
বাংলাদেশ
পরিবেশ আন্দোলন (বাপা) ও বাংলাদেশ এনভায়রনমেন্টাল নেটওয়ার্কের উদ্যোগে
জ্বালানি, জলবায়ু ও টেকসই উন্নয়ন নিয়ে দুই দিনব্যাপী আন্তর্জাতিক সম্মেলনে
উদ্যোক্তা ও বিশেষজ্ঞরা যেসব বক্তব্য দিয়েছেন, সুপারিশ করেছেন, আপত্তি
তুলেছেন; তা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ বলে মনে করি। এ সম্মেলনে অংশগ্রহণকারীরা
কেউ সরকারের উন্নয়ন কর্মসূচিকে বানচাল করার বাসনা ব্যক্ত করেননি। বরং তাঁরা
বলেছেন, সরকারের উন্নয়ন পরিকল্পনা এমন হতে হবে, যাতে পরিবেশের ক্ষতি না হয়
এবং বৃহত্তর জনগণ সেই উন্নয়নের সুফল পায়।
বলার অপেক্ষা রাখে না যে
সরকার যেমন দেশের উন্নয়ন চায়, তেমনি সরকারের বাইরে যেসব গবেষক, বিশেষজ্ঞ
আছেন, তাঁরাও উন্নয়নের বিরোধী নন। তাহলে সরকারের চাওয়া ও বিশেষজ্ঞদের
চাওয়ার মধ্যে দ্বন্দ্ব কোথায়? দ্বন্দ্বের একটা বড় জায়গা হলো বিশেষজ্ঞরা মনে
করেন, টেকসই উন্নয়ন করতে হলে পরিবেশের কথাটি মাথায় রাখতে হবে। পরিবেশ না
বাঁচলে সেই উন্নয়ন আখেরে কোনো সুফল দেবে না। অনেক সময় দেখা যায়, জনগণের
দৈনন্দিন চাহিদা মেটাতে কিংবা দেশের অর্থনৈতিক উন্নয়নের পরিকল্পনা নিতে
গিয়ে সরকার পরিবেশ ও প্রতিক্রিয়ার বিষয়টি উপেক্ষা করে থাকে। বিশেষ করে
বাংলাদেশের মতো ছোট্ট অথচ জনবহুল দেশে পরিবেশ ও উন্নয়নের ভারসাম্য রক্ষা
করা সহজ নয়। বিশেষ করে যখন উন্নয়নের ফেরিওয়ালারা নানাভাবে সরকারের কাছ থেকে
নানা উন্নয়ন প্রকল্প অনুমোদন করিয়ে নিতে মুখিয়ে থাকেন।
২০০৯ সালে
আওয়ামী লীগ যখন ক্ষমতায় আসে, তখন বিদ্যুৎ খাতের অবস্থা খুবই শোচনীয় ছিল। এ
কারণে বিদ্যুতের চাহিদা মেটাতে সরকারকে রেন্টাল ও কুইক রেন্টাল
বিদ্যুৎকেন্দ্র স্থাপনের অনুমতি দিতে হয়। এ বিদ্যুৎকেন্দ্রগুলো মানুষের
জরুরি প্রয়োজন মিটিয়েছে সত্য, কিন্তু চড়া দামে। উদ্যোক্তারা ভর্তুকির নামে
কোটি কোটি টাকা হাতিয়ে নিয়েছেন এবং সরকার তাঁদের আইনিভাবে দায়মুক্তি দিয়েও
রেখেছে। সেটি ছিল আপৎকালীন ব্যবস্থা। এরপর সরকার একের পর এক কয়লাভিত্তিক
বিদ্যুৎকেন্দ্র প্রতিষ্ঠা করে চলেছে, যা নিয়ে বিশেষজ্ঞ ও পরিবেশবিদেরা শুরু
থেকে আপত্তি করে এসেছেন। বিশেষ করে সুন্দরবনের ক্ষতি করে রামপাল
বিদ্যুৎকেন্দ্র স্থাপন, কিংবা ইলিশের বড় আশ্রয়স্থল হিসেবে পরিচিত স্থানে
পায়রা বিদ্যুৎকেন্দ্র কেবল পরিবেশের জন্য ঝুঁকিপূর্ণ নয়, ভবিষ্যতে মারাত্মক
বিপর্যয় সৃষ্টি হওয়ার আশঙ্কা আছে।
যখন উন্নত দেশগুলো কয়লা ও
পরমাণুভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্র থেকে সরে এসে নবায়নযোগ্য বিদ্যুৎ উৎপাদনের
ওপর জোর দিচ্ছে, তখন সেই কয়লা ও পরমাণুভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্রের ওপর নির্ভর
করা কতটা যৌক্তিক, সেই প্রশ্নও আছে। দুই দিনের সম্মেলনে দেশি-বিদেশি
বিশেষজ্ঞরা বলেছেন, উন্নয়নের নামে পরিবেশ ধ্বংস করা যাবে না। ক্ষমতাবান
গোষ্ঠীর কাছে বিদ্যুৎ ও জ্বালানি খাত চলে গেছে বলে সরকারকে সতর্ক করে
দিয়েছেন বিশিষ্ট অর্থনীতিবিদ ও বাংলাদেশের প্রথম পরিকল্পনা কমিশনের সদস্য
রেহমান সোবহান। দেশের উন্নয়নের জন্য বিদ্যুতের প্রয়োজন আছে, আর চাহিদার
চেয়ে বেশি বিদ্যুৎ উৎপাদন করার পেছনে গোষ্ঠীস্বার্থই প্রাধান্য পেয়েছে।
সরকারের
উচিত অবিলম্বে জ্বালানি খাতের এই ক্ষমতাবানদের রাশ টেনে ধরা এবং সংশ্লিষ্ট
ব্যক্তিদের সঙ্গে আলোচনা করে পরিবেশবান্ধব ও বৃহত্তর জনগণের স্বার্থ রক্ষা
করে, এমন জ্বালানি নীতি গ্রহণ করা। বিদ্যুৎ উৎপাদন করলেই হবে না, দেখতে
হবে সেই উৎপাদনের সুফল কারা পাচ্ছেন এবং পরিবেশকে কতটা ঝুঁকিতে ফেলছেন।