
শান্তিরঞ্জন ভৌমিক ||
(পূর্ব প্রকাশের পর)
চলল।
রবীন্দ্র-সাহিত্য, রবীন্দ্র-সঙ্গীত নিষিদ্ধ করার সরকারি হুকুমনামা জারি হলো, নজরুল সাহিত্যকে খণ্ডিত করে গ্রহণ করার অপপ্রয়াস চলল, পাকিস্তানী মনোভাবপুষ্ঠ ভাষা ও সংস্কৃতি চর্চার দিক্নির্দেশনা সরকারিভাবে প্রবর্তিত হতে থাকল, এমন কি উর্দুকে বিদ্যালয়ের পাঠ্যসূচিতে অন্তর্ভক্ত করা হলো। কিন্থ একুশের চেতনা, ৫২’এর ভাষা আন্দোলনের সুদৃঢ় অবস্থান কোনোভাবেই তা মেনে নেয়নি। নেয়নি বলেই ৫৪’এর নির্বাচন, ৬২এর শিক্ষাকমিশনের বিরুদ্ধে সংগ্রাম, ৬৬-এর ছয় দফায় স্বায়ত্ত্বশাসন, ৬৯ এর গণ অভ্যুত্থান, ৭০এর নির্বাচন এবং ৭১’এর মহান মুক্তিযুদ্ধে বাঙালির অকুতোভয় অংশগ্রহণ ঐতিহাসিক অবস্থান হিসেবে আজ স্বীকৃত। এ সব সাফল্যের ভিত্তি হচ্ছে ৫২’এর ভাষা আন্দোলন।
আজ ৫২’এর ভাষা আন্দোলনকে কেবলমাত্র মাতৃভাষার মর্যাদাপূর্ণ স্বীকৃতি হিসেবে একটি একক আন্দোলন বিবেচনা করলে ঠিক হবে না। তার সুদূরপ্রসারী প্রভাব পড়েছে শিক্ষা-সংস্কৃতিতে, প্রগতিশীল আন্দোলনে, স্বাধিকার প্রতিষ্ঠায়, স্বাধীনতা সংগ্রামে এবং সর্বোপরি বাঙালি জাতির ঐতিহ্যরক্ষায়।
আজ একবিংশ শতাব্দীর প্রথম পাদে এসে যারা এ অবস্থানে দাঁড়িয়ে আত্মপরিচয়ের শ্লাঘায় উদ্বুদ্ধ হচ্ছি-আমরা নি:সন্দেহে ৫২’এর ভাষাআন্দোলনের ফসলভোগকারী প্রজন্ম।
বাংলা ভাষার ভবিষৎ
বাংলাদেশ আজ সার্বভৌম স্বাধীন রাষ্ট্র। আমাদের প্রাণের ভাষা বাংলা আজ রাষ্ট্রীয় স্বীকৃতিতে সমুজ্জ্বল। ড. মুহম্মদ শহীদুল্লাহর ভাষায় আজ জাতি ও ভাষা একাকার হয়েছে। অনেক ত্যাগ তিতিক্ষার পর, রক্ত ঝরানোর পর আপন মাকে মা বলার অধিকার পেলাম। এক সুবাতাস আমাদের ধমণীতে প্রবাহিত।
বাংলা আমার মা
বাংলা আমার প্রেম
বাংলা আমার জীবন
বাংলা আমার মরণ।
স্বাধীনতার সুবর্ণজয়ন্তী পালনকালে আমরা আজও কোথায় যেন হতাশ হই। বাংলাদেশের অনেক লেখাপড়া জানা লোককে যখন জিজ্ঞাসা করা হয়-স্বরবর্ণ ও ব্যঞ্জনবর্ণ কয়টি? সঠিক উত্তর দিতে পারেন কয়জন? ধ্বনি যে আকৃতি পেয়ে বর্ণ হয়, বর্ণ মিলিত হয়ে অর্থপ্রকাশ করলে শব্দ হয়, শব্দে বিভক্তি যোগ হলে পদ হয়, পদে পদে মিলিত হয়ে অর্থ প্রকাশ করলে বাক্য হয়, আর বাক্যগুলো মনের ভাব প্রকাশ করে ভাষা হয়-একথা কতজন জানেন! ব্যঞ্জনবর্ণে ২টি ‘ব’, দুটি জ (য) দুটি ণ, (ন), তিনটি শ (স, ষ), দুটি ত (ৎ), ঙ বা ং রাখার প্রয়োজন আছে কি? তা আমরা কতজন জানি? আমরা কি জানি যে, আকার, বর্ণ ও মাত্রার মধ্যে পার্থক্য কি, পংক্তি, চরণ ও স্তবকের পার্থক্য কোথায়? ব্যঞ্জনবর্ণের কয়টি বর্ণে মাত্রা নেই, ডানে বাঁয়ে মধ্যে মাত্রা কোনগুলোর-উচ্চারণের ধরণ কি! এসব প্রশ্ন করলে অনেকের কাছে অবান্তর মনে হবে। আমি বলতে চাই-যারা অর্থাৎ আমরা