ্ঠান বন্ধের ক্ষেত্রে যুক্তিটা কী, সেটি পরিষ্কার না হলেও সবার মধ্যে একটা বিষয় জোরালোভাবেই চাউর রয়েছে যে, সরকার মিটিং-মিছিল-সভা-সমাবেশ ও আন্দোলনের উত্তাপ থেকে নিজেদের নিরাপদ রাখতেই শিক্ষা প্রতিষ্ঠান বন্ধ রেখেছে। যারা খুব বেশি পষ্ট করে কথা বলতে পছন্দ করেন, তারা মনে করেন- সরকার আন্দোলন থেকে নিজেদের দূরে রাখতেই শিক্ষা প্রতিষ্ঠান বন্ধ রাখার মতো আত্মঘাতী সিদ্ধান্ত নিয়েছে। সরকারের উচিত এসব কানাঘুষা ও চাউর হওয়া বিষষের যৌক্তিক ব্যাখা দেওয়া। তা না হলে মানুষের মধ্যে চাউর হওয়া বার্তাটাই সত্য বলে পরিগণিত হবে।
সরকার যদি শিক্ষার ক্ষেত্রে প্রকৃতই আন্তরিক হয়, তা হলে কথা নয়- কাজ দিয়ে, বাস্তবায়ন করে এর প্রমাণ হাজির করতে হবে। তা না হলে সব কথায় কেবলই কথার কথা বলে পরিগণিত হবে। দেশ স্বাধীন হয়েছে পঞ্চাশ বছর হলো, সুবর্ণজয়ন্তী পেরোল নানা উচ্ছ্বাসে । কিন্তু শিক্ষার ক্ষেত্রে কোনো বড় কিছু সিদ্ধান্ত গৃহীত হলো না। গত পঞ্চাশ বছরে অনেক শিক্ষামন্ত্রী এসেছেন, গেছেন- শিক্ষার হালহকিকত তিমিরেই রয়েছে এবং অবনমন হচ্ছে কেবলই। এই অবস্থায় আমাদের একজন চেঞ্জমেকার দরকার- যিনি শিক্ষার ক্ষেত্রে আমূল সংস্কার আনবেন। বর্তমান শিক্ষামন্ত্রীকে আমরা একজন চেঞ্জমেকার হিসেবে দেখতে চাই। তিনি প্রধানমন্ত্রীর নেতৃত্বে শিক্ষা খাতে আমূল সংস্কার সাধন করবেন এবং প্রকৃতার্থেই নিজেকে একজন চেঞ্জমেকারের ভূমিকায় হাজির করবেন, জারি রাখবেন আমাদের সবস্তরের শিক্ষার মান আন্তর্জাতিক পর্যায়ে নিয়ে যাওয়ার শুভচেষ্টাগুলো বাস্তবায়নে করণীয় দিকগুলো বাস্তবায়ন করার চেষ্টাকে ফলপ্রসূ করার লড়াই। যদি সেটি সত্যিই হয়, তা হলে এইচএসসির এই ফল নিয়ে আমরা মন খুলে আনন্দ করতে পারব। তা না হলে এই ফল শুধু শুনতে ভালো লাগবে, পড়তে ভালো লাগবে। কিন্তু জাতির ভাগ্যোন্নয়নের জন্য যে ধরনের শিক্ষিতজন তৈরি হওয়া দরকার, সেটি তৈরি হবে না।
এবারের এইচএসসির ফল এমন একটা সময়ে বেরোল- যখন শাহজালালে চলছে উপাচার্যের পদত্যাগের লক্ষ্যে শিক্ষার্থীদের মরণপণ লড়াই। এ আন্দোলনকে যদি আমরা আমলে নিই, তাদের দাবিগুলো বাস্তবায়নে আন্তরিক হই- তা হলে আখেরে আমাদের শিক্ষারই ব্যাপক উন্নতি সাধন হবে। শিক্ষা ক্ষেত্রে একটা গলদ ও বিষবৃক্ষ দানবীয় পর্যায়ে তার বিস্তার ঘটানোর চেষ্ট করছে। সেটি রোখাটা সময়েরই দাবি। এ দাবিকে উপেক্ষা করে আমরা কি শিক্ষার সর্বনাশ ঘটাব, নাকি এখান থেকে উত্তরণ ঘটিয়ে নিজেদের কল্যাণসাধন করব এবং শিক্ষানুরাগী জাতি হিসেবে বিশ্বমানে নিজেদের নতুন পরিচয় হাজির করব- এই সিদ্ধান্ত নেওয়ার সময় বোধ করি এখনই।
ড. কাজল রশীদ শাহীন : লেখক, সাংবাদিক ও গবেষক