বাংলা ভাষার লালন করতে চাই-তারা সচেতন হচ্ছি না কেন। সাধারণ নিরক্ষর মানুষ জন্মগতভাবে ভাষা শিক্ষা গ্রহণ করে, ব্যাকরণ জানা তাদের জন্য জরুরি নয়। কিন্থ লালনের অধিকর্তারা মাতৃভাষাকে সম্মানের সাথে গ্রহণ কতটুকু করেছেন এ প্রশ্নটা প্রাসঙ্গিকভাবেই উঠে। আমাদের দেশের বৃত্তবানরা সন্তানদের শিক্ষা গ্রহণ করতে বিদেশে পাঠান, ইংলিশ মিডিয়াম স্কুলে ভর্তি করে ছোট শিশুকে দশবৎসরেই অজানা এ্যাকুরিয়াম করে তোলেন। এখনও আমাদের মানসিকতার খাট্নি রয়েছে, বাংলা ছাড়া অন্যভাষা শিক্ষার জন্য আমাদের যে প্রচেষ্টা-তা অনেক ক্ষেত্রেই হাস্যম্পদ। যদিও বাংলা ভাষার শব্দ ভাণ্ডার বিদেশী ভাষা থেকে এসে সমৃদ্ধ করেছে, আমরা উদারভাবে তা গ্রহণ করেছি আপন স্বভাব মানসিকতায়। এই বিষয়টি অনেকেই সহজভাবে গ্রহণ করতে চান না। অথচ যে আত্মবিশ্বাস নিয়ে বাঙালি জাতি আজন্ম সংগ্রাম করে টিকে আছে, সে সংগ্রাম এখনও শেষ হয়নি, বাংলা ভাষার শক্র আজ বাংলাভাষীরাই। আত্মপরিচয়ে দ্বিধা, আপন সংস্কৃতি চর্চায় অনুদারতা, নববর্ষ পালন, পৌষমেলা উদযাপন, বসন্তউৎসবের আয়োজন এমন কি একুশে অনুষ্ঠান উদযাপনে অনীহা বা প্রথাগত বিশেষ দিবস পালনে কৃত্রিমতাই মূলত আমাদের অসারতা ধরা পড়ে।
তাই প্রশ্ন ওঠে-বাংলা ভাষার ভবিষ্যৎ কি? জবাব জানা আছে, বলা যায়-পালন করা হয় না। এজন্যই আমরা অবহেলিত, ঘৃণিত। তবু আশা জেগে রয়-যখন বাংলা একাডেমির দিকে তাকাই, একুশের বইমেলায় মহামিলন ঘটে, নববর্ষে রমনার বটমূলে গানের আসর বসে, বসন্তের আগমনে বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র-ছাত্রীরা অনুষ্ঠানে মেতে ওঠে, মাঠে কৃষক গান গায়, মাঝি ভাটিয়ালী সুরে নৌকা চালায়, জাতীয় কবিতা উৎসবে কবিতাপ্রেমীরা শাশ্বত বাংলার জয়গান করে-আমি-আমরা নিজেদের ফিরে পাই।
তুচ্ছ মনে হয় প্রতিবন্ধকতা
প্রতিজ্ঞায় জীবন চলে
উজান স্রোতে-অন্য কোথা, অন্য কোনখানে।
ভিন্ন নিরিখে দুটি কথা বলে আমার কথা শেষ করতে চাই। আজ আমাদের দেশে পশ্চিমবঙ্গের অনেক কবি সাহিত্যিক শিল্পীদের সমাবেশ দেখতে পাই। তাঁরা এখানে কেন আসেন-এরূপ একটি প্রশ্ন মাঝে মাঝে আমাদের মনে উদয় হয়। নিভৃতে আলাপচারিতায় বুঝা যায়-ভারতের অঙ্গ রাজ্য পশ্চিমবঙ্গে বাংলাভাষাসেবী যাঁরা, তাঁরা আন্তরিকভাবেই অনুভব করেন-বাংলা ভাষায় জীবন যাপন করতে হলে বাংলাদেশই আজ তাঁদের তীর্থক্ষেত্র। এই অবগাহনের পবিত্রতায় নিজেদের আত্মতৃপ্তি ও আত্মমুক্তির জন্য এখানে আসা। সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়ের ভাষায়-‘বাংলাদেশই বাঙালিদের তীর্থক্ষেত্র।’ চলুন, আর আনুষ্ঠানকতা নয়, জীবনযাপনের সহজ বিকাশে বাংলাভাষাকে আমাদের একমাত্র সবকিছুর কেন্দ্রবিন্দু হিসেবে প্রতিষ্ঠা করি। (সমাপ্ত